সুত্রপাত / বই ও সিনেমা / বিখ্যাত বই কামসূত্র ও যৌনবিজ্ঞান
কামসূত্র

বিখ্যাত বই কামসূত্র ও যৌনবিজ্ঞান

জুনায়েদ রহমানঃ

কামসূত্র (সংস্কৃত: कामसूत्र বা কামসূত্রম এই শব্দ সম্পর্কে pronunciation, Kāmasūtra প্রাচীন ভারতীয় পণ্ডিত মল্লনাগ বাৎস্যায়ন রচিত সংস্কৃত সাহিত্যের একটি প্রামাণ্য মানব যৌনাচার সংক্রান্ত গ্রন্থ। গ্রন্থের একটি অংশের উপজীব্য বিষয় হল যৌনতা সংক্রান্ত ব্যবহারিক উপদেশ। গ্রন্থটি মূলত গদ্যে লিখিত; তবে অনুষ্টুপ ছন্দে রচিত অনেক পদ্যাংশ এতে সন্নিবেশিত হয়েছে। কাম শব্দের অর্থ ইন্দ্রিয়সুখ বা যৌন আনন্দ; অপরদিকে সূত্র শব্দের আক্ষরিক অর্থ সুতো বা যা একাধিক বস্তুকে সূত্রবদ্ধ রাখে। কামসূত্র শব্দটির অর্থ তাই পুস্তকের আকারে এই জাতীয় উপদেশমালার গ্রন্থনা। এতে রমণীদের জন্য প্রযোজ্য চৌষট্টি কলা বিবৃত হয়েছে।

ধর্ম, অর্থ ও কাম দৈনন্দিন জীবনের লক্ষ্য। কিন্তু মোক্ষ জন্ম ও পুনর্জন্মের চক্র থেকে মুক্তিলাভ। কামসূত্র গ্রন্থে লিখেছে:
“ধর্ম অর্থ অপেক্ষা শ্রেয়, অর্থ কাম অপেক্ষা শ্রেয়। কিন্তু অর্থই রাজার জীবনে প্রথম উদ্দেশ্য হওয়া উচিত। কারণ কেবল ইহা হতেই প্রজাগণ জীবনধারণ করিবেন। পুনরপি, কাম বেশ্যাদিগের উপার্জনপথ এবং তাহারা অন্য দুই অপেক্ষা ইহাকেই বাছিয়া লয়। ইহা সাধারণ নিয়মের ব্যতয়।” (কামসূত্র ১।২।১৪)[১১] প্রথম তিনটির মধ্যে ধর্ম সর্বোচ্চ লক্ষ্য। দ্বিতীয়টি জীবনের নিরাপত্তা ও শেষেরটি সুখের জন্য প্রয়োজনীয়। উদ্দ্যেশ্যের মধ্যে বিরোধ ঘটলে শ্রেষ্ঠ উদ্দেশ্যটি অনুসরণ করা উচিত। তাই অর্থোপার্জনের জন্য ধর্মত্যাগ বা সুখের জন্য অর্থোপার্জনের পন্থাটিকে উপেক্ষা করা অনুচিত। যদিও এর ব্যতিক্রম আছে।

বাৎস্যায়নের মতে, শিশুকালেই এক ব্যক্তির অর্থোপার্জনের উপায় শিক্ষা করা উচিত। যৌবন আনন্দ উপভোগের কাল। বয়স অতিবাহিত হলে তাঁর ধর্মকর্মে মনোসংযোগ করে মোক্ষলাভের উপায় চিন্তা করা উচিত। গৌতম বুদ্ধও একটি কামসূত্র শিক্ষা দিয়েছেন। এটি অত্থকবগ্গ গ্রন্থের প্রথম সূত্রে পাওয়া যায়। এই কামসূত্র অবশ্য সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রকৃতির। এখানে বুদ্ধ ইন্দ্রিয়সুখের অনুসন্ধান কত ভয়ানক হতে পারে তা শিখিয়েছেন। অনেক পাশ্চাত্য পণ্ডিত কামসূত্রকে তান্ত্রিক যৌনতার পাঠ্যগ্রন্থ মনে করেন। তা ভুল। হিন্দু তন্ত্র ঐতিহ্যে যৌনাচারের প্রয়োগ ব্যাপক হলেও, কামসূত্র তান্ত্রিক গ্রন্থ নয়। এখানে কোনো তান্ত্রিক ধর্মানুশীলনের কথা বলা হয়নি।

অনুবাদ
Lamairesse – Kama Sutra.djvu
কামসূত্র গ্রন্থের সর্বাধিক প্রসিদ্ধ ইংরেজি অনুবাদটি ১৮৮৩ সালে ব্যক্তিগতভাবে প্রকাশিত হয়। এই অনুবাদটি বিশিষ্ট প্রাচ্যবিদ ও লেখক স্যার রিচার্ড ফ্রান্সিস বার্টনের নামাঙ্কিত। তবে বার্টনের বন্ধু ইন্ডিয়ান সিভিল সারভেন্ট ফস্টার ফিজগেরাল্ড আরবুটনটের নির্দেশনায় মূল কাজটি করেছিলেন অগ্রণী ভারতীয় পুরাতত্ত্ববিদ ভগবানলাল ইন্দ্রজি। এই কাজে তাঁকে সহায়তা করেন শিবরাম পরশুরাম ভিদে নামক তাঁর এক ছাত্র। বার্টন এই অনুবাদের প্রকাশের কাজটি করেন। এছাড়া একাধিক পাদটীকা সন্নিবেশিত করে তিনি গ্রন্থটির সম্পাদনাও করেছিলেন। তাঁর সম্পাদনার ভাষা ছিল একাধারে রসিকতা ও পাণ্ডিত্যপূর্ণ। ভূমিকায় তিনি লিখেছিলেন:

বাৎস্যায়নকে পাদপ্রদীপের আলোকে এনে কিভাবে তাঁর রচনা ইংরেজি ভাষায় অনুবাদ করা হল, তা জানবার জন্য অনেকেই উৎসুক হবেন। ব্যাপারটি ঘটেছিল এইভাবে। পণ্ডিতদের সঙ্গে বসে ‘অনঙ্গরঙ্গ’ অনুবাদ করতে গিয়ে বারংবার কোনো এক বাৎস্যার নাম রচনাসূত্র হিসেবে উঠে আসছিল। বাৎস্যা ঋষির মতে এই, বাৎস্যা ঋষির মতে তাই। বাৎস্যা ঋষি এই বলেছে, এবং এই রকম আরো কত কি। স্বাভাবিক ভাবেই প্রশ্ন জাগল যে এই বাৎস্যা ঋষিটি কে। পণ্ডিতেরা উত্তর দিলেন বাৎস্যা সংস্কৃত সাহিত্যে প্রেমের উপর এক প্রামাণ্য গ্রন্থের রচয়িতা। কোনো সংস্কৃত পাঠাগারই তাঁর রচনা ছাড়া সম্পূর্ণ হয় না। এবং এও জানলাম যে তাঁর রচনার সম্পূর্ণাংশ একসঙ্গে পাওয়াও এখন দুষ্কর। বোম্বাইতে যে রক্ষিত পাণ্ডুলিপিটিতে অনেক ভুলভ্রান্তি ছিল। তাই পণ্ডিতেরা বারাণসী, কলকাতা ও জয়পুরের সংস্কৃত পাঠাগারগুলিতে লিখে সেখান থেকে পাণ্ডুলিপি আনানোর বন্দোবস্ত করলেন। সেখানকার পাণ্ডুলিপির প্রতিলিপি এসে পৌঁছালে, সেগুলিকে পরস্পরের সঙ্গে তুলনা করে দেখা হল। তারপর ‘জয়মঙ্গল’ নামে এক টীকার সাহায্যে সমগ্র পাণ্ডুলিপির একটি সংশোধিত প্রতিলিপি প্রস্তুত করা হল। এই প্রতিলিপিটিই ইংরেজিতে অনুবাদ করা হয়েছে। নিচে মুখ্য পণ্ডিতের শংসাপত্রটি দেওয়া হল:

এই গ্রন্থের বিভিন্ন প্রতিলিপির সঙ্গে তুলনা করার পর সহকারী প্রতিলিপিটি আমি নিজে সংশোধন করেছি। প্রথম পাঁচটি খণ্ডের সংশোধনের কাজে সাহায্য করেছে ‘জয়মঙ্গল’ নামক টীকাটি। কিন্তু অবশিষ্ট কাজটি বেশ জটিল আকার নেয়। একটি প্রতিলিপি মোটামুটি সঠিক হলেও, অন্যগুলি প্রায় পুরোটাই ছিল ভুলে ভরা। যাই হোক, যে অংশটি একাধিক ক্ষেত্রে পাওয়া গেছে, সেইটিই সঠিক বলে গ্রহণ করেছি। তাঁর নিজের অনুবাদের ভূমিকায় শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের ধর্মীয় ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপিকা ওয়েন্ডি ডনিগার লিখেছেন, “managed to get a rough approximation of the text published in English in 1883, nasty bits and all”। ভিয়েনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অফ ইন্দোলজির ভাষাতাত্ত্বিক ও সংস্কৃতবিদ অধ্যাপক ক্লোডুইগ ওয়েরবা মনে করেন ১৮৮৩ সালে অনুবাদের স্থান ১৮৯৭ সালের রিচার্ড সিমিড প্রকাশিত আকাদেমিক জার্মান-লাতিন গ্রন্থের পরে।

ওয়েন্ডি ডনিগার ও হাভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর স্টাডি অফ ওয়ার্ল্ড রিলিজিয়নের ভারতীয় মনোবিশ্লেষক ও সিনিয়র ফেলো সুধীর কক্কড় অনূদিত ইংরেজি অনুবাদটিই এই গ্রন্থের প্রামাণ্য অনুবাদ। ২০০২ সালে অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস থেকে এটি প্রকাশিত হয়। ডনিগার সংস্কৃত বিষয়বস্তু সম্পাদনা করেন এবং কক্কড় গ্রন্থের মনোবিশ্লেষণী ব্যাখ্যা দেন। ইন্দ্র সিনহা কৃত একটি উল্লেখযোগ্য অনুবাদ প্রকাশিত হয় ১৯৮০ সালে। ১৯৯০-এর দশকের প্রথম দিকে এই অনুবাদের যৌন ভঙ্গিমা সংক্রান্ত অধ্যায়টি ইন্টারনেটে ব্যাপক প্রচার লাভ করে। কেউ কেউ এই অংশটিকে সমগ্র কামসূত্র বলে ধরে নেন।

দ্য কমপ্লিট কামসূত্র নামে আর একটি উল্লেখযোগ্য অনুবাদ ১৯৯৪ সালে অ্যালান ড্যানিলোর নামে প্রকাশিত হয়। এই অনুবাদ প্রথমে ফরাসিতে ও পরে ইংরেজিতে করা হয়। মধ্যযুগীয় ও আধুনিক টীকা সহ বাৎস্যায়নের মূল রচনা এই অনুবাদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়। অ্যালান ড্যানিলোর অনুবাদে অনেক মূল স্তবকচ্ছেদ রক্ষিত হয়েছে যা ১৮৮৩ সালের সংস্করণে করা হয়নি। এছাড়া তিনি মূল রচনার সঙ্গে পাদটীকাও যোগ করেননি। তিনি দুটি গুরুত্বপূর্ণ টীকার ইংরেজি অনুবাদ গ্রন্থভুক্ত করেছিলেন:

পৃষ্ঠাপাদটীকা রূপে মধ্যযুগীয় টীকাকার যশোধর কর্তৃক সংস্কৃতে রচিত জয়মঙ্গল টীকা গ্রন্থপাদটীকা রূপে দেবদত্ত শাস্ত্রীর আধুনিক হিন্দি টীকা ড্যানিলো ব্রাহ্মণ ছাড়া সকল সংস্কৃত শব্দের ইংরেজিতে আক্ষরিক অনুবাদ করেছিলেন। তিনি যৌনাঙ্গের নামের বিষয়ে মূলের সূত্র ত্যাগ করেন। গ্রন্থের পুরনো অনুবাদগুলিতে যেভাবে “লিঙ্গম ” বা “যোনি ” কথাদুটি ব্যবহৃত হয়েছে, তার বিরোধিতা করে তিনি বলেন, বর্তমানে হিন্দুদের কাছে এই দুটি শব্দ কেবল শিব ও তাঁর স্ত্রীর যৌনাঙ্গ বোঝায়। তাঁর মতে, মানব যৌনাঙ্গের নাম হিসেবে এগুলির উল্লেখ ধর্মবিরুদ্ধ। “লিঙ্গম” শব্দের অর্থ কেবলমাত্র “যৌনাঙ্গ” – এই মত নিয়ে এস এন বালগঙ্গাধরের মতো পণ্ডিতেরও দ্বিমত আছে।

তথ্যসূত্রঃ Keay, John (২০০০)। India: A History। New York: Grove Press।
McConnachie, James (২০০৭)। The Book of Love: In Search of the Kamasutra। London: Atlantic Books।
Apte, Vaman Shivram (১৯৬৫)। The Practical Sanskrit Dictionary। Delhi: Motilal Banarsidass Publishers।

শেয়ার করুন
  • 16
    Shares

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!