সর্বশেষ সংযুক্তি
সুত্রপাত / মুক্তমত কলাম / কমিউনিস্টরা বিভ্রান্ত, উত্তরণের উপায়

কমিউনিস্টরা বিভ্রান্ত, উত্তরণের উপায়

মোর্শেদ হালিমঃ

রাষ্ট্র গঠনের উপাদান হল, সার্বভৌমত্ব, জনগণ, ভূমি ও প্রশাসন। চারটি উপাদান থাকলে আমরা তাকে রাষ্ট্র বলতে পারি। কমরেড লক্ষ্য করুন, সামন্তযুগে বুর্জোয়াদের রাষ্ট্র ছিল না। তারা রাজার অধীনে সামন্তসমাজে বসবাস করত। তাদের কর্তৃত্ব বলতে কিছু ছিল না। রাজা-জমিদারদের অত্যাচার শোষণ থেকে মুক্তির জন্য তারা আন্দোলন সংগ্রাম করে, শ্রেণিসংগ্রাম করে এবং রাজতন্ত্র ও ধর্মতন্ত্র উচ্ছেদ করে ইউরোপীয় ও মার্কিনীয় বুর্জোয়ারা তাদের ধনীর জাতীয়তার ভিত্তিতে রাষ্ট্র প্রস্তুত করল। তাদের ব্যবসা-বাণিজ্য প্রসার, অধিক মুনাফার জন্য আফ্রি-এশীয় বাজার দখলের লক্ষ্যে তাদের পার্লামেন্টে আইন-কানুন তৈরি করল। শ্রমজীবীদের উদ্বৃত্ত মূল্য শোষণের জন্য তাদের আত্মসাৎকৃত বুর্জোয়া সম্পত্তি বৈধ করার জন্য বিচারব্যবস্থা তৈরি করল। তারা তাদের পণ্য বাজারজাত করতে শিক্ষাব্যবস্থা বাজারমুখী করে ঢেলে সাজালো। কমরেড, বুর্জোয়ারা আজ তাদের সংস্কৃতি তৈরি করেছে। গান, কবিতা, নাটক দিয়ে শ্রমজীবীদের মনোজগৎ দখল করে রেখেছে। পরিশেষে বলতে পারি বুর্জোয়ারা তাদের ধনীর জাতীয়তাবোধে রাষ্ট্র তৈরি করতে পারছে।

অথচ আমরা গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখবো, শ্রমজীবীদের কোনো দেশ, রাষ্ট্র তাদের পক্ষে পার্লামেন্ট, আইন-কানুন তৈরি হয়নি। যেহেতু আন্দোলন সংগ্রাম বন্ধ নেই সেহেতু ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন থেকে মুক্ত হতে দুনিয়ার বিভিন্ন প্রান্তে কোথাও ধর্মের ভিত্তিতে, কোথাও ভাষার ভিত্তিতে, কোথাও সাদা-কালো বা স্থানের ভিত্তিতে এক বিভ্রান্তকর জাতীয় মুক্তি আন্দোলন বিশেষ করে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরপর স্বাধীন জাতিরাষ্ট্র গড়ে উঠতে থাকে। দুনিয়া যদি শ্রমিক দেহ ধরি মালিক যেমন শ্রমিকের শরীর থেকে তার শ্রম-সময় বিচ্ছিন্ন করে ফেলে তেমনই জাতিরাষ্ট্র দুনিয়া থেকে ভাববাদী কায়দায় বিচ্ছিন্ন হওয়ার নামান্তর। ফলে কমিউনিস্টদের অপরিক্কতার জন্য বুর্জোয়া দেশপ্রেমিক বুদ্ধিজীবীদের জন্য দুনিয়ার শ্রমজীবীদের তাদের শ্রমভিত্তিক জাতীয়তাবোধে একটি প্রলেতারিয়েত জাতিতে গড়ে না তোলে তাদের মুসলিম শ্রমিক, খ্রিস্টান শ্রমিক, হিন্দু শ্রমিক, বাঙালি শ্রমিক, ইংরেজ শ্রমিক, বর্মী শ্রমিক, জাপানী শ্রমিক, নারী শ্রমিক, পুরুষ শ্রমিক ইত্যাদি পরিচয়ে বুর্জোয়া জাতিরাষ্ট্রে তাদের নাগরিকত্ব দেয়া হয়। যার সবটুকুই মার্কসবাদ পরিপন্থী।

ফলে শ্রমজীবী মানুষের যে আন্দোলন, সংগ্রাম মার্কস-এঙ্গেলস শুরু করেছিলেন; তা পথভ্রষ্ট হল। শ্রমিকরা আজ বুর্জোয়া রাষ্ট্রে তাদের একটা বিচ্ছিন্ন পরিচয় পেয়েছে। বুর্জোয়া স্বাধীন রাষ্ট্রগুলিকে তাদের রাষ্ট্র ভাবতে শিখেছে। বাস্তবে শ্রমজীবীদের যে আসলেই রাষ্ট্র নেই; তারা ভাবতে পারে না। বুর্জোয়া পার্লামেন্টারি আইন-কানুনকেই তাদের মুক্তির সনদপত্র ভাবছে। ফলে কমিউনিস্ট আন্দোলনের যে ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে মার্কসীয় ইশতেহার রচিত: তাও আধুনিক কমিউনিস্টরা অকার্যকর করে তোলেছে। তারা বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক বিকাশের রাজনৈতিক লাইন নিয়ে বুর্জোয়া পার্লামেন্টে শ্রমিক মুক্তির দিবা স্বপ্নে বিভোর। শ্রমজীবীর দেশ নেই, শ্রমভিত্তিক জাতীয়তাবোধে প্রলেতারিয়েত কে জাতি হিসেবে গড়ে তোলার কার্ল মার্কসের যে আহবান তাকে হাস্যক করে ফেলেছে। তারা আজ নতুন নতুন অঞ্চলভিত্তিক ব্যাখ্যা তৈরি করছে। অগ্রসর দেশগুলিতে মোটের উপর একই হলেও ভিন্ন ভিন্ন দেশে ব্যবস্থা বিভিন্ন রকম হতে পারে কার্ল মার্কস তা অস্বীকার করেননি। তবে তা স্থানগত, ধর্মগত, ভাষাগত, বর্ণগত জাতীয়তা আদর্শে নয় বরং হতে হবে শ্রমভিত্তিক জাতীয়তাবাদী আদর্শের আলোকে।

কমরেড, আন্তর্জাতিকবাদ মূলত বুর্জোয়া জাতিগুলির একটা বিশ্ব সংগঠন। এই আন্তর্জাতিকতা কখনো শ্রমজীবীদের জাতীয়তাবোধে উদ্বুদ্ধ নয় বুর্জোয়া জাতিরাষ্ট্র গুলির সমন্বয়ক মাত্র। তাই আজ পুঁজিবাদী বিশ্বে দাঁড়িয়ে আমাদের আবার ভাবতে হবে কমিউনিস্ট ইশতেহার এখনো প্রাসঙ্গিক। অবৈজ্ঞানিক স্বদেশীয় সমাজতন্ত্রের এই বুর্জোয়া ধারা থেকে শ্রমজীবীদের মুক্তির “বিশ্ব শ্রমজীবী মানুষদের সমিতি” তৈরি কাজ শুরু করতে হবে।

শেয়ার করুন
  • 9
    Shares

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *