সর্বশেষ সংযুক্তি

ক্ষুধা

অজয় বড়ুয়াঃ

ক্ষুধা লাগছে লাগছে কিছু খাইতে দাও। মায়ের কোন সাড়া না পেয়ে পাচঁ বছরের ছেলেটি মায়ের হাত ধরে বলে মা কি হলো কিছু খাইতে দাও, ক্ষুধা লাগছে কইলাম তো। ছেলের আর্তনাদ দেখে মায়ের মুখখানা কাল বৈশাখীর ঝড়ের মত অন্ধকার হয়ে আসে,আর নামতে থাকে দু চোখ দিয়ে কাল বৈশাকীর ঝড় মা আচল দিয়ে নিজের মুখটি ছেলের কাছ থেকে লুকানোর চেষ্ট করে, নিজের মুখটি আচলের নিচে লুকাতে ব্যর্থ হলে, ছেলেটিকে শক্ত করে নিজের বুকের মাঝখানের জড়িয়ে ধরে। তখন ছেলেটি মায়ের চোখের জলের কারণ বুঝে যায়।

আর মাকে বলে মা আমার ক্ষুধা লাগে নাই। আমিতো এমনি এমনি কইছি। আমার ক্ষুধা লাগে নাই, আর ক্ষুধা লাগবো কেন! কাল দুপুরে পেট ভইরা ভাত খাইছি আজকে এখনো দুপুর হয় নাই, দেহ এখনো পেট ভরা আছে। নিজের পেট ফুলিয়ে দেখাই মাকে। মা আর নিজেকে সামলে রাখতে না পেরে মুখে আচল দিয়ে ছেলের কাছ থকে নিজেকে লুকানোর জন্য ঘরের ভেতর চলে যায়। আর ছেলেটি গুটি গুটি পায়ে ঘরের ভেতর ডুকে মায়ের গা ঘেষে বসে। আর মা ছেলেটিকে বুকে জড়িয়ে নেয়। ছেলেটি কাঁদো কাঁদো কন্ঠে বলে মা মা’গো তুমি এমন করে কাইন্দো না। আমার ক্ষিদা লাগে নাই, তোমার দু’টি পায়ে পড়ি মা, তুমি কাঁদলে যে আমার বুকে খুব ব্যাথা লাগে।

ছেলের কথায় মা তাড়াতাড়ি আচল দিয়ে মুখ মুছে। আর বলে দেখ বাপ তুর মা কাঁদছে না, দেখ আমি কাঁদছি না। তারপর ছেলেটি তাড়াতাড়ি করে মায়ের বুক থেকে মুখ তুলে বলে মা ওই যে খাওনের দোকানটা আছে না রাস্তার মোরে সেখানে অনেক খাওন সুন্দর কইরা রাখে। কত সুন্দর সুন্দর খাওন কিন্তু সেইখানের যারা খাওনের জন্য যায় তারা পুরা খাবার টা কেউ খায় না। অর্ধেক খাইয়া ফালাই দেয়। তারপর আবার মাকে প্রশ্ন করে আইচ্ছা মা ওই খানে যারা খাওনের জন্য আসে তাদের অনেক পয়সা আছে না? জবাবে মা ছেলের মাথায় হাত বুলিয়ে বলে হ বাপ। তাদের মেলা পয়সা। আইচ্ছা মা তাদের এত ট্যাহা পয়সা আছে কিন্তু আমাদের ট্যাহা পয়সা নাই কেন। তারাও মানুষ, আমরা ও মানুষ তাইলে আমাদের ট্যাহা পয়সা নাই কেন? মা কোন উত্তর খুজে না পেয়ে বলে বাপ তারা অনেক বড় লোক আমরা গরিব। আইচ্ছা মা আমাদের ২টা হাত, ২টা পা চোখ কান সব আছে তাদের ও হাত, পা, চোখ কান আছে তাইলে তারা বড় লোক হয় কেমনে?

মা এইবার ছেলের প্রশ্নের উত্তর খুজে পায় না। ছেলেটি হঠাৎ করে মায়ের কোল থেকে উঠে বলে মা আমি যাই ওই দোকানের পাশে মাঝে মাঝে খাওন ফালাই দিতে দেহা যাই। যদি পাই ২জনের লাইগা লাইয়া আমু নে বলেই এক দোড় দেয়। মা তাকে আটকাতে চেয়েও পারে না। ছেলেটি দূড়ে পৌছে যায় সে ডাস্টবিন এর পাশে যেখানে বিভিন্ন বিলাসিতার খাবারের এঁটোকাঁটা পরে থাকে। কিন্তু ছেলেটি সেখানে গিয়ে দেখে সে আসতে একটু দেরি করে ফেলেছে যেঁ এঁটোকাটাঁ তার দুপুরের খাবার হতো সে খাবারে ভাগ বসিয়েছে একটি কুকুর কুকুরটি প্রায় সব কিছু খেয়ে ফেলেছিল। সামান্য কিছু হয়তো পরেছিল, তারপর সে কুকুরটি কে ভাগিয়ে দেয়, আর সেখান থেকে কিছু খাবার কুড়িয়ে খেয়ে নেয়। তারপর দাড়াঁয় সেই বিলাসি খাবারের দোকানের সামনে। একটু পরে দোকান থেকে কোট টাই পড়া এক লোক বের হয়ে আসে দেখতে পেয়ে ছেলেটি তার কছে হাত পাতে আর বলে, স্যার কাল বিকাল থেকে আমি আর আমার মা কিছু খাই নাই। কিছু ট্যাহা দেন খাওনের লাইগা। লোকটি ধমক দিয়ে বলে যা ভাগ অশিক্ষিত ফকিরের বাচ্চা।

লোকটি আসলে ঠিক আসলে ঠিক বলেছিল। ছেলেটি অশিক্ষিত ফকিরের ছেলে কিন্তু কোট-টাই পড়া লোকটি তার শিক্ষার যথাযথ প্রমাণ দিয়েছিলেন। তারপর ছেলেটি জ্যামে পড়া একটি রাস্তার পাশদিয়ে হাঠতে তাকে হঠাৎ বিলাস বহুল একটি গাড়ি থেকে ছোট্ট একটি মেয়ে খোলা জানালা দিয়ে ছেলেটির দিকে আঙ্গুল দেখিয়ে বলে আম্মু আম্মু অই ভাইয়াটির গায়ে এত ময়লা কেন? ভাইয়াটা কি গোসল করে না? মেয়েটির মা বলে আম্মু ওইটা ভাইয়া না ওই টা ফকিরের বাচ্চা। আম্মু ফকিরের বাচ্চা মানে কি? ততক্ষণে গাড়ি ছেড়ে যায়।

কথা গুলো শুনার পর ছেলেটি দু’হাত দিয়ে চোখের জল মুছে মুছে রাস্তার পর ধরে হাঠতে থাকে। সে দেখতে পাই এক রিকশাচালক রাস্তার পাশে খাবার খেতে বসছে, সে ক্ষুধার দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে রিকশাচালক দেখতে পেয়ে বলে কিরে ক্ষিধা লাগছে, খাবি?? ছেলেটি মাথা নাড়ে সম্মতি জানাই, আয় তবে এই বলে রিকশাচালক খাবার ভাগ করে দেয়। কিন্তু ছেলেটি খাবার গুলো না খেয়ে একটি পলিথিন কুড়িয়ে তার মধ্যে ভরে নেয়। রিকশাচালক বলে কিরে খাবার না খেয়ে পলিথিন ভরে নিলি কেন? ছেলেটি বলে আমার মা যে কাল দুপুর থেকে কিছু খায় নাই, মার লাইগা নিয়া যাইতাছি। রিকশাচালক বলে তুই খাইছোস? ছেলেটি না বোধক মাথা নাড়ে, তারপর রিকশাচালক ছেলেটির কথা শুনে একমনে তাকিয়ে থাকে আর চোখের জল মুছে বলে আয় বয় এই নে খাবার গুলো খাইয়া ল, এই বলে নিজের ভাগের খাবার গুলো ছেলেটিকে খেতে দেয়। খাবার শেষ করার পর ছেলেটি বলে আমি যাই আমার মা রে খাবার গুলো দিয়া আসি। বলে ছেলে খুশি হয়ে এক দূর দেয়। আর রিকশাচালক একমনে চেয়ে থাকে ছেলেটির চলে যাওয়ার দিকে।

শেয়ার করুন
  • 24
    Shares

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!