তোমাদের প্রতি শতকোটি সালাম

লাবণী মন্ডলঃ

এই তরুণরাই ইতিহাস-ঐতিহ্যকে ধারণ করবে- এরাই ইতিহাস গড়বে। তারা বায়ান্না দেখেনি, একাত্তর দেখেনি- তারা একবিংশ শতাব্দীর স্বৈরাচারী সরকার, ফ্যাসিবাদী সরকারকে দেখেছে। তারা দেখেছে এই সরকারের আমলে ছাত্রদের উপর অন্যায়-অত্যাচার। ছাত্রীদেরকে ধর্ষণ করে মেরে ফেলা, তারা দেখেছে ‘কোটা সংস্কার’ আন্দোলনকর্মীদের উপর জুলুম- তারা আরো সাক্ষী হলো জগন্নাথ বিশ^বিদ্যালয়ের ছাত্র আরিফুলের লাশের। তাদের সহপাঠীদেরকে মেরে রক্তাক্ত করার সাক্ষীও তারা। তাদের কাছে আন্দোলনের অনেক উপাদানই রয়েছে। এই বয়সেই তো পুরো পৃথিবীকে পরিবর্তন করা যায়, অগ্নি বয়স। ভাঙ্গচুর করার বয়স। নতুন করে গড়ে তোলার বয়স। সুকান্ত, সোমেনদের তো এরা ভুলতে পারে না। তারাও যে ইতিহাসের অংশ। তাদের সহপাঠীর উপর বাস তুলে দিয়ে মেরে ফেলবে- আর তারা মেনমেনিয়ে, প্যানপ্যানিয়ে আন্দোলন করবে, মানববন্ধন করবে এটা প্রত্যাশা কেন করবো আমরা! তাদের কি রাজনৈতিক কোনো বাঁধা আছে, মেম্বারশীপ হারানোর ভয় আছে, পার্টির শৃঙ্খলাভঙ্গের দায় আছে- সরকারের কাছে চক্ষুশূল হওয়ার ভয় আছে? না, কোনটাই নেই! তাদের কাছে আছে টগবগে তারুণ্য, যে তারুণ্য দিয়ে জয় করতে পারে পুরো বিশ্বকে।

দয়া করে কেউ তাদেরকে মার্জিত হতে বলবেন না, সুশীলিয় কায়দায় আন্দোলন করার পরামর্শ দিবেন না, তাদেরকে অহিংস হওয়ার কথাও বলবেন না, তাদের শ্লোগানের ভাষা নিয়ে নাক ছিটকাবেন না- কারণ তাদের ক্ষোভকে দমানোর জন্য চেষ্টা করলে আপনি ‘মনুষ্যত্বহীনের’ পরিচয় দিবেন। তাদের ক্ষোভকে জমিয়ে রাখার কোনো যৌক্তিকতা নেই, জ্বালাক না দু’চারটা গাড়ি, মারুক না দু’চারটা পুলিশবাহিনী। কত ছাত্রই তো জীবন দিল, কত নারীই ধর্ষণ হলো, কত শিশুই তো হত্যার শিকার হলো- তাদের এই ক্ষোভ তো একদিনের না, জমানো ক্ষোভ- এই ক্ষোভকে সুশীলিয় কায়দায় দমানো যাবে না, তাহলে যে বাষ্প হয়ে বিস্ফোরণ ঘটবে! যে বিস্ফোরণে তারা সরকার পতনের ডাক দিতে পারে- অস্বাভাবিক কিছু না! ইতিহাসে আছে এরকম ঘটনা! এরা তো ইতিহাসের পার্ট!

এই ছাত্রদের আন্দোলনকে কিভাবে দেখবো- এটা কি গণআন্দোলন, বিপ্লবী আন্দোলন, সরকার হঠানোর আন্দোলন? না কোনটাই নয়! তবে, একটা দেশের চিত্র ফুটে ওঠে এই আন্দোলনের মধ্যদিয়ে, দেশের ফ্যাসিবাদী অবস্থা যখন চরমমাত্রায় পৌঁছে ঠিক তখনই দেশের আবালবৃদ্ধবণিতা ফুঁসে ওঠে। যে আন্দোলন গণআন্দোলনে রূপ নিতে পারে, বিপ্লবী আন্দোলনে শক্তি জোগাতে পারে- প্রয়োজনে সরকারকেও হঠানোর ডাক দিতে পারে। সব সময়ের ব্যাপার। তিনদিন ধরে ধারাবাহিকভাবে এই আন্দোলন চলছে। ছাত্র-ছাত্রীরা রাস্তা অবরোধ করছে, শ্লোগান ধরছে। এই তাপদাহে রাস্তায় পুরো দিন কাটাচ্ছে। কারণ একটাই তাদের সহপাঠী দু’জনকে মেরে ফেলেছে- আহত করেছে অনেককে। তাদের জীবনেরও নিরাপত্তা নেই। তাই তারা রাস্তায় নেমে এসেছে। এটা খুবই পজিটিভ আন্দোলন। এই আন্দোলনকে সমর্থন করা, পাশে দাঁড়ানো আমাদের বিবেকের দায়। যে যেখান থেকে পারি চলুন আমরা সমর্থন জানাই ওদেরকে, ওদের শক্তি জোগাই।

হাজার-হাজার ছেলেমেয়েরা যখন রাস্তায় ওরা কিন্তু বিশৃঙ্খলা হচ্ছে না, ওরা নিজেদের মধ্যে কোনো কলহ তৈরি করছে না, নারী বন্ধুদের দিকে হাত বাড়াচ্ছে না- তবে কেন ওদেরকে ফ্যাসিস্ট পুলিশ মারবে, ওদেরকে রক্তাক্ত করবে! কারণ, ফ্যাসিবাদের ভিত কেঁপে উঠছে, মনের ভিতর ভয় ঢুকেছে। ক্ষমতা হারানোর ভয় ঢুকেছে- যে ভয়কে জয় করার জন্য পেটুয়াবাহিনী লেলিয়ে দিয়েছে এই ফ্যাসিস্ট সরকার। আর ওদিকে নিজের ছেলের নামে ভূ-উপগ্রহের কেন্দ্রের নামকরণ করছে- তারপরও উনাকে আপনারা ‘মানবতার আম্মা’ উপাধি দিবেন? বাচ্চারা তোমরা ’৫২ থেকে শিখেছো, তোমরা হটে যেতে পারো না- তোমাদের জয় হবে। আর একটি মানুষকেও যাতে অন্যায়ভাবে না মারা হয়, আর একটি শিশু-মেয়ে যাতে ধর্ষণ না হয়, ছাত্রদের উপর যাতে সকলপ্রকার অন্যায়-অবিচার তুলে নেওয়া হয় সে শ্লোগান তোলে তোমরা। তোমাদের দাবিদাওয়াভিত্তিক আন্দোলনের সফলতার সাথে এটাও মনে রাখবে এই সরকার তোমাদের জন্য নয়, এই সরকার একটা শ্রেণীর প্রতিনিধিত্ব করে। যে শ্রেণীটা রক্তচোষা শ্রেণী। যে শ্রেণীটা শাহজাহান সরকারদের শ্রেণী।

ছাত্রদের আন্দোলন দমানোর শক্তি রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস বাহিনীর নেই। এই কথাটিকে স্পষ্ট করে দিতে চাই। যত মারবে, ততই ফুঁসে উঠবে। ততই জ¦লে উঠবে, যে আগুন ওই গণভবন পর্যন্ত পৌছাতে পারেÑ সুতরাং ভেবেচিন্তে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের পদক্ষেপ নিতে হবে। আর একটি ছেলে-মেয়ের গায়ে হাত তুললে ওই হাত ভেঙ্গে দেওয়া হবে, ঘরে বসে থাকবে না কোনো বিবেকবান মানুষ। ওদের দাবিদাওয়া মেনে নিন, ওদের ক্ষোভকে বুঝুন। ওদের যন্ত্রণাকে উপলব্ধি করুন সরকারবাহাদুর। না হলে কিন্তু আপনার পতন অনিবার্য। আপনি মনে করেছেন কয়েকজন মাথামোটাদেরকে কিনে নিয়েই গদি রক্ষা করা যাবে, না তা যাবে না! আপনার গদি ছাড়ানোর জন্য এরাই যথেষ্ট। আপনার পেটুয়াবাহিনী ক’জনকে মারবে, আহত করবে? আরিফুলের লাশ আপনার ঘুম নষ্ট করে না, ছাত্রদের আন্দোলন আপনার ঘুম হারাম করে না, পূর্ণার ক্ষতবিক্ষত দেহও আপনাকে ভাবায় না- আপনার রক্ত, মাংস, হৃৎপি- এত নিষ্ঠুর, ক্ষমতারলোভে আপনি আর ‘মানুষ’ নেই পাথর হয়ে গেছেন। আপনি ভুলে গেছেন অতীত, অতীতের ইতিহাস। ছাত্রদের জয়, লড়াকুদের জয়, সংগ্রামীদের জয়। এত মনভোলা তো আপনার হওয়ার কথা নয়? আপনি তো ইতিহাসের স্বাক্ষীও?

মানবতাকর্মী, বড় বড় এনজিওবিদরা কোনো উচ্চবাচ্য করছে না। তারা যে পাচাটাদেরই প্রতিনিধিত্ব করে। হাজার হাজার ডলার নারী, শিশুদের নামে এনে নিজেরা প্লট, ফ্ল্যাট করে, নিজেরা ভূরিভোজ করে। এদেরকে বয়কট করুন। এসব নামধারীদের বিরুদ্ধেও আওয়াজ তোলা সময়ের কর্তব্য। এরা ফ্যাসিস্টদেরই চ্যালা। ফ্যাসিস্টব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখার জন্য যত ফায়দা-ফন্দি। সুতরাং, স্কুল-কলেজ পড়–য়া শিক্ষার্থীরা তোমরা ভয় পেয়ো না, তোমরা কারো প্রলোভনের ফাঁদে পা দিও না- তোমরা তোমাদের দাবী আদায় করেই ঘরে ফিরো। আমরা তোমাদের পাশে আছি, সাথে আছি। তোমাদের জয় যে আমাদেরই জয়, হাজার জনতার জয়। এই শাহজাহান খানদের টিকিয়ে রাখার শক্তির বিরুদ্ধেই শ্লোগানটা তুলতে হবে, ব্যক্তি শাহজাহান খান তো বড় কথা নয়। বড় কথা হলো এর মূল খুঁটি- যে খুঁটির জোরে তার ওরকম হাসি বের হয়, এটা তো সংখ্যায় কম বলে বেহায়াপনার পরিচয় দেয়। এই বর্বরজানোয়াদেরকে মুখোশ খুলে দিয়ে প্রকৃত মানুষদের প্রতি আস্থা রাখা শুরু করতে হবে- তবেই এদেরকে শিক্ষা দেওয়া হবে।

শাহজাহান খানসহ এসব বেহায়া, নির্লজ্জ ব্যক্তিদের পদত্যাগ করতে হবে। রাস্তাঘাটে, বাসা-বাড়িতে, অফিস-আদালতে নিরাপত্তা দিতে হবে। নারীর উপর সকল ধরনের সহিংসতা বন্ধ করতে হবে। শিশুর উপর সকল অন্যায়-অবিচার বন্ধ করতে হবে। সকল নিপীড়িত মানুষের উপর আগ্রাসী মনোভাব পরিহার করতে হবে। এসব তারা তো আর এমনি এমনি করবে না সেজন্য লড়াই করতে হবে, সংগ্রাম করতে হবে। শক্তিশালী গণআন্দোলন গড়ে তুলতে হবে, প্রকৃত সংগঠকদের এই দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিতে হবে, এখনই সময়।

ইস্যুৎকেন্দ্রীক, ঘটনাকেন্দ্রীক আন্দোলন করে থেমে না গিয়ে প্রকৃত সমাজপরিবর্তনের ডাক দিতে হবে। আমি বিশ্বাস করে যে ডাকে আমরা এই ছেলেমেয়েদেরকে পাবো। ইতিহাস তাই বলে। ছেলেমেয়েরা আগে থেকেই ওত সুসংগঠিত থাকে না, ওত পরিকল্পিতও থাকে না, তারা স্বতঃস্ফূর্তভাবে আন্দোলনে অংশগ্রহণ করে। বিজয় ছিনিয়ে আনে। ওদের ভেতরের দহনজ্বালাকে কাজে লাগানোর দায় তো নিতেই হবে! বাচ্চারা তোমাদের পাশে আছি, তোমরাই দায়িত্ব নিবে এই সমাজটাকে পরিবর্তন করার। নতুন ভোরের সূর্য তোমাদের হাত ধরেই আসবে। তোমাদের দৃঢ়তা আমাদের প্রেরণা। তোমাদের বয়সেই বিপ্লবের জন্য ঘর ছেড়েছিলাম। এখন আবার তোমরাই উজ্জীবিত করছো। তোমাদের এই প্রণোদনা আমাকে/আমাদেরকে প্রণোদিত করছে। তোমাদের প্রতি শতকোটি সালাম। তোমরা বিজয়ের বেশে ঘরে ফিরো, তোমাদের রক্তাক্ত দেহের শপথ নাও- এই বাংলাদেশ একদিন সব মানুষের হবে। যেখানে থাকবে না কোনো ফ্যাসিবাদী দুঃশাসন, স্বৈরাচারী একনায়কতন্ত্র। যেখানে মানুষে মানুষে কোনো ভেদাভেদ থাকবে না, পাহাড়-সমতলে কারো কোনো অধিকারক্ষুন্ন হবে না, নারীর উপর কোনো অবিচার হবে না, শিশুরা প্রাণ খুলে হাসতে পারবে। তোমাদের অগ্নিশপথে আমরাও সাক্ষী হবো। তোমাদের জয়ে আমরাও উল্লসিত হবো। তোমরা থেমে যেও না কিন্তু, তোমরা প্রলোভনে পরিও না। তোমরা এই ফ্যাসিবাদের ভিতকে কাঁপানোর যে প্রত্যয় নিয়েছো তা শেষ পর্যন্ত দেখবে বলেই প্রত্যাশ করি। তোমাদের আর একটি ছাত্রও যাতে অন্যায়ের শিকার না হয় সে দায়িত্ব তোমাদেরই। তোমাদের আন্দোলনে পূর্ণ সমর্থন রইলো। এই তেজ, দৃঢ়তাকে বাঁচিয়ে রেখো, স্বপ্নের পৃথিবী গড়ে তোলো। এই তারুণ্যের উদ্যমতাকে স্যালুট। তারুণ্যের জয় হোক, জয় হোক সকল নিপীড়িত-মেহনতী জনতার। জয় হোক সকল মানবজাতির।

By | ২০১৮-০৮-২৯T০৮:১৬:৪১+০০:০০ আগস্ট ২, ২০১৮|মুক্তমত|০ Comments

About the Author:

Leave A Comment

error: Content is protected !!