সর্বশেষ সংযুক্তি
সুত্রপাত / ধর্ম ও দর্শন / নতুন দৃষ্টিতে চার্বাকদর্শন

নতুন দৃষ্টিতে চার্বাকদর্শন

“চার্বাকদর্শন ” নামটি যেন আমাদের কাছে একটা বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।নামটি বলার সাথে সাথে কিছু ছকাবদ্ধ ধারণা সামনে এসে দাঁড়ায়।আমরা সেই ছকাবদ্ধতার আলোকে কেউ এর পক্ষে কেউ এর বিপক্ষে থাকি।মজার ব্যাপার হলো :আমরা কেউ সত্যতা যাচাই করিনি আমাদের ধারণার। আমরা বিচার করতে পারি কিন্তু কে করবে? এই বিচার করে আদৌ কোনো ” লাভ” আছে?
আমরা চার্বাকদর্শন নিয়ে কথা বলার শুরুতে শল্য চিকিৎসা শুরু করি।কাটাছেড়া করে দেখার চেষ্টা করি “চার্বাক ” থেকে কি রাক্ষস বের হয় কিংবা বের হয় সুন্দর কথা অথবা বের হয় চর্বণ করা।শল্য চিকিৎসাটা ভালোই।এর দরকার আছে।তবে কিনা কাটাছেড়াতে এত সময় ব্যয় করার চেয়ে কাজের কাজটা করলে ভালো হয়।আমরা যদি এই দর্শন বিচারের ক্ষেত্রে এর “সিদ্ধান্ত ” নিয়ে কাজ করতাম তবে বেশি ভালো হতো। আমরা অনেককিছু বুঝতে পারতাম। যদিও এর ” সিদ্ধান্ত ” নিয়েই আমরা কাজ করি তবে কিনা তা আমাদের ছকে যা মালমসলা আছে তার আলোকে। নতুন করে ভাবনাচিন্তা করে কিছুই করিনা।
কিন্তু চলমান ব্যাপারগুলো কতটা ন্যায়সঙ্গত তা নিয়ে প্রশ্ন করার সময় এসেছে।কারণ আমরা যদি আমাদের ইতিহাস- ঐতিহ্য থেকে এতটা বিমুখ হই তাহলে আমাদের আগামীদিনের কর্মতৎপরতায় খামতি থেকে যাবে।আমরা যারা অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করি ও বিশ্বাস করি একটি ইনসাফের সমাজ তৈরিতে তাদের চার্বাকদর্শন সম্পর্কে বিমুখতা মানায় না।কারণ এই দর্শনের জন্ম প্রতিবাদের মাধ্যমে।আর সবার আগে আমাদের যা করতে হবে তা হলো আমাদের পূর্বছক বাতিল করতে হবে।
চার্বাকদর্শন আমরা আজকে যেভাবে পাচ্ছি তা অতীতে এমন ছিলনা।বহু প্রতিবাদী চিন্তা মিশতে মিশতে আজ বর্তমান রূপ ধারণ করেছে চার্বাকদর্শন। আবার এ কথাও অস্বীকারের জো নেই চার্বাকদর্শন এর দোহাই দিয়ে ভোগবাদের প্রচারও হয়েছে ব্যাপক।আবার মাঝে মাঝে দেখা গেছে অন্যান্য মতের লোকের এই দর্শনের চিন্তাকে বিকৃতভাবে উপস্থাপন করেছে।সবটাকে অনুধাবন করেই অগ্রসর হতে হবে।
এই দর্শন যেমন আমাদের এই অঞ্চলের প্রতিবাদী চিন্তা ও তৎপরতার অন্যতম শক্তিঘর তেমনি আমাদের মানবজীবনকে সমৃদ্ধ করার পথ এখানে “সিদ্ধান্ত” আকারে হাজির আছে।
ভূতচৈতন্যবাদ, প্রত্যক্ষপ্রাধান্যবাদ,যদৃচ্ছাবাদ প্রভৃতি চিন্তার মিলনক্ষেত্র আজ চার্বাকদর্শন। এর আলোচনায় সবার প্রসঙ্গই আসা উচিত। কিন্তু এই আলোচনায় তা আনা নিষ্প্রয়োজন। তাই সেই কাজটি করতে ক্ষান্ত রইলাম।এবার এগোনোর পালা।তবে এই অগোনোর জন্য আমাদের কয়েক হাজার বছর পিছিয়ে যেতে হবে। যেতে হবে বুদ্ধেরও আগে। উপনিষৎ যখন রচিত হচ্ছে সেই সময়ে গিয়ে আমাদের স্থির হতে হবে। কারণ তখন থেকে এই অঞ্চলে মানুষে মানুষে ভেদ প্রবল হয়েছে। এর পক্ষে-বিপক্ষে প্রচুর তর্ক হয়েছে। যারা এই বিভাজনের বিরোধিতা করলেন তাদের চিন্তার ফসল আজকের চার্বাকদর্শন।আমরা চার্বাকদর্শন সম্পর্কে কোনো প্রামাণিক “শাস্ত্র” পাইনা।কিন্তু এই দর্শনের সিদ্ধান্তের সন্ধান পাই অনায়াসে।এই দর্শন তৈরি হয়েছিল অত্যন্ত সহজ বয়ানে এবং তা জনতার মাঝে ব্যাপকভাবে প্রচারিত হয়েছিল।আর এর সিদ্ধান্তগুলো এতটাই জীবনকেন্দ্রীক যে তাকে পরিহার সম্ভব হয়নি।আমরা ওই সময়ের প্রতিবাদী চিন্তকদের চিন্তার সমন্বয় করে এর সন্ধান পাই।তবে আজকের বাস্তবতায় বৌদ্ধ দর্শন,থেকে আমাদের সাহায্য নিতে হবে। কারণ বৌদ্ধমতে এর বহু সিদ্ধান্ত স্বীকৃত হয়েছে।আমরা সিদ্ধাচার্য সরহপার লেখায় চার্বাকদর্শন এর বহু তত্ত্বের বিশ্লেষণ পাই। কারণ হলো এই সিদ্ধান্তগুলো এতটাই মৌলিক যে কেউ এগুলো বাদ দিতে পারেনা।
আমরা হয়ত জানি এই দর্শনকে বস্তুবাদী দর্শন বলা হয়।তবে অন্যান্য বস্তুবাদী (ইউরোপীয়) দর্শনের সাথে এর ব্যাপক পার্থক্য আছে।তাছাড়া আমাদের একটা বড় সমস্যা হলো আমরা এই মত আলোচনার সময় সর্বদা আস্তিক – নাস্তিক বাইনারি প্রয়োগ করি। এটা একদমই অনুচিত।কারণ আমরা যে বাইনারি প্রয়োগ করি তার বহু উপরের স্তরে এই দর্শনের অবস্থান।এটা মনে রাখতে হবে আমাদের মুক্তমনারা যেভাবে একে উপস্থাপন করে তাও কিন্তু এর বিকৃতি।
এবার আমরা আসব চার্বাকদর্শন এর মৌলিক চিন্তা নিয়ে।এগুলো আমরা অতি সহজ বয়ানে পয়েন্ট দিয়ে দিয়ে আলোচনা করব।তাছাড়া আমরা বর্তমানের আলোকে বয়ানগুলো লেখব।কারণ যে শ্লোকগুলোর সন্ধান আমরা পাই তা ধরে ধরে ব্যাখ্যা লিখতে গেলে অনেক সময় দরকার। আর এখানে তার দরকার নেই।যারা চার্বাকদর্শন নিয়ে আগ্রহ অনুভব করবেন তারা শ্লোক, শ্লোকের অনুবাদ, ব্যাখ্যা পড়ে বর্তমানের আলোকে সাজিয়ে দেখবেন।যদি তা কেউ করেন তাহলে আমাদের আলোচনা সার্থকতা পাবে।এবার পয়েন্টে আসি।পয়েন্টগুলো নিম্নরূপ :
১)শৃঙখলাপূর্ণ, সংযত, নিষ্কলুষ জীবনযাত্রাই সুখ।এই সুখই পুরুষার্থ।
২)মানুষে মানুষে সৃষ্ট সকল ভেদাভেদ মিথ্যা।মানুষের উপর “শাসন” কায়েমের জন্যই এর উদ্ভব।
৩)স্বতন্ত্রভাবে কেউ মুক্তিলাভ করতে পারেনা।সবাই একে অপরের সাথে সংযুক্ত।তাই ব্যক্তির নয়; সামাজিক মুক্তিই প্রকৃত মুক্তি।
৪)সকল প্রকার ভেদভাবমুক্ত ও শুদ্ধাচারী মানুষই মুক্ত মানুষ।
৫)”স্ব” এর ধারণাকে বুঝতে হলে কেবল নিজের দেহে আটকে থাকলে চলবেনা। নিজের দেহকে অতিক্রম করে সমাজের ধারণায় আসতে হবে।
৬) সত্যিকার সামাজিক জীবনের অর্থই হলো নিজের সুখ অন্যের সাথে ভাগ করে নেয়া; সর্বোপরি অন্যের কল্যাণে নিজেকে উৎসর্গ করা।
৭) দুঃখভয়ে সুখ ত্যাগ অনুচিত ।একে বর্জন করে সুখ আসেনা। একে আত্মসাৎ করেই সুখ আসে।
৮)রাজশক্তি শেষাবধি সর্বশক্তিমান এর ন্যায় আচরণ করে।
৯)কোনোকিছু প্রমাণ করতে হলে “বস্তু ‘” আকারে প্রমাণ করতে হয়।অধিবিদ্যার বিষয় এভাবে প্রমাণ অসম্ভব।
১০) প্রত্যক্ষই সবচেয়ে শক্তিশালী প্রমাণ। তবে সর্বদা এটি যে নির্ভুল হবে তা ঠিক নয়।এছাড়া লৌকিক(কাণ্ডজ্ঞানযুক্ত অনুমান স্বীকার ককরা যায়।
১১)জগতে চলমান “সৃষ্টিচক্র ” ঘটে বস্তুতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায়।
১২)মৃত্যুর পর একইভাবে জগতে ফিরে আসা যায়না। দেহ পঞ্চভূতে মিশে যায়।
১৩) “চেতনা” কখনই দেহ ছাড়া সম্ভব নয়। কারণ দেহবিহীন জ্ঞান বা চেতনা অসম্ভব।
আমরা যদি এই বিষয়গুলো অনুধাবন করে অগ্রসর হই তবেই আমাদের আগামী দিনের কর্ম ঠিকভাবে সম্পন্ন হবে।সেই আশা ব্যক্ত করে আলোচনা এখানেই ক্ষান্ত করছি।

শেয়ার করুন
  • 12
    Shares

২ মন্তব্য

  1. এর ওপর আরো লেখা চাই শ্রদ্ধেয় গবষকের কাছে।দারুন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!