সর্বশেষ সংযুক্তি
সুত্রপাত / গল্প অথবা উপন্যাস / গোধূলির শেষ গল্প

গোধূলির শেষ গল্প

মো: রোকনুজ্জামানঃ

বিকেলটা খুব মনোরম ছিল। তাই ভাবলাম নদীর ধার থেকে একটু ঘুরে আসি।
পিছন থেকে(রবিউল ভাই)
-এই রোকন এতক্ষন ধরে তোকেই খুজতেছি, কই ছিলি?
-(আমি) কেন?
-দেখিস না আজ বিকেলটা কত সুন্দর চল ঘুরতে যাবো!
-কোথায়?
-দুচোখ যেদিকে যায় সেদিকে যাবো।
-বাহ! খুব আনন্দে আছিস দেখছি, তো এতো আনন্দিত হওয়ার কারন টা জানতে পারি?
নাকি ভাবি খুজে পেলি?

-আরে না! আজ ভার্সিটিতে অনুষ্ঠান ছিল, তাই অনেক মজা করেছি আর এই মজার গল্পগুলো তোকে না বললে হয়,বল? ওর কথা শুনতে শুনতেই দুজনে রহনা দিলাম অজানা গন্তব্যের দিকে। ও আমার জ্যাটাতো ভাই, বয়সে আট বছরের বড়। ওর পড়াশুনা প্রায় শেষ আর আমি ভার্সিটি এপ্লিকেন্ট। শুধু ও আমার ভাই নয়। আমার ভালো একজন শিক্ষক, ভালো বন্ধু । আমার সাথে ওর সম্পর্ক যেন আত্মার আত্মীয়।

মা-বাবার একমাএ সন্তান রবিউল। ওর বাবা হাল চাষ করেই ওকে এতদূর এনেছে। ওর বাবা আর খাটতে পারে না। তাই একটু বেশি কষ্ট হলেও টিউশনি করেই পরাশুনার পাশাপাশি সংসারের হাল ধরেছে রবিউল। নদীর ধার বেয়েই হাটতেছিলাম, দু ধারে ছিল কাশবন। আর বয়ে চলা নদীর ঠিক উপরে রক্ত বর্ণ সূর্যটি এসে পড়েছে। প্রকৃতি যেন শরতের কাশফুল দিয়েই নিজেকে রাঙ্গিয়ে নিয়েছে! হাটছিলাম আর শুনছিলাম ওর অমর প্রেমের গল্প। মেয়ে পছন্দ হয়েছে, প্রস্তাব দিবে এই মুহুর্তে ভ্রমরের বিপরীত পক্ষ থেকে শোনা গেলো, ওই মেয়ের সাত দিন পর বিয়ে। হাসি আর চেপে রাখতে পারলাম না আমি !

-হাসছিস কেন??
-(আমি)আরও তো তিনটা মেয়ের কাছে একই প্রস্তাব দেয়া হয়েছিল। কিন্তু সবার তো একই
নিয়ম সাত দিনের মধ্যে বিয়ে হয়ে যায়। তাই বলছি মেয়ে বুঝি তোর কপালে নাই !!!
– হ্যা রে আমারো তাই মনে হচ্ছে, যাকে প্রস্তাব দেই তারই বিয়ে হয়ে যায়।
এমন সময় আমার প্রজাপতি পক্ষ হঠাৎ বেরিয়ে এলো।
-(রবিউল ভাই) চোখ ইশারা করলো আমাকে কথা বলার জন্য । কিন্তু তার সাথে তো কথা বলা দূরের কথা, তাকে দেখলেই হৃৎপিন্ডে কম্পন এসে যায় আমার, নারি চলাচল ৮০% বেড়ে যায়। কাছাকাছি আসার পর চোখে চোখ পড়ল আমার সাথে , প্রজাপতি পক্ষ সেই সরলতার সুযোগ নিয়ে মুচকি একটা হাসি দিল। যা আমার হৃদয়কে ক্ষত বিক্ষত করে অশান্ত প্রেমের সাগরে ফেলে দিল। ওর চাহনি দেখে মনে হলো, আমার পুরো পৃথিবী ওর মাঝেই লুকিয়ে আছে। আর হাসিটাতে যেন পৃথিবীর সব রং মাখানো ছিল।

প্রজাপতি পক্ষ বিদায় নিলে, আমিও ভাইয়ের কাছে নিজের অপারগতা স্বীকার করলাম। সেদিন যেন আনন্দের জোয়ার এসেছিল। আমাকে ভাই বলছিল, আজ অন্ধকার না হওয়া পর্যন্ত হাটবো। আমি কারন জানতে চাইলাম? ও বললো আর আসতে পারবো কি না জানি না। তবে আজ ভালো ভাবেই ঘুরবো। তাই আমি আর না করলাম না। ওর কাছে যা শিখেছি তা আদর্শের নীতি, ন্যায়ের স্লোগান, আর প্রকৃত মেধা সন্ধানের চাবি। সামনে আমার এডমিশন টেস্ট তাই টেবিলে লাঙ্গল চালাতেই ব্যস্ত, দুই দিন গত হয়েছে ওর সাথে দেখা নাই। ওর বাড়িতে গিয়ে শুনি ও নাকি অসুস্থ!

জ্বরের সাথে শ্বাস কষ্টও ছিল তাই ওকে বললাম ভালো ডাক্তার দেখা। কিন্তু ও অর্থনৈতিক কারনে তা নাকোজ করলো। এদিকে চলছিল হাতুড়ি ডাক্তারের অভিঙ্গতার ঝনঝনানি। পরের দিন আরও বেশি হলো। আমাকে ও বলল মেডিকেল ভর্তি হবো। আমি আর ওর বাবা মেডিকেল ভর্তি করালাম। দুপুর থেকে সন্ধার মধ্যেই ও একটু সুস্থ হলো। তখন ও ওর বাবাকে বললো, আপনি চলে যান রোকন থাকলেই হবে। যথা নিয়মেই ওর বাবা বাসায় চলে আসলো, এবং সন্ধা থেকেই ও সুস্থ ছিল। আমাকে ও শিখাচ্ছিল (মেডিকেলের কেবিনেই) ইংলিশে কিভাবে ভালো করা যায়। আর আমি তা মনোযোগ সহকারে আয়ত্ত্ব করছিলাম।

পড়াশুনার পাশাপাশি, পাশের বেডের এক ভাইয়ের সাথে ও খুব মজা করে গল্প করছিলো। রাত বার টা বেজে গেলো, ভাই এবং আমি দুজনেই ঘুমিয়ে পড়লাম। রাত তিনটা বাজে হঠাৎ জেগে দেখি ওর প্রচুর পরিমানে শ্বাস কষ্টের সমস্যা হচ্ছে। ছুটে গেলাম ডাক্তারের কাছে, ডাক্তার অক্সিজেন লাগালেন। ও দেখি শক্ত করে আমার হাতটা চেপে ধরে আছে। আর আমার দিকে এমন ভাবে তাকিয়ে আছে যেন, পৃথিবীর সব আলো তার শেষ হয়ে আসছিল। ডাক্তার আমাকে কিছু ঔষধ আনার জন্য নিচে পাঠিয়ে দিল। খুব তাড়াহুড়া করে ঔষধ নিয়ে আসলাম। এসে দেখি ও অর্ধেক বিছানায় আর অর্ধেক নিচে পড়ে আছে। কম্বল আর বালিশ ও মেঝেতে পরে গেছে । বেডের নিচে কিছু পানি ছিল তা পরে পুরো মেঝে ভিজে গেছে। অক্সিজেন টা খুলে গিয়ে ছটফট করছে।

কি করব ভেবে পাচ্ছিলাম না। দুচোখ যেন সাগর হয়েছিল আমার। শুধু অঝরে জল আসছিল দুচোখ বেয়ে। ডাক্তার আমাকে ডেকে নিল, ওর সমন্ধে বিস্তারিত শুনলো। আমি ডাক্তারকে বার বার অনুরোধ করছিলাম স্যার ওকে প্লিজ সুস্থ করে দেন। তখন ডাক্তার আমাকে বললো তোমার ভাইয়ের সময় মাএ এগারো (১১) ঘন্টা। দুঃখের সাগরে কান্নার বাজ ভেঙ্গে পড়ল। ডাক্তারের পা ধরে অনুরোধ করেছিলাম, আমার জীবন দিয়ে হলেও ওকে সুস্থ করে দেন। আমি নিজের থেকেও ওকে বেশি ভালোবাসি। কিন্তু তাতে কোন লাভ হলো না। এ যেন বিধাতার নিয়তি। চোখ মুছতে মুছতে ওর কাছে গেলাম। ও আমাকে ইশারা করল অক্সিজেনটা খুলে দিতে। আমি খুলে দিলাম। ও আমাকে আস্তে আস্তে বললো। কাল আমার সোনালি ব্যাংকের পরীক্ষা আছে। ডাক্তার কি বললো? আমি তাড়াতাড়ি সুস্থ হবো তো? চাকুরিটার যে ভীষণ প্রয়োজন! এ কথা শুনেই, আর দাড়িয়ে থাকতে পারলাম না। জড়িয়ে ধরেই চিৎকার করে কাদতে লাগলাম। নিজেকে সামাল দেয়ার মতো অবস্থা আমার ছিল না।

ভোর থেকেই ওর বাবা-মা, আত্মীয়-স্বজন, এলাকাবাসি সবাই চলে আসলো। সবাই দেখলো, ওকে বাচাতে চেষ্টার কোন ত্রুটি ছিল না। কিন্তু আমি ছাড়া আর কেউ জানতো না ও দুপুর দুই(২) টার দিকে আমাদের সবাইকে নিরাশ করবে! তখন ১ঃ৩০ বাজে আমি ওকে বললাম আমি একটু বাসায় গিয়ে আবার আসবো। ও বললো আর এই টুকু সময় থাকলিনা? হয়ত আর দেখাই হবে না। না দাড়িয়ে দ্রুত বাইরে চলে আসলাম। কি করে দেখবো ওর মুত্যু? ও যে আমার আত্মার আত্মীয়! বিপদের বন্ধু, ভালোলাগা মুখ, আর আদর্শের স্তম্ভ! গোধূলির লগ্নের মতই তার জীবন প্রদীপ ও নিভে যায়। শুধু রেখে যায়, ফেলে যাওয়া কিছু স্মৃতি।

শেয়ার করুন
  • 154
    Shares

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!