সর্বশেষ সংযুক্তি
সুত্রপাত / চিন্তা ও দর্শন / মার্ক্সীয় সাম্যবাদ অনিবার্য
Karl Mark

মার্ক্সীয় সাম্যবাদ অনিবার্য

মোর্শেদ হালিমঃ

ইউরোপে ১৬৮৮ সালে ইংলিশ বিপ্লব ও ১৭৮৯ সালে ফরাসি বিপ্লবের পথধরে পুঁজিবাদ যাত্রা করে। দীর্ঘ কালপর্যায়ে ইউরোপীরা দুনিয়ার প্রায় অঞ্চল তাদের উপনিবেশিক শাসনে পরিণত করেছিল। কার্ল মার্কস কমিউনিস্ট ইশতেহার রচনা করেন ১৮৪৮ সালে। এরপূর্বেই স্বাধীনতা আন্দোলন, ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন, ইংরেজ হঠাও, স্বাধীনতা নয় মৃত্যু এমন স্লোগান দুনিয়া জোরে উচ্চারিত হতে থাকে। যেমন, আমেরিকা স্বাধীন হয় ১৭৭৬ সালে, রুশ বিপ্লব হয় ১৯১৭ সালে, দেশভাগ হয় ১৯৪৭ সালে ইত্যাদি।

সাম্রাজ্যবাদ বিষয়টা আসলে কি? সামন্তরাজা কি রাজ্য দখল করেনি? ইউরোপীয়রা কি আমেরিকা, ভারত, অস্ট্রেলিয়ার বাজার থেকে তাদের কাঁচামাল সংগ্রহ করেনি? যাক গে, সারা দুনিয়াকে শোষণ করে ইউরোপীয়রা পু্ঁজিবাদ প্রতিষ্ঠা করল। সারা দুনিয়ার মানুষ কেউ ধর্মের ভিত্তিতে, কেউ ভাষার ভিত্তিতে, কেউ অঞ্চনের ভিত্তিতে ইংরেজ বিরোধী প্রশ্নে জাতীয়তাবোধ গড়ে তুলে এবং আন্দোলন সংগ্রাম প্রস্তুত করতে থাকে। একপর্যায়ে জাতিরাষ্ট্র এর ধারণা স্বদেশপ্রেমিক বুদ্ধিজীবিরা ইংরেজদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করতে লাগল। স্বাধিকার অর্জনে জাতিরাষ্ট্র ভিত্তিক বিচ্ছিন্নবাদী ধারণা হতে দুনিয়ায় ভাববাদী বুর্জোয়া জাতীয়তা গড়ে ওঠে। কার্ল মার্কস দুনিয়াকে খণ্ড খণ্ড করে বোঝেননি। তিনি অর্থনীতিকে ভিত্তি ধরে পুঁজির পরিণতি ব্যাখ্যা করেন। পুঁজির ধর্ম ইউরোপ এক রকম, আমেরিকা আরেক রকম বা ভারতে অন্য রকম নয়। স্থানের, ভাষার, ধর্মের যে ভিন্নতা তৈরি হয়ে রয়েছে তা মূলত অর্থনৈতিক কারণেই। তাই তিনি পুঁজির বিরুদ্ধে সর্বহারার জন্য কমিউনিস্টদের করনীয় কমিউনিস্ট ইশতেহারে বর্ণনা করেন। রাষ্ট্রীয় সমাজতন্ত্রের যে ধারণা, সাম্রাজ্যবাদের ধারণা, জাতীয় বুর্জোয়া বিকাশের যে লেনিনীয় ধারণা তা কতটুকু মার্কসবাদের সঙ্গে যায়?

কোন একক রাষ্ট্রে পুঁজিবাদের সাথে আপোস না করে সমাজতন্ত্র তৈরি করা যায় তা কতটুকু বিজ্ঞানসম্মত? পুঁজির বিকাশ হচ্ছিল? দুনিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে ইংরেজ বিরোধী যে স্বাধীনতার আন্দোলন গড়ে ওঠল সেখানে শ্রেণিসংগ্রামের দৃষ্টিভঙ্গি কই? স্বদেশীরা বিদেশিদের শাসন মানবে না, নিজেরাই পুঁজিপতি হবে অথচ সর্বহারা শ্রেণিকে জাতি হিসেবে গড়ে তুলতে কমিউনিস্টদের যে কর্তব্য মার্কস লিপিবদ্ধ করলেন তা লেনিনবাদীরা কতটুকু পালন করেছে? নাকি উন্নতদেশের পুঁজির বিরুদ্ধে অন্ননুত, উন্নয়নশীল উপনিবেশিক পুঁজির সংগ্রামকে সমাজতান্ত্রিক সংগ্রাম বলে দাবি করা হচ্ছে। এইটা স্বাভাবিক: মার্কসের আগেও এমন কাল্পনিক সমাজতন্ত্রের কথা শুনে থাকি। সমাজতন্ত্র কোনো স্বপ্নের ব্যাপার নয়, মার্কস-এঙ্গেলস স্বপ্নের স্থলে বিজ্ঞান কে প্রতিস্থাপন করেন। তাই সামাজিক মালিকানা কোন একক রাষ্ট্রের বিষয় নয়। পুঁজিবাদ তার নিয়মেই অগ্রসর হচ্ছে তার বিকাশের একপর্যায়ে ভাষাগত বৈষম্য, ধর্মগত বৈষম্য, স্থানগত বৈষম্য সহ তার মুনাফার স্বার্থেই কাঁটাতারের বেড়া তুলে ফেলবে। বিকাশের পর্যায়ে দুনিয়া দুভাগে পৃথক হবে একদিকে বুর্জোয়া জাতীয়তাবোধ ও প্রলেতারিয়েত জাতীয়তাবোধ।

জাতিরাষ্ট্র গুলো মিশে একাকার হয়ে পড়বে। বাজারিক পণ্যের সম্পর্ক ছাড়া মানুষের প্রেম-ভালোবাসা বিলোপ হয়ে যাবে। দুনিয়ার বেশী সংখ্যক মানুষের বাস্তব পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি অসহনীয় হয়ে পড়বে। আর তখনই বিশ্ব বুর্জোয়া জাতির বিরুদ্ধে প্রলেতারিয়েত তার জাতীয়বোধে রক্তক্ষয় সংগ্রামের দ্বারা শাসকশ্রেণিতে উত্তীর্ণ হতে তার বাস্তবতাই তাদের বাধ্য করবে। যেমনটা করেছিল দাসমালিকদের উচ্ছেদ করতে সামন্তরা, যেমনটা করেছিল সামন্তদের উচ্ছেদে বুর্জোয়ারা। পূর্বের প্রত্যেক সংগ্রামে পরিপূর্ণ বিকাশ সমগ্র দুনিয়াতে একযোগে হয়নি। তাই মালিকানা বদলের বাস্তব পরিস্থিতিও তৈরি হয়নি। অনেক শ্রমিকবান্ধব শাসক চাইলেও দুনিয়াকে শান্ত করতে পারতেছে না। তাই মার্কস বলেন, সাম্যবাদ এমন একটি ব্যবস্থা যা পূর্বে মানুষের অভিজ্ঞতায় নেই। আর এইটা সম্ভব বিশ্বপুঁজির চূড়ান্ত বিকাশের মধ্য দিয়ে। অধৈর্য্য হয়ে কাল্পনিক ভাবে স্বপ্ন দেখতে পারেন, কালই বিপ্লব করে ফেলতে পারেন আদৌতে তা মার্কসীয় দৃষ্টিভঙ্গি পরিপন্থি।

শেয়ার করুন
  • 7
    Shares

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *