সর্বশেষ সংযুক্তি
সুত্রপাত / মুক্তমত কলাম / রোহিঙ্গা সংকট ও বর্তমান বাংলাদেশ

রোহিঙ্গা সংকট ও বর্তমান বাংলাদেশ

মোঃ আরাফাত রহমানঃ

মিয়ানমারের জাতিগত সহিংসতার কারণে ১৯৭৮ সাল থেকে এ যাবৎ বিভিন্ন সময়ে লাখ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। ৩৯ বছর ধরে বাংলাদেশ বাস্তুহারা রোহিঙ্গাদের ধারণ করলেও এ পর্যন্ত কোনো সরকারই উল্লেখযোগ্যসংখ্যক রোহিঙ্গাকে নিজ দেশে ফেরত পাঠাতে সক্ষম হয়নি। বিভিন্ন সময়ে আলাপ আলোচনার মাধ্যমে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশকারী রোহিঙ্গাদের একটি ক্ষুদ্র অংশকে মিয়ানমার সরকার ফেরত নিয়েছে। কিন্তু আবার জাতিগত সহিংসতা সৃষ্টির মাধ্যমে বা সেনা অভিযানের মাধ্যমে রাখাইনে বসবাসরত রোহিঙ্গাদের বেশির ভাগকেই বাংলাদেশে অনুপ্রবেশে বাধ্য করেছে। যা হোক, মানবিক কারণে বাংলাদেশ সরকার সীমান্ত উন্মুক্ত করে দিয়ে বাস্তুহারা রোহিাঙ্গাদের অনুপ্রবেশের যে সুযোগ দিল, তাতে আন্তর্জাতিক মহলে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হয়েছে নিঃসন্দেহে। আমি মনে করি, অবাধে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের সুযোগ দেওয়া অনেকটা খাল কেটে কুমির আনার মতো ঘটনা। কারণ গনহারে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের ফলে বেশ কিছু ঝুঁকির ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে কিংবা হতে যাচ্ছে, যা দেশের দক্ষিণ পূর্বাঞ্চলের সামাজিক নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বিনষ্ট করতে যথেষ্ট।

জাতিসংঘের সূত্র মতে, বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী টেকনাফ ও উখিয়ায় আশ্রয় নেওয়া বাস্তুহারা রোহিঙ্গার সংখ্যা ১৫ লাখেরও বেশি। আন্তর্জাতিক চাপের মুখে রাখাইনে বসবাসরত রোহিঙ্গাদের ওপর মিয়ানমার সেনাবাহিনীর নির্যাতনের মাত্রা কিছুটা হ্রাস পেলেও গড়ে প্রতিদিন ৭০০-৮০০ শত রোহিঙ্গা দলে দলে বাংলাদেশে আসছে। স্থানীয় দালালচক্রের সহায়তায় সাম্প্রতিক সময়ে মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করছে, সহানুভূতি পেতে গণমাধ্যমের সামনে চলছে সত্য-মিথ্যার সংমিশ্রণে করুণ নির্যাতনের বয়ান। সময় থাকতে সরকারের উচিত এই দালালচক্রের মূল হোতাদের চিহ্নিত করে অতিদ্রুত আইনের আওতায় আনা। রোহিঙ্গারা বুঝতে পেরেছে যে রাখাইনে থাকার চেয়ে বাংলাদেশে থাকাটাই তাদের জন্য আর্থিকভাবে বেশি লাভজনক। ফলে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে সীমান্তবর্তী অঞ্চলগুলোতে তাদের সংখ্যা দিন দিন বেড়ে চলছে এবং এসব অঞ্চলে বাঙালি জনগোষ্ঠী সংখ্যালঘুতে পরিণত হয়েছে।

২০১১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী টেকনাফ ও উখিয়া উপজেলায় বসবাসকারী বাঙালি জনগোষ্ঠীর সংখ্যা প্রায় পৌনে পাঁচ লাখ। রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ অবিলম্বে বন্ধ করা উচিত। সময় থাকতে কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে টেকনাফ-উখিয়া অঞ্চলে মিয়ানমার থেকে আগত রোহিঙ্গাদের প্রভাব-প্রতিপত্তি যে দিন দিন বেড়ে যাবে সে ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই। সীমান্তসংলগ্ন এলাকায় বিশাল আয়তনের আশ্রয় শিবির গড়ে তোলা দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের জন্যও হুমকিস্বরূপ সরকারকে বিষয়টি ভেবে দেখতে হবে। তারা যাতে আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াতে না পারে সে জন্য সরকারকে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের পরামর্শে দ্রুততার সঙ্গে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।

বাস্তুহারা রোহিঙ্গার আড়ালে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে উগ্রবাদী জঙ্গি নেটওয়ার্কের সদস্যদের অনুপ্রবেশ ঘটার যথেষ্ট আশঙ্কা আছে। বাংলাদেশকে অস্থিতিশীল ও অকার্যকর রাষ্ট্রে পরিণত করার লক্ষ্যে বাংলাদেশের অখ-তা তথা স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বে অবিশ্বাসী দেশি-বিদেশি বিভিন্ন চক্র নানা কৌশলের আশ্রয় নিয়ে ত্রাণ বিতরণের নামে রোহিঙ্গাদের সংস্পর্শে যাচ্ছে এবং তাদের সংগঠিত করার চেষ্ঠা চালাচ্ছে। নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের আঞ্চলিক নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলতে অশুভ মহল বাস্তুহারা রোহিঙ্গাদের ব্যবহার করতে পারে। বাংলাদেশের মাটিতে রোহিঙ্গাদের অবস্থান পাকাপোক্ত করার পাঁয়তার চলছে। বিভিন্ন স্বার্থান্বেষী মহল নেপথ্যে থেকে তাদের মিয়ানমারে ফিরে না যাওয়ার ব্যাপারে উৎসাহিত করছে। এ ব্যাপারে সরকারের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে আরো তৎপর হওয়া প্রয়োজন। এরই মধ্যে কিছু আলামত লক্ষ করা গেছে। ঠিকানাবিহীন রোহিঙ্গা অধিকার প্রতিষ্টা কমিটির নামে ২১ দফা দাবিসংবলিত ব্যানারে ছেয়ে গেছে আশ্রয়কেন্দ্রগুলোর চারপাশের এলাকা।

রোহিঙ্গারা দাবি করছে ২১ দফা নিঃশর্ত বাস্তবায়িত হলে তবেই তারা মিয়ানমারে ফিরে যেতে আগ্রহী, অন্যথায় নয়। যেখানে মিয়ানমার সরকার রোহিঙ্গাদের নাগরিক হিসেবেই স্বীকার করে না, সেখানে ২১ দফা দাবির নিঃশর্ত বাস্তবায়ন সুদূর পরাহত বলেই আমার ধারণা। বলতে দ্বিধা নেই, আশ্রয় নেওয়া বাস্তুহারা রোহিঙ্গারা হয়তো এ দেশেই স্থায়ীভাবে থেকে যাওয়ার পরিকল্পনা করছে। এ জন্যই হয়তো তাদের একটি বিরাট অংশ নিবন্ধনে অনাগ্রহ দেখাচ্ছে। আশ্রয়কেন্দ্রে সরকারি ব্যবস্থাপনায় ত্রাণসামগ্রী বিতরণে সরকারকে আরো কঠোর হতে হবে। যত দ্রুত সম্ভব সীমান্ত বন্ধ করে দিয়ে রোহিঙ্গাদের নিবন্ধনের সময়সীমা বেঁধে দেওয়া প্রয়োজন। বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের মাঝে এ মর্মে প্রচারণা চালাতে হবে যে নিবন্ধিত হলেই সরকার নির্ধারিত সব ধরনের সহযোগিতা মিলবে, অন্যথায় নয়।

মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের অধিকার প্রতিষ্ঠা ও নিশ্চিত করার দায়িত্ব নিতে হবে মিয়ানমার সরকারকেই। তারা যদি এ ক্ষেত্রে আগ্রহ না দেখায় বা ব্যর্থ হয়, তাহলে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে এ সমস্যার নিরসনে এগিয়ে আসতে হবে। দুঃখজনক হলেও বলতে হয়, ভূ-রাজনীতি এবং রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থে সার্ক বা আসিয়ানের মতো আঞ্চলিক জোটগুলোর সদস্য রাষ্ট্রগুলো রোহিঙ্গা সংকট নিরসনে এযাবৎ কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নিতে পারেনি। একটি বিষয় পরিষ্কার যে আন্তর্জাতিক চাপ সত্ত্বেও সামরিক জান্তার ইচ্ছা-অনিচ্ছাকে আমলে না নিয়ে রোহিঙ্গা সংকট নিরসন সুচির পক্ষে সম্ভব নয়। অন্যথায় মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক শাসন পদ্ধতির ভিত নড়ে যেতে পারে। এতে রোহিঙ্গা সংকট আরো প্রলম্বিত হবে নিঃসন্দেহে। বাংলাদেশের মতো একটি দেশের পক্ষে বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গার ভার বহন করা চ্যালেঞ্জিং বিষয়। অতএব, বাস্তুহারা রোহিঙ্গাদের ভার আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে ভাগ করে দিতে হবে। বাংলাদেশ সরকারকে সুপরিকল্পিতভাবে কূটনৈতিক তৎপরতা চালাতে হবে। ভারত ও চীনকে আস্থায় নিয়ে মিয়ানমারকে সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের মাধ্যমে রোহিঙ্গা সংকট নিরসনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে।

লেখকঃ ছাত্র, আইন বিভাগ, প্রিমিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম।

শেয়ার করুন
  • 116
    Shares

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *