সর্বশেষ সংযুক্তি
সুত্রপাত / নারী / তিন পুঁজিবাদী  ফাঁদ থেকে সাবধান মেয়ে

তিন পুঁজিবাদী  ফাঁদ থেকে সাবধান মেয়ে

তামান্না তাবাসসুম:
আমাদের সমাজব্যবস্থা একটি মেয়ের মধ্যে ছোটবেলা থেকেই কিছু  হিনমন্যতা ঢুকিয়ে দেয় যা থেকে সে সারাজীবনে বের হতে পারে না।এর কারন হিসেবে  কিছু প্রবাদ,কুসংস্কার, সামাজিক কুপ্রথা, মূর্খতা ছাড়াও গ্লোবালি যেটা সবচেয়ে বড় নিয়ামক হিসেবে কাজ করে তা হল পুঁজিবাদী চাল। চলুন পরিচিত হই তিনটি ভয়াবহ পুঁজিবাদী চালের সাথে ।

১.বিউটি মিথ:  সৌন্দর্য একটা  বিমূর্ত কন্সেপ্ট। এর কোন নির্দিষ্ট ফ্রম,ফিগার, কালার নেই। আজকে সবাই স্ট্রেইট চুল সুন্দর বলছে, কিছুদিন আগে ছিলো কার্লি চুল।এখন সবাই স্টাইল করে চুল স্ট্রেইট করে আর আগে এক সময়ের নায়িকারা কার্লি করতো। কোন অঞ্চলে স্লিম কে সুন্দর বলে, কোন অঞ্চলে ভাল স্বাস্থকে। আবার একটা কথা তো আছেই যার নয়নে যারে লাগে ভালো। আর মেয়েদের অন্যতম দোষ হল নিজের সৌন্দর্য নিয়ে হিনমন্যতায় ভোগা। অনেক সুন্দর মেয়েও নিজের কোন না কোন খুঁত বের করে তা নিয়ে অযথাই চিন্তা করে।এই চিন্তা তার মাথায় গেঁথে দেয় ফেয়ার এন্ড লাভলি টাইপ বিভিন্ন প্রোডাক্টের বিজ্ঞানপন।এরাই রেসিজমকে এখনো টিকিয়ে রেখেছে। এখনে সুন্দরী মানে অবশ্যই তাদের বলে দেয়া ছাঁচে সুন্দরী।এরা নিজেদের নতুন নতুন  প্রোডাক্ট বিক্রির জন্য সুন্দরের সঙ্গা কয়দিন পর পর বদলায়। সৌন্দর্যকে একটা নির্দিষ্ট বলয়ে আটকে দেয়। পুরোটাকে ধাবিত করা হয় একটা ক্যালকুলেটিভ ফিগারের দিকে।আর তখন সবাই তেমন হতে চায়। মানব জাতির অন্যতম বৈশিষ্ট হলো আমাদের কারো সাথে কারো মিল নেই আর সেখানে আমরা মূর্খের মতো সবাই একি রকম হতে চাচ্ছি ! এ কেমন অসম্ভব চিন্তা ! বিজ্ঞাপন চিত্রে এটা দেখানো হয় তোমার  সৌন্দর্য হচ্ছে তোমার পুঁজি। আর এটা এই অর্থে যে সৌন্দর্যই হচ্ছে শক্তি। একটা মেয়ের যত গুনই থাকুক, এখানে তাকে সুন্দর হতে হবে। আর তাই বিভিন্ন প্রসাধনের ব্যবহার।

.ফলস নিড এর প্রতি উৎসাহী করা: ফলস নিড হচ্ছে এমন  নিড বা প্রয়োজন যার আসলে মানুষের দরকার নেই। কিন্তু মিডিয়ার দ্বারা প্রভাবিত হয়ে মানুষের মনে হয় যে এটা ছাড়া তার চলবেইনা। এই যে আজকাল বিয়ের অনুষ্ঠানে এলাহি কান্ড করা হয়, যাদের তেমন সামর্থ নাই তাদেরও মনে হয় এভাবে বিয়ে না করলে চলছেই না, মধ্যবিত্যরাও করে এই ব্যাপক অপচয়।ফলস নিড এর অভাব বোধ আসলে ইয়াং জেলারেশনের ছেলে মেয়ে সবাই ভোগে। এই লেখাটা যেহেতু মেয়েদের নিয়ে তাই এখানে তাদেরই ফোকাস করছি। মেয়েরা    রুপচর্চা বা শো-অফ করতে গিয়ে এমন অনেক কিছু করে যার আসলে দরকার নেই। যেমন  চুল ভালোই আছে, হুট করে রিবন্ডিং করে নিলো। অনেক মেয়েই হাত পা ওয়াক্সকিং করান। একটা মানুষের শরীরে লোম থাকা খুবি স্বাভাবিক, মানুষের বেশ ছেড়ে প্লাস্টিকের শরীর হওয়ার কোন মানেই হয়না।এগুলো সাময়িক সুন্দর করে ঠিকই কিন্তু কয়দিন পর এমন অবস্থা হয় যে আপনাকে রেগুলার এই সেবা গুলো নিতেই হয়। এগুলো   নিজের শরীরের জন্য কস্টকরও ক্ষতিকর দুটোই। অনেক ছোটবেলা থাকেই মেয়ে বাচ্চাদের মনে  ‘বারবি ডল’ ইমেজ আর ‘প্রিন্সেস’ ইমেজ ঢুকিয়ে দেয়া হয়। যেই ইমেজের বাস্তবের সাথে কোন মিল নেই। তারা মনে একটা ড্রিম লাইফ লালন করে, আর বাস্তবের সাথে যখন তা মেলে না তখনি নিজেকে অসুখি ভাবে। তারা তখন প্রিন্সেসের মতো ড্রেস ( যেই ড্রেস পড়ে আরাম নাই, শান্তি মতো হাটা যায় না ) উচু হাই হিল ( যা স্বাস্থের পক্ষে খুবি ক্ষতিকর, বর্তমান যুগ যেই ফাস্ট; হাই হিল পরে ঠুস ঠুস করে হেটে কতদূর আগাবা মেয়ে ? ) বারবির মতো ফিগার বানাতে গিয়ে  না খেয়ে দেয়ে স্বাস্থের বারটা বাজায় ।মরিচিকার পিছনে ছুটতে গিয়ে বাঁধা পড়ে যায় তার স্বাভাবিকতা।  সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনে পুঁজির বিকাশ প্রক্রিয়ার মধ্যে পড়ে হারিয়ে যায় নারীর মানুষ অবয়ব।একটা স্বাভাবিক সোন্দর্যের বাইরে গিয়ে নিজেকে আর্টিফিসিয়াল ভাবে উপস্থাপন করতে মরিয়ে হয়ে ওঠে এরা।

মিডিয়া সারাক্ষন আপনাকে প্রভাবিত করবে এই সব ফলস নিডের দিকে যাওযার জন্য কারন এর পিছনে আছে বছরে তিন হাজার তিনশ কোটি ডলারের ডায়েট শিল্প , দুই হাজার কোটি ডলারের প্রসাধনী শিল্প , ৩০ কোটি ডলারের কসমেটিক সার্জারী শিল্প।

.নারী অধিকার/ স্বাধীনতার ভুল সঙ্গায়ন: এটি সবচেয়ে ভয়াবহ ফাঁদ। পুঁজিবাদিরা নারী অধিকার/ স্বাধীনতা এসব টার্ম খুব বেশি ইউজ করে যাস্ট ব্যবসা করে, আর  কিছু না। বেশিভাগ ক্ষেত্রেই নিজেদের পন্য বেচার জন্য এরা এসবের ভুল সংঙ্গায়ন করে। এখন তাদের কথায় ব্রেন ওয়াসড না হয়ে একটু মাথা খাটায় বুঝতে হবে সুন্দরী প্রতিযোগীতা নারীকে আসলে কতটা এগিয়ে দেয় নাকি আরো কয়কশো বছর পিছিয়ে দেয় । এরা সুন্দরীর  দুটো পাখা লাগিয়ে বিজ্ঞাপন দিয়ে বোঝায় এই প্রতিযোগিতায় গেলে নারী ইচ্ছা মতো উড়তে পারবে, আসলে এই পাখা থাকে কর্পোরেট প্রভুদের পকেটে। সৌন্দর্য কে তারা দেখে পন্য হিসেবে। তারা নারীদের প্রকৃত মুক্তির পথ দেখায় না বরং মুক্তির সম্ভাবনাগুলোকে হত্যা করে ভুল পথে পরিচালিত করে।

সন্তান প্রসবের পূর্ব মুহূর্তেও নারী শ্রমিককে ছুটি দেয়না  মর্মান্তিক পুঁজিবাদ!নারীর গার্হস্থ্য শ্রমকে পুঁজিবাদ অর্থনীতির কোনো হিসাবের মধ্যেই আনে না। তারাই কিনা বলে নারী মুক্তির কথা !

ফেয়ার এন্ড লাভলি টাইপ প্রোডাক্ট গুলা দেখায় দুনিয়াটা কেবল সুন্দরীদের জন্যই ।যারা সাদা চামড়ার না তাদের দারা কিচ্ছু হবে না।সানসল্ক নাকি চায় মেয়েরা শাইন করুক দিন থেকে রাতে, তাই তাদের চুলও শাইন করতে হাবে! আরো কিসব কম্পানি আছে তাদের দেয়া প্রডাক্ট ইউজ করলে চাকরি, বিয়া, নায়িকা কোন কিছু হওয়াই  কোন ব্যপার না।এরা এভাবে দেখায় যযে ক্রিমটি ব্যবহার করার পরপরই সাফল্যের চুড়ায় দেখা গেল তাকে।
কিন্তু আসলে তো যোগ্যতা ছাড়া শুধু রুপ দিয়ে কিছুই হয় না। বাইরের দেশে যাব না শুধু বাংলাদেশের কথা বলি, পৃথিবীর সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ বিজয় করে বাংলাদেশকে সম্মানিত করেছেন যে দুই নারী, দেশ চালাচ্ছেন যে নারীরা, নাসার সেরা বিজ্ঞানী হল আমাদের  মেয়ে, অর্থনীতির চাকা সচল রেখেছে যে গার্মেন্টস কর্মীরা ; ফেয়ার অ্যান্ড লাভলীর মতে তাদের কোনো শক্তি নাই! ভাল অভিনয় গুন না থাকলে শুধু রূপ দিয়ে নায়িকাও হোওয়া যায় না।

পুঁজিবাদ যখন বুঝাতে চায়, নারী, তোমার রুপ তোমার জন্য শক্তি। তখন নারী সেটা মেনে নেবে কেন? কী ভয়ানক নির্বোধ, একটি মেয়ে কত সহজেই তাকে অবমাননা করার সুযোগ একদল ব্যবসায়ীর হাতে তুলে দিচ্ছে! পুঁজিবাদের শক্তি বোধহয় এটাই যে, সে বোধকে ভোঁতা করে দিতে পারে।

লেখক: শিক্ষার্থী, ব্রাক  ইউনিভার্সিটি।

শেয়ার করুন
  • 1
    Share

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *