সর্বশেষ সংযুক্তি

যাত্রা বিরতি

শাহাদাত হোসাইন স্বাধীনঃ

বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার আগে থেকেই হল শব্দটা সম্পর্কে একটা আগ্রহ কাজ করত। শুনতাম বিশ^বিদ্যালয়ের হল মানে নাকি অন্যরকম এক জীবন। আড্ডাবাজি, বন্ধুত্ব, বড়-ছোট ভাই সম্পর্ক রাজনীতি, বিতর্ক সব নাকি গড়ে উঠে হল কেন্দ্রীক। বড় ভাইদের কাছ থেকে হল জীবনের গল্প শুনতে শুনতে ভাবতাম কবে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হবো আর কবেই বা হলে থাকব।

আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয় জেনে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে আমি বরাবরই আগ্রহী ছিলাম। কিন্তু ভর্তির ছয় মাসের মাথায় সে আগ্রহে কিছুটা ভাটা পড়ে গেছে। থার্ড ইয়ারে উঠার আগে এই ক্যাম্পাসের কেউ হলে সিঙ্গেল সিট পায় না । আরও আমি থাকি মীর মশাররফ হোসেন হলে। নান্দনিক স্থাপতশৈলীর কারণে এই হলে নন এলাটেডরাও এসে ভিড় করে। যার ফলে স্বাভাবিকের তুলনায় সিট সংকট আমাদের হলে একটু বেশি। গণরুমে অনেক বন্ধু পাওয়া যায় ঠিক কিন্তু দিনশেষে নিজের একটা সিট না হলে হলের আনন্দ যেন বৃথা। সেকেন্ড ইয়ারের মাঝামাঝি সময়ে সব বন্ধুরাই বিভাগের সিনিয়রের ছেড়ে যাওয়া কোন রুমে উঠে যাচ্ছে। শুধু যেন গণরুমে থেকে যাচ্ছি আমি একা। অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে হয়ত গণরুমে থেকে যাওয়া শেষ আদমী টা আমি হতে চলেছি।

সেদিন হল গেটে এক পলিটিক্যাল বড় ভাইয়ের সাথে দেখা হয়ে গেল। ভাই বলল, ‘কিরে ছোট মন খারাপ করে বসে আছিস কেন!’
– না ভাই এমনি বাড়ির জন্য খারাপ লাগছে। ভাই জানেন আমার ব্যাচের সবাই সিট পেয়ে যাচ্ছে আমরা ক’জন শুধু গণরুমে আছি।
কি বলিস তোর বিভাগের বড় ভাইরা হল ছাড়ে নি ?

-ভাই একজন তো জেলার ছোট ভাইকে রুম দিয়ে গেছে আরেকজন নাকি রিপিটার হল ছাড়বে আরও একবছর পর। আচ্ছা ছোট ভাই মন খারাপ করিস না । ব্যবস্থা একটা না একটা হবে। রাতে একবার আমার রুমের দিকে আসিস আমি কিছু একটা চিন্তা করে দেখব।

যাক একটা আশ্বাস তো পেলাম। ইচ্ছে করছে গলা ছেড়ে গান গাইতে। সে রাতে ভাইয়ের রুমে গেলাম, তিনি আমাকে বললেন, হলে একটি রুম দীর্ঘদিন ধরে তালা দেওয়া আছে, কেউ থাকে না। ৪৫৮/এ,ঐ যে পশ্চিম পাশের শেষের দিকের রুমটা । তালা ভেঙ্গে ঐ রুমে উঠতে হবে। পারবি তুই ! আমি একটু ইতস্তত বোধ করলাম আবার কোন ঝামেলায় এসে পড়লাম না তো! বললাম, ‘ভাই পলিটিক্যাল কোন গ্যাঞ্জাম নাই তো !’‘আরে না বোকা, ঐ রুমে থাকত আমার বিভাগের ৩৭ তম ব্যাচের সাব্বির ভাই। হুট করে ভাইয়ের সুইডেনে স্কলারশীপ হয়ে যায় । ১০ দিনের মধ্যেই সব প্রসেসিং হয়ে যায়। তাই অন্য কাউকে রুম দিয়ে যেতে পারে নি। তিনি আমাকে রুমের একটা চাবি দিয়ে চলে যান। বলেছিল কোন ছোট ভাইকে রুম টা দিয়ে দিস । কিন্তু আমি রুমের সেই চাবি’টা হারিয়ে ফেলেছি। তাই তালা ভাঙ্গার আলসেমিতে ঐ রুমে এখনো কেউ উঠে নি।

ভাইয়ের কথায় আস্থা রেখে আমি আর আমার বন্ধু অমিত রুমের তালা ভেঙ্গে রুমে উঠে পড়ার সিদ্ধান্ত নেই, যা আছে কপালে। আমরা হলে নিজেদের একটা রুম পেতে চলেছি তাও আবার তালা ভেঙ্গে দখল করতে হচ্ছে। এ যেন সৈয়দ ওয়ালিল্লাহর ‘একটি তুলসী গাছের কাহিনী’ গল্পের পরিত্যক্ত বাড়ি দখলের উন্মদনাকেও হার মানায়। তারপরদিন গিয়েই রুমের তালা ভাঙ্গতে লেগে গেলাম। আমাদের কৃত্রিম হইচই আর তালা ভাঙ্গার আওয়াজে পলিটিক্যাল গ্যাঞ্জাম মনে করে লোকজন সব জড়ো হয়ে গেছে। আমাদের উন্মদনা তবু থামে নি। মনুষ্যহীন পৃথিবী আসলে পরিতাজ্য। রুমে ঢুকতেই কি ভ্যাপসা একটা গন্ধ। চারপাশে ধুলোর আস্তরন। খোলা জানালা দিয়ে বৃষ্টি ঢুকে বেড ভিজে নষ্ট হয়ে গেছে। রুমের ডানপাশে টেবিলের পাশে “ জাকসু চাই” একটি বড় দেওয়ালিকা। রুমের স্থানে স্থানে দীপান্বিতাকে নিয়ে লেখা। বুঝতে বাকি রইল না কে এই দ্বীপান্বিতা ।

টেবিলের উপর একটা মাটির ব্যাংক ছাড়াও বেশ কিছু মাটির শোপিস ছড়ানো ছিটানো। বুঝতে বাকি রইল না প্রেম সাম্রাজ্যের এক শৌখিন জমিদারের পরিত্যক্ত বাড়ি এটা।‘এই রুম তো ডেটল দিয়ে না ধূলে জাতে উঠবে না বন্ধু,’অমিত বলল। আরে দোস্ত কাজে লেগে যা, রুমের নাম দেখেছিস ‘অমরাবতী’। আমরা এই রুমকে আসলে ই অমরাবতী বানাবো। তিনদিন ধরে পরিষ্কার করে রুমটাকে মানুষ বসবাসের উপযোগী করে তুলেছি রুমের অগ্রজ সাব্বির ভাইয়ের আঁকা একটা দেয়ালিকাও মুছতে ইচ্ছে হয় নি। তার দেয়ালের লেখা গুলি আমরা পড়তাম আর ভাইকে নিয়ে সারাদিন মজা নিতাম ।

রুমে উঠার কয়েকদিন পর আমি আর আমার বন্ধু অমিত সেলফি তুলে হলের গ্রুপে পোস্ট করলাম ,‘নতুন ঠিকানা অমরাবতী ৪৫৮/এ,সবার দাওয়াত রইল।’ দেয়াল লেখার পাশাপাশি রুমের নামটিও মুছতে ইচ্ছে হয় নি। অমরাবতী শব্দের অর্থ ইন্দ্রলোক বা ইন্দ্রের রাজধানী। হিন্দু পুরাণ অনুসারে ইন্দ্র হচ্ছে স্বর্গ ও দেবতাদের রাজা। আর সে ইন্দ্রপুরের বাসিন্দা হওয়ার সুযোগ কেন মিস করবো। গ্রুপে পোস্ট করার পরদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখি ইনবক্সে এক বড় ভাই ম্যাসেজ দিছে । অমরাবতী নামটা কিন্তু আমার দেওয়া। আমি ৪৫৮/এ’র সদ্য সাবেক বাসিন্দা। এরপর থেকে ভাইয়ের সাথে হলের স্মৃতি নিয়ে রুমের স্মৃতি নিয়ে প্রায়ই কথা হতো।

মাঝে মাঝে ভাইয়ের দেয়ালিকা’র ছবি পাঠাতাম গল্পে গল্পে জানলাম দ্বীপান্বিতা এই ক্যাম্পাস থেকে পাওয়া ভাইয়ের আরেকটি অমূল্য রতন, ভাইয়ের গার্লফ্রেন্ড। আপু ফার্মেসী বিভাগ থেকে পড়াশোনা শেষ করে সাভারেই একটি ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানীতে জব করছে। ভাই সুইডেন থেকে দেশে ফিরলেই দুজনে বাবুই পাখির মত এই শহরের কোন এক তালগাছের মাথায় ছোট্ট একাট ঘর বাধঁবেন। একদিন নাকি ভাই বিভাগের ফিল্ড ওয়ার্কে গেছিলেন কুমিল্লা। সেখানে বৃষ্টিতে ভিজে জ্বর বাঁধিয়েছেন। রাতে প্রচন্ড জ্বর আসলে ডাক্তার দেখিয়ে স্যারেরা বাড়ি ফেরার ব্যবস্থা করে দিলেন। কোন ভাবেই বাড়ি যেতে রাজি হন নি। তিনি ক্যাম্পাসে ফিরে আসেন। তিনি নাকি জানতেন ‘অমরাবতীতে’ ফিরলে জ্বর সেরে যাবে। সত্যি সত্যি নাকি হলে ফেরার পরদিন তার জ্বর সেরে যায়।

আসলে এই বিশ্বাস বিশ্ববিদ্যালয় হলে থাকা সব ছাত্রের। বিশেষ করে আমরা যারা জাহাঙ্গীরনগরে পড়ি আমাদের এমনই নিখাদ ও নিখুঁত বিশ্ববিদ্যালয় প্রেম। হলের প্রতি আমাদের এমনই টান এমনই ভালবাসা। এই ক্যাম্পাসকে আমরা আমাদের দ্বিতীয় জন্মের আতুঁরঘর মনে করি। এই বিশ্ববিদ্যালয় ভাল থাকলে আমরা ভাল থাকি। বিশ^বিদ্যালয়ে কোন ঝড় উঠলে আমাদেরও মননের সব গাছপালা ভেঙ্গে পড়ে।

যখন কোন কাজে ঢাকা যাই, রাতে ফেরার পর ক্যাম্পাসের বাতাস লাগলেই যেন সারাদিনের সব ক্লান্তি মুছে যায় আমার। ভাইয়ের সাথে যখনি কথা হতো ভাই বলত, ‘ছোট ভাই আর একটা দিনের জন্য ক্যাম্পাস লাইফটা ফিরে পেতে চাই। আরেকটা দিনের জন্য ‘৪৫৮/এ, অমরাবতীতে’ গা এলিয়ে ঘুমাতে চাই্। বুঝছিস, এখানে আরাম করে সিগারেট টানতে পারি না। চায়ের স্বাদ টাও কেমন জানি। টিএসসির কালাম ভাইয়ের চা খাই না কতদিন হলো। টারজানের শরবত কি আর এই দেশে মেলে! আমি আসছি তো প্রায় ১০ মাস । সামনের কোরবানীর ঈদে কিন্তু ১৫ দিনের জন্য দেশে যাওয়ার সুযোগ পাচ্ছি। অন্তত একদিনের জন্য অমরাবতী’র মালিকানা ছেড়ে দিস আমাকে।’ আমি বললাম, ‘কি বলেন ভাই! অমরাবতী তো আপনার,সারা জীবনের জন্য আপনার। আপনার যখন ইচ্ছা আসবেন।’ ‘ঠিক আছে ছোট ভাই শিগগিরই দেখা হচ্ছে ! প্রচুর চিল ,কাক হবে।’ এই ছিল ভাইয়ের সাথে আমার শেষ আড্ডা। কোরবানীর ঈদ প্রায় ঘনিয়ে আসছে। অমিত বাড়ি চলে গেছে। এই ছেলেটা’র শুধু ছুটি দরকার সাথে সাথে ট্রাভেলিং টু গাইবান্ধা। আর ফিরবে ক্যাম্পাস খোলার ঠিক আগের দিন।

আমার বাবা-মা এবার হজ্বে গেলেন । ছোট বোনটাও গেছে বাবা-মায়ের সাথে। তাই এইবার আমাকে ঈদ করতে হবে ঢাকায়, আন্টির বাসায়। ঢাকার বদ্ধ জীবনের চেয়ে আমি ক্যাম্পাসের খোলা পরিবেশে বেশ আরামে আছি। আন্টিকে বললাম আমি ক্যাম্পাসে ঈদের নামাজ পড়ে বাসায় আসব। ঈদ যত ঘনিয়ে আসছে ততই ক্যাম্পাস জনশূন্য হয়ে যাচ্ছে। এই দিনগুলিতে আমি আর নাজমুল ভাই সারাদিন সাইকেলে চালিয়ে ট্রান্সপোর্টে চা খেয়ে শেষ রাতে হলে ফিরতাম। সেদিন নাজমুল ভাইকে বললাম ভাই চলেন আজ আমার রুমে থাকেন। অমিত বাড়ি গেছে। তাছাড়া পুরা ব্লকে আর কেউ নেই। নাজমুল ভাই আসল না। আমি রুমে ফিরে আসলাম। কখন যে ঘুম চলে আসল নিজেই জানি না। হঠাৎ মাঝরাতে কে যেন রুম নক করল।

ঠক! ঠক!!
ঠক! ঠক …
ঘুম ভেঙ্গে গেল। নক করার ধরণ দেখে বুঝতে পারলাম অনেকক্ষণ ধরে নক করছে। ঘুমের ঘোরে আমি দরজা খুললাম নাজমুল ভাই মনে করে। কিন্ত দরজা খুলে দেখি, সাক্ষাত ইন্দ্রের রাজা। বিশ্বাস হচ্ছিল না। চোখ খসে দেখলাম ইন্দ্রের রাজা সাব্বির ভাই উপস্থিত । টিনের চালে কাক আমি তো অবাক। ‘ভাই আপনি! কেমনে কীভাবে কখন? একটা ফোন তো দিতে পারতেন।’ এক নাগাড়ে কথাগুলো বলে ফেললাম।

আরে পাগলা, আমাকে আমার হলে ফোন দিয়ে আসতে হবে নাকি । না ভাই, ঠিক আছে । ভাই ফেসওয়াশ নেন,তাওয়েল আর লুঙ্গি নেন। ফ্রেশ হয়ে আসেন । ভাই ফ্রেশ হতে হতে আমি উপরের বেড ঘুছিয়ে দিয়ে নিজের জন্য বিছানা করে নিলাম। ভাই রুমে আসতেই রুমের প্রতিটি লেখা টেবিল, খাট, আলমারি সব ধরে ধরে দেখতেছিলেন। মনে হচ্ছিল মা তার হারানো সন্তানকে ফিরে পেয়েছে। ‘বুঝলি ছোট ভাই কি আবেগ আর ভালবাসার আমার এই অমরাবতী। এই রুমের জানালা দিয়ে কত বৃষ্টি দেখেছি, কত কুয়াশাচ্ছন্ন সকাল দেখেছি। টেবিলে একটা ক্যাকটাস ছিল। রুমের সামনে গাঁদা ফুল, পুদিনা গাছ লাগাইতাম। তোদের প্রজন্মের কোন শখ নেই দেখি। রুমে কোন টব লাগাস নি কেনো! চে গুয়েভারার একটা গ্রাফিতি তো আকঁতে পারিস নাকি!’

ভাই বলতেই আছে আর রুমের এ পাশ থেকে ও পাশ হাটঁতে আছে। আমার ঘুমের ঘোরে ঢলে পড়ে যাওয়ার অবস্থা। ভাই এত রাতে জার্নি করে আসছেন। ঘুমান কাল সকালে আপনার গল্প শুনবো। আমার কথা কেড়ে নিয়ে ভাই বলল আরে জার্নি করে না। আমি তো বাড়ি যাচ্ছিলাম। হঠাৎ করে হেমায়েত’পুর এলাকায় গাড়ির কি যেন সমস্যা হলো গাড়ি নাকি আর চলবে না। ড্রাইভারকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। যাত্রা বিরতির এই সুযোগে অন্তত হলে একবার ঢু মারা যায়। এসেই ট্রান্সপোর্টে একটা চা খেলাম আর সিগারেট ধরাতে ধরাতে হলে আসলাম, কতদিন ক্যাম্পাসে সিগারেট ধরাই না। ভাই তো বকবক করেই যাচ্ছিলেন আর আমি জি¦ ভাই, জি¦ ভাই করছিলাম। আর কখন যে আমি ঘুমিয়ে গেলাম নিজেও জানি না। সকাল বেলা নাজমুল ভাইয়ের ফোনে ঘুম ভাঙ্গল। কিরে আজ বের হবি না! ভাই আমার রুমে তো সাব্বির ভাই আসছে, ভাইকে সময় দিতে হবে। কথাটা শেষ করে উপরে থাকাতেই দেখি ভাই রুমে নাই। দরজা খোলা। তাহলে কি ভাই ওয়াশরুমে গেলেন! অনেকক্ষণ অপেক্ষা করেও দেখি ভাই আসেন না। চলে গেছেন একবার বলে যাবেন না। আমাকে একবার ঘুম থেকে ডাকলে কি বা হতো। এটা কেমন কথা। ভাই তো এমন লোক না, এমন ফ্রেন্ডলি একটা লোকের এ কেমন আনফ্রেন্ডলি আচরণ। আচ্ছা যাইহোক, হয়ত বাস ঠিক হয়ে গেছে তাই ফোন পেয়ে চলে গেছেন। এরপর আমি ফ্রেশ হয়ে প্রতিদিনকার অভ্যাসমত ফেসবুকে ঢু মারতে গিয়ে চোখ কপালে।

‘আমরাই জাহাঙ্গীরনগর’ ফেসবুক গ্রুপে একটা পোস্ট আমি কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারছি না। “গতরাত ১ টার দিকে জিরাবো এলাকায় বিপরীত মুখী দুই বাসের দূর্ঘটনায় ১১ জন নিহত। সুইডেন ফেরত আমাদের সাব্বির হোসেন ,ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগ ৩৭ তম আবর্তন ভাই ও এই দূর্ঘটনায় মারা গেছেন। আমরা জাহাঙ্গীরনগরীয়ান’রা সাব্বির হোসেনের অকাল মৃত্যুতে গভীর ভাবে শোকাহত।” সাদাত ভাইয়ের পোস্ট দেখে আমি নিজেই নিজেকে বিশ্বাস করতে পারছিনা।

এটা কীভাবে সম্ভব। এই লোক গত রাত দুই টার দিকে তো আমার রুমে ছিলেন তাহলে কিভাবে ১ টা’ সড়ক দূর্ঘটনায় মারা যায়। সাদাত ভাইকে ফোন দিয়ে ভাই মারা যাওয়ার খবর নিশ্চিত হওয়ার পর নিজেকে আরও বিশ্বাস করতে পারছি না। তাহলে কি আমার হ্যালুসিনেশন ছিল রাতের ঘটনা! না না এটা’ও তো না। তাহলে আমি রাতে নিচে ঘুমালাম কেন। আর উপরে যে আরেকজন লোক ছিল তা স্পষ্ট বুঝা যাচ্ছে। এই যে পাল্টানো লুঙ্গি পড়ে আছে বিছানায়। এই যে আমি ড্রয়ার থেকে গেস্ট তাওয়েল বের করে দিলাম না হলে এই তাওয়েল বাইরে কেন? আচ্ছা রাত ২ টায় ভাই ট্রান্সপোর্টে সিগারেট পেল কোথায়! এই তো সিগারেটের শেষাংশ রুমে পড়ে আছে । আমি আর অমিত কেউ তো সিগারেট খাই না।

তাহলে কি, ভাইয়ের অতৃপ্ত আত্মাই শেষ বারের জন্য একবার তার অমরাবতীতে ঘুরে গেল। না, না এইভাবে ভাইয়ের চলে যাওয়ার কোন মানে হয় না। এমন হওয়ার কথা ছিল না। জীবনের শেষ দিন হলেও একবার তার ক্যাম্পাসে তার প্রিয় লাল দূর্গের হলে একটা রাত’ই তো থাকতে চেয়েছিলেন। ঘাতক বাস সেটা করতে দিল না। শহরের বুকে একটি বাবুই পাখির বাসা বুনতে চেয়েছিলেন । কিন্তু এই শহর আমাদেরকে স্বপ্ন বুনতে দেয় না। ক’দিন আগে সেজান ভাই গেল । এবার সাব্বির ভাই গেল। এরকম তো হওয়ার কথা না। আমাদের স্বপ্নগুলো কেন ফুল হয়ে ফুটতে পারে না। কেন অতৃপ্ত আত্মা নিয়ে বিদায় নিতে হয় সাব্বির ভাইদের। এই কেমন যাত্রা বিরতি অমরাবতী’তে। এমন যাত্রা বিরতি তো হওয়ার কথা ছিল না। সাব্বির ভাই স্মরণে ও নিরাপদ সড়কের দাবিতে শহীদ মিনারে মোমবাতি হাতে দাঁড়াতে দাঁড়াতে অনেক প্রশ্ন আসছে সামনে। কাদের জন্য সাব্বির ভাই, সেজান ভাই’কে রাস্তায় পিষে যেতে হয়। তারা কারা যারা সড়কে মৃত্যুর সার্টিফিকেট বিক্রি করে। তারা কারা যারা আমার ভাইয়ের মৃত্যুর খবর শুনে হায়েনার হাসি হাসে!

প্রশ্ন অনেক! উত্তর কে দিবে?অনেক প্রশ্ন নিয়ে মিছিলে শরিক হয়েছি। এই মিছিল সব পাওয়ার, এই মিছিল সব হারাবার। এই মিছিল নিরাপদ সড়কের অধিকার আদায়ের। এই আওয়াজ নিরাপদে বাচঁতে চাওয়ার। ধীরে ধীরে দীর্ঘ হতে থাকে আমাদের মিছিল। যোগ দেয় পায়েল, সেজান, সাব্বিরের বন্ধুরা। তারা আর কোন বন্ধুকে আর কোন ভাইকে রাস্তায় পিষে যেতে দিতে চায় না। জেনারেশন নকিং দ্যা ডোর, নিরাপদ সড়ক চাই। তবে তোমাকে আসতেই হবে নিরাপদ সড়ক।

শেয়ার করুন
  • 404
    Shares

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!