সুত্রপাত / গল্প অথবা উপন্যাস / বালক দলের অভিযান

বালক দলের অভিযান

শাহাদাত হোসাইন স্বাধীন,

আর আট দশটা গ্রামের মতোই কলাতলী গ্রাম। গ্রামে সজল ও তার বন্ধুদের দের এ ছোট খাটো গ্যাং আছে। গ্যাংয়ের একটি সাইনবোর্ডে খচিত নাম ওআছে ‘কলাতলী বালক সংঘ’। তবে  বালক দল নিজেদের গ্যাং বলেই পরিচয় দিত । ঐ যে বালক  সংঘের ছেলেরা যায় বলার চেয়ে ঐ যে গ্যাংয়ের ছেলেরা যায় বলা অনেক বেশী আধিপত্যশীল। এই গ্যাং মসজিদের ইমাম হুজুর ছাড়া মোটামুটি কাউকে তোয়াক্কা করে না। সজল, উত্তম, সবুজ, নিহাদ, ফোরকান আর জামাল গ্যাংয়ে নিয়মিত। এছাড়া মাঝে মাঝে অনেকে আসে আবার চলে যায়।

পাড়ায় গ্যাংয়ের বেশ কিছু অবধারিত কাজ আছে। পাড়ার সালিশে ভীড়ের মাঝে কিছু একটা বলে মাথা লুকিয়ে ফেলা, বর্ষায় ভেঙ্গে যাওয়া রাস্তা মেরামত করা, আশপাশের আটগ্রামের যে কোন মেজবানে দাওয়াত বিনে দুই-তিনবার করে খাওয়া, নব দম্পতির টিনের চালে মাঝরাতে ঢিল ছোড়া, এশার নামাজের কথা বলে বাড়ি থেকে বের হয়ে জয়নাল মুন্সির ডাব চুরি করা, মসজিদের পাকা পেঁপের দিকে নজর দেয়া। এছাড়া সময়ের প্রয়োজনে আরও কত কাজ যে তাদের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে তার ইয়াত্তা নেই।তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে জাগতিক আলো নিভে গেলে বালক দলের অভিযান শুরু হতো।
সজল আর উত্তম বয়েজ স্কুলে পড়লেও সবুজ আর নিহাদ পড়ে বাড়ি থেকে ছয় মাইল দূরের মাদ্রাসায়। আর ফোরকান মাত্র কলেজে উঠেছে। জামাল পড়ে শহরে। কিন্তু কলেজ বন্ধ দিলেই গ্যাংয়ের নিয়মিত মহড়ায় জামাল হাজির হতো।

বাজারের দক্ষিণে মানুষের কোলাহল কম। ঐদিকটায় বড় শিরিষ গাছতলা । শিরিষতলা দিনের বেলা এই বালক দলের দখলে থাকে। তাছাড়া রাতের বেলা তাদের যোগাযোগ ঘটে পাড়ার মসজিদের উত্তরে কবরস্থানের পাড়ে। প্রায় রোজ রাতে এশারের নামাজের কথা বলে বাড়ি থেকে বের হয় সবাই।  সন্ধ্যার পর এই চৈত্রের রাতে বাড়িতে থাকাও দুষ্কর। ঘরে ঘরে সবার বিদ্যুতের খাম্বা এসেছে। বাড়িতে সবার লাইট-ফ্যান ঝুলছে। কিন্তু সন্ধ্যার পর সেই লাইটও জ্বলে না পাখাও ঘুরে না।

স্কুল থেকে ফিরে সোজা ফুটবল মাঠ সেখান থেকে বাজারের পিছনের জমিদার দীঘিতে ঝাপাঝাপি শেষে সন্ধ্যার পরপরই পড়ার টেবিলে বসতে হয় স্কুল পড়ুয়াদের। সন্ধ্যার পরপর প্রতি বাড়ির লোকজন হারিকেন জ্বালিয়ে রাখে। বিদ্যুত দেবতার আশির্বাদে শেষ রাতে পাখা চললেও চলতে পারে কিন্তু সন্ধ্যায়  আলো জ্বলবে না।
হারিকেনের আলো, চৈত্রের রাত্রির গরম আর সারাদিনের ক্লান্তি নিয়ে পড়তে বসার কিছুক্ষণের মধ্যেই মায়েরা তাদের সন্তানদের বইয়ের উপর ঘুমন্ত অবস্থায় খুঁজে পায়।বাড়ির বড়রা অসহনীয় গরমে ঠিকতে না পেরে  গাছতলায় বা বাড়ির উঠানে বসে। কিন্তু একটা গাছের পাতাও দয়া করে না এই হতভাগাদের।

বইয়ের উপর ঘুমিয়ে পড়া ছেলেমেয়েদের মায়েরা এসে হাতের কাছে যা আছে তা নিয়ে মাঝেমাঝেই উত্তম মাধ্যম চালায়। কখনো মা আসার আগ মুহূর্তে দৈববাণীর বলে ছেলেরা জেগে উঠে। মা-ছেলের এই লুকোচুরি গল্প কারো কারো শেষ হয় মসজিদের এশার আজান পড়লে। সেই ভাগ্যবানরা হলো সজলরা।
ধর্মের অজুহাত খন্ডন করার যুক্তি যেহেতু বঙ্গ দেশে এখনো পয়দা হয় নি,তাই আযান দিলেই সজলের পড়ার টেবিল থেকে উঠার অনুমতি মিলে।মসজিদে যাওয়ার কথা বলে সজল ও তার বন্ধুরা কবরস্থানের পাড়ে একসাথে হতো। যাওয়ার পথে ফোরকান আর নিহাদকে শিষ দিয়ে ডাকার দায়িত্ব  সজলের। নামাজের কথা বলে বের হলেও কবে  মসজিদে ঢুকেছে সে স্মৃতি সজল আর সজলের বন্ধুরা কখনো মনে করতে পারবে বলে মনে হয় না।

কখনো সন্ধ্যা পেরিয়ে মাঝরাত্রিরেও কারেন্ট আসতো না কলাতলী গ্রামে। পঞ্চমি চাঁদটা যখন সুপারি গাছের মাথায় আসে তখন ভান্ডারীদের উঠানে গানের আসর বসত। একজন একজন করে সবাই গিয়ে বসত ভান্ডারীদের আম গাছ তলায়। ভান্ডারী গান করত..পিঞ্জরের পাখি..তোর দুঃখ বুঝে না কেউ, তোর বুকে ব্যথার ঢেউ। ভান্ডারী মাঝে মাঝে গান না করে হারমোনিয়াম বাজাত। তার হারমোনিয়ামের করুণ সুর নিস্তব্ধ রাতের অন্ধকার ভেদ করে মিলিয়ে যেত দূরে। পাড়ার মহিলাদের মধ্যে সজলের দাদির গলায় গানের সুর উঠলে লোক সমাগমে তিনি গায়তে লজ্জা পেতেন।
—‘ ভান্ডারী মিয়া তোমার হারমোনিয়ামের সুরে আর থাকতে পারলাম না।’-কথা টা বলেই পাশে বসে পড়ত নাজির মিয়া।
ভান্ডারী কৃতজ্ঞতায় মাথা নেড়ে হারমোনিয়ামেই তার মনোযোগ নিবৃত করে।
অালোহীন গ্রামের মানুষ এরা।এই মানুষগুলোর জীবনে যেমন বিদ্যুতের আলো পৌঁছতে পৌঁছতেও পৌঁছে নি ঠিক তেমনি জীবনের আলো ও তাদের দেখা হয় নি কখনো। সভ্যতার আলো বা বিদ্যুতের আলো উভয়ে তাদের ধোকা দিয়ে যায় বারেবারে। সারাদিন মাঠে কাজ করে রাতে চৈত্রের গরমে প্রকৃতির দয়া পেতে গাছের তলায় বসে এরা জীবনের গান গায়।  তাদের  গলায় ভেসে আসে জীবনের সেই্ অমানিশার গল্প। কখনো কখনো সুর করে পুঁথি পড়ে নায়ক মুন্সী। সাত সাগর তের নদী পেরিয়ে রাক্ষসের হাতে বন্দি রাজকুমারীকে কীভাবে রাজকুমার উদ্ধার করে সে গল্প পড়ে শোনায় মুন্সি। এভাবে চাঁদ হেলে পড়ে পশ্চিম আকাশে। ঘুমকাতুরে চোখ নিয়ে বাড়ি ফেরে পড়শীরা। ।

গানের আসর নিয়ে বালক দলের কোন মাথাব্যথা নেই। সবাই যখন গানে মগ্ন তখন বালকেরা ভাবে আজ তারা কার গাছের ডাব পাড়বে।ডাব খেয়ে বলবন্ত বালকেরা নিরাীহ গোছের পথচারীখে ভয় দেখানোর অভিযানে নামত। এই তাদের প্রতি দিনকার রুনি বলা যায়।

শীতকালে আরেক অমানিশা গ্রাস করত এই গ্রামকে।  শীতের সময়ে পালা করেই আজ এই বাড়ি কাল ঐ বাড়ি ডাকাতি হতো। খবর পেয়ে পরের দিন সকাল বেলা ডাকাতি হওয়া বাড়িতে গিয়ে ঘটনার কাল্পনিক বিবরণ তৈরী করত বালকেরা। তবে সজলদের গ্যাংয়ের কেউ এখনো ডাকাত দেখেনি। । ডাকাত দেখেতে কেমন তার একটা স্থিরচিত্র মাথায় সবার তৈরী হয়ে আছে কারো কারো। কেউ ভাবত বলি খেলার জওয়ানদের মত শক্তিশালী এরা। একজন ডাকাত ১০জন লোককে কুপেকাত করতে পারে। অনেক জোড়ে ঘোড়া চালাতে পারে এরা। কেউ ভাবে ডাকাতদের ইয়া লম্বা দেহ আর বড় বড় গোঁফ আছে। আর সিনেমার ভিলেনদের মত বিদেশী অস্ত্র থাকে পকেটে।

অনেকবার ডাকাতদের ধাওয়া করেছে গ্রামবাসী কিন্তু ডাকাত ধরতে পারেনি। কারণ একটাই, গ্রামের পিছনে বিশাল এক বিল। বিলের মাঝখান দিয়ে গেছে একটা মরা খাল। সেই খাল পেরুলে আর কেউ ডাকাত ধাওয়া করত না। সবাই জানে সে খালে সব মানুষখেকো জ্বিন ভূতেরা থাকে। আজ পর্যন্ত অনেকের ঘাড় মটকেছে বলে প্রচলিত আছে। তবে, কে দেখেছে বা কার ঘাড় মটকেছে তাকে কখনো খুঁজে পাওয়া যায় নি। তবে সবাই জানে রাতের বেলা মরা খালে গেলে জীবন নিয়ে ফিরে আসা যাবে না। তবে অনেক আগে জালালের বাপ রাতের বেলা প্রাকৃতিক কাজ সারতে গিয়েছিল মরাখালের পাড়ে। পরের দিন সকাল বেলা বদনার উপর তাকে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়। মরার নাকি ভয়ঙ্কর চোখ আর ইয়া লম্বা জিহবা বের হয়েছিল। কিন্তু গ্রামবাসীর ধাওয়া খেয়ে ডাকাতরা কেনই বা সেই মরা খালের দিকে দৌঁড়াতো সে কারণ আজও অজানা।

এই মরাখালের উপর দিয়ে একটি রাস্তা সজলদের গ্রামের সাথে মুন্সি পাড়াকে যুক্ত করেছে। তবে মুন্সি পাড়ার সাথে সজলদের পাড়ার যত যোগাযোগ সন্ধ্যার আগে হতো। সন্ধ্যার পর মরাখাল কেউ পেরুতে চাইতো না। এমনকি মুন্সি পাড়ার কারো গঞ্জ থেকে ফিরতে দেরী হলে সজলদের গ্রামে কারো বাড়িতে থেকে যেতো মরাখাল আর পার হতো না।

কদিন পরে  তৌফিক নামে একটা ছেলের বিয়ে অনুষ্ঠান হয় কলাতলী গ্রামে। বিয়ের রাতে বাড়ির বাইরে থাকাকে কোন দোষের পর্যায়ে ধরা হতো না। তাছাড়া নব-দম্পত্তির টিনের চালে বিয়ের রাতে ঢিল ছোড়া বালক দলের অন্যতম রুটিন কাজ ছিল। এই বিয়েতে তারা আরেকটা প্লান করে। তারা আজ বন্ধু ফোরকানের কাছ থেকে সিগারেট খাওয়ার তালিম নিবে। বালক থেকে পুরুষ হয়ে উঠার  স্কীকৃতি পেতে তাদের সিগারেট টানার তালিমটা ভীষণ দরকার হয়ে পড়েছিল তখন।

বিয়ের রাতে সবখানে লোকজন। নিজেদের নিরাপদ জায়গা বলতে সেই কবরস্থানের পাড়। কিন্তু কবরস্থানের পাড়ে সিগারেট টানতে শেখার মত পাপী তারা নয়। এর আগে ডাব, কাঠাঁল ও পেঁপে চুরি করে কবরস্থানে লুকিয়ে রেখেছে বহুবার। তাই বলে কবরস্থানের পাড়ে বসে সিগারেট টানার মত পাপ কাজ করতে কারো মন সায় দিচ্ছে না।

সব শেষে সিদ্ধান্ত হলো তারা মরা খালের দিকে গিয়ে সিগারেট খাওয়া শিখবে। মরা খালে যাবে না কিন্তু ঐ রাস্তার তালগাছ তলায় বসলে তাদের সিগারেট খাওয়ার কথা কেউ জানবে না। আর যাই হোক এই রাতে এইদিকে কেউ আসবে না। প্রথম সিগারেট খাওয়ার অভিজ্ঞতা নিতে গিয়ে এই বালক দল ভয়ে এতই মাতাল ছিল যে সেই রাতে নব দম্পতি টিনের চালে ঢিলের আওয়াজ থেকে বেঁচে যায়। পরদিন সকাল বেলা সিগারেট খাওয়ার কথা জানাজানি হবার ভয়ে রাতে মরা খালের রাস্তায় যাওয়ার সাহসীকতার গল্প কাউকে বলে বেড়াতে পারেনি বালকেরা।

মরাখালের পানি আরও কমে আসে। শীত শেষ করে চৈত্রের গরমে চারদিকে মাঠ-ঘাট হাহাকার। রাতের বেলাও শান্তি নেই। কোথাও কোন গাছপালা নড়ছে না। কোন বাতাস নেই। কারেন্ট আর যায়না গ্রামে। কারণ সে আসার সুযোগই পায় না। হারিকেন আলোর চেয়ে তাপ ছড়ায় বেশী। ক্লাস টেনে উঠেছে সজল। প্রচন্ড পড়ার চাপ।

ইদানিং মায়ের সাথে সজলের প্রায় তর্কাতর্কি হচ্ছে। সকাল সন্ধ্যা সজলের নামে নালিশ আসে। সে একটা সেকেন্ড হ্যান্ড ফোন কিনেছে। বাবাকে বলে, সে ফোন নিয়ে নিছে সজলের মা। সজল বুঝতে পারে মায়ের ভালবাসায় টান পড়েছে। রাতের খাবারে তার ছোট ভাই রবিনের প্লেটে মাছের মাথা দেখে সজলের মেজাজ চরমে উঠে।
– কিরে রবিন, ‘তুই মাছের মাথা খাস কবে থেকে?
– মা দিছে! মা বলছে, মাছের মাথা খেলে বুদ্ধি খুলবে। আমি তো বার্ষিক পরীক্ষায় ভাল রেজাল্ট করেছি। তাই মা আমাকে মাছের মাথা খেতে দিয়েছে।
‘মা, মা, রবিনকে কেন মাছের মাথা দিছো। তুমি জানো না আমি মাছের মাথা খেতে চাই।’ চিৎকার করে সজল বলল।
ঘরের ভিতর থেকে মায়ের ডাক, ‘যাকে যা দিছি তা দিয়ে খেয়ে উঠ, তুই আমার মাথা খাচ্ছোস, হচ্ছে না! আবার মাছের মাথা লাগে তোর..!’

না, এই অপমান সহ্য করা সম্ভব না। সে মায়ের মাথা খাচ্ছে ? ঝগড়া করে বাড়ি থেকে বের হয়ে যায় সজল। এটা স্রেফ অন্যায়, যাওয়ার সময় বলে গেছে যে ঘরে তার প্রতি কোন দরদ নেই সে ঘরে আর ফিরবে না।

চরম অভিমান লাগছে। অকারণে মা তাকে অপছন্দ করছে। হঠাৎ কেউ যেন এসে তাদের ভালবাসার মাঝে বিভেদের দেয়াল তুলে দিয়েছে। কান্না চাপা দিতে গিয়েও চাপা দিতে পারল না। এই কান্না অভিমানের কান্না। অভিমানে কেঁদে মানুষ অভিমান ঘুঁচাতে চায়।
‘আমি নিজের সন্তান হওয়া সত্ত্বেও মা আমাকে পছন্দ করে না। বিল্লালের বাপ কি সব নালিশ করে তা নিয়ে সন্ধ্যার পর থেকে গ্যাঁন গ্যাঁন করে। আমি  মায়ের কুঁড়িয়ে পাওয়া সন্তান শুনছিলাম  মিথ্যা না।’
এসব ভাবতে ভাবতে হাটঁছে আর অভিমানে চোখের জল পড়ছে।
তার মনে হচ্ছে এই পৃথিবী তার নয়। বন্ধুদের আর ভাল লাগে না। ফুটবল ম্যাচের টাকা ভাগ-বাটোয়ারায় তারা সজলকে ঠকিয়েছে। মুন্সি বাড়ির তাল তারাই চুরি করেছে কিন্ত সজলকে সে প্ল্যানে রাখেনি। সজল আর ফোরকানকে ইদানিং তারা কোন প্লানে রাখছে না । উল্লাপাড়ার একটা মেয়েকে উত্তম পছন্দ করে। প্রতিদিন বিকালে উত্তম নিহাদ আর সবুজকেকে নিয়ে ঐ মেয়েকে দেখতে যায়। একই স্কুলে একসাথে পড়ার পরও উত্তম সজলকে এসব কিছু বলে নি। ওরা নাকি আজকাল পলিটিক্সও করছে।

এসব ভাবতে ভাবতে নিজের অজান্তে মরা খালের ব্রিজে এসে বসেছে। আসার পথে টুইন্যার দোকান থেকে সিগারেট কিনে নিয়েছে। মনের ভেতর জমে থাকা অভিমান আর কষ্ট ধোঁয়া হয়ে মিশে যাক এই বিলের প্রান্তর জুড়ে। মরা খালের ব্রিজে রাত্রিবেলা বসে আছে সজল, তার ভয় লাগছে না। মানুষের দুইটা সেন্স  একসাথে কাজ করে না। অভিমানের রাতে মানুষের মনের সকল আদিম ভয় কেটে যায়। এই রাতে ডাকাত দলের খপ্পরো পড়ার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেয়া যায় না।
‘আসুক ডাকাত দল, আসলে ডাকাত দলে যোগ দিয়ে দিব। ঘর যেহেতু ছেড়েছি আর ঘরে ফিরব না।’ কিন্তু কোন ভাবনাতে সজল সান্তনা খুঁজে পাচ্ছে না।
জ্বিন ভূতের কথা মনে পড়তেই গা শিরশিরিয়ে উঠল। ভয় কাটাতে একটা সিগারেট ধরাল সজল। ‘না, এতো জায়গা থাকতে মরা খালের ব্রিজে আসা ঠিক হয়নি আমার। জমিদার দীঘির পাড়ে অথবা কবরস্থানে পশ্চিম পাড়েও তো বসা যেত। রাগের মাথায় এসব কি মনে থাকে।
আরে জ্বিন ভূত এসব ভূয়া। বিশ্বাস করি না। সত্য হলে ডাকাত দলকে জ্বিনে ধরে না কেন।’ এসব ভেবে স্বান্তনা খোঁজার চেষ্টা করে সজল।

সিগারেট টানতে টানতে কিছুক্ষণ পর চোখ গেল ব্রিজের বিপরীত পাশে। চোখ গেল না শুধু চোখ আটকে গেল। ২৪/২৫ বছর বয়সী এক  সুন্দরী তরুণী বসে আছে। জিন্স-টি শার্ট পড়া। চুল ক্লোজআপ ওয়ান তারকাদের মত। সুন্দরী তো নয় অপরূপ সুন্দরী। অনিন্দ্য সুন্দরী। এত সুন্দরী যে চোখ ফেরানো দায়। এই মর্ত্যলোকের মানুষ এত সুন্দর হতে পারে না। সে অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে মেয়েটির দিকে। এই চন্দ্রিমা রাতের মিটি আলোর চেয়েও মেয়েটির রুপের সৌন্দর্য্য বাড়ন্ত। হঠাৎ গা শিরশিরিয়ে উঠল। সৌন্দর্যের অনুভূতি নিমিষেই ভয়ে রুপ নিল। এত রাতে এই ব্রিজে এত সুন্দরী মেয়ে! সজলদের গ্রামে কেন দশ গ্রামে এমন সুন্দরী শহুরে মেয়ে থাকার কথা না।

তাহলে এই কি মরাখালের সেই ভূত! যে সবার ঘাড় মটকে দেয়!! ভাবতেই গা কাপঁছে সজলের। মুখ থেকে সিগারেট পড়ে গেছে অনেক আগে। আবার আরেকট সিগারেট ধরাতে শত চেষ্টা করেও ধরাতে পারল না। আগুন থাকলে ভূত মানুষের কোন ক্ষতি করতে পারে না সে জানে। কিন্তু কিছ্ইু করতে পারছে না। নিজের উপর নিয়ন্ত্রণ নেই তার। ভূত তার সব নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিয়েছে। কিছুক্ষণ পর হয়ত ভূত অট্টহাসি দিয়ে তার ঘাড় মটকে দিবে। হাত-পা কাঁপছে তার।

মায়ের কথা মনে পড়ছে সজলের। আর ও বেশী রাগ হচ্ছে মায়ের উপর। মা যদি ওমন না করত তবে সে কি এত রাতে এসে মরাখালের ব্রিজে বসে। জীবনের শেষ মূহুর্ত সজলের জন্য। এই ভূত তাকে এখনি মেরে ফেলবে নতুবা তার রাজ্যে নিয়ে গিয়ে সারাজীবনের জন্য দাস বানিয়ে রাখবে। জীবনের আসন্ন পরিণতি চোখের সামনে ভাসছে।
কিন্তু ভূত এক মুহুর্তের জন্য ও তার দিকে তাকাচ্ছে না। সে নির্বিকার। তাতে সজলের ভয় আরও বাড়ছে। যত দোয়া দরুদ জানে, সব পড়ার চেষ্টা করছে। কিন্তু মুখ দিয়ে কিছুই আসছে না। আল্লাহও তার মুখের জবান নিয়ে গেছে। মায়ের সাথে ঝগড়া করার ফল এটা।
‘মায়ের মুখে মুখে আর জীবনে তর্ক করব না আল্লাহ। আমার মুখের জবান ফিরিয়ে দাও। বলতে গিয়ে ফের কাদঁছে সজল।’ কিন্তু এই মেয়ে জ্বিনের সামনে কাদঁবে না সে। একটা মেয়ে জ্বিনের ভয়ে কান্না করার চেয়ে মরে যাওয়া ঢের ভাল।
মৃত্যুর মুখোমুখি দাড়িঁয়ে পুরুষত্ব দেখানোর সাহস শুধু ১৩/১৪ বছরের বালকেরই আছে। সদ্য গজিয়ে উঠা পুরুষত্বের মান রাখতে তারা যেকোন বাজি ধরতে রাজি। ।
মায়ের সাথে আর কখনো তর্ক করবে না এই তওবা করার পর আস্তে আস্তে মুখ দিয়ে দোয়া-দরুদ বের হচ্ছে। মনে হচ্ছে হাত পায়ের কাঁপুনিও একটু কমে আসছে। সজলের সাথে এতসব হয়ে যাচ্ছে কিন্তু জ্বিনের কোন নড়চড় দেখছে না সে।
জ্বিন তার মোবাইলে হেডফোন লাগিয়ে গান শুনেই যাচ্ছে। হঠাৎ সাহস করে আবার তাকাল জ্বিনের দিকে। কিন্তু জ্বিন উধাও। না আশপাশেও দেখা যাচ্ছে না।
এটাই সুযোগ সজল! দৌঁড়া। জীবনকে শেষ বারের মত ভালোবেসে সে দৌঁড় দিল।

এরপর যখন সজলের জ্ঞান ফিরেছে তখন সে বেডে শুয়ে আছে। বেডের পাশে বসে মা কাদঁছে। আর মসজিদের ইমাম হুজুর তাকে ঝাঁড়-ফুক করছে। সব বন্ধুরা নিরাপদ দূরত্বে দাড়িঁয়ে আছে। চোখ খুলতেই তারা সজলকে ঘিরে ধরেছে। সজলের গায়ে তখন  প্রচন্ড জ্বর ।

মরাখালের ব্রিজ পার হয়ে তালগাছের নিচে তাকে বেহুশ অবস্থায় টুইন্যা দেখতে পেয়ে বাড়ি নিয়ে আসে। সে রাতের ঘটনা সজলের উপর বেশ প্রভাব ফেলে। সে সহজে  স্বাভাবিক হতে পারছিল না।। অজান্তে একটা গাছের পাতা পড়লেও যেন সে চমকে উঠে। পুরুষ হয়ে উঠা একটি বালক হঠাৎ নেতিয়ে গেল।মনের ভয় আর শরীরের জ্বর সারতে আরও বেশ কয়েকদিন লেগে যায়।

এরই মধ্যে সজলের ভূতের দৌঁড়ানির খবর গ্রামময় রাষ্ট্র হয়ে গেছে।

মুন্সি পাড়ায় ঢাকার কোন এক বড় অফিসার গ্রামে বেড়াতে এসেছে। তার এক অনিন্দ্য সুন্দরী মেয়ে আছে। প্রতিদিন বিকালে সে মেয়ে বাজারের পিছনের জমিদার দীঘি, মরাখালের ব্রিজে একা একা হাঁটে। বিকালে সবুজ, নিহাদ ও উত্তম মেয়েটাকে ফলো করে। নানা রকমের আঞ্চলিক  ডাক ছাড়ে।

সজল অনেকদিন বাড়ির বের হয় না। তার বন্ধুরা তাকে আজকে সে মেয়ে দেখাতে নিয়ে যাবে।
কিন্তু মরাখালের কথা মনে পড়তেই তার বুকের ভেতরটা ভয়ে কুচিয়ে উঠে। পরে সবাই মিলে গ্রামের জমিদার দীঘির পাড়ে ঘুরতে বের হয়।
কিছুক্ষণ পর একটা গাড়ি এসে থেমেছে দীঘির পাড়ে। গাড়ি থেকে বেশ ক’জন লোক নেমে সজলদের দিকে আসছে।
কেউ কিছু বুঝে উঠার আগে সজল একটা মেয়ের দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে। উত্তম আর নিহাদ তাকিয়ে আছে সজলের দিকে ।
—– এই এভাবে কি দেখছিস? তুই কি মেয়েটাকে চিনিস? নিহাদ অবাক হয়ে বলল।
আরে এই তো সে জ্বিন যে মরাখালের ব্রিজে আমার ঘাড় মটকাতে চেয়েছিল। কিছু বলতে চেয়ে চুপ হয়ে গেল সজল।
বেশ কিছু ভাবনা তাকে নাড়িয়ে তুলল। কোথাও ভুল হচ্ছে না তো। সত্যিই কি সে রাতে এই মেয়েটাই ছিল। একদম হুবুহু মিল যে। চুলের কাট,জিন্স প্যান্ট টি শার্ট, সব ই তো মিলে যাচ্ছে । ঐ রাতের মতো কানে হেডফোন দিয়ে গান শুনছে।
না, আপাতত কাউকে কিছু বলা যাবে না।

মুন্সি পাড়ার সেই মেয়েকে বন্ধুদের আড়ালে প্রতিদিন ফলো করতে থাকে সজল।

মেয়েটার সাথে অনেকবার কথাও বলতে চেয়েছে। কিন্তু সাহস হয়নি। এতোদিনে মেয়েটিও হয়ত বুঝে ফেলছে সজল কিছু বলতে চায়। মেয়েটা কি বুঝতে পেরেছে সেদিন মরাখালের ব্রিজে মেয়েটিকে দেখে দৌঁড়ে পালানো ছেলেটা সজল। না, না এই লজ্জ্বার কথা পৃথিবীর কেউ না জানুক। মেয়েটার প্রতি একধরনের ভালবাসা জেগে উঠছে সজলের। মেয়েটাকে সে প্রতিনিয়ত ভাবে। গতরাতে তো মেয়েটা কাছে আসতেই সজলের পুরুষত্বের সকল শক্তি নিঃশেষ হয়ে যায়।

একদিন সকালে উঠেই মুন্সি পাড়ার ঔ বাড়িতে গিয়ে হাজির সজল। গিয়ে দেখে ঐ মেয়ে ও তার পরিবার ঢাকায় ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছে। এর মধ্যেই উঠানে গাড়ি এসে দাড়িঁয়েছে। মেয়েটা গাড়িতে উঠছে। চোখের হালকা ইশারায় সজলের দিকে কিঞ্চিৎ তাকাল বোধহয়।

বাড়ি ছেড়ে রাস্তায় এসে দাঁড়িয়েছে সজল। ধূলা উড়িয়ে গাড়ি চলতে শুরু করেছে। হঠাৎ খেয়াল করল  একটা মেয়ে সজলের দিকে তাকিয়ে হাত নেড়ে বিদায় জানাচ্ছে। আর মুখে তার এক চিলতি মুচকি হাসি। এই বেশ কয়েকদিন ধরে বলতে চাওয়া সব কথার উত্তর যেন এই হাসি। গাড়ির পেছন পেছন দৌঁড় দিতে চেয়েও পারেনি সজল। এক অস্পর্শ ভালবাসা তার হৃদয়ে বয়ে যায়।

বন্ধুদের বলতে না চেয়েও সে রাতের সব কিছু খুলে বলেছে সজল। এখন তারা প্রায়ই রাত-বিরাতে মরাখালের ব্রিজে আড্ডা দেয়। তবে দ্বিতীয় কোন ঢাকার পরী কিংবা মরাখালের জ্বিনের সাক্ষাত আজ অবধি কেউ পায় নি।
মাঝে মাঝে ঢাকার পরীর সাথে সজলের কথা হয়, দেখা হয়, তবে স্বপ্নে। বয়স পার হলে হয়ত সজলের স্বপ্নে আসবে অন্য কোন নারী।

 

#………………..
গল্পটি কাল্পনিক। এমনকি আমার প্রথম গল্প ‘যাত্রা বিরতি’ ও একটি কাল্পনিক গল্প। আরেকটি গল্প লিখেছি ‘ইংরেজি ক্লাস ছুটির ঘন্টা ’ গল্পটি ও কল্পলিত।

শেয়ার করুন
  • 21
    Shares

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!