সুত্রপাত / রাজনীতি ও রাষ্ট্রচিন্তা / বাম গণতান্ত্রিক জোট- কিছু কথা

বাম গণতান্ত্রিক জোট- কিছু কথা

অভিনু কিবরিয়া ইসলামঃ

৮টি বামপন্থী প্রগতিশীল দল নিয়ে আত্মপ্রকাশ করতে যাচ্ছে বাম গণতান্ত্রিক জোট। সিপিবি, বাসদ, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি,বাসদ (মার্কসবাদী), গণসংহতি আন্দোলন, ইউনাইটেড কমিউনিস্ট লীগ, গণতান্ত্রিক বিপ্লবী পার্টি ও বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক আন্দোলন এই জোটে শামিল থাকছে।

দীর্ঘদিন ধরে এই রাজনৈতিক দলগুলো বিভিন্ন ইস্যুতে যুগপৎ আন্দোলন করে আসছিল, তেল-গ্যাস কমিটির আন্দোলনে এক ব্যানারের নিচে এসেছিল। আন্দোলন সংগ্রাম, হরতালের মত কর্মসূচি তারা পরস্পরের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করেই পালন করত। গত বছর এপ্রিল-মে মাসে সিপিবি-বাসদ এবং গণতান্ত্রিক বামমোর্চাভুক্ত এই দলগুলো একসাথে অক্টোবর বিপ্লব শতবর্ষ উদযাপনের কর্মসূচি পালন করার ব্যাপারে উদ্যোগ নেয় ৷ এর মধ্যেই বিভিন্ন ইস্যুতে এই দুই জোট একই সাথে কর্মসূচি পালনের সিদ্ধান্ত নেয়, নিজেদের পৃথক অস্তিত্ব বজায় রেখেই৷ গত বছরের ১৫ জুলাই, এই দুই জোট সংবাদ সম্মেলন করে ৫ দফার ভিত্তিতে এক ব্যানারে কর্মসূচি পালনের সিদ্ধান্ত নেয়৷ তখন থেকেই আশা করা হচ্ছিল, অচিরেই অভিন্ন জোট গঠনের সিদ্ধান্ত আসবে। ১ বছর সময় লেগে গেলো এই সিদ্ধান্তে আসতে।

কেন এতটা সময় লাগলো? সবার মনে এই প্রশ্ন জাগা স্বাভাবিক। অনেকে বলেন, এটা বাম নেতাদের ব্যর্থতা, কেউ বলেন, বামপন্থীরা একটা শব্দের জন্য দুই দলে ভাগ হয়ে যায়, আবার কেউ বলেন, এদের বুদ্ধি বেশি-আক্কেল কম, নেতারা কেউই নেতৃত্বের ক্ষেত্রে আপস করতে চায় না, ইত্যাদি ইত্যাদি! কিন্তু ব্যাপারগুলো এত সরল নয়, এত স্থুলও নয়। এই অঞ্চলে বাম আন্দোলনের ইতিহাস একদিন দুদিনের নয়, শত বছরের। এই একশ বছরে দুনিয়াতে অনেক অদল বদল ঘটেছে। কমিউনিস্ট পার্টি মস্কো-পিকিং এ বিভক্ত হয়েছে, অর্ধশতাব্দীরও আগে। জাতীয় মুক্তি সংগ্রামে অংশগ্রহণের কৌশল কি হবে, গণতান্ত্রিক বিপ্লব সংঘটিত কে করবে, বিপ্লবের স্তর কি, কোন পন্থায় বিপ্লব সংঘটিত হবে, বুর্জোয়া রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে সম্পর্ক কেমন হবে, নির্বাচন প্রশ্নে আমাদের মনোভাব কেমন হবে, ইত্যাদি বিষয়ে মতভেদ তৈরি হয়েছে, দূরত্ব তৈরি হয়েছে, ভুল বোঝাবুঝি তৈরি হয়েছে। সোভিয়েত পতনের পর, অনেকে সমাজতন্ত্রের রাজনীতি পরিত্যাগ করে বুর্জোয়া দলে যোগ দিয়েছেন, কেউ কেউ এখনো বাম বলে নিজেদের দাবি করেও বুর্জোয়া শাসকের সমস্ত অন্যায়ের ভাগীদার হচ্ছেন৷ এইরকম একটা জটিল পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে বামপন্থী দলগুলো অগ্রসর হয়েছে ঐক্যের দিকে, দ্বিদলীয় রাজনৈতিক বৃত্তের বাইরে নিজেরাই বিকল্প হয়ে ওঠার প্রত্যয়ে, এর চেয়ে ভালো খবর হয় না।

এই বাস্তবতা মাথায় রাখতে হবে, এই রাজনৈতিক দলগুলো সকলেরই শেকড় একটি অভিন্ন উৎসভূমিতে হলেও, এবং সকলের গন্তব্য একই সাগরমুখী হলেও, সময়ে সময়ে ভিন্ন ভিন্ন নদী ও শাখানদীর মত এদের গতিপথ পৃথক হয়েছে এবং বদলেছে। এই দলগুলোর প্রতিষ্ঠার ইতিহাস এবং তাদের বিকাশ ভিন্ন ভিন্ন ধারার। ইতিহাস বিশ্লেষণ, বিভিন্ন ঐতিহাসিক বিষয়ের ব্যাখ্যা, বর্তমান জাতীয় ও আন্তর্জাতিক রাজনীতির বিশ্লেষণ, আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থার বিশ্লেষণে এই রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে পার্থক্য কোন জাদুবলে এক নিমিষেই দূরীভূত হওয়ার মত ব্যাপার নয়৷ কিন্তু এই মতপার্থক্য স্বত্ত্বেও লড়াই সংগ্রাম এবং ছাড় দেয়ার মানসিকতাই এই ঐক্যকে সংহত করতে ভূমিকা রেখেছে।

আরেকটু কঠিন করে বললে, বর্তমানে বাংলাদেশের বিষয়গত (objective) পরিস্থিতিই এই ঐক্য বা জোট গঠনকে অপরিহার্য করে তুলেছে। শাসকশ্রেণি অন্যায়, অগণতান্ত্রিক শাসন যেভাবে চাপিয়ে দিচ্ছে, গণতান্ত্রিক পরিসর যেভাবে সংকুচিত করে নিয়ে আসছে, সেক্ষেত্রে ঐক্যবদ্ধ না হলে এই আক্রমণ মোকাবেলা করা অসম্ভব হয়ে পড়ছে। হতে পারে, এই রাজনৈতিক দলগুলো কেউই আকারে খুব বড় নয়, দলগুলোর মধ্যেও সাংগঠনিক আকার ও শক্তিতে পার্থক্য রয়েছে, তবে একথা সকলেই স্বীকার করবেন, এই দলগুলোর নেতাদের দীর্ঘ লড়াইয়ের অভিজ্ঞতা রয়েছে, শত প্রলোভনেও এই দলগুলোর নেতাকর্মীরা নিজেদের বিকিয়ে দেয় নি। এই দলগুলোর ভেতরে রয়েছেন মণি সিংহ, ভাসানী, ফরহাদ, তাহেরের অনুসারীরা। এই মহান নেতাদের সারাদেশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা আরো অসংখ্য অনুসারী, যারা নিস্ক্রিয় হয়ে আছে, তাদের মধ্যে আশার সৃষ্টি করবে এই জোট। আশা করি, এই জোট সরল অংকের মত দুই আর দুইয়ে মিলে চার বানাবে না, বরং এই জোট এক্স ফ্যাক্টর কিংবা প্রভাবক হিসেবে লড়াইয়ের গুণগত ও পরিমাণগত পরিবর্তন ঘটাবে।

বাম দলগুলোর জোট বুর্জোয়া দলগুলোর মত হালুয়া রুটির ভাগাভাগির জোট নয়, নিছক নির্বাচনী হিসেব নিকেশের জোট নয়৷ বাম জোট মানে বিকল্প কর্মসূচি, আর্থসামাজিক ব্যবস্থা বদলের বিকল্প ইশতেহার। আওয়ামী লীগ বা বিএনপি একে অপরের বিকল্প নয়, পরিপূরক। ক্ষমতায় যে শ্রেণির আধিপত্য, কিংবা বিদেশী যেসব মোড়লরা আছে, তাদের স্বার্থ রক্ষায় এই দুই দলই নিজেদের বিকিয়ে দিতে পারে, লুটপাটের স্বর্গরাজ্য বানাতে পারে আমাদের প্রিয় বাংলাদেশকে, তা দেশবাসী জানে। সুতরাং সত্যিকারের বিকল্প হলো তারাই, যারা আদর্শগতভাবে সৎ এবং যারা বিকল্প রাজনৈতিক কর্মসূচি মানুষের সামনে তুলে ধরতে পারে। এই ঐক্য তাই শুধু টেবিলের ঐক্য নয়, কাগজে কলমের ঐক্য নয়, এই ঐক্য লড়াইয়ের ঐক্য। তাই সময় লাগলেও, সময় নেয়াটা জরুরি ছিল। গোঁজামিলের ঐক্য হওয়ার চাইতে নিজেদের বোঝাপড়াটা বাড়ানো দরকার ছিল।

নেপালে ক্ষমতায় এখন ঐক্যবদ্ধ কমিউনিস্ট পার্টি। সিপিএন(ইউএমএল) ও সিপিএন (মাওবাদী)-এর মধ্যে কিছুদিন আগেও এক ধরনের অনতিক্রম্য মনে হওয়া দূরত্ব ছিল। লড়াইয়ের স্ট্রাটেজি ও ট্যাক্টিক্সে, ইতিহাস বিশ্লেষণে তারা একে অপরের থেকে বেশ দূরে ছিল। আজ তারা শুধু জোট করে পার্লামেন্টে দুই তৃতীয়াংশের মত আসন নিশ্চিত করে নাই, সাথে সাথে ঐক্যবদ্ধ পার্টিও গঠন করেছে। আমাদের দেশে বাম দলগুলো সেরকম শক্তিশালী না হলেও ঐক্যবদ্ধভাবে তারা অগ্রসর হতে পারে অনেকদূর! কে জানে, সময়ের প্রয়োজনে হয়তো একদিন ঐক্যবদ্ধ রাজনৈতিক দলও গঠিত হতে পারে!

বাস্তবতা হলো, এখনও এই বাম দলগুলোর মধ্যে দূরত্ব দূরীভূত হয়নি। এখনো ভুল বোঝাবুঝি আছে, হয়তো কিছুটা সন্দেহ-অবিশ্বাসও আছে। কখনো কখনো হয়তো তুচ্ছ ইগোও বড় হয়ে দেখা দেয়। অতীতের অভিজ্ঞতাও ভালো নয়, এগারো দল- বাম গণতান্ত্রিক ফ্রন্ট ভেঙ্গে গিয়েছিল৷ ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিয়ে, এবার ঐক্যটা আরো মজবুত করা দরকার৷ লড়াইয়ের মাঠেই ঐক্য দৃঢ় হয়। আশার কথা, বর্তমান পরিস্থিতিই লড়াইয়ের ময়দানে সকলকে নামতে বাধ্য করবে।

এই ঐক্যকে চোখের মণির মত রক্ষা করতে হবে। আর এর দায়িত্ব নিতে হবে, এই দলগুলোর স্বপ্নবান কর্মীদের। নিজেদের মধ্যে সন্দেহ অবিশ্বাস কমিয়ে ফেলতে হবে, অসহিষ্ণুতার চাষবাস বন্ধ করে দিতে হবে, একে অপরকে বোঝার চেষ্টা করতে হবে, অন্যের মতকে শ্রদ্ধা করতে হবে, ছাড় দিতে জানতে হবে।

বাম ঐক্য দীর্ঘজীবী হোক।

শেয়ার করুন
  • 61
    Shares

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!