সর্বশেষ সংযুক্তি

দাগ

লুৎফর রহমান:

যৌবনে সমাজবিপ্লবের আন্দোলনে জড়িয়ে গেলাম । পরিচয় হলো সজিবের সাথে । ঘটনাচক্রে সজিবের পরিচয় হলো রাতুলের সাথে । রাতুল এতিমখানার মেয়ে । এক হৃদয়বান নিঃসন্তান মা সেখান থেকে ওকে গ্রহণ করে পরম স্নেহে লালন-পালন করেন । রাতুল কলেজে পা রাখতেই মহিলার মৃত্যু হয় । ওর স্বামী ছিলেন খারাপ প্রকৃতির লোক, নেশাখোর । এলাকার নেশাখোরদের সাথে ছিলো তার বিরাট সখ্যতা । এদের কুপরামর্শে নেশার টাকা জোগাড়ের উদ্দেশ্যে সে রাতুলের রূপকে ব্যবহার করে । পরিচয়হীন, স্বজনহারা রাতুল এই বৃদ্ধের জঘন্য খাঁচায় বন্দি হয়ে যায় ।

অমানবিক এই বিষয়টি নিয়ে আমাদের গ্রুপে বিশদ আলোচনা হয় । আমরা বৃদ্ধের খোঁজ-খবর নিয়ে দেখি পৃথিবীতে তারও কেউ নেই । সিদ্ধান্ত মোতাবেক ওর কাছে রাতুলের বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে যাওয়া হলে লোকটা ভীষণ ক্ষেপে যায় সোনার ডিম-পাড়া হাঁসটি হাতছাড়া হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দেয়ায় । এ রাস্তা যে কোনো ফল দেবে না তা আমাদের কাছে পরিষ্কার হয় । সুতরাং সবাই মিলে ভিন্ন এক সিদ্ধান্ত নেই । সে-মোতাবেক দক্ষতার সাথে দুনিয়ার আলো-বাতাস থেকে বুড়োকে বিদেয় করে দেয়া হয় । বিষয়টি অজ্ঞাত থেকে গেলেও তারপর থেকে ঘটনার পর ঘটনা ঘটতে থাকে আমাদের জীবনে । পরিণতিতে আমি বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ি ।

সময়ের সিঁড়ি বেয়ে শেষমেষ অবস্থান নেই আমার বর্তমান ঠিকানায় । নিরিবিলি আশ্রয়টিতে কর্মশেষে ক্লান্ত দেহ-মনে শোবার প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম, এমন সময় কে একজন দরজায় কড়া নাড়লো । দরজা খোলে আমি অবাক ! আগন্তুক আমাকে প্রশ্ন করলো, চিনেছেন কি ? আমি বললাম, চিনেছি, রাতুল । কেমন যেনো রোগা-রোগা লাগছিলো ওকে । আপনাকে এতো রাতে, এ-বাসা ও-বাসা অলিগলি অনেক খোঁজে তারপর পেলাম – রাতুল বললো, এমন নির্জন জায়গা নিয়েছেন কেনো ? পরে এ-দিক ও-দিক খোঁজে বললো, কাউকে দেখছি না-যে !

আমার একাকিত্বকে রাতুল চিহ্নিত করলো । তাকে খুব খুশি-খুশি লাগছে, সকালের শিশির-কণায় চিকচিক সূর্যালোক পড়ার মতো । সে অপরূপ হেসে বললো ভালোই হলো সারারাত চুটিয়ে গল্প করা যাবে । ঘরে কি চায়ের বন্দোবস্ত আছে ? থাকলে ভালো হয় । আমি এই অনাকাঙ্ক্ষিত অতিথির জন্য মোড়ের দোকান থেকে চা-চিনি-বিস্কিট আনতে বের হলাম ।

ফিরে এলে রাতুল নিজেই চা বানাতে শুরু করলো । বানাতে-বানাতে আমাকে প্রশ্ন করলো, আমার বিয়ের দিনটির কথা কি আপনার মনে আছে ? আমি হেসে বললাম, তা বেশ মনে আছে । আপনার কাবিননামায় আমি একনম্বর সাক্ষী ছিলাম । এর আগে আমাদের গ্রুপের সবাইকে একত্রিত করে প্রশ্ন করা হয়েছিলো, এই অসম্ভব সুন্দর মনের মেয়েটিকে তোমরা একজন গ্রহণ কর, কে হবে সেই ভাগ্যবান পুরুষ ? সজিব অতি ক্ষিপ্রতার সাথে জবাব দিলো, আমি ।

আমি যখন কথা বলছিলাম, রাতুল গভীরভাবে আমাকে পর্যবেক্ষণ করছিলো । সে শুরু করলো, সেদিন আমি বারবার আপনাকে দেখছিলাম । আমি বললাম, আপনাকে সদ্য-ফোটা গোলাপের মতো দেখাচ্ছিলো, চোখে-মুখে যেনো একটা ঔজ্জ্বল্যের ছাপ ছিলো । আপনার দৃষ্টিও ক্ষণে-ক্ষণে আমার উপর নিক্ষিপ্ত হচ্ছিলো ; এই বলে রাতুল চা-য়ে চিনি মেশাতে শুরু করলো । বিয়ের পর রাতুলের সাথে আমার নিয়মিত দেখা হতে থাকলো । আমি আমার কথা, রাতুল তার নিজের কথা খুঁটিনাটি সব বলতো, একটা অন্যরকম বিনিময় । আমি একদিন জিজ্ঞেস করলাম, আপনি কি সজিবকে এসব বলেছেন ? না, এসব একান্ত আমার নিজের কথা, উত্তরে সে বললো ।

রাতুলের চা-বানানো হয়ে গেছে । সে দুহাতে দুকাপ চা নিয়ে আমার বিছানায় এসে আয়েশে তার কাপে চুমু দিলো । আমি প্রশংসা করলাম, আগের মতোই খাসা বানিয়েছেন । সলাজ-মুখে ফের সে বলা শুরু করলো, তারপর হঠাৎ একদিন আপনি হারিয়ে গেলেন, আজো আমি যে-রহস্য ভেদ করতে পারিনি ! আমি জবাব দিলাম, ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলাম । বাবা তখন এ পথ থেকে ফেরাতে আমার বিয়ে দিতে সচেষ্ট হলেন, বিয়ে ঠিকও হলো । কিন্তু একপর্যায়ে কনেপক্ষ আমার সব জেনে আমাকে প্রত্যাখ্যান করলে বাবার চেষ্টা ব্যর্থ হলো । আমি হাঁপ ছেড়ে বাঁচলাম । রাজশাহীতে আমার দায়িত্ব পড়লো । আমি আমার পরিচিত মানুষ ও জায়গা ছেড়ে সেখানে চলে গেলাম । তারপর ওখানে গিয়ে আমি মামলায় ফেঁসে যাই ।

শোনে রাতুল মন্তব্য করলো, থাক ও-সব কথা পুরনো দিন ঘষে কী-আর হবে ! আমরা বর্তমানে আসি, আমার আগমন আপনার মাঝে কি কোনো কৌতূহল জাগিয়েছে ? আমি জবাব দিলাম, নিশ্চয় ! আপনি বরাবরই কৌতূহলের পাত্রী, বিশাল জলরাশির মতো । এ-ছাড়া আপনার মধ্যে একটি সুন্দরের রহস্যময়তাও বিরাজ করে । আমরা এই সুন্দরকে উদ্ধার করেছিলাম কোনো এক অন্ধকারের তলদেশ থেকে । চেয়েছিলাম এর গতিপথ বদলে দিতে । রাতুলের চেহারায় একটা কষ্টের ছাপ ফুটে ওঠলো, সে বললো, কিন্তু আমার জীবনের পথ ও গতি কোনোটাই বদলায় নি । একদিন সজিবের ছোটভাই আজম আমাকে অসম্ভব একটা কথা শোনালো, বললো, তোমাকে উদ্ধার করেছি আমরা সকলে মিলে, তুমি একজনের হতে পারো না । তুমি আমাদের সকলের । শোনে আমার ভয় হলো । আমি পুনরায় অন্ধকারে প্রবেশ করতে চাইলাম না । সজিবকে সব জানালাম, কোনো ফল হলো না । আজম দস্যুর মতো আমার সবকিছু কেড়ে নিলো । এদিকে দুভাইয়ের দ্বন্দ্ব চরমে ওঠলো । সজিবের গুপ্তহত্যার ভেতর দিয়ে এই দ্বন্দ্বের অবসান হলো । আমার উপর আজমের একচ্ছত্র আধিপত্য কায়েম হলো, অর্থাৎ আবার আমার একটি মৃত্যু হলো । রাতুল কথাগুলো বলতে বলতে কী-রকম অন্যমনস্ক হয়ে যাচ্ছিলো ! সে আমার অনুভূতিকে স্পর্শ করার মানসে ক্ষণিকের জন্য নিরব হলো । সহজ গলায় বললাম, আমি সবই জানি । এবার রাতুল ক্ষিপ্ত হলো, জানলেন তো প্রতিবাদ করলেন না কেনো ? আপনার মুখোমুখি হওয়ার সাহস আমার হয়নি, আমি উত্তর দিলাম । রাতুলের মুখ ম্লান হলো, মানুষের বুক ভেঙ্গে গেলে যেমনটা হয় । তারপর সে হঠাৎ বলে ওঠলো, জানতাম বীরেরা সাহসী হয় !

ঘড়ির দিকে তাকালাম, রাত বারটার ওপরে । চোখ থেকে ঘুম উধাও যদিও মনের ক্লান্তি নামেনি । রাতুল আরেক দফা চা করে আনলো । পেয়ালা থেকে কুণ্ডলী পাকিয়ে ধুয়া ওড়ছে । রাতুল বিছানার উপর পা তুলে আমার দিকে ঝুঁকে বসলো । ওর চোখ দুটোকে মনে হলো নীল সমুদ্র, ঢেউয়ের পর ঢেউ যেনো আঁচড়ে পড়ছে, এবং ভিজিয়ে দিচ্ছে আমার শুকনো বালুতট আর হু-হু বাতাসের মতো দৃষ্টি তীক্ষ্ণভাবে বিদ্ধ করছে আমার সত্তা । রঙিন ঠোঁটের কাঁপন, শরীরের মদির গন্ধ ঝড় তুলছে অন্তর্লোকে, আমার মন নিমগ্ন হতে উৎসুক হলো ।

কিন্তু রাতুলকে স্বাভাবিক দেখলাম । সে বলে চললো, এখানেই কি শেষ ? আজমও আমার উপর তার স্বঘোষিত মালিকানা ধরে রাখতে পারলো না । আপনি নিশ্চয় কবি মাসুদকে চেনেন । চিনি, আমি বললাম, কবিতার চেয়ে কবি-কবি ঠাটই যার বেশি, ধনির দুলাল এবং পরাক্রমশালী । রাতুল বললো, মাসুদ আজমের পরিচিত ও বন্ধু হিসেবে প্রায়ই আমার কাছে আসতো । যেচে আমার প্রশংসা করতো, বলতো রাতুল আপনি খুব সুন্দর, মানুষ এতো সুন্দরও হয় ! কিন্তু আমার এ-সব মোটেই ভালো লাগতো না । ভালো না-লাগলে কী হবে, আমি তার কবিতা হয়ে গেলাম । আজমকে এ-সব বললে কী হতো ? আমি অভ্যস্ত হয়ে পড়েছিলাম । পুরুষ-পর্বটি আমার মুখস্থ হয়ে গিয়েছিলো । যদিও আমি নিজেকে আবিষ্কার করতে সচেষ্ট ছিলাম একজন পুরুষের মধ্যেই । তারপর একদিন সেই ভয়ঙ্কর ঘটনাটি ঘটলো । আজম নিখোঁজ হলো । আর তাকে পাওয়া গেলো না । মাসুদ আমাকে তার কবিতার পালকিতে উঠিয়ে নিয়ে গেলো কামনার ভুবনে । পুরুষের কামনা প্রচণ্ড, অবশ্য তা প্রাপ্তির পূর্ব-মুহূর্ত পর্যন্ত । পেয়ে গেলে এর ধার কমতে থাকে এবং একসময় তা শূন্যের কোঠায় নেমে আসে, খুঁজে অন্য একটি ক্ষেত্র । মাসুদের বেলায়ও তা-ই হলো । খুব দ্রুত আমি তার কাছে এক অপ্রয়োজনীয় বস্তুতে পর্যবসিত হলাম । কথাগুলো একদমে বলে, আমি এ-সব জানি কি-না রাতুল জানতে চাইলো । আমি বললাম, সব জানি । এবার সে সত্যি  ভীষণ ক্ষেপে গেলো এবং বললো, আপনি কাপুরুষ, অপদার্থ, ভাবতে এবং বোঝতে আমারই ভুল হয়েছে ।

ঘরের ভেতরের পরিবেশ উত্তপ্ত হয়ে ওঠলো । মনে হলো শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে । আমি দক্ষিণের জানলাটা খুলে দিলাম । বাইরে অন্ধকার, আকাশ মেঘে-মেঘে ঢেকে গেছে । রাত তিনটে । চারদিকে নিশ্চিদ্র নিরবতা । আমার মনের ক্লান্তি বাষ্পের মতো উবে গেলো । অন্তরে কী-রকম একটা যন্ত্রণা ঘা দিতে থাকলো ! রাতুলের কথাগুলো স্প্লিন্টারের মতো বুকে বিঁধছিলো । ভেবে পাচ্ছিলাম না আমি কী বিষয়ে অবমূল্যায়ন করেছি । আমি সুন্দর ও সত্যকে ভালোবাসি, তো আমার ভেতর ও বাইর এক হলো না কেনো ? রাতুলের কথার কোনো জবাব দিতে পারলাম না, কণ্ঠ রুদ্ধ হয়ে এলো । মাথা নুইয়ে আমি অনেকক্ষণ বসে থাকলাম । যখন রাতুলের দিকে চাইলাম দেখলাম ওর চোখ দুটো জলে ভরে গেছে, মনে হলো এখনই উপছে পড়বে । ওর সকল কষ্ট যেনো আমার কষ্টকে জড়িয়ে ধরলো । আমার ভেতরের কান্নাকে চাপা দিতে পারছিলাম না । মনে হলো জ্বলন্ত বাল্বটিকে উপেক্ষা করে নিকষ অন্ধকার সবটা ঘর ঢেকে দিয়েছে । আমি এই অন্ধকার থেকে মুক্তির আশায় সবগুলো বাল্ব জ্বালিয়ে দিলাম । রাতুল আমার দৃষ্টির সীমানায় স্পষ্ট হলো । আমি যেনো দিগম্বর এক রাতুলকে প্রত্যক্ষ করলাম । ওর সর্বাঙ্গে অসংখ্য কালো দাগ দেখতে পেলাম ঠিক আমার ভেতরের অন্ধকারের মতো ।

শেয়ার করুন