সর্বশেষ সংযুক্তি
সুত্রপাত / চিন্তা ও দর্শন / এই ফাগুণেই আমরা হয়তো দ্বিগুণ হবো

এই ফাগুণেই আমরা হয়তো দ্বিগুণ হবো

মাসকাওয়াথ আহসান:

“বি হিউমেন ফার্স্ট” নামের অনলাইন মিছিলে যোগ দিতে দিতে মানবিকতা ব্যাপারটা কী সে সম্পর্কে নিশ্চিত হতে চেষ্টা করছিলাম। দেশে দেশে  মানুষ যখন মানবিক ঐক্যের জন্য প্রকৃতির দেয়া শিক্ষা ভুলে; নানারকম বিভাজনের জনমনোরঞ্জক কালো-জাদুকরের ইশারার দিকে ছুটছে; ব্যক্তিগত জীবনে ভিন্নমত নাকচ করে দিয়ে কট্টর মনোভাব পোষণ করছে; তখন আবার মানবিক সম্মিলনীর পরিবেশ কী করে ফিরে আসবে; এই দুঃশ্চিন্তা মন খারাপের হাওয়া হয়ে দোল দেয়।

মানুষের পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধই মানবিক গুণের প্রধান উপাদান। এই শ্রদ্ধাবোধ কিংবা ভিন্নমতের প্রতি শ্রদ্ধা দেখানোর মতো ঔদার্য্য আজ বিরল। আংশিক ও চয়িত ন্যায়বিচারের জন্য সক্রিয় থেকে সামগ্রিক ন্যায়বিচারের ক্ষমতা হারিয়ে ফেলছে সমসাময়িক সমাজ।

দক্ষিণ এশিয়ায় সভ্যতা বিকাশের আদি থেকেই তীব্র সামাজিক শ্রেণীবিভাগ থাকায়; বিপুল সংখ্যক মানুষ দারিদ্র্য আর অশিক্ষার মাঝে বসবাস করায়; অস্তিত্বের লড়াই ছাড়া আর কোন বুদ্ধিবৃত্তিক দিক বিকশিত হয়নি। এখানে ধর্ম মানুষের একমাত্র চিন্তার ক্ষেত্র হয়ে রয়ে গেছে। ধর্মের নৈতিকতার দিকগুলো আত্মস্থ করার পরিবর্তে ধর্মের নামে জোট বেঁধে অন্য ধর্মের মানুষের কাছ থেকে কেড়েছিঁড়ে খাওয়ার অমানবিক জনপদ দক্ষিণ এশিয়া।

ধর্ম-যুদ্ধে কেড়ে ছিঁড়ে খাওয়ার কুরুক্ষেত্রের নেতারা ও তাদের কাছের লোকেরাই নব্য এলিট বা উচ্চবর্ণের মানুষ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। এরা নিজেদের ছেলে-মেয়েদের আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত করেছে। আর ধর্ম-যুদ্ধে ব্যবহৃত অধিকার-বঞ্চিত শিশুদের বঞ্চিত করেছে সমসাময়িক ও জীবনোপযোগী শিক্ষা থেকে। এতে করে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে ধর্মীয় অনুভূতির অবোধ, আত্মঘাতী ও অযৌক্তিক প্রবণতাকে লালন করা হয়েছে বিভাজন ও যুদ্ধের উপাদান হিসেবে ব্যবহারের জন্য।

দক্ষিণ এশিয়ায় কোন আদর্শিক রাজনীতির বিকাশ আমরা দেখতে পাইনা। আদর্শের অনেক গালভরা শ্লোগান, বক্তৃতা শোনা গেলেও শেষ পর্যন্ত তা মনের মধ্যে সংগুপ্ত ধর্মীয় অনুভূতির জিঘাংসা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ধর্ম-সঞ্জাত নৈতিকতার গুণগুলো নিয়ে প্রত্যন্তের শান্তিপ্রিয় বাউল, বৈরাগী, সূফিরা যখন শান্তিপূর্ণ-সহাবস্থানের জন্য মানবিক জয়গান করতে চেয়েছেন; তখনই তাদের ওপর সশস্ত্র চড়াও হয়েছে শাসক ও শোষক কাঠামোর লেলিয়ে দেয়া পালিত কট্টরপন্থীরা। কারণ দক্ষিণ এশিয়ায় ঘৃণার ভিত্তিতে মানুষের বিভাজনের ব্যবসাটা টিকিয়ে রাখতে গেলে কথিত ছদ্মরাজনীতিক (ঘৃণা-ব্যবসায়ী)-দের মাঝে মাঝে মাটির ওপর খড়ি দিয়ে বিভাজন দাগ এঁকে অবোধ জনতাকে বোঝাতে হয়, এটা আমরা আর ওটা ওরা। আমাদের অস্তিত্বের জন্য ওদের নিশ্চিহ্ন করতে হবে।

দক্ষিণ এশিয়ার সমস্যা হচ্ছে এই জনপদের মানুষের কালচারাল জিন বা সাংস্কৃতিক বংশগতিতে শাসক ও উচ্চবর্ণের মানুষদের প্রতি ভক্তি-শ্রদ্ধা জানিয়ে অধিকার বঞ্চিত মানুষকে বেঁচে থাকতে হয়েছে। সত্যিকারের পরিশ্রম করে এখানে কেউ জীবনে উন্নতি করে না; এখানে সবসময় শাসকগোষ্ঠীর কোলাবরেটর বা দালাল হয়ে ধন-সম্পদ অর্জন করতে হয়েছে। ফলে কালচারাল জিনে মানুষের মুক্তির চেতনার চেয়ে রাজাকার-স্তাবক চেতনাই বেশী বিকশিত হয়েছে।

ফলে হাজার বছরের চাকরস্য চাকর মনোবৃত্তি থেকে বেরিয়ে আসা দক্ষিণ এশিয়ার মানুষের পক্ষে প্রায় অসম্ভব। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো পৃথিবীর সর্বোচ্চ দাস রপ্তানীকারক। আবার চাকরস্য চাকর মনোবৃত্তির হীনমন্যতা লুকাতে দক্ষিণ এশিয়ার মানুষের মনের মধ্যে চট করে প্রভু সাজার একরকম নরভোজি রোগ  রয়ে গেছে। দেশের মানুষকে দাস হিসেবে বিদেশে পাঠিয়ে বা দেশে কৃষক-শ্রমিক-মেহনতী মানুষকে হীরক খনির  নির্যাতিত সাব-হিউম্যান বা উপমানব করে রেখে শাসক শ্রেণী হীরার মালা গলায় দিয়ে উন্নয়নের রূপকথার গল্প শুনিয়ে মানুষ খায়-জীবন বিকাশের সম্ভাবনাগুলোকে  হজম করে ফেলে।

এই অমানবিক দক্ষিণ এশিয়ায় মানবিকতার জয়গান তাই ইউটোপিয়া বা কষ্ট-কল্পনার মতো শোনায়। এইখানে গলায় হারমোনিয়াম ঝুলিয়ে এককালে গান গেয়ে ফেরা উদারপন্থী থেকে তরবারি-ত্রিশূল হাতে ধর্ম-যুদ্ধ করা কট্টরপন্থী; সবাই ধীরে ধীরে নানা-আঙ্গিকে ধর্ম নিয়ে ব্যবসা করা ঘৃণাজীবীদের ধামাধরা হয়। রাতারাতি ভোল পালটে ফেলার ক্ষেত্রে জুড়ি নেই দক্ষিণ এশিয়দের। এখানে দল-মত-বিশ্বাস নির্বিশেষে সাধুবাবা-পীর-রাজনৈতিক নেতা আর তাদের ভক্তদের দেহভঙ্গি-মনোভঙ্গি-ঘৃণাপ্রকাশের ভাষা একই।

দক্ষিণ এশিয়ার তরুণ-তরুণীদের মাঝ থেকে যদি চাকরস্য-চাকর মনোবৃত্তি; কারো ধামাধরা রাজাকার-কোলাবরেটর হবার উদগ্র বাসনাগুলোকে দূর করা যায়; রাজনৈতিক-ধর্মীয়-উন্নয়ন সংস্থার ধান্দার লোভ কমানো যায়; গরীব ছিলাম বলে রাজাকার হয়ে দ্রুত ধনী হতে হবে দরিদ্রকে আরো দরিদ্র করে-এই আত্মকেন্দ্রিক তৃষ্ণা কমানো যায়; তবেই কেবল মানবিক ও সভ্য সমাজ সৃজনের স্বপ্ন দেখা যায়; সাম্য ও শুভ ভাবনার সমাজ গড়া সম্ভব।

মানুষকে শুধুই মানুষ হিসেবে ভালোবাসলে ক্ষতি কী! সেকী মুসলমান-নাকি হিন্দু-নাকি বৌদ্ধ-নাকি খৃস্টান- নাকি অবিশ্বাসী- গোত্র জাতীয়তাবাদী-  নাকি আদিবাসী; সে ধনী কিংবা গরীব কীনা; সে ফর্সা বা শ্যামল কীনা এসব প্রশ্ন মনে উঁকি দেয়াই অমানবিকতা।  সে আমার মত ভাবছে না বলেই তাকে হত্যা করতে হবে; বা আইনের কালো ধারা ব্যবহার করে উইচহান্টিং-এতো কোন মানুষের বৈশিষ্ট্য হতে পারে না।

ভিন্ন বিশ্বাস-অভিমত বা আত্মপরিচয়ের জন্য মানুষ খুন করলে; কিংবা মানুষকে কারাগারে পাঠালে একসময় জনপদ মানুষ শূণ্য হয়ে পড়ে। তখন জনপদজুড়ে চলে দানবের উল্লাস; জনমনোরঞ্জনের অশ্লীল কোলাহল; নরভোজের নিষ্ঠুর গন্ধে জনপদের আত্মা বিপন্ন হয়। সেই বিপন্ন বাস্তবতায় দাঁড়িয়েই আমরা ঘুরে দাঁড়াতে চাই; আমাদের ভালোবাসা আর অহিংসার শক্তিকে খাটো করে দেখার সুযোগ নেই।

কে জানে এই ফাগুণেই আমরা হয়তো দ্বিগুণ হবো।

লেখক: প্রধান সম্পাদক, ই-সাউথ এশিয়া।

শেয়ার করুন
  • 60
    Shares