“নির্বাচন”

রহমত শেখের সাথে কবির হোসেনের পরিচয় হয় স্থানীয় কলেজের একটা অনুষ্ঠানে। কবির হোসেনকে এর আগে ঈদ পূজা ও জাতীয় দিবসসমূহে শুভেচ্ছামূলক ব্যানারে ও পোস্টারে দেখেছে রহমত, কথা হয়নি। রহমত তখন বিদায়ী ছাত্রনেতা, ত্রিশের কাছাকাছি বয়স, কলেজের নতুন শিক্ষকেরাও তাকে আপনি করে ডাকে। কলেজে রহমতের প্রভাব প্রতিপত্তি আছে, এগারো বছর ধরে প্রতি সকালে সে কলেজে আসে, চার বছর ধরে তার বসার নির্দিষ্ট জায়গা ও হাতলভাঙা চেয়ার আছে ক্যান্টিনের একপাশে, জুনিয়র ছেলেরা তাকে দেখলে সিগারেট লুকিয়ে সালাম দেয়।

কবির সাহেব অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি, ঢাকায় তার বিরাট ব্যবসা, অনুষ্ঠানের সকল খরচও তিনি বহন করেছেন, গুঞ্জন ছিলো তিনি নির্বাচন করবেন, ঢাকায় বড় নেতাদের সাথে তার নিত্য উঠাবসা আর আড্ডা। নিজ এলাকায় বড় একটা আসেন না, কিন্তু টাকা-পয়সা দেন বিভিন্ন অনুষ্ঠানে, এখন নিয়মিত যাতায়াত শুরু করেছেন। কবির সাহেব কলেজে ঢুকতেই ছাত্ররা তাকে শুভেচ্ছা ও স্বাগতম জানিয়ে শ্লোগান দিচ্ছিলো, রহমত শেখ হাত উঁচু করে ইশারা করতেই সকলে থেমে যায়। রহমত মালা হাতে নিয়ে কবির সাহেবের সামনে দাঁড়িয়ে সালাম দেয়, স্যুট টাইয়ে অভ্যস্ত এই লোকটিকে এর আগে পাঞ্জাবি পাজামাতে কখনো দেখা যায়নি। –

স্যার, আসসালামালাইকুম।

আপনার আগমনে আমরা আনন্দিত ও কৃতার্থ।

– ধুর হারামজাদা, স্যার কিসের? ভাই ডাকবি, ভাই, তোরা সবাই তো আমার ভাই ভাইস্তা লাগোস, আমি তো এই মাটিরই পোলা।

তারপর রহমতের কাঁধে হাত রেখে কবির সাহেব হেঁটে হেঁটে মঞ্চে পৌঁছান। বক্তৃতায় তিনি মদ জুয়া আর দুর্নীতির বিরুদ্ধে কথা বলেন, এলাকার নানা সমস্যা নিয়ে কথা বলেন। রহমত কলেজে একটা কম্পিউটার ল্যাবের প্রয়োজনীয়তার কথা বলতেই কবির সাহেব নিজ টাকায় ল্যাব করে দেবার প্রতিশ্রুতি দেন, ছাত্ররা করতালি দিতে থাকে। রাতে রহমতকে ফোন করে চা খেতে ডাকেন কবির সাহেব, বাজারে চা খেয়ে গ্রামের পথ ধরে হেঁটে হেঁটে গল্প করা শুরু করেন তারা। কবির সাহেবের সাথে তার একমাত্র বোনের ছেলে জ্যাকি ছিলো, জ্যাকি রহমতের সমবয়সী, রহমত দুজনকেই নিজের বাড়িতে ভাত খেতে ডাকে, কবির সাহেব হাসিমুখে রাজী হয়ে যান। চেয়ার টেবিল টানাটানি শুরু করতেই কবির সাহেব ধমক দিয়ে বলেন যে তিনি সবার সাথে পাটিতে বসে খাবেন, অত আদিখ্যেতা করার দরকার নেই।

শুটকি মাছের ভর্তা আর ডাল দিয়ে ভাত খেয়ে উঠার পর কবির সাহেব রহমতের মাকে ডেকে একটা পাত্রে তার স্ত্রীর জন্যে কিছুটা শুটকি ভর্তা দিয়ে দেবার অনুরোধ করেন। খাওয়া শেষে পথে হেঁটে বাসায় ফেরার পথে কবির সাহেবের অনুমতি নিয়ে রহমত রাস্তার একটু ভেতরে চলে যায় কিছুক্ষণের জন্য।

ধোঁয়া উড়ছে দেখে কবির সাহেব ফের রহমতকে ডাকেন, রহমত দৌঁড়ে এসে দুহাত পেছনে নিয়ে দাঁড়ায়। রহমত সাহেব বললেন, “রহমত, ধোঁয়া যদি ছাড়োস সেটা মুখ দিয়েই ছাড়, গোয়া দিয়ে ছাড়তাছোস ক্যান?” রহমত হকচকিয়ে জবাব দিলো, “আপনি এত বড় একজন মানুষ, আপনার সামনে সিগারেট খাইলে বেয়াদবি হবে।”

কবির সাহেব বললেন তাকে নিজেদের একজন ভাবতে, আর পাশে হাঁটতে হাঁটতে সিগারেট টানতে নির্দেশ দিলেন রহমতকে। রহমত এরপর থেকে দিনরাত কবির সাহেবের সাথে ঘুরে বেড়ায়, বাজারে হাটে পালাগানের আসরে খেলার মাঠে বিভিন্নজনকে কবির সাহেবের সাথে আলাপ ও পরিচয় করিয়ে দেয়। কবির সাহেবকে ওসিও সালাম দেয়, উপজেলা পরিষদের প্রশাসনিক কর্তাব্যক্তিরাও সালাম দেয়, তারা কবির সাহেবকে স্যার ডাকে, আর রহমত ও তার অনুসরণে গ্রামের লোকেরা ডাকে ভাই। রহমতের বুকের ভেতরে গর্ব হয় সে কবির সাহেবের সবচে কাছের মানুষ বলে, কবির সাহেব তার কাঁধে হাত রেখে মাঝেসাঝে আলাপ আলোচনা করেন বলে।

রহমতের খালাতো বোন রুমা আর মা, এই দুজন আছে সংসারে। বোনটির বিয়ের বয়েস হলো, রহমতেরও কিছু একটা করার সময় এখন। মায়ের কিছু জমানো টাকা ছিলো, এটা দিয়ে রহমতের ব্যবসা শুরু করবার কথা বাজারে। রহমত ভাবলো এখন কবির ভাইয়ের সাথেই তার থাকা উচিত, নির্বাচনের আগ পর্যন্ত সে ভাইকে দেখুক, পরে ভাই তাকে অবশ্যই দেখবেন। যার মাথার উপর কবির ভাই আছেন এই দেশে তার আর কিছুই লাগবে না। রহমতের পরিচিতি ও সম্পর্কগুলোকে ব্যবহার করে কবির সাহেব গ্রামের লোকদের সাথে মিশে গেলেন, ক্রমশ তাদের একজন হয়ে উঠলেন, অভ্যস্ত হয়ে গেলেন লুঙ্গি পরে ধানক্ষেতের আইল ধরে হাঁটাতেও। রহমতও চা বিড়ি আর সমাবেশের পেছনে নিজের জমানো টাকা ঢালতে লাগলো, এই আশায় যে ভাই নির্বাচিত হয়ে গেলে তার আর কোনো চিন্তা নাই।

এদিকে জ্যাকি ঘনঘন আসতে লাগলো রহমতের বাসায়, রহমত থাকলেও আসে, না থাকলেও আসে, আর রুমাকেও দেখা যেতে লাগলো সেজেগুঁজে বসে থাকতে। একদিন পুরোনো আমগাছটার আড়ালে রহমত দেখলো রুমার হাতে চুড়ি পরিয়ে দিচ্ছে জ্যাকি, প্রথমে বড়ভাইসুলভ রাগ হবার পরেও ক্রমশ রাগ থেমে স্বপ্ন দানা বাধতে লাগলো তার মনে। তবুও রহমত কবির ভাইকে ঘটনাটা জানালো, কবির ভাই জবাব দিলেন প্রেম ভালোবাসা আছে বলেই পৃথিবীটা এখনো চূড়ান্ত স্বার্থপর ও নিরানন্দের হয়ে যায়নি, ব্যাপারটা নিয়ে তিনি পরে কথা বলবেন। রহমতের স্বপ্নের ছাইগুলোকে যেন বাতাস দিয়ে গেলো কবির ভাইয়ের কথাগুলো।

আরশেদ মাদবরের সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হলো কবির সাহেবের, রহমত দিনরাত খেটে চললো। আরশেদ মাদবরের লাঠিয়াল বাহিনী দুবার রহমতের উপর হামলা করলো, রহমত দুবারই আহত হবার পরে বললো নির্বাচন শেষ হলে কবির ভাই ওদের দেখে নেবেন, রহমতের উপর আঘাতকারীকে কবির ভাই ক্ষমা করবেন না। নির্বাচনের আগে রহমত আবিষ্কার করলো তার আসলে একটা কবির ভাই আছে, কবির ভাইয়ের আছে অনেকগুলো রহমত। নির্বাচন হলো সারাদিন, ভোট গণনা শেষে কবির ভাই জিতলেন, কবির ভাইয়ের চারপাশে তখন অনেকগুলো স্যুট টাই পরা শহুরে ভদ্রলোক, সামনে টিভি ক্যামেরা, কবির ভাই তখনো পাঞ্জাবি পরে আছেন। রহমতের হাতে তড়িঘড়ি করে দুটো চকচকে নোট গুঁজে দিয়ে কবির ভাই তাকে মিষ্টি কিনে খেতে বললেন, আর বললেন ব্যস্ততা ফুরোলেই ফোন করবেন। বাড়িতে ফিরে রহমত দেখলো তার বোনটা উঠোনে উপুড় হয়ে বসে বমি করছে, তার মায়ের চোখেমুখে ভয় আর শঙ্কা। রহমত মাঝরাত পর্যন্ত ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকলো, পরিচয়ের পর এবারই প্রথম কোনো রাতে ভাই রহমতকে ফোন করলেন না। ভাই ঢাকা থেকে ফিরলেন এক সপ্তাহ পর, এর মধ্যে চারবার ফোন করেছিলো রহমত, তিনবার ফোন ধরেনি কেউ।

চতুর্থবার কবির সাহেবের পিএস ফোন ধরে বলেছে,স্যার ব্যস্ত। কবির সাহেবের বাসায় ঢুকতে গেলেও দারোয়ান রহমতকে আটকে দিলো, নিজের ঘরে নিয়ে বসালো, আগের দর্শনার্থী ফিরে এলেই রহমত স্যারের সাথে দেখা করতে পারবে। দারোয়ানের ঘরে ঢুকে চেয়ারে বসতেই রহমত খেয়াল করলো খাবার টেবিলে পড়ে আছে তার মায়ের দেয়া শুটকি ভর্তার পাত্রটি, ওটা এরচে ভেতরে ঢুকতে পারেনি। রহমত যখন কবির সাহেবের বসার ঘরে গেলো তখন চারপাশে বেশ লোকজন, সবাই কবির সাহেবকে স্যার ডাকছে, ভদ্রলোক গরমেও স্যুট পরে আছেন। জানালা দিয়ে তাকালে রহমত দেখতে পেলো বাগানে হাত ধরাধরি করে বসে আছে জ্যাকি আর আরশেদ মাদবরের মেয়ে আঁখি। হেরেও আরশেদ মাদবর কবির সাহেবের পাশে বসে হাসিমুখে পান চিবোচ্ছেন, আর নিজের মাদকাসক্ত ও মাদক ব্যবসায়ী ছেলেটাকে কবির সাহেবের হাতে তুলে দিয়ে বলছেন এই ছেলেটাকে কবির সাহেব যেন ছোট ভাইয়ের মতো আগলে রাখেন। কবির সাহেব ছেলেটিকে বুকে টেনে নিলেন। রহমত কবির সাহেবের সামনে গিয়ে বললো,

আসসালামালাইকুম স্যার, আপনি জিতেছেন, আমি হেরেছি, আমরা হেরেছি, মানুষ হেরে গেছে। তারপর তড়িঘড়ি করে বেরিয়ে গেলো কবির সাহেবের বাড়ি থেকে। রহমতের ঘাড়ের উপর তখন ভাইয়ের হাত নেই। ভাই আর ভাই নেই। কবির সাহেব তখন শুধু জ্যাকি, আরশেদ মাদবর ও আরশেদ মাদবরের একমাত্র ছেলেটির ভাই, বাকি সবার কাছে তিনি এখন স্যার। রহমত তখন শূন্য, বাড়িতে পথ চেয়ে আছে তার মা ও বোন, আর আমগাছের ডালে বাধা আছে দড়ি। রহমত বাড়িতে ফিরবে, বাকি সবাই ঘুমিয়ে গেলে।

লেখক-নাজমুল হাসান নাইম বিশ্বাস

শিক্ষার্থী,জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় 

By | ২০১৮-১১-২৪T১৩:০৮:০১+০০:০০ নভেম্বর ১৩, ২০১৮|গল্প অথবা উপন্যাস|০ Comments

About the Author:

Leave A Comment

error: Content is protected !!