সুত্রপাত / ইতিহাস / স্মৃতিপট

স্মৃতিপট

মোর্শেদ আলম শাকিল:

একদিন চলতে চলতে হারিয়ে যাব পড়ে থাকবে কিছু পায়ের চিহ্ন। আস্তে আস্তে সে চিহ্নগুলোও হয়তো প্রকৃতির সাথে বিলিন হয়ে যাবে আমার ফুল বাগানের ফুল গুলোর দিকে তখন আর কারো নজর হয়তো পড়বে নাহ। কিছু ফুলগাছ মরে যাবে, কিছু ফুলগাছ হয়তো বা স্থান পাবে অন্যের ফুল বাগানে আমার রুমের দেওয়ালে হয়তো বড় করে আমার একটা ছবি টাঙিয়ে রাখা হবে কোনো অবুঝ শিশু যখন জিজ্ঞাসা করবে, “ছেলেটি কে?” তখন আম্মু মুখে কাপড় চেপে কেঁদে বলবে, “ওটা আমার ছেলে সাকিল”।
টেবিলে কলম দিয়ে আচর কেটে লেখা প্রত্যেকটা লেখা’ই তখন থাকবে, শুধু থাকবো না, এই আমিই বন্ধুরা থাকবে, তাদের সেই আড্ডা-খুনশুটিও থাকবে, থাকবে একটা সিগারেট ১০জনে ভাগ করে খাওয়ার অভ্যাসটাও, তবে সেখানে তখন একটা মানুষ এর খুব অভাব পড়বে, এই আমার’ই সবার কানের কাছে ভোমরা পোকার ন্যায় গুনগুনিয়ে ডিস্টার্ব করার মানুষটা সেদিন থাকবে না পাড়ার মোড়ের জামাল চাচার চায়ের দোকানটা হয়ত থাকবে, কিন্তু বেশি করে চিনি দিয়ে চা খাওয়া কোনো একটা ছেলে সেদিন থাকবে না, থাকবে না পায়ের উপর পা তুলে সিগারেট খাওয়া ছেলেটা ফেইসবুকের মানুষগুলো তখন আর শুনতে পাবে না, “ভালো আছি বলেই তো এখনো ফেবুতে আছি” কারণ, তখন এই পাশের মানুষটি যে ভালো থাকবে না।

ঢিল ছুড়ে অন্যের বাগানের আম চুরি করার জন্য অনেক ছেলে আসবে,শুধু আসবে না এই “নীরব” ছেলেটি’ই। মৃত্যুশয্যায় শুয়ে তখন অনেক বাচতে ইচ্ছা হবে, আর কয়েকটা বছর শুনতে ইচ্ছা হবে,”মোবাইলটা রেখে এইবার একটু পড়তে বস” কোনো একসময় কোনো একটা মানুষের প্রধান কাজ হবে হয়ত প্রতিদিন ব্যাগে করে ঔষধ আনা-নেওয়া। কোন একদিন আর কাউকেই ঔষধ আনতে হবে না, প্রয়োজন ফুরাবে ফার্মেসীতে আসা-যাওয়ার।

খাবার টেবিল এর একটা চেয়ার ফাকা থাকবে, বাসার সবাই চেয়ারটার দিকে তাকিয়ে থাকবে,আম্মু চেয়ারটির দিকে তাকিয়ে সেদিন আর খেতে পারবে না, চেয়ার ছেড়ে উঠে চলে যাবে সোজা আমার রুমে, আনাচে কানাচে আমাকে খুঁজবে, কিন্তু
পাবে না। আব্বু কোনো এক সন্ধ্যায় ভুল করে আমার পছন্দের ডিমের চপ এনে আমাকে ডাকবে, কিন্তু কোনো উত্তর পাবে না। চপ গুলো রুমের কোনো এক কোণায় ফেলে দিয়ে মন খারাপ করে নিজের রুমে গিয়ে শুয়ে পড়বে।

স্কুল গেটের কাছে রাজা কাকা সেদিনও হয়তো ঝালমুড়ি বিক্রি করবে, চুলগুলোয় হয়ত পাক ধরবে, দাড়ি-গোফেও হয়তো হালকা পাক ধরবে তখন আর কাকাকে একটি ছেলে বলবে না,”কাকা বেশি করে মরিচ দিয়ে ঝালমুড়ি বানাও তো” আমার উপর অভিমান করা কিছু মানুষ সেদিন আর অভিমান করবে না, চোখের কোণায় দুফোটা জল নিয়ে বলবে,”নীরব তোকে খুব মিস করছি” আমাকে ঘৃণা করা মানুষগুলোও হয়ত আমার মৃত্যুর দিনে আব্বু-আম্মুর পাশে এসে দাড়াবে, চোখ থেকে একটু পানি ঝরবে, তারপর আড়ালে গিয়ে হয়ত বলবে,”শয়তানটা গেছে ভালো হইছে”।

রুমের টেবিলে রাখা পেঁচিয়ে যাওয়া হেডফোনটারও কাজ শেষ হবে। চলে তো একদিন যাবই তবে রেখে যাব একরাশ স্মৃতি, মৃত্যু জিনিষটা সত্যিই খুব ভয়ঙ্কর  শত পাতার ভীর থেকে একটি পাতাকে হঠাৎ করে উড়িয়ে নিয়ে যায়। কিন্তু ঝরে যাওয়া পাতাটি হয়তো বাকি পাতাদের ছেড়ে যেতেই চায় না। আমিও যে যেতে চাই না কিন্তু মৃত্যুর কাছে যে সবাইকে হার মানতেই হবে আচ্ছা, মানুষ এর নাহয় মৃত্যু হয় কিন্তু মানুষ এর রেখে যাওয়া স্মৃতিগুলোর কখনো মৃত্যু হয় না কেন?

লেখক: অনলাইন এক্টিভিষ্ট।

শেয়ার করুন
  • 44
    Shares
error: Content is protected !!