সর্বশেষ সংযুক্তি
সুত্রপাত / রাজনীতি / মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের প্রতি আমাদের কেন এত হীনমন্য দৃষ্টিভঙ্গি !

মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের প্রতি আমাদের কেন এত হীনমন্য দৃষ্টিভঙ্গি !

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা পরবর্তী সবচেয়ে বেশী আলোচিত ইস্যু হচ্ছে ‘বিতর্কিত শিফট’ পদ্ধতি,কলা ও মানবিকী অনুষদে মানবিক বিভাগের শিক্ষার্থীদের উপেক্ষা ও মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ। প্রথম দুইটি বৈষম্যের সাথে আমি পূর্ব পরিচিত হলেও মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের বিষয়টা এই বার প্রথম খেয়াল করলাম।

শিফটের বিষয় টা যদি আলোচনা করি । একটি ইউনিটের পরীক্ষা ৯ টি শিফটে ৯ ধরনের প্রশ্নে ভর্তি পরীক্ষায় মেধা যাচাই একটি কান্ডজ্ঞানহীন সিদ্ধান্ত ছাড়া কিছু্ই না। কোন যুক্তিতে ৯ টি প্রশ্নের মান একই হয় ? বিশ্ববিদ্যালয়ের গানিতিক ও পদার্থ বিজ্ঞান অনুষদের শীর্ষ ১০০ জনের ফলাফল বিশ্লেষণ করে দেখা যায় ৯ টি শিফটের ৪৭ জনই এসেছে একটি শিফট থেকে,কোন কোন শিফট থেকে এসেছে মাত্র একজন।  অথচ একটি শিফটে ৪ হাজারের ও বেশী শিক্ষার্থী পরীক্ষা দেয়। প্রশ্নপত্রের মান যে একই রাখা যায় নি এই চিত্র তার অন্যতম প্রমাণ। (এই সংক্রান্ত একটি নিউজ লিংক নিচে সংযুক্ত আছে) 

বিশ্ববিদ্যালেয় প্রশাসন একই শিফটে পরীক্ষা না নেওয়ার পেছনে অন্যতম বড় যুক্তি দাঁড় করান জালিয়াতির আশংকা। ব্যাপারটা অনেকটা জুজুর ভয়ে বাড়ি থেকে বের না হওয়ার মতো।  জালিয়াতির আশংকা থাকলে জালিয়াতি মোকাবেলায় দৃঢ় পদক্ষেপ গ্রহণ করা যেতে পারে।  কিন্তু তাই বলে বৈষম্যমূলক,অপরিপক্ক,অযৌক্তিক একটা পদ্ধতি শিক্ষার্থীদের উপর চাপিয়ে দেওয়ার কোন মানে হয় না।  তাছাড়া ভর্তি পরীক্ষা উপলক্ষে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের আয় তো কম না।  মোটা দাগে ১৫ কোটি বা তার বেশী আয় হয় প্রশাসনের। এত এত টাকা ফি নেওয়ার পর কেন পরীক্ষা পদ্ধতিকে স্বচ্ছ করবেন না আপনারা। জালিয়াতির আশংকায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ভর্তি পরীক্ষাকে বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে নিয়ে যাবেন না (যদিও বা অনেকে বলে  মোটা অংকের আয়ে ভাগ পড়ার আশংকাই এর প্রধান কারণ) কিন্তু শিফট পদ্ধতি মেধা যাচাইয়ের  উপযুক্তে কোন মাধ্যম হতে পারে না এই জায়গায় বিশ্ববিদ্যালয় প্র্রশাসনের একমত হবেন আশা করি। তাই পুরা ভর্তি পরীক্ষা পদ্ধতি  নিয়ে নতুন করে ভাববার সময় এসেছে বলে মনে হয়।

অামি ২য় বিষয় নিয়ে কথা বলতে চাই তা হলো আমাদের প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থায় আমরা বাংলা মিডিয়ামে প্রধানত বিজ্ঞান ,মানবিক ও ব্যবসায়ী শিক্ষা এই তিনগ্রুপে পড়াশোনা করি। প্রচলিত ভাবে ক্লাসের প্রথম সারির শিক্ষার্থীরা্ বিজ্ঞান বিভাগে পড়াশোনা করে। এই দেশে বিজ্ঞান বিভাগ থেকে আসা শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষা গ্রহণের সুযোগ ও বেশী। দেশে বর্তমানে সরকারী মেডিকেলের সংখ্যা ৩৫ এবং বেসরকারী মেডিকেলে সংখ্যা ৬৫ এর মতো।  প্রতিবছর এই্ সব প্রতিষ্ঠান থেকে ১০ হাজার ডাক্তার বের হচ্ছে । অন্যদিকে ৪ টি প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় এবং ১৪ টি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে শুধুমাত্র বিজ্ঞানের শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষায়িত। তাছাড়া অন্যান্য সরকারী ও বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়েও বিজ্ঞান বিষয়ক সাবজেক্ট বেশী। ফলে দেশে বিজ্ঞানের শিক্ষার্থীদের উচ্চ শিক্ষার সুযোগ বেশী।

অন্যদিকে মানবিক ও ব্যবসায়ী শিক্ষা বিভাগ থেকে আসা শিক্ষার্থীেদের জন্য আলাদা অনুষদ আছে। তবে কলা ও মানবিকী অনুষদে আবার বিজ্ঞান ও ব্যবসায়ী শিক্ষা বিভাগের  শিক্ষার্থীদের জন্য কোটা নির্ধারণ একটা বৈষম্য। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে গাণিতিক ও পদার্থ বিজ্ঞান অনুষদে ৪৫৪ টি আসন,জীববিজ্ঞান অনুষদে ৩৬০ টি আসনে স্বাভাবিকভাবে বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থীরা পড়ার সুযোগ পায়।  অন্যদিকে সমাজ বিজ্ঞানের ৩৪০ ও ব্যবসা অনুষদের ২০০ এবং আইন অনুষদের ৬০ টি সিটের জন্য প্রতিযোগিতা উন্মুক্ত রাখা হয়েছে।  কিন্তু কলা ও মানবিকী অনুষদ যেটা মানবিক বিভাগের শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষায়িত হওয়ার কথা সেখানে বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থীদের জন্য কোটা রাখা হয়েছে । যার ফলে নিজেদের অনুষদেই উপেক্ষিত মানবিকের শিক্ষার্থীরা।

অনুষদের ৩৬৩ টি সিটের মধ্যে ১৫৮ টি বিজ্ঞান বিভাগের জন্য ১৫৪ টি মানবিক বিভাগের জন্য ৩৮ ব্যবসায়ী শিক্ষা বিভাগের জন্য ও ১৩ টি মাদ্রাসা ও টেকনিক্যাল থেকে অাসা শিক্ষার্থীদের জন্য সংরক্ষিত। তার মানে কলা ও মানবিকী অনুষদে মানবিক বিভাগের শিক্ষার্থীদের আসন ৪২% বাকিদের ৫৮ %।  বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থীদের জন্য আলাদা অনুষদ থাকা সত্ত্বেও কোন প্রয়োজনে মানবিকী অনুষদে তাদের জন্য আসন সংরক্ষিত করে রাখা হয় ! যেহেতু সব বিভাগের শিক্ষার্থীরা মানবিকী অনুষদে পরীক্ষা দিতে পারে সেহেতু প্রয়োজন সাপেক্ষে মানবিক বিভাগের জন্য সিট সংরক্ষণের দরকার ছিল। কারণ বাকি বিভাগের জন্য নির্ধারিত অনুষদ রয়েছে। নতুবা সমাজ বিজ্ঞানের মতো উন্মুক্ত প্রতিযোগিতা রাখতে পারত। কিন্তু কোন যুক্তিতে কোন ভাবনা থেকে কলা ও মানবিকী অনুষদের শিক্ষকরা এই ধরনের অযৌক্তিক,বৈষম্যমূলক সিদ্ধান্ত দিনের পর দিন চাপিয়ে দিচ্ছেন তা আমার কাছে বোধগম্য নয়।

এবার আসি মাদ্রাসা শিক্ষার্থী প্রসঙ্গে,মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের প্রতি একটা হীনমন্য দৃষ্টি, একটু বাঁকা চোখে তাকানো এটা দীর্ঘদিন ধরে হয়ে আসছে । কলা ও মানবিকী অনুষদের মানবিক বিভাগের মতো মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের প্রতিও বৈষম্য করা হচ্ছে।মাদ্রাসায় এখন ২০০ নাম্বারের ইংরেজি ২০০ নাম্বারের বাংলা এবং স্কুল সিলেবাসের মতো অভিন্ন সিলেবাস পড়ানো হচ্ছে। তাহলে তাদের কে উন্মুক্ত প্রতিযোগিতায় আনতে সমস্যা কোথায়। মাদ্রাসায় হাজার হাজার শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে। তাদের জন্য টেকনিক্যালের সাথে মাত্র ১৩ টি বরাদ্দ রাখছে কোন হিসাবে।

এই বিষয়ে কলা ও মানবিকী অনুষদের ডিন অধ্যাপক মোজােম্মেল হক একটি ইংরেজি পত্রিকায় মন্তব্য করেছেন। তিনি বলেছেন ,“মাদ্রাসা শিক্ষার্থীরা চারুকলা,নাটক ও নাট্যকলা,দর্শন এসব পড়তে আগ্রহী নয় তবু আমরা তাদের কে কিছুটা সুযোগ দিয়ে থাকি আমাদের অনুষদে। ”বিষয়টা এমন যে তিনি মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের করুণা করে পড়তে দিচ্ছেন।

ডিন মহোদয়কে কে বলেছে তারা আগ্রহী নন !   টুপি পাঞ্জাবী দেখে তিনি একটা হেজেমনি ধারণায় তিনি এই মন্তব্য করেছেন iহয়তো।  তিনি হয়ত জানেন না বিশিষ্ট চলচিত্রকার তারেক মাসুদ ফরিদপুরের ভাঙ্গা মাদ্রাসা ও ঢাকার লালবাগ মাদ্রাসায় পড়াশোনা করে দেশ কাঁপানো চলচিত্র আমাদের উপহার দিয়ে গেছেন।  মাদ্রাসা শিক্ষার্থীরা এখন দেশসেরা বিজ্ঞানী,ডাক্তার,গবেষক ও লেখক হচ্ছে।  তারা রাজনীতি করছে। গণজাগরণ মঞ্চের উত্তাল দিনে আমি অনেক মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের শ্লোগান দিতে দেখেছি।  । আমার বন্ধু ফয়সাল (নৃবিজ্ঞান ৪৪) মাদ্রাসা থেকে পড়াশোনা করে এসে আমার পাশে বসে মিশেল ফুকো, সিগমন্ড ফ্রয়েড,কাল মার্কস পড়ে ।

প্রগতিশীল বোদ্ধাদের একটি অংশের একটি হেজেমনি ধারণা রয়েছে একটা ছেলে মাদ্রাসা মানে সে জঙ্গী,সে মুক্ত চিন্তা করতে পারে না,সে প্রতিক্রিয়াশীল। আখিরাত ছাড়া তাঁর আর কোন চিন্তা নেই। এই ধারণা ডিন মহোদয়কে এই ধরনের মন্তব্য করতে উৎসাহী  করেছে বলে মনে করি।  প্রশাসনের একজন কর্মকর্তা মন্তব্য করেছেন ক্যাম্পাসের যতসব অঘটন ঘটে তা মাদ্রাসা শিক্ষার্থীরা ঘটায় তাই তারা মা্দ্রাসা শিক্ষার্থীদের তারা কম সুযোগ দিতে চান। এই ধরনের সাধারণীকরণ বক্তব্য,মন্তব্য ও চিন্তা ক্ষতিকর। হলি আর্টিজেনে হামলা করেছে ইংরেজি মাধ্যমের শিক্ষার্থীরা তাই বলে আমি সব ইংরেজি মাধ্যমের শিক্ষার্থীরা জঙ্গি বলতে পারি না। আমি চ্যালেঞ্জ নিয়ে বলতে পারি ক্যাম্পাসে গত এক বছরে হওয়া সহিংসতার মধ্যে ২% সহিংসতায়ও মাদ্রাসা শিক্ষার্থীরা জড়িত না।

তারা রক্ষণশীল হয়েও থাকে তবে তাদের চারুকলা, দর্শন,নৃবিজ্ঞান আরও বেশী বেশী পড়ার সুযোগ দেওয়া উচিত। তারাও দেশের অংশ। দেশ গড়তে তাদের অংশীদারিত্ব ও গুরুত্পূর্ণ। তাদেরকেও আমাদের পাশে বসানো উচিত। আমরা তাদের সাথে কথা বলতে চাই। কিন্তু  তাদের কে অস্বীকার করে নাক ছিটকানো হীনমন্যতা ও বর্ণবাদী আচরণ।

মাদ্রাসা নিরীহ শিক্ষার্থীদের প্রতি হেজেমনি ধারণা ,ফোবিয়া,দাঁড়ি টুপি দেখলেই ‘বাংলা ভাই’ বানানোর প্রবণতা থেকে আমাদের বের হওয়া উচিত। মাদ্রাসা পড়ুয়া শিক্ষার্থীরাও আমার ভাই-বোন বন্ধু,আমি তাদের সাথে গিটারের সুরে গলা মেলাতে চাই,মুক্তমঞ্চে নাটক দেখতে চাই। একসাথে মিছিলে শ্লোগান দিতে চাই।
লেখক,শাহাদাত হোসাইন স্বাধীন,শিক্ষার্থী জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
শিফট বৈষম্য সংক্রান্ত নিউজ লিংক
শেয়ার করুন
  • 204
    Shares

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!