সুত্রপাত / ইতিহাস / একুশের চেতনা এখন আর খুঁজে পাই না

একুশের চেতনা এখন আর খুঁজে পাই না

শহীদুল্লাহ শহীদ:

১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমে যে স্বাধীনতার বীজ বপন ছিল সেটি কারো অস্বীকার করার ক্ষমতা নেই।  যে ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমে আমরা একটি দেশ ও স্বাধীন ভাষা পেয়েছি।  বাংলা ভাষার প্রতিটি বর্ণেই রয়েছে রক্তের ইতিহাস। যে বর্ণ পেতে আমাদের কম কষ্ট করতে হয়নি। বুকের তাজা রক্ত দিয়েছি। পৃথিবীতে এমন কোন দেশ নেই যারা ভাষার জন্য জীবন দিয়েছে।  সালাম, রফিক, জব্বার এদের রক্তের বিনিময়ে আজ আমরা মায়ের ভাষায় কথা বলছি, মত প্রকাশ করছি। এখন কথা হলো যাদের রক্তের আমরা মায়ের ভাষায় কথা বলছি তাদের কতটুকু সম্মান করছি বা করতে পেরেছি। যখন দেখি ভাষা শহীদদের পরিবারের সদস্য অর্থ কষ্টে দিন যাপন করে তখনি মনে হয় আমরা তাদের যথার্থ সম্মানটুকু দিতে পারিনি।

যখনি দেখি ভাষা শহীদদের পরিবারের কেউ অন্যের বাড়িতে কাজ করে তখনি বুঝতে পারি আমরা তাদের কত কদর করি।অনেক ভাষা সৈনিক এখনো জীবিত রয়েছে তাদের কি আমরা সম্মান দেখাতে পারছি ? এ প্রশ্নগুলি যখন মাথার ভিতর আসে তখন কেমন একটা খারাপ লাগা তৈরি হয়। এ দেশের অধিকাংশ ছাত্ররা এখনো আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা কি সেটি জানে না।জানবেই বা কেমন করে ? ভাষা আন্দোলন নিয়ে তো এখন আর তেমন মাতামাতি হয় না। পাঠ্যবইতে যেটুকু ছিল এখন সেটুকু পর্যন্ত নেই, তাই ছাত্রদেরও জানার আগ্রহ কমে গেছে। ১৯৫২ এর পর যে হারে স্কুল, কলেজে শহিদ মিনার নির্মাণ করার কথা ছিল আমরা সেটুটু নির্মাণ করতে পারিনি। আর তখনকার সময়ে যে শহীদ মিনারগুলি নির্মিত ছিল সেগুলিও এখন ভেঙ্গে পড়ার মতন অবস্থা। এখনো অনেক উপজেলা বা শহরেই শহীদ মিনার নেই।

যা আছে তাও অযত্ন অবহেলাতে পড়ে থাকে সারা বছর। ২১ ফেব্রুয়ারি আসলে তা ঘষামুছার কাজ করে চকচকে করে ফেলি বাকি সারা বছর আমাদের আর কোন খবর থাকে না। ৯০ দশকের দিকে ভাষা শহীদদের শ্রদ্ধা জানানোর জন্য বিশাল আয়োজন চলত। সামাজিক, রাজনৈতিক, ছাত্র সংগঠনের নেতারা বা বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার লোক ভোরে প্রভাত ফেরিতে যেত। তখন আবার ২১ শের চেতনা জাগ্রত হত। অনেকে রাতে না ঘুমিয়ে সারারাত ফুলের রিং তৈরি করতো। সে রিং নিয়ে খুব ভোরে নগ্ন পায়ে কয়েক ঘন্টা লাইনে দাঁড়িয়ে শহীদ বেদিতে পুষ্পমাল্য অর্পণ করতো । সারা রাত না ঘুমানোর অসার্থকতা যেন আকাশ ছোয়ার মত মনে হত। আজকাল এসব আর চোখে পড়েনা। আগেরকার সে জৌলস আর দেখিনা। এখন অনেকে দায়সারা ভাবে শহীদ মিনারে যায়। কেউ কেউ আবার দলের পদবী বাঁচাতে শহিদ মিনারে যায়।

আবার অনেক নেতাকে দেখি যারা জুতা পায়ে দিয়েও শহীদ বেদিতে পুষ্পমাল্য দেয়। এক সময় মৌলভীরা প্রকাশ্য ফতুয়া দিত শহীদ মিনারে ফুল না দিতে। এসব উগ্র সাম্প্রদায়িক গোষ্টি আজকে অনেকটা সফল। কারন এখন আর আমাদের যুব সমাজ শহীদ মিনারে যায় না। শহীদদের শ্রদ্ধা জানানোকে বেদাত মনে করে। অনেক তরুণ আবার শহীদ মিনারে যায় ছবি তুলতে। ছবি ফেসবুকে আপলোড দিয়ে নিজেকে পাক্কা বাঙালি দাবি করে।

যদি এভাবে চলতে থাকে তাহলে আগামীতে শহীদ দিবস বা ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস আমরা ভুলতে বসব। যদি আমরা আবার ফিরে যেতে পারি আমাদের আগের জৌলসে তবেই ভাষা আন্দোলনের চেতনা জাগ্রত হবে। তা না হলে ভাষা আন্দোলনের প্রকৃত ইতিহাস কালের গর্ভে হারিয়ে যাবে। তাই আসুন আমরা আরেকবার ঘুরে দাড়াই। বায়ান্নের চেতনা নিয়ে সামনে এগিয়ে যাই।

জয় বাংলা।

লেখক: সাবেক সভাপতি, বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন, কক্সবাজার জেলা সংসদ।

শেয়ার করুন
error: Content is protected !!