সুত্রপাত / নারী / পিরিয়ড হলে নারী কেন অপবিত্র হবে ?
অনিক

পিরিয়ড হলে নারী কেন অপবিত্র হবে ?

অনিক বড়ুয়াঃ

বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম লিখে গিয়েছেন,
” বিশ্বে যা-কিছু মহান সৃষ্টি চির- কল্যাণকর,
অর্ধেক তার করিয়াছে নারী অর্ধেক তার নর ”

উপরের কথাটি যেমন সত্যি, তেমন দিনের ধবধবে সাদা আলোর মতো পরিষ্কার সবার কাছে। তবুও কেন নারীর সাথে হরেক রকমের শর্ত এঁটে দিয়েছে আমাদের সমাজ। প্রতিটি পদে পদে যেন লেগেই থাকে নানা রকম বাঁধা। অথচ যেই নারীরা না থাকলে আজকের বিশ্ব কল্পনা করা যায়না। সেই নারীদের মোকাবেলা করতে হয় সমাজের চিরাচরিত কু-প্রথার সাথে। নারীরা আছেই বলে আমরা সমান তালে এগিয়ে যাচ্ছি এবং হাইব্রিড ফলনের মতো অধিক পরিমাণ ফল পাচ্ছি প্রতিটি ক্ষেত্রে।

তারপর ও প্রতিটি ক্ষণে ক্ষণে জীবন চলায় হাজার রকম বাঁধা বিপত্তির সম্মুখীন হতে হচ্ছে নারীদের। যদি নারী-পুরুষ সমান তালে চলতে হয় তাহলে নারীদের পথ চলায় আমাদের সহনশীল ও নমনীয় হতে হবে। সমাজে নারীর দৈনন্দিন চলার পথ সুগম ও পরিষ্কার নয়। একজন পুরুষ যতটা স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে চলাফেরা করতে পারে ততটুকু ভাবে একজন নারী তা পারেনা। একজন নারী আর পুরুষের মধ্যেকারে বায়োলজিকেল পরিবর্তন ছাড়া অন্যকোন পার্থক্য আছে বলে আমার জানা নেই। এই বায়োলজিকেল পার্থক্য থাকার কারণে নারীদের পড়তে হয় যত বাঁধা-বিপত্তিতে।

প্রতিটি মানুষের বেড়ে উঠার সময় দেহের নানা রকম পরিবর্তন দেখা যায়। এই সময়টাতে একজন পুরুষ যতটা ছন্নছাড়া হয়ে নিজের মতো করে বেড়ে উঠে, ঠিক সেভাবে একজন মেয়ে কখনো পারেনা। বড় হওয়ার ক্ষেত্রে নারীর একটা স্বাভাবিক পরিবর্তন হল পিরিয়ড। দৈহিক বৃদ্ধির সাথে সাথে নিয়মমাফিক ভাবে প্রত্যেক নারীর মাসে একবার নির্দিষ্ট সময়ে পিরিয়ড হয়। মোদ্দাকথা, নারীর বয়ঃসন্ধিকালে পদার্পনের প্রথম বৈশিষ্ট্যই ‘ ঋতুস্রাব ‘ বা পিরিয়ড। একে মাসিক ও বলা হয়। এটি প্রত্যেক নারীর শরীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়ার অংশ। আর এই পিরিয়ড নিয়ে আমাদের সমাজে যত কুসংস্কার গোপনীয়তা ও লজ্জা। একটু সহজ কথায় বলতে গেলে পিরিয়ড হল নারীর জীবনচক্রের একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। কিন্তু এই স্বাভাবিক প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করে আমাদের সমাজে যত অস্বাভাবিক আচরণ লক্ষ্য করা যায়।

এই অস্বাভাবিক কাজকর্ম কিন্তু এক-দুই দিনে তৈরি হয়নি। এসব বহুকাল থেকে হয়ে আসছে এবং তার পরিপেক্ষিতে আজকের যুগের নারীরা ও তার স্বীকার। পিরিয়ড প্রত্যেক নারীর একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন। এটি যেমন আনন্দের বিষয় নয় তেমনি বেদনা ও লজ্জার বিষয় নয় এবং সংকোচের বিষয় নয়। কিন্তু এই কুসংস্কার আচ্ছন সমাজ এই বিষয়টাকে মানতে নারাজ। দুনিয়ার যত কুসংস্কার তাতেই যেন এই সমাজের মঙ্গল, সুখ ও শান্তি বয়ে আনে। পিরিয়ডের দিনগুলোতে নারীর দৈহিক পরিবর্তনের সাথে কিছু মানসিক পরিবর্তন হয় তা কিন্তু কারো চোখে পড়েনা ও তা নিয়ে কেউ ভাবেনা। উল্টো পিরিয়ডের দিনে নারীকে অপবিত্র ও নোংরা ভাবে উপাস্থাপন করে এই কুসংস্কার সমাজ।

পিরিয়ড হলে কেন নারী অপবিত্র হবে! কেন নারী মন্দিরে যেতে পারবেনা! কেন নারী পূজা দিতে পারবেনা! কেননারী তার শারীরিক কষ্টের কথা শেয়ার করতে পারবেনা! কেন তার তলপেটের ব্যাথার কথা বলতে সংকোচ লাগে! কেনবা নিজের আপন ভাইটাকে নিজের ন্যাপকিনের প্রয়োজনের কথা বলতে লজ্জা পাবে! এসব আমাদের ব্যর্থতা, আমরা নারীর জন্য যথার্থ পরিবেশ করে দিতে পারছিনা। যেখানে নারীরা তাদের সকল সুবিধা-অসুবিধার কথা নিঃসংকোচে ও নির্ভয়ে বলতে পারবে।

সুস্থভাবে পিরিয়ড হওয়া মানে একজন নারী নতুন একটি প্রাণের সঞ্চার করতে সক্ষম ও সেই শক্তি অর্জন করে। নারী এই অসীম শক্তির অর্জন করে বিধায় আমি লিখতে পারছি, এবং আমি, আপনি, আমরা সবাই এই সুন্দর পৃথিবীর মুখ দেখতে পারছি ও একটি সুন্দর ভবিষ্যৎ চিন্তা করি। তাই পিরিয়ডের সময় নারীদের প্রতি আরো যত্নবান হওয়া উচিত। আমাদের আচরনের কারণে যেন প্রতিটি নারী তাদের পিরিয়ডের দিনগুলোকে অন্যসব স্বাভাবিক দিনগুলোর মতো করে অতিবাহিত করতে পারে। সমাজের সকল কুসংস্কার ধুয়ে মুচে সাফ করে দিয়ে নারীদের সাথে আমাদের মানিয়ে নিতে হবে। পিরিয়ডের দিনগুলো স্বাভাবিক আচরনের মাধ্যমে বুঝিয়ে দিতে হবে পিরিয়ড কোন লজ্জা বা সংকোচের নয়।

পিরিয়ড একটি স্বাভাবিক দৈহিক পরিবর্তনের অংশ। পিরিয়ডের দিনগুলোতে সকল নারী আত্মবিশ্বাসী হোক , তাদের নিজের শরীরকে আরো ভালো করে জানুক, স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করুক তাদের স্বাভাবিক শরীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়াকে। নারী-পুরুষের অংশীদ্বারে এগিয়ে যাক আমাদের সুন্দর আগামি। পৃথিবীর সকল নারীর মতো সুস্থ থাকুক সুন্দর থাকুক পৃথিবীর সকল জীব।
জয় হোক মানবতার, জয় হোক নারীর।

লেখকঃ ছাত্র, কম্পিউটার সায়েন্স এন্ড ইন্জিনিয়ারিং বিভাগ, চট্টগ্রাম প্রিমিয়াম বিশ্ববিদ্যালয়।

শেয়ার করুন
  • 87
    Shares

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!