সুত্রপাত / বই ও সিনেমা / হুমায়ুন আজাদের মহাআবিস্কার ‘নারী’

হুমায়ুন আজাদের মহাআবিস্কার ‘নারী’

মেহেদি আরিফঃ

হুমায়ুন আজাদের “নারী” এক অমর গ্রন্থ, মহাগ্রন্থ। বোধকরি এটা লেখকের মহাআবিস্কার। লেখক যুক্তি আর তথ্যের মহাসমুদ্রে হাবুডুবু খেয়ে এক ডুবুরীর কাজ করেছেন। তিনি তথ্য, উপাত্ত সংগ্রহ করে যুক্তির বেদিতে দাঁড়িয়ে সমাজের বুকে নারী- পুরুষের মধ্যকার বিরাজমান পার্থক্য দেখানোর চেষ্টা করেছেন।একজন সচেতন সমাজবিজ্ঞানীর বেশে তিনি সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে প্রবেশ করে সমাজের অন্তঃপুরের অবলাদের স্বপক্ষে মুখ খুলেছেন। পৃথিবীর খুব কমসংখ্যক পুরুষ আছেন যারা নারীদের স্বপক্ষে মুখ খুলেছেন। মুখ খোলার যে সাহস দরকার তা খুব কম সংখ্যক মানুষের আছে। এই অল্পসংখ্যক মানুষের মাঝে একজন ডঃ আজাদ।

নারীবাদী ডঃ আজাদ নারীর বিধাতা হিসেবে দেখেছেন পুরুষকে। কর্তার ইচ্ছা যেমন কর্ম তেমনি পুরুষের ইচ্ছাতে নারী উঠবে, বসবে, আদেশ পালন করবে হোক সেটা তাদের পক্ষে বা বিপক্ষে। মনোবিজ্ঞানী ফ্রয়েডের তিনি এক হাত দেখে নিয়েছেন। নারীদের নিয়ে ফ্রয়েডের সমালোচনাকে তিনি প্রবলভাবে কটাক্ষ করেছেন। তিনি তাকে আদিম পিতৃতন্ত্রের এক প্রখ্যাত ও প্রভাবশালী উত্তরপুরুষ হিসেবে বিবেচনা করেছেন। ফ্রয়েড মনে করতেন যে, ‘নারী কোন একটি অঙ্গকে হারিয়ে ফেলেছে। তাই নারী নাকি পুরুষের পুরুষাঙ্গটিকে ঈর্ষা করে’। সিমন দ্য বোভোয়ার মনে করেন, ‘পুরুষ হচ্ছে অনিবার্য, অপরিহার্য, অবধারিত; আর নারী হচ্ছে আকস্মিক, অপ্রয়োজনীয়, সংখ্যাতিরিক্ত।’ সমাজ পুরুষকে মনে করে ধ্রুব আর নারীকে মনে করে আপেক্ষিক। রাজকবি টেনিসন মনে করেন, “নারী শিকারী আর পুরুষ শিকার”। সঙ্গম এখন হয়ে উঠেছে একধরনের সমর। আজাদ মনে করেন যে সঙ্গম এখন এক ধরনের রাজনীতি। ‘সেক্স’ ও ‘জেন্ডার’ এই দুইটি শব্দের পার্থক্য দেখিয়ে লেখক বলেন ‘সেক্স’ জৈবিক আর ‘জেন্ডার’ মনস্তাত্ত্বিক অর্থাৎ সাংস্কৃতিক। তিনি মনে করেন, “নারীপুরুষ মেয়েলি বা পুরুষালি গুণ নিয়ে জন্ম নেয় না; জন্মের পরে সমাজসংস্কৃতির চাপে তারা অর্জন করে মনোলৈঙ্গিক ব্যক্তিত্ব”।

পুরুষ নিয়ন্ত্রন করে একটি সংস্থা যার নাম পরিবার, এই পরিবারের যূপকাষ্ঠে বলি জীব হল নারী। নারী শোষণের মহত্তম যন্ত্রটির নাম হল পিতৃতন্ত্র। জমি আর নারী পুরুষের কাছে এক। পুরুষের সুবিধার সাম্রাজ্যে সূর্য কখনও অস্ত যায়না। একই ভাবে নারীর অসুবিধার রাজ্যে কখনও চাঁদ উঠেনা। তাইতো সতীদাহ প্রথার মত জঘন্য প্রথার বিষবাষ্প থেকে রক্ষা পায়নি নারী সমাজ। বহু ঘাত-প্রতিঘাতের পর ১৮৫৬ সালে এই ভয়ংকর প্রথা বিদায় নেয়। রুশো, রাসকিন, রবীন্দ্রনাথ কিংবা জন স্টুয়াট মিল কে তিনি দুষেছেন। রুশোর দর্শনে নারী পুরুষের কামের সামগ্রী, আর তার স্থান পুরুষের অধীনে। আজাদ মনে করেন যে কুসংস্কারের মন্দিরে রুশো বলি দিয়েছেন নারীকে। সঠিক পিতৃত্বের ব্যাপারে কথা বলেছেন রুশো, কিন্তু নিজেই ছিলেন কামার্ত লম্পট, অনেক অবৈধ সন্তানের জনক তিনি। তিনি সুযোগ বুঝেই নারীকে করেছেন গর্ভবতী। অথচ তিনি নারীর বিরুদ্ধে কলম ধরেছেন সগর্বে। তিনি নারীকে সতী রূপে পেতে চেয়েছেন-এক দেহে মেরি ও মেরেলিন মনরো। রুশোর মত রাসকিন, রবীন্দ্রনাথ কিংবা মিল ও পুরুষ আধিপত্যের স্বপক্ষে কথা বলেছেন। রবীন্দ্রনাথ ভাবতেন, “পুরুষের আছে বীর্য আর নারীর আছে মাধুর্য”।

বিভিন্ন মনীষীর উদ্ধৃতি আর গবেষণার ডালি নিয়ে আজাদ সাজিয়েছেন তাঁর “নারী” বইটি। বিভিন্ন ধর্মের উদ্ধৃতি দিয়ে সাহিত্যের কুশীলব ডঃ আজাদ নারী যে সমাজে নিগৃহ তা প্রমাণ করতে চেয়েছেন। তিনি এম হেদায়েতুল্লাহ নাম্নী এক বোদ্ধার বিবৃতি দিয়ে বলেছেন, “ইসলামে বিয়ে ঐশী ধর্মানুষ্ঠান নয়, বিয়ে একটি রসকসহীন কর্কশ চুক্তি”। হেদায়েতুল্লাকে আল্লাহ হেদায়েত করুন। যুক্তির খাতিরে ইসলামী শরিয়ত চলতে পারেনা। এটা চলবে এর নিজস্ব গতিতে অন্যের মতিতে নয়। আজাদ মনে করেন যে একজন পুরুষের পক্ষে তিন তালাক বলে দিলেই তালাক হয়ে যাবে। না এত সহজ কোন কিছু নয় এটা। এটা ছেলের হাতের ললিপপ নয়। একজন পুরুষের চার জন স্ত্রী থাকলে কেন একজন নারীর চার জন স্বামী থাকবে না, এ ধরণের চিন্তা পাগলামি করার সামিল। একজন স্ত্রী লোকের চারজন স্বামী থাকলে তার গর্ভের বাচ্চা কোন স্বামীর এটা বোঝা মুশকিল। আজ হয়তো চিকিৎসা বিজ্ঞান অনেক এগিয়েছে তাই নির্ণয় করা যায় যে এটা কোন স্বামীর বাচ্চা। কিন্তু আগে এই সুযোগ ছিল না।

আজাদ জমাজমি বণ্টনের ক্ষেত্রে নারী পুরুষের যে পরিসংখ্যান দেখিয়েছেন তা গ্রহণযোগ্য নয়। যুক্তির কষ্টিপাথরে যাচাই করলে তা মূল্যহীন মনে হয়। ইসলাম এবং অন্যান্য ধর্মে নারীর অবস্থান দেখিয়েছেন, ভাল করেছেন। কিন্তু আলোর দিক তিনি কম ফুটিয়ে তুলে অন্ধকারে নারীর অধিকার হাতড়িয়েছেন। ইসলাম নারীর যে মর্যাদা দিয়েছে সেটা তিনি যুক্তির শিকলে বাঁধতে চেয়েছেন, কিন্তু গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে তিনি এর সমাধান পেতেন। তাই সবার আগে ধর্মীয় জ্ঞান দরকার। নারী পুরুষের সাহায্য ছাড়া যেমন চলতে পারেনা, তেমনি পুরুষ ও পারেনা নারীকে ছাড়া চলতে। আমাদের ধর্মীয় বিষয় খুব ভালভাবে জেনে তারপর আলোচনা করা উচিত। সব কিছুর উত্তর আছে। আমাদের উচিত উত্তর খোঁজার। নারীপুরুষ উভয়কেই তাদের মন মানসিকতার পরিবর্তন করা দরকার। অজ্ঞ লোকের সাথে কথা পেড়ে লাভ নেই। এরা বোঝে কম, বকে বেশি। “নারী” বইটি হল বিভিন্ন তথ্যের এক অফুরন্ত ভাণ্ডার। এটির সাহিত্যিক মান খুবই উঁচুদরের। সাধারণ পাঠকের কাছে এটি অসাধারণ একটি বই, জ্ঞানীর কাছে বিশাল তথ্যের ভাণ্ডার, আর নারীবাদীদের কাছে বাইবেল সম। তাই বলে এটি সকলের কাছে অন্ধবিশ্বাসের চূড়ান্ত রূপ হতে পারে না।

শেয়ার করুন
  • 15
    Shares

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!