সর্বশেষ সংযুক্তি
সুত্রপাত / নারী / এই ধর্ষণকামী রাষ্ট্রব্যবস্থার পরিবর্তন চাই

এই ধর্ষণকামী রাষ্ট্রব্যবস্থার পরিবর্তন চাই

লাবণী মন্ডলঃ

চারদিকে নির্বাচনী হাওয়া। কয়লা চুরি, স্বর্ণ চুরি কোনোকিছুই নির্বাচনী হাওয়ায় প্রভাব ফেলতে পারছে না। আর তো সামান্য শিক্ষার্থীদের মৃত্যু, ১০ বছরের শিশু কন্যা ধর্ষণ! হাস্যকরই বটে! কেউ কেউ তো মিটিমিটি হাসছে- আরে মরছে তো ত্রিপুরা কন্যা তাতে এমন কি আর হয়েছে বলে স্বস্তির নিশ্বাসও ফেলছে! কেউ তো রীতিমতো গবেষণায় নেমেছে মেয়েটির পোশাক ঠিক ছিল কিনা! হুম! খারাপ শুনালেও এ কথাগুলোই ঠিক। আর শিক্ষার্থী দের মৃত্যু ও তো নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা। এত এত জনসংখ্যার মধ্যে এরকম দু’চারজন মরলেও রাষ্ট্রের কিছু যায় আসার কথা কি- বলুন!

খাগড়াছড়ির প্রাকৃতিক পরিবেশ আমাদেরকে মুগ্ধ করে। আহা! বেঁচে থাকার প্রেরণা দেয়! জীবন সুন্দর, বাংলাদেশ সুন্দর, পৃথিবী সুন্দর বলে স্বস্তির নিঃশ্বাসও ছাড়ি। কিন্তু, ওই ত্রিপুরা শিশুটির জন্য মানবতাবোধ জেগে ওঠে না, প্রতিবাদে, প্রতিরোধের আগুন জ¦লে ওঠে না- বিদ্রোহ জেগে ওঠে না! এই শ্রেণীবিভক্ত সমাজেই এগুলো যেন খুব স্বাভাবিক!

তবুও বলছি! কৃর্তিকা ত্রিপুরা পূর্ণা। মাত্র ১০ বছরের শিশু। যার ভিতরে যৌনআকাঙ্ক্ষা জন্ম নেয়নি। ওকে ধর্ষণ করার জন্য ওর শরীরের স্তন, যৌনাঙ্গ, নিতম্বও প্রস্তুত হয়নি। ওগুলো খুবই অপরিপক্ক ছিল। কিন্তু এটা যে ধর্ষকামী রাষ্ট্র! এই রাষ্ট্রই আবার একাত্তরের ধর্ষণের গল্প শোনায়, ইতিহাস শোনায়! এই রাষ্ট্রটাই যেখানে ধর্ষকামী চিন্তা পোষণ করে সেখানে ধর্ষণ করার জন্য ধর্ষণের উপযুক্ত হওয়ার প্রয়োজন আছে কী! ত্রিপুরা, গারো, খ্রিস্টান, মুসলিম, হিন্দু কেউ তো আর রেহাই পাচ্ছে না এই ধর্ষকামী রাষ্ট্রব্যবস্থার ভয়ালথাবা থেকে।

খাগড়াছড়ির দীঘিনালা উপজেলার এ ঘটনাটি ঘটেছে শনিবার। এই শিশুটি টিফিনের খাবার খেতে বাড়িতে যান তার মা তখন জুম চাষের কাজে ব্যস্ত ছিলেন। জীবনসংগ্রামে যুক্ত ছিলেন। আর মেয়েটি তো চতুর্থশ্রেণীর ছাত্রী। প্রতিদিনকার মতো ওইদিনও তার বাড়ি ফেরার কথা কিন্তু না ফেরছিল না। রাত এগারোটায় শিশুটিকে বাড়ির পাশে ছড়ার জঙ্গলে পাওয়া যায়। তার দুটি হাত ভেঙ্গে দেওয়া হয়, তার যৌনাঙ্গসহ সারা শরীরে আঘাতের চিহ্ন। যৌনাঙ্গ কেটে ক্ষত বিক্ষত করা হয়েছে, পায়ুপথে গাছের গুড়ি ঢুকিয়ে দেয়া হয়েছে। শিশুটিকে ধর্ষণ করেই তো থেমে যায়নি ওই নরপশুরা। শিশুটিকে খুবলে খুবলে খাওয়ার বাসনাও জেগেছিল ওদের পশুচরিত্রে।

পূর্ণার জন্য কোনো আফসোস, কোনো হতাশা জাগছে না আমার চেতনা। শুধু ক্ষোভ আর ক্ষোভ। এই রাষ্ট্রব্যবস্থার উপর ঘৃণা তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে। এই পূর্ণারা আমাদেরকে বিদ্রোহী করে তোলার জন্য কতটুকু অবদান রাখছে সেটা আজ বড়ই প্রশ্ন! নাকি পূর্ণারা ধর্ষণ হয়েই যাবে, আমরা আবারও স্বাভাবিক হয়ে যাবো! আবার কোনো নতুন ইস্যুৎ, নতুন চিন্তায় মগ্ন থাকবো। খাগড়াছড়িতে গিয়ে লাইভ দিবো, হরেকরকমের ছবি দেওয়াতে ব্যস্ত থাকবো! আমাদের পক্ষে সবই সম্ভব হয়ে যাচ্ছে! আমাদের চিন্তাশক্তি ভয়ংকরভাবে এই ধর্ষকামী রাষ্ট্রব্যবস্থা গ্রাস করেছে। তা নাহলে, প্রতিবাদ কই? প্রতিরোধ কই? অগ্নিমশাল জ¦লছে কই?

হ্যাঁ, সমাজতন্ত্র হলে আমাদের অনেক সমস্যার সমাধান হবে। তার মানে বর্তমানে যে সমস্যাগুলো সেগুলো নিয়ে ন্যূনতম প্রতিবাদটুকু কই? মানুষের প্রতি মানুষের যে ন্যূনতম দায়িত্ব তার প্রকাশ কই? নাকি, এই ভেবে বসে আছি ‘আমার তো কিছু হয়নি, আমার সন্তান তো নিরাপদেই আছে’… এটা ভেবে বসে থাকলে ভয়ংকর ভুল হবে। আমি/আপনি কেউ তো নিরাপদে নেই এই ধর্ষকামী রাষ্ট্রব্যবস্থার থাবা থেকে।
পূর্ণাকে নিয়ে বিস্তর লেখা, বিস্তর বিবরণ দেওয়ার শক্তি আমার নেই। আমি অত বড় রাজনৈতিক ব্যক্তিও হয়নি। সবকিছুকে স্বাভাবিক দেখার শক্তিও নেই। এসব ঘটবে বলে নিজেকে সান্ত্বনা দিতে পারছি না। অস্থির হচ্ছি, বড় অস্থির। মানসিকভাবে ভেঙ্গে পড়ছি। মানসিক আঘাতটা চরম থেকে চরম হচ্ছে। সমাজের এত এত ঘটনা নিয়ে ভাবতে গেলে নির্ঘাত পাগল হয়ে যাবো! কিছুই কি করার নেই আমাদের? এই বাংলাদেশে, হ্যাঁ এই বাংলাদেশে- কোনো মানুষই কি আজ নিরাপদে আছে? শিশু, নারী কেউ কি নিরাপদে আছে?

তবুও কেন ফুসে উঠছি না আমরা, আমাদের মেরুদণ্ড কোথায় আটকে আছে! আমাদের চিন্তাশক্তি কারো কাছে কি বর্গা দেওয়া! পূর্ণার জন্য, পূর্ণাদের জন্য আমাদের আর্তনাদের ধ্বনি এত ঠুনকো কেন? এই আর্তনাদ কেন ওই বধির রাষ্ট্রের কানে পৌঁছছে না? ওই বঙ্গভবনে পৌঁছানো জরুরী নয় কী! নারীবান্ধব প্রধানমন্ত্রীর কানে পৌঁছানো জরুরী নয় কি! এই দায়িত্ব নেওয়াটা কি আমাদেরই উচিত না! আমরা তবে কেন বেঁচে আছি! কেন পরিবর্তনের কথা বলে মুখে ফেনা তুলছি! আমাদের কাজটা কি! হাজারো প্রশ্নে নিজেকেই জর্জরিত করছি। ভাববেন না কাউকে হেয় করছি- নিজেকে নিজে প্রশ্ন করছি। যে প্রশ্নগুলো আপনি/আপনারাও নিজেকে করতে পারেন। যত প্রশ্ন জাগবে ততই মানুষ প্রতিবাদী হবে। পূর্ণাদের বসবাসযোগ্য বাংলাদেশ, পূর্ণাদের বসবাসযোগ্য পৃথিবী গড়ে তোলার ভিত শক্ত হবে।

বারবার পূর্ণার মা-বাবার মুখটি আমার চেতনাকে আঘাত করছে। তারা নিজেদেরকে কি বলে সান্ত¦না দিবে! একী নৃশংস চিত্র চারদিকে! পাহাড়-সমতলে কোথাও আজ শান্তি নেই। চরম ফ্যাসিবাদী আমলে পেটের বাচ্চাটি পর্যন্ত রক্ষা পাচ্ছে না! তারপরও আমরা এই ধর্ষকামী রাষ্ট্রব্যবস্থা নিয়ে কোনো আওয়াজ করবো না! এই ভোগবাদী, পুঁজিতান্ত্রিক, পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থাকে আঘাত করার মতো কোনো কাজ করবো না। সহি দেশপ্রেমিক, সহি জাতীয়তাবাদী, সহি নারীবাদী, সহি কমিউনিস্ট হয়ে দিব্যি নাক ডেকে ঘুমাবো। বাহ্! চমৎকার! চমৎকার! চমৎকার!

এই শূয়োরের রাষ্ট্রের কোনো কিছুই আর আমাকে টানে না। শূয়োর রাষ্ট্রের সংবিধান মানি না, মানতে চাই না। যে সংবিধান মানুষের ন্যূনতম নিরাপত্তা দিতে পারে না- সে সংবিধান আমার হতে পারে না! যে সংবিধান পূর্ণাদের জন্য নয় সে সংবিধান আমারও নয়! যে নারীবান্ধব সরকার নারীর নিরাপত্তাটুকুই দিতে পারে না- সে সরকার আমার হতে পারে না! এরকম নারীবান্ধব সরকার আমার দরকার নেই!

পূর্ণা তুই বেঁচে গেছিস! তুই আর একটু বড় হলে অর্থাৎ তোর বয়স ১৩-১৫ হলে তোর টান টান স্তন দুটো ছিড়ে খেত, তোর যৌনাঙ্গ কামড়িয়ে খেত। তুই মরে বেঁচে গেছিস! তোর তো কোনো চিন্তা নেই! তোর মৃত্যুতে আমাদেরও কিছু যায় আসছে না বুঝছিস! আমরা দিব্যি ঘুমুচ্ছি, খাচ্ছি, আনন্দ করছি! পূর্ণা তোর কাছে ক্ষমা চাওয়ার মতো শক্তিও আমার নেই, শুধু ভাবছি আমার উপর এরকম ভয়ালথাবা কবে/কখন পরবে…

এই রাষ্ট্রব্যবস্থাকে ঘৃণা করি, এই ধর্ষণকামী রাষ্ট্রব্যবস্থার পরিবর্তন চাই।

শেয়ার করুন
  • 339
    Shares

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!