সর্বশেষ সংযুক্তি

লালু

সীমান্ত বড়ুয়াঃ 

সকাল ১০টা। পুরনো ধাঁচের দোতলা বাড়ির গেইটে ছোট্ট একটা সাইনবোর্ডে লেখা “রহমান ম্যানশন”। বাড়ির উঠোনে জনাব ফারুখ রহমান সাহেব বেতের মোড়ায় বসে আছেন। রোদ এসে ঠেকছে তার গায়ে কিন্তু তিনি উঠছেন না। একটু পর পর তার কপালে ভাজ পড়ছে । খুব চিন্তিত দেখাচ্ছে তাকে। ফারুখ সাহেব সিগারেট ধরালেন। এ নিয়ে পর পর দুইটা সিগারেট ধরানো হলো। সচরাচর এমনটা করেন না তিনি। ফারুখ সাহেবের অভ্যাস হলো সিগারেট খাওয়ার সময় প্রচুর থুথু ফেলেন। টানা দুইটা সিগারেট খাওয়ায় মোড়ায় চারপাশ থুতুতে ভর্তি হয়ে গেল। সেগুলোর উপর কিছু বদ মাছি ভনভন করছে আবার উড়ে এসে বসছে ফারুখ সাহেবের গায়ে। তিনি প্রায়ই শব্দ করেই শুয়োরের বাচ্চা বলে মাছি তাড়ালেন। পরপরই নিজের উপর প্রচন্ড বিরক্ত হলেন। আজকাল অতি তুচ্ছ কারনেই তার মেজাজ বিগড়ে যাচ্ছে। তার যে বয়স হচ্ছে এটি একটি লক্ষণ । তবে এই মূহুর্তে তার মেজাজ খারাপ হওয়ার কারন শুধুমাত্র বদ মাছির উৎপাত নয়। ফারুখ রহমান সাহেব তার মেজাজ খারাপের কারনগুলো একে একে সাজাতে লাগলেন।

কারন ১ – তিনি চায়ের কথা বলেছেন প্রায় ৩০ মিনিট হতে চললো তাকে এখনো চা দেওয়া হয়নি। খালি পেটে সিগারেট খাওয়াতে তার বমি বমি লাগছে। কারন ২ – অনেক কষ্টের পর তিনি মনমতো একটি গরু কিনেছেন ঠিক কিন্তু বাড়ি আনার পর থেকে গরু কিছুই মুখে দিচ্ছে না। গরুটি অসুস্থ হলে তার কোরবানী কবুল হবে না।

কারন ৩ – একটু আগে তিনি জানতে পারলেন গতকাল দুপুর নাগাদ এক মধ্যবয়সী লোক তার বাড়ির গেইট ধরে অনেক্ষণ দাঁড়িয়ে ছিলো। কোন কু মতলব ছাড়া কেউ এভাবে গেইট ধরে ঘন্টার পর ঘন্টা দাঁড়িয়ে থাকবে না। ফারুক সাহেব বাড়ির গেইটের দিকে তাকালেন। সেখানে কাঁঠাল গাছের নিচে কোরবানীর জন্য কেনা গরুটি বাঁধা আছে। পাশেই তার পাঁচ বছরের নাতি ফয়সাল খেলছে পাশাপাশি সে গরুটির সাথে কথাও বলছে। গরুটি একটু পর পর মাথা নেড়ে যেন তার কথায় সায় দিচ্ছে। ফয়সালের হাতে একটা লাঠি, সেটা দিয়ে গোবরের মধ্যে সে কিছু খুঁজছে আবার লাঠিটা নাকের কাছে এনে শুঁকছে। এমন জঘন্য দৃশ্য দেখে ফারুখ সাহেবের গা গুলিয়ে বমি আসার উপক্রম হলো। তিনি বিড়বিড় করে বললেন মা যেমন বদের বদ ছেলেটাও হয়েছে বদ। তিনি সবকিছু উপেক্ষা করে আবারো গরুটার দিকে তাকালেন। গরুর সাইজ বিশাল, দেখলে চোখ জুড়িয়ে যায়। এই প্রথম তিনি এত বড় গরু কোরবানী দিতে যাচ্ছেন। এই উপলক্ষে তিনি আত্নীয়-স্বজনদের খবর দিয়েছেন যেন একবার হলেও স্বচক্ষে এই গরু দেখে যায়।

তিনি কয়েকজনের কাছে শুনেছেন আজকাল গরুগুলোকে নাকি ইঞ্জেকশন দেয়ার ফলে তাদের পেট ভরা থাকে তাই তারা কিছু খেতে চায়না। আবার একজন বলেছে কয়েকটি গরু নাকি স্ট্রোক করে মারাও গেছে। তিনি গরুর মালিক আর গরুকে উদ্দেশ্যে করে একটি অশ্লীল গালি দিলেন। বেলা বাড়ছে। একটু আগে ফয়সাল গোবরমাখা লাঠি হাতে এসে বলছে,” দাদা আম্মা কইছে তোমারে রোদে বসে না থাইকা ঘরে যাইতে। ” রহমান সাহেব তাকে তাড়ানোর ভঙ্গি করলেন। মনে মনে বললেন তোর ঢংগী মারে গিয়ে বল ঘরে বসে থাকতে।

তবে এই রোদে বসে থাকতে তার মোটেও ভাল লাগছে না। তিনি বসে আছেন অন্য কারনে। তিনি গেইটের দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন। গতকাল গেইট ধরে দাঁড়িয়ে থাকা লোকটির অপেক্ষা করছেন। তিনি জানেন এসব বদ লোকেরা কোন আকাম করার আগে বাড়ির চারপাশে চক্কর দিতে থাকে তারপর সুবিধামতো প্ল্যান বানায়। তিনি এলাকার মাস্তান ছামছুকে বলে রেখেছেন। কল দেয়া মাত্রই ছামছু তার দলবল নিয়ে হাজির হবে।
সূর্য এখন ঠিক মাথার উপর এসে পড়েছে কিন্তু এখনো কেউ আসার নাম গন্ধ নেই।

বেলা ১২.৩০ টার দিকে রহমান ভিলার গেইটের সামনে মধ্যবয়সী একটি লোককে হাটাহাটি করতে দেখা গেল। লোকটির পরনে লুঙ্গী আর ময়লা শার্ট। ছেঁড়া পকেট সামনের দিকে ঝুলে আছে। হাতে মোটা চটের ব্যাগ। গেইট খুলে লোকটি খালি পায়ে সোজা ফারুখ সাহেবের দিকে আসতে লাগলো। ফারুখ সাহেব উঠে দাড়ালেন তবে তার মুখ দিয়ে কোন শব্দ বের হলোনা।
লোকটি ফারুখ সাহেবের সামনে এসে দাড়ালো।রোদে পোড়া চেহেরার বেটে খাট একজন মানুষ। তার দুই হাতই মুষ্ঠীবদ্ধ। মনে হচ্ছে খুব কঠিন কিছু করতে যাচ্ছে সে। এরপর লোকটি তার চটের ব্যাগে হাত দিল। এক অজানা আশঙ্কায় ফারুখ সাহেবের ভীতর দিয়ে শীতল শ্রোত বয়ে গেল। তার মনে হলো অনন্তকাল ধরে তিনি দাঁড়িয়ে আছেন। নীরবতা ভেংগে প্রথম কথা বললো লোকটি।

“আসসালামুয়ালাইকুম সাব, আমি ছগীর। এই লন আপনার টেকা। লালুরে ফেরত নিতে আইছি। লালুরে দিয়া দেন।” ফারুখ সাহেব এখন লোকটিকে চিনতে পেরেছেন। ইনি গরুর মালিক যার সাথে ঘন্টাখানেক দরদামের পর তিনি গরুটা কিনেছিলেন। আর লালু হলো কাঁঠাল গাছে বাঁধা গরু। লোকটি একটু দম নিয়ে আবারো বলতে শুরু করলো, “সাব, নিজের পোলার মতো করে বড় করছি লালুরে। নিজের হাতে খাওয়াইছি। বাড়ির লোকের মতোই হয়ে গেছিলো লালু। সাব, অভাবের সংসার। টাকার লোভে পড়ে তারে বেচছি। বড়ই অন্যায় করছি, সাব। কালকে থেইকা আমার পোলাডা খানাপিনা বন্ধ কইরা দিছে। পাগলের মতো ছুটে আইছি আপনের কাছে।”

এই প্রথম ফারুখ সাহেববের মুখ দিয়ে কথা বের হলো। তিনি কঠিন মুখ করে বললেন, তা কি করে হয়! আজ বাদ কাল কোরবান। কোরবানীর গরু আমি কেমনে ফেরত দেই! পাগলামী করেন? ভালই ভালই বিদায় হন। নইলে ,,,,,,, ফারুখ সাহেব কথা শেষ করার আগেই লোকটি তার পা জড়িয়ে ধরে কাঁদতে লাগলো। “দয়া করেন,সাব। পোলাডারে কথা দিয়া আইছি লালুরে ফেরত লইয়া যাব।”

ফারুখ সাহেব হুঙ্কার দিয়ে উঠলেন। পা ছাড় হারামজাদা বলে পা সরিয়ে নিলেন লোকটি ছিটকে মাটিতে পড়ে গেলো। তোকে আমি পুলিশে দিব হারামজাদা। মগের মুল্লক পাইছোস? বেচা গরু ফেরত নিতে আসছোস! এক্ষুণি বিদায় হ এখান থেকে। এক্ষুণি পুলিশ ডাকতেছি বলে চিৎকার করতে করতে তিনি বাড়ির দিকে চলে গেলেন। কিন্তু পুলিশে ফোন করলেন না তিনি। ফোন করলেন ছামছুকে। তারপর সিগারেট ধরিয়ে বারান্দায় এসে দাঁড়ালেন। লোকটি এখনো যায়নি। সে গরুটির গলা জড়িয়ে ধরে গরুর সাথে কথা বলছে। রহমান সাহেবের মুখ রক্তবর্ণ হয়ে উঠলো। অস্ফুট স্বরে তিনি কি যেন বললেন বোঝা গেল না। একটু পর লোকটি গেইটের দিকে রওনা হলো। হাটতে হাটতে শার্টের হাতায় কয়েকবার চোখ মুছলো। গেইট পার হতে গিয়ে গেইটের সাথে ধাক্কা খেল একবার। পিছনে ফিরে আবারো গরুটির দিকে তাকালো লোকটি তারপর দ্রুত হেটে মূহুর্তের মধ্যে ফারুখ সাহেবের দৃষ্টিসীমানার বাইরে চলে গেল। ফারুখ সাহেব হাফ ছেড়ে বাঁচলেন।

খাওয়া দাওয়ার পর ফারুখ সাহেব সময়মতো ঘুমাতে গেলেন। পরদিনের যাবতীয় কাজের একটা প্ল্যান বানালেন। অনেক রাত অবধি তার ঘুম এলোনা। ঘুম আর জাগরনের মধ্যে তিনি অদ্ভূত এক স্বপ্ন দেখলেন। তিনি তার মাকে দেখলেন স্বপ্নে। তার মা লালুর পিঠে বসে আছে আর রশি ধরে তিনি টেনে নিয়ে যাচ্ছেন। মাকে তিনি শেষবাররের মতো দেখেন ছোটবেলায় তখন তার মা ছিলো অল্পবয়স্ক। স্বপ্নেও তার মাকে জোয়ান আর রূপবতী লাগলো। তবে তার পরনে ছিলো হাফ প্যান্ট আর সেন্ডো গেঞ্জী। স্বপ্ন বলেই ব্যাপারটা তার কাছে স্বাভাবিকই মনে হলো। কিছুক্ষন পর তারা এক মরভূমির উপর চলে আসলো। প্রচন্ড রোদে পিপাসায় তার গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেলো। এরপর ঘুম ভেংগে গেল। তিনি দরদর করে ঘামছেন তখন। বাকি রাতটা তিনি জেগেই কাটিয়ে দিলেন।

পরদিন সকালে রহমান ম্যানশনের ভিতরে ছোটকাট একটা ঝড় উপস্থিত হলো। ফারুখ সাহেব খুব ভোরে পাঞ্জাবী পড়ে বেরিয়েছেন কসাই আনতে যাবেন বলে। এরপর থেকেই তিনি লাপাত্তা। বেলা বাড়ার সাথে সাথে সবার উৎকণ্ঠা কান্নাকাটিতে রূপ নিলো।

অন্যদিকে ছাত্তারপাড়া বস্তির এক ভাংগা ঘরের সামনে পৃথিবীর সবথেকে সুন্দরতম দৃশ্যটি ঘটে চলেছে। নোংরা কাপড় পড়া মধ্যবয়স্ক এক ব্যক্তিকে জড়িয়ে ধরে কান্না করছেন ফারুখ সাহেব। তিনি মনে মনে বললেন আজ তার জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিন। তার মনে হলো চোখের পানিতে তার জীবনের সমস্ত পাপ ধুয়ে মুছে চলে যাচ্ছে ।

কিছুক্ষন পরের ঘটনা, রহমান সাহেব পিরিচবিহীন এক নোংরা কাপ হাতে নিয়ে চোট্ট একটি চৌকিতে বসে আছেন। একটু পরপর তিনি চায়ের কাপে চুমুক দিচ্ছেন। দূর থেকে তাকে দেখে মনে হবে স্বর্গের কোন অমৃত পান করছেন তিনি। অন্যদিকে ছগীর ও তার ছেলে অপলোক দৃষ্টিতে লালুর দিকে তাকিয়ে আছে। লালু মাথা নিচু করে ভাংগা বালতি থেকে পানি খাচ্ছে। আর তাই বিমোহিত হয়ে দেখছে দুজন যেন স্বর্গীয় কোন অপরূপ ঘটনা ঘটে চলেছে তাদের সামনে।

শেয়ার করুন
  • 52
    Shares

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!