সর্বশেষ সংযুক্তি
সুত্রপাত / ইতিহাস / বড়ুয়া’রা ‘মগ’ নয় !

বড়ুয়া’রা ‘মগ’ নয় !

জিতু চৌধূরীঃ

মগ প্রথমত চট্টগ্রাম গালির ভাষা হিসেবে ব্যবহার শুরু হয়েছিলো । অন্থানীয় বা অচট্টগ্রামীরা চট্টগ্রামীদের মগ বলে হেয় করতে চাইত । যা হোক, মগের নামে একটা সম্প্রদায় ছিল এখন ও আছে । মগ আরাকান নিবাসী জাতি বিশেষ । জাতিতত্ত্ববিদেরা এদের ইন্দো-চীন নিবাসী বলে মনে করেন । সাধারণত মগ বলতে আরাকানীদের বুঝায় । আরাকানীরা চট্টগ্রামের কিছু অংশ, কখনো পুরো অংশ শাসন করেছে । স্থানীয় বৌদ্ধদের উপর মগদের শাসন যেমন ছিল ত্রিপুরাধিপতিদের শাসন, মুসলমানদের শাসন এবং চাকমাদের শাসন । এই শাসন বৌদ্ধদের উপর মেঘলা দিনের চন্দ্রা লোকের ন্যায় ছিল । এই একটা প্রভাব যায় তো অন্য প্রভাব এসে পড়ে । এর মধ্যে দেখা যায় চাকমাদের সাথে ছিল বড়ুয়াদের গভীর সম্পক । চাকমা রাজ সরকারের বড়ুয়ারা চাকুরী করতো । বড়ুয়া ও চাকমা জাতির সাংস্কৃতিক সম্বন্ধ ছাড়া ও বহুবার রক্তের সর্ম্পক ঘটিয়েছে । একের অংশ বিশেষ অপরে মিশিয়ে গিয়াছে । নানা ঘাত প্রতি ঘাতের মধ্যে ও উভয় জাতির পাশপাশি বাস করিয়াছে । পূর্বে হয়েছে ১৮৬০ সালে চাকমা ও বড়ুয়াদের মধ্যে দূরত্বের সূচনা হয় । ধর্মাধার মহাস্থবির বলেন, চাকমা বলিয়া শুকদেব রায়কে দূরে রাখা চলে না । বড়ুয়া বংশ হতে শুকদেবের বংশে রাজত্ব আসিয়াছে ।

ইতিহাস পাঠে জানা যায়, আরাকান রাজাদের সময় বড়ুয়ারা গোষ্ঠী পরিবর্তন করেছে । আারাকানীদের নাম ও গোষ্ঠী নিয়েছে শাসক বর্গের সাথে একাত্ন হবার জন্য । প্রছন্ন হিন্দুর মতো ও দিন কাটিয়েছে তারা । কিন্তু কখনো মনের জগতে কারো ছায়াপাত ঘটায়নি । এজন্যে দেখা যায়, ১১ শতকের রাজা অনোর থই আারাকানে বৌদ্ধ ধর্ম সংস্কার করলে ও তার প্রভাব এখানে এসে লাগে নি । অনেক জল গড়িয়ে যাওয়ার পর এই সেই দিন মাত্র সারমেধ মহাস্থবির এ খানে ধর্ম সংস্কার করেন । এর কারন কি ? উত্তর খুজতে গিয়ে চোখে পড়লো রাউলদের যাদের পৃষ্ঠপোষক ছিল বৌদ্ধ জমিদারেরা বা সামন্তরা । সামন্ত মানে হলো সামন্ত রাজা । এরা বৌদ্ধ ধর্মালম্বী ছিল । এখন ও তাদের বংশধর পাওয়া যায় কলকাতা ধর্মাঙ্কুর, বঙ্গীয় বৌদ্ধ সমিতি বা বেঙ্গল বুড্ডিষ্ট এসোসিয়েশনের প্রয়াত আজীবন সাধারন সম্পাদক ডা: শান্ত কুমার চৌধুরী ছিলেন সামন্ত রাজার বংশধর ।

বৌদ্ধ সামন্তরা নিজেদের টিকিয়ে রাখতে চেয়েছেন তাদের বড় বড় ধর্মীয় অনুষ্টান যথা, কালিপুজা, দূর্গাপূজা ইত্যাদির মধ্য দিয়ে । কালি বালিকা বৌদ্ধ তারা দেবীর ভাবে পূজিত হয়েছে । এই সমস্ত করেছে রাউলীরা । এদেরই কারনে মগ বা আরাকানী যারা এখানে এসেছিলো তারা বৌদ্ধদের উপর ধর্মীয় প্রভাব বিস্তারে সক্ষম হয়নি । বরং তারাই তন্ত্রে মুগ্ধ হয়েছে । তন্ত্রের এই শক্তি এখানকার বৌদ্ধদের মগ হতে দেয় নি । বার্মা আরাকানের জাতির মানুষ বা তাদের বংশধর যারা ১৫০০-১৭০০ সাল নাগাদ জলদস্যু বা আরাকান রাজ্যবিস্তারে উদ্যেশ্যে বাংলাদেশে চট্টগ্রাম এবং তার আশে পাশে উপকূলবর্তী কিছু অংশ আক্রমন করেন । স্থানীয় মানুষদের ধরে নিয়ে ক্রীতদাস হিসাবে চালান করে দিতো । ১৬২০ সালে ঢাকায় ব্যাপক হামলা করেছিলো মগেরা । সে সময় বাংলার সুবাদার ইব্রাহীম খান তাদের প্রতিহত করেছিলেন । ১৬২৫ সালের মগদের আরাকান রাজা শ্রী সুধর্ম মোঘল রাজধানী ঢাকায় আক্রমন করে । সেই সাথে পরাজিত হয়ে সুবেদার আমজাদ খান পালিয়ে যান । মগেরা পালিয়েছিল, মগ ধাওয়ানী হয়েছিল ১৯৬৬-তে । কিন্তু তখনো তারা শঙ্খ নদীর ওদিকে ছিল ।

চট্টগ্রাম পুরো দখলে আনেন শের জামাল খাঁ ১৭৫৬ সালে । তখন শুরু হয়েছিল ২য় বা মগ ধাওয়ানী । এবার সম্পূর্ণ ভাবে মগেরা উচ্ছেদ হয়ে যায় । সুতরাং মগেরা এখানে অপ্রিয় হয়েছিল । তাদের আচার সংস্কৃতি এখানে প্রিয় ছিল না বা স্থানীয় সংস্কৃতিকে গ্রাস করতে পারে নি । এদের অত্যাচারের কারনে মগ শব্দটা গালির ভাষারুপে দেখা দিয়েছিল । মগের মুলুক কথাটা ও তার একটা প্রমান । ১৭৭৬ সালে চাকমা সররদার শ্রী দৌলত খাঁ এবং রাম খাওন নামক অন্য একজন মগ সরদার ইষ্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানীর বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারন করে । ১৭৭৭এ চট্টগ্রামের পর্বত মধ্যে খেদা করে হাতী ধরার ব্যবস্থা করে কোম্পানী । সে বছর প্রায় ১০ হাজার মগ আরাকান ত্যাগ পূর্বক চট্টগ্রামের পার্বত্য প্রদেশে আশ্রয় নেয় ।

মহারাজ ধন্যমানিক্য (১৪৬৩-১৫১৫) ১৫০১ সালে চট্টগ্রাম আক্রমণ করে মগধেশ্বরীকে ত্রিপুরায় নিয়ে যান এবং উদয়পুরে সসন্মানে ত্রিপুরা সুন্দরীরুপে প্রতিষ্ঠা করেন । কিন্তু এর বিরুদ্ধে চট্টগ্রামের বৌদ্ধরা মুকুট রায় এর নেতৃত্বে ত্রিপুরার সুন্দরীর মন্দির আক্রমন করেছিলো ১৬৩১ সালে এবং মঠের চুড়া ভেঙ্গে ফেলেছিল । ১৬৮১ সালে মহারাজ রাম মানিক্য মন্দিরের সংস্কার কর্ম সম্পাদন করেন । উপরোক্ত বর্ননা থেকে বুঝা যায় ইনি স্থানীয় বৌদ্ধ প্রতিনিধি । তখন আরাকানিরা সরাসরি চট্টগ্রাম শাসন করতো না । স্থানীয় মধ্য থেকে তারা প্রতিনিধি নির্বাচন করতো । ইনি তন্ত্রের সমর্থক ছিলেন এবং তার সময় পর্যন্ত চট্টগ্রামে তন্ত্র প্রচলন ছিল প্রমান পাওয়া যায় । ইনি আরাকান রাজের দূর্ব্যবহারে মোগল সেনাপতি ইসলাম খাঁ বশ্যতা স্বীকার করেন । এর পর থেকে চট্টগ্রামে বৌদ্ধ প্রভাব ও তন্ত্রের উচ্ছেদ হয় ১৬৩৮ সালে। শুকদেবরায় পূর্বে চাকমা এবং বড়ুয়া একত্রে ছিল । তাদের নেতা ছিলেন সেরমুস্তা খাঁ ১৭৩৭ সাল । রাজ্যসীমা উত্তরে ফেনী নদী দক্ষিনে শঙ্খ নদী । শুকদেব সেরমুস্ত খাঁর পালিত পুত্র রাজা হয়ে মোঘল সরকার রায় উপাধি নেন । ইনি আলী কদম থেকে রাজধানী শিলক নদীর কাছাকাছি রাঙ্গুনীয়া উপজেলা নিয়ে যান এবং স্থানটির নাম সুখ বিলাস রাখেন । ইনি চাকমা সরদার এবং সম্ভ্রান্ত ব্যক্তিকে দেওয়ান উপাধি দিয়ে সন্মানিত করতেন ।

তথ্যঃ বৌদ্ধ সংস্কৃতি ও চট্টগ্রামের বড়ুয়া সম্প্রদায় ১৯৮৯ সাল,পৃঃ ১৪,১৫,১৬,১৭ দীনেশ চন্দ্র সেন ১৯৯৩ সাল পৃঃ ৬৮১,ইতেফাক ২০১৫ সাল ১০ জানুয়ারী শনিবার, নয়া দিগন্ত,মমতা বন্দ্যােপাধ্যায় ২০১৭ সাল ১৬ সেপ্টেম্বর শনিবার।

শেয়ার করুন
  • 219
    Shares

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!