সর্বশেষ সংযুক্তি
সুত্রপাত / মুক্তমত কলাম / কোটা আন্দোলন এবং আমাদের অনুভূতি

কোটা আন্দোলন এবং আমাদের অনুভূতি

নিকুঞ্জ বিথীকাঃ

দেশে একটা বিরাট আন্দোলন চলছে। সেই আন্দোলনের মূল লক্ষ্য বৈষম্য দূর করা। কোথায় সেই বৈষম্য? সরকারী চাকুরীতে, বিশেষত বি সি এস এ। কি বৈষম্য? আরে সেখানে ৫৫% কোটা আওতাধীন। কি কি কোটা? নারী কোটা ১০%, জেলা কোটা ১০%, আদিবাসী কোটা ৫% আর আর আর আর মুক্তিযোদ্ধা কোটা ৩০%। এইখানে কি নারী কোটার দরকার নাই? সমস্যা হইলো আমাদের মেয়েরা তাদের ভাইয়েদের সাপোর্ট করতে গিয়ে রাজপথে সামিল হয়। তখন তাদের কোটার কথা মনে করিয়ে দেয়া হলে তারা ডিশিসন নিয়ে ফেলে তাদের আর কোটা লাগবেনা।

এই কোটা কি সত্যিই লাগবেনা? আপারা মেধাবী মানুষ। আপারাই ভালো বলতে পারবে। তবে আমার যুক্তি বলে লাগবে। সেটা কেমন? কোটার মূল লক্ষ্য সাম্যতাকে ধরে রাখা। সাম্যতা তো যোগ্যতায় বা অবস্থানে পিছিয়ে থাকা গোষ্ঠীর জন্য এপ্লাই করা হয়। নারীরা কি অযোগ্য? না নারীরা অযোগ্য না। তবে নানা যুক্তি কুযুক্তি দিয়ে আমাদের সমাজে নারীদের কোণঠাসা করে রাখার প্রবণতা প্রকট। এছাড়া আরো একটা বিষয় উল্লেখ না করলেই নয়। এই ১০% কোটা নির্ধারিত হয়েছিলো মুক্তিযুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত নারীদের কথা ভেবে। উল্লেখ্য বীরাঙ্গনারা তখন পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত নারীর আওতায়। সম্ভবত এখনো। কিন্তু বীরাঙ্গনারা এদেশে সামাজিক স্বীকৃতি কখনো পায়নি। একটা সমাজ, দেশ যখন বীরাঙ্গনাদের অস্বীকারের ইতিহাস তৈরি করে রাখে তখন সে সমাজ কতটা নারীবান্ধত তা প্রশ্নসাপেক্ষ?

আর এই প্রশ্নাতীত জায়গায় থেকে আমাদের আপামণিরা কিভাবে সমতার আপোসে আসতে চায় তা আমার বোধগম্য না! তাও সরকারী চাকুরীর মত একটা মাথা বর্গা দেয়ার কর্মক্ষেত্রে নিজের প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করতে সাম্যতার অন্যতম নির্দেশক নারী কোটার গুরুত্বকে অস্বীকার করা বিষ খাওয়ার সামিল বলেই মনে করি।

আচ্ছা এবার আদিবাসী, জেলা কোটা সম্বন্ধে বলো। এই কোটাগুলো নাকি শেষপর্যন্ত ফাঁকাই থাকে। আসলে কোটাধারী এবং মেধাবী দুই দলে যদিও প্রার্থীদের ভাগ করা হচ্ছে তবে মৌখিক পরীক্ষা পর্যন্ত দুই দলকে মেধার পরীক্ষা দিয়েই টিকে থাকতে হয়। আসলে শেষ পর্যন্ত টিকে যাওয়া চাকুরীপ্রার্থীরা সবাই মেধাবী। শেষের ধাপে এসে যখন দেখা যায় এই দুই কোটার কোন প্রার্থী নাই তখন তা ফাঁকাই থাকছে। এখানে এসে একটা প্রশ্ন করা যেতে পারে সেটা হলো এই সুবিধার তাদের দরকার নেই, নাকি এই সুবিধার যোগ্য হয়ে তারা গড়ে উঠছেনা, নাকি আরো কোন সমস্যা তৈরি হয়ে আছে? একটা সার্কুলারে সাম্যতা দিয়ে দেশের সব অংশের মানুষের চাকুরীতে অংশগ্রহণের সুযোগ থাকা আসলে সাম্যতা নাকি বৈষম্য? এর উত্তরের জন্য বোধহয় আমাদের আরো কিছুদিনের জন্য অপেক্ষা করতে হবে।

সবশেষে থাকলো মুক্তিযোদ্ধা কোটা। এবং এই কোটাটাই যত সমস্যার গোড়া। কারণ এর পরিমাণ ৩০% এবং তা আবার পোষ্যর শর্তও মেনে চলে! এই কোটার বিরোধিতা করার আগে আমাদের চারপাশটা একটু পর্যবেক্ষণ করলে স্পষ্ট হবে আমাদের দেশটা সত্যিকার অর্থেই রাজাকারবান্ধব। এদেশে প্রকাশ্যে রাজাকারদের বন্দনা চলে, মুক্তিযোদ্ধাদের তাচ্ছিল্য করা হয়। এমনকি সরকারী চাকুরীলোভীরা মুক্তিযোদ্ধাদের কি ধরনের সুযোগ সুবিধা দেয়া উচিত তারও দিক নির্দেশনা দেয়ার ধৃষ্টতা দেখায়। উল্লেখ্য এই রাজাকারবান্ধব বাংলাদেশে রাজাকারদের পৃষ্ঠপোষকতায় উল্লেখযোগ্য সব রাজনৈতিক দলই ভূমিকা রেখেছে। তাই এখানে একজন রাজাকার কেন রাজাকার না সেই বিষয় যতটা আলোচিত হয় ততটা আলোচিত হয়না একজন মুক্তিযোদ্ধা এবং তার পরিবারকে কেন সর্বোচ্চ সুবিধা দেবোনা।

আরো একটা বিষয় না বললেই না এদেশে যথেষ্ট ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা সনদও তৈরি হয়েছে। যে দেশের লোক খাবারে ভেজাল মেশাতে সিদ্ধহস্ত সেই দেশ সনদে দুই নম্বরি করবেনা তাকি হয়? আমরা কিন্তু ভেজাল খাবার তৈরিকারকদের পিছনে একাট্টা হতে পারিনি যা আমাদের জীবনের জন্য সরাসরি হুমকি, আমরা একাট্টা হতে পারি মুক্তিযোদ্ধাদের সুবিধার বিরুদ্ধে। কারণ তারা বহুত নরম চিজ। তারা একবারই জেগেছিলো। একটা দেশও দিয়েছিলো।

সরকারী চাকুরীতে কোটা বৈষম্য হ্রাস কি লক্ষ লক্ষ বেকারের জন্য আশাজাগানিয়া কোন ব্যাপার? তাহলে এই আন্দোলনে একাত্মতা আসে কেমনে? ধরুন সরকার সত্যিই কোটা বাতিল করলো এবং এই আন্দোলনকারীদের কেউ একজন পুলিশের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রধান কর্মকর্তার আসন অভিষিক্ত করলেন এবং তখন প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের কারণে উত্তরবঙ্গ থেকে দারিদ্র্যপীড়িত মানুষের মিছিল আসতে শুরু করলো দারিদ্র বৈষম্য দূর করার দাবী নিয়ে আপনাদের এই রাজকীয় শহরে। একজন সরকারী বড় কর্মকর্তা হিসেবে একসময়ের সেই আন্দোলনকারী হিসেবে ঠিক কি ভূমিকা নেবেন ? সরকারের ব্যর্থতার দায় ঘাড়ে নিয়ে ইস্তফা নাকি ভুখা মানুষগুলোর দিকে গুলি তাক করবেন?

আমার অনুভূতি জগাখিচুড়ি কারণ আন্দোলনকারীরা মুক্তিযোদ্ধাদের কৃতিত্বের কথা, ত্যগের কথা স্মরণ করছে মুক্তিযোদ্ধা সুবিধা হ্রাসের দাবীতে। তারা নিজেদের সেই কাতারের মানুষ ভাবছে! হাসবো না কাঁদবো বুঝতে পারছিনা!

এতগুলো মানুষ ভুল ভাবনায় থাকবে না, আমিই হয়তবা ভুল!

শেয়ার করুন
  • 9
    Shares

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *