সুত্রপাত / নারী / নারীর কোন ধর্ম নেই

নারীর কোন ধর্ম নেই

ফারজানা কাজীঃ

হুমায়ুন আজাদ বলেছিলেন “রামমোহন রায় হিন্দু নারীকে দিয়েছেন প্রাণ, ইশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর দিয়েছেন জীবন; রামমোহনের যেখানে শেষ, বিদ্যাসাগরের সেখানে শুরু”। রামমোহন চেয়েছিলেন সহমরণের আগুন থেকে শুধু নারীর প্রাণটুকু রক্ষা করতে। কিন্তু বিদ্যাসাগর বুঝেছিলেন বেঁচে থাকার জন্যে শুধু নিশ্বাস নিলেই হয় না, জীবন উপভোগ করেই বাঁচতে হয়। চিতার আগুনে ছাই না হয়ে বিধবার প্রাণটি বেঁচে গেলেও তাকে আজীবন ফলমূল ও একাহারী হয়ে মৃত স্বামীর ধ্যান করে বেঁচে থাকতে হবে। বিধবার থাকবে না কোনো চাহিদা, কোনো আকাঙ্ক্ষা, কামনা বা বাসনা। কোনোদিন বিয়ের চিন্তা মাথায় আনা যাবে না। হিন্দু বিধবার নেই বিয়ের অধিকার।

কিন্তু বিদ্যাসাগর বুঝতে পেরেছিলেন বিধবার শরীরটিও রক্তমাংসের। তারও ক্ষুধা আছে, তৃষ্ণা আছে। যেখানে হিন্দু পিতৃতন্ত্রে বিধবার বেঁচে থাকারই অধিকার ছিলো না, নারী পোড়ানোই ছিলো ধর্ম, সেখানে রামমোহনের জন্যে বিধবার প্রাণটুকু ছাড়া আর কিছু চাওয়া অসম্ভব ছিলো।

দিল্লি সুলতানি রাজত্বকালে সতীদাহ প্রথার জন্য যাতে বিধবাকে বাধ্য না করা হয় তাই সতীর কাছ থেকে অনুমতি নিয়ে সতীদাহ প্রথা সম্পাদন করার রীতি ছিল। যদিও পরে এটি একটি প্রথানুগামিতার রূপ নেয়। মুঘল সম্রাটরা স্থানীয় চলিত প্রথায় সাধারণত অন্তর্ভুক্ত হতেন না কিন্তু তারা এই প্রথা বন্ধের ব্যাপারে সচেষ্ট ছিলেন। মুঘল সম্রাট হুমায়ুন (১৫০৮-১৫৫৬) সর্বপ্রথম সতীদাহের বিরুদ্ধে রাজকীয় হুকুম দেন। এরপর সম্রাট আকবর (১৫৪২-১৬০৫) সতীদাহ আটকানোর জন্য সরকারীভাবে আদেশ জারি করেন যে, কোনো নারী, প্রধান পুলিশ কর্মকর্তার সুনির্দিষ্ট অনুমতি ছাড়া সতীদাহ প্রথা পালন করতে পারবেন না। এছাড়াও এই প্রথা রদের জন্য তিনি পুলিশ কর্মকর্তাদের অধিকার দেন যা তারা যতদিন সম্ভব ততদিন সতীর দাহের সিদ্ধান্তে বিলম্ব করতে পারেন। বিধবাদেরকে উত্তরবেতন, উপহার, পুনর্বাসন ইতাদি সাহায্য দিয়েও এই প্রথা না পালনে উত্সাহিত করা হত। ফরাসি বণিক এবং ভ্রমণকারী তাভেনিয়ের লেখা থেকে জানা যায় যে, সম্রাট শাহ জাহানের রাজত্বে সঙ্গে শিশু আছে এমন বিধবাদেরকে কোনমতেই পুড়িয়ে মারতে দেওয়া হত না এবং অন্যান্য ক্ষেত্রে, গভর্নররা তড়িঘড়ি সতীদাহের অনুমতি দিতেন না, কিন্তু ঘুষ দিয়ে করান যেতো।

হিন্দুবিধি বিধবাকে সম্পত্তির অধিকার দেয়নি। কিন্তু দায়ভাগ আইনে(দায়ভাগ হিন্দুদের উত্তরাধিকার সংক্রান্ত আইনগ্রন্থ। খ্রিস্টীয় দ্বাদশ শতকে জীমূতবাহন এটি রচনা করেন। দায়ভাগে এ পৈতৃক সম্পত্তির বিভাগ, বিবিধ প্রকার পুত্র, উত্তরাধিকার ও উত্তরাধিকারীদের ক্রম, স্ত্রীধন, অবিভাজ্য সম্পদ প্রভৃতি সংক্রান্ত বিধি-বিধান আলোচিত হয়েছে।) বাংলায় নিঃসন্তান বিধবারাও সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হতেন; তাই আত্মীয়-স্বজনেরা সম্পত্তির লোভে বিধবাদের মৃত স্বামীর চিতায় তুলতেন। হিন্দু নারীর মর্মান্তিক পরিণতি ছিলো বিধবা হওয়া। মৃত স্বামীর চিতায় পুড়ে মরা থেকে রামমোহন বিধবাদের বাঁচান। ১৮২৯ সালের ডিসেম্বর ৪-এ বৃটিশ ভারতের বেঙ্গল প্রেসিডেন্সীতে সতিদাহ প্রথাকে আনুষ্ঠানিকভাবে বাতিল ঘোষণা করা হয়। এসময় বাংলার গভর্ণর ছিলেন লর্ড উইলিয়াম বেন্টিংক। অবশ্য এ আইনী কার্যক্রম গৃহীত হয় মূলতঃ রাজা রামমোহন রায়ের সামাজিক আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতেই। এই আদেশকে চ্যালেঞ্জ করে লন্ডনের প্রিভি কাউন্সিলে মামলা করা হয় । প্রিভি কাউন্সিল ১৮৩২ সালে বেঙ্গলের গভর্ণর লর্ড উইলিয়াম বেন্টিংকের ১৮২৯ এর আদেশ বহাল রাখেন। খুব অল্পসময়ের মধ্যে ভারতের অন্যান্য কোম্পানী অঞ্চলেও সতীদাহ প্রথাকে বাতিল ঘোষণা করা হয়।

মহাভারতে সত্যবতী স্বামী শান্তনুর মৃত্যুর পরও বহু বছর জীবিত ছিলেন। তাছাড়া বিচিত্রবীর্য এর মৃত্যুর পর তার দুই স্ত্রীও জীবিত ছিলেন। অন্যদিকে পাণ্ডুর দ্বিতীয় স্ত্রী মাদ্রী সহমরণে যান কারণ মাদ্রী মনে করেছিলেন পাণ্ডুর মৃত্যুর জন্যে যেহেতু তিনি দায়ী। যদিও মহাভারত অনুযায়ী মাদ্রী স্বামীর মৃত্যুসংবাদ পাওয়ার পর দুঃখে প্রাণ ত্যাগ করেন, এবং দুজনের দেহই একসাথে দাহ করা হয়। অর্থাৎ মাদ্রীকে দাহ করার আগেই তিনি মারা গিয়েছিলেন। সুতরাং, ধারণা করা যায় প্রাচীন হিন্দু সমাজে সতিদাহ প্রথা ছিলো না। বিভিন্ন ঘটনার মধ্য দিয়ে হিন্দু স্ত্রীকে সহমরণে বাধ্য করা হত। বিশেষ করে কোনো ধনী লোকের সম্পত্তি অধিকার করার লোভে আত্মীয়রা তার সদ্যবিধবা স্ত্রীকে ধরে বেঁধে, ঢাক-ঢোলের শব্দ দ্বারা তার কান্নার আওয়াজকে চাপা দিয়ে তার স্বামীর সাথে চিতায় পুড়িয়ে মারতেন।

রামমোহন ও বেন্টিংক হিন্দু বিধবার প্রাণ ফিরিয়েছিলেন, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর তাকে দেন জীবন। বিধবার জীবন ছিলো অপমান, লাঞ্ছনা আর কলঙ্কের। বিদ্যাসাগর বিধবা-বিবাহের আন্দোলন শুরু করেন। উচ্চ-বর্ণের হিন্দু সমাজ দীর্ঘদিন ধরে বিধবাদের পুনরায় বিয়ের অনুমোদন দেয় নি। বিধবারা এমনকি যারা শৈশবে বা কৈশোরে বিধবা হয়েছিলেন তারাও বৈরাগ্য ও কঠোর ত্যাগস্বীকার করে জীবনযাপন করবেন এমনটাই প্রত্যাশিত ছিল। তথাকথিত পরিবারের সম্মান ও পারিবারিক সম্পত্তি রক্ষা করার জন্য এরকম নিয়ম করা হয়েছিল। পণ্ডিত ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অক্লান্ত প্রচেষ্টায় ব্রিটিশ সরকার ভারতে হিন্দু বিধবা পুনর্বিবাহ আইন প্রণয়ন করেন। যার মাধ্যমে বিধবাদের উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্য সম্পত্তির অধিকার ইত্যাদি সামাজিক রক্ষাকবচ প্রদান করা হয়। প্রবল বিরোধিতার পরে ১৮৫৬ সালের ১৬ জুলাই বিধবা বিবাহ আইন পাশ হয়(তাও বিধবার যোনির ক্ষত-অক্ষত বিচারে! সত্যি, ধর্মীয় রক্ষণশীল সমাজপতিরাই এমন অশ্লীল হতে পারে!)। বিধবা বিবাহ প্রচলনের পরে বিদ্যাসাগর পুরুষের বহুবিবাহ রহিত করার লড়াইয়ে নামেন। সংসারে নারীকে সম্মানজনক ভাবে প্রতিষ্ঠা করাই ছিলো তাঁর লক্ষ্য।

রামমোহন হিন্দু বিধবার প্রাণদাতা, বিদ্যাসাগর জীবনদাতা; তবে প্রাণ ফেরানোর চেয়ে জীবন দেওয়া অনেক কঠিন। বিধবাকে এখন আর চিতায় উঠতে হয় না, বিয়েও হয়। কিন্তু প্রতিদিন শতশত নারী সহমরণে যায়। চিতায় ওঠে তার ইচ্ছা-অনিচ্ছা, ভালোলাগা, মন্দলাগা, চাওয়া-পাওয়া, স্বাদ-আহ্লাদ, কামনা, বাসনা- তা সে যে ধর্মেরই হোক না কেন!

নারীর আসলে কোনো ধর্ম নেই। সব ধর্মেই নারী অবহেলিত। নারীকে মানুষ হিসেবে দেখেনি কোনো ধর্ম। হিন্দু ধর্ম নারীকে বানিয়েছে বলির পশু, অন্য ধর্ম করেছে দাসী, ভোগ্য, পণ্য। তবু আশ্চর্য, নারীই ধর্মকে টিকিয়ে রেখেছে যুগ যুগ ধরে! নারী ধর্মের বলি হয়েও ধর্ম পালন নারীই করছে বেশি। নারীই যেন ধর্মকে আঁকড়ে ধরে আছে। বেশির ভাগ হিন্দু নারীর ঘরে টানানো থাকে রামকৃষ্ণ পরমহংস, স্বামী বিবেকানন্দ, শ্রীকৃষ্ণ কিংবা রামের ছবি। প্রতিদিন নারীরা উনাদের পায়ে পুজো দেন। প্রাণদাতা রামমোহন কিংবা জীবনদাতা বিদ্যাসাগরকে ক’জন স্মরণ করেন? হয়তো অনেকেই চেনেনই না। চিনলেও তাঁদের প্রতি তেমন শ্রদ্ধা আসে না। আমি মনে করি পৃথিবী জুড়ে সমস্ত নারীর উচিৎ ধর্ম নামক নোংরা, অশ্লীল, বিষাক্ত জিনিসটিকে আস্তাকুঁড়ে ছুঁড়ে ফেলে দেওয়া।

শেয়ার করুন
  • 19
    Shares

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!