সর্বশেষ সংযুক্তি
সুত্রপাত / ইতিহাস / আমার সাংবাদিকতা ও পেছনের প্রেরণা ।। সাহিদা সাম্য লীনা

আমার সাংবাদিকতা ও পেছনের প্রেরণা ।। সাহিদা সাম্য লীনা

সাহিদা সাম্য লীনা:
কিছুদিন আগে জানতে পারলাম বাংলাদেশ নারী সাংবাদিক কল্যাণ কেন্দ্রের উদ্যোগে চট্টগ্রাম বিভাগের নারী সাংবাদিকদের নিয়ে একটি ওয়ার্কশোপ হবে কক্সবাজারে। ফেনী জেলা থেকে আমিও শেষ পর্যন্ত যাবার সুযোগ পাই। কেননা আমার নামটি প্রথমে আসেনি যে কোন কারণে ।অথচ আমি কাজ করছি ফেনী সদরেই মূল স্পটে। যাই হোক নারী সাংবাদিক ফ্রিল্যান্স হলেও খুঁজতে আমাকেও জানানো হলো আরো একজন। যেহেতু নারী সাংবাদিক নেই এখানে। জানি অনেকে লেখালেখি করে। তাদের মধ্য থেকে কয়েকজনকে ইনভাইট করি। তাদের মতামত শুনে হতবাক না হয়ে পারিনি।আমার শহরের নারীদের এই মনোভাবে রীতিমতো বিস্ময় হয়েছি। আসলে আমরা এখনো পিছিয়ে এই কথাটা আমাকে কষ্ট দিলো। আজ এই লেখা তাদের এই অনিহার পিছনের সারমর্ম নিয়ে আর আমার সাংবাদিক হয়ে গড়ে উঠার স্পৃহার ও পেছনের প্রেরণাকে নিয়ে । যা আমি এখনো তিলে তিলে শিখছি।কোন লোভ, কোন পেশা আমাকে আকৃষ্ট করেনি যা এই সাংবাদিকতা পেশা আমাকে ডুবে রেখেছে। এই ডুবটাতে থাকতে চাই আমরণ।

একবার এক অনুষ্ঠানে আমাদের ফেনীর এমপি নিজাম হাজারী বলেছিলেন ফেনীতে নারী সাংবাদিকের সংখ্যা বাড়াচ্ছেন না কেন? আমি উনাকে উত্তরে যা বলেছি তিনি সহ উপস্থিত আরো অতিথীরা অবাক হয়েছেন। আমার তখন মনে হয়েছে অকপটে আমার নির্লজ্জ সত্য কথাটা শুনে ফেনীবাসি হিসাবে লজ্জিত হয়েছেন। মনে মনে ভাবছিলাম আমি কি ভুল করেছি কথাটা বলে ? তবে, তারা বুঝেছেন আমি আসল বাস্তবতা খুলে দিয়েছি। এমপি সাহেব হাসিমুখে আমাকে জিইয়ে থাকার উৎসাহ দিয়েছেন ও বলেছেন তারপরও চেষ্টা করেন নারীদের এই পেশায় আনতে। এর আগেও আমি দোকলা হতে অর্থাৎ নারী সাংবাদিক সহযোদ্ধা তৈরিতে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। সেদিনের পর থেকে আমি চেষ্টা করেছি আরো নারী সাংবাদিক কাউকে তৈরির। এখনো করছি।

জেলা সদরে এটার অপ্রতুলতা আমাকে ভাবিয়েছে। ছাগলনাইয়া উপজেলা থেকে একসময় বকুল আকতার দরিয়া কাজ করেছেন। এখন তিনি বেশীরভাগ সময়ে অসুস্থ থাকেন। উনার ভাষ্যমতে, দীর্ঘদিন থেকেও এই পেশা তাকে দিতে পারেনি বেঁচে থাকার কোন অবলম্বন। গতকাল যখন আবার প্রখ্যাত সাংবাদিক এবিএম মুসার মেয়ে ও বাংলাদেশ নারী কল্যাণ কেন্দ্রের সভাপতি পারভীন সুলতানা ঝুমা ম্যাডাম প্রশ্ন করেন আচ্ছা আমাদের ফেনীর এ অবস্থা কেন? নারী সাংবাদিক সংখ্যা কম কেন? ম্যাডামের আহ্বানে গত কয়েকদিনের বৃথা চেষ্টা করেছি মনে হচ্ছে। একজন নারী লেখককে অন্তত ফেনীর জন্য প্রতিনিধিত্ব করতে চেষ্টা করেছি। আমার চেষ্টা সব পানিতে গেছে। কয়েকজন নারী লেখক ভেবেছে তাকে জোর করে সাংবাদিক বানানো হচ্ছে বা আমার কোন সাফল্য চলে আসবে তাদের উপস্থিতির কারণে। মনে তাদের নানা শংকা, দ্বিধা, সন্দেহ। কেউকে ঘন্টার পর ঘন্টা বুঝিয়েও বোঝাতে পারিনি একটা ট্রেনিং এ যাওয়া মানে আপনি সাংবাদিক হবেন না।

একজন লেখক হিসাবে অংশ নিবেন। নতুন অভিজ্ঞতা হবে। অনেকের সাথে পরিচয় হবে। লেখক হিসাবে আপনার পরিচিতি আসবে। ফেনীকে আপনি তুলে ধরবেন। আপনার সাহস আসবে। আপনি আরো সমৃদ্ধ হবার পথ খুঁজে নিতে পারবেন। কিন্তু তাদের একটাই উত্তর অতোদূর যাবোনা। সাংবাদিকের কোন অনুষ্ঠানে যাবোনা। সাংবাদিক হবার কোন ইচ্ছাই নাই। কবি ,সাহিত্যিকের অনুষ্ঠান হলে যেতাম। হাসবো না কাঁদবো ভুলে গেছিলাম। বুঝলাম ,এরা এখনো কুসংস্কারে আবদ্ধ। একটা গন্ডিতে এদের জীবন এরা সীমাবদ্ধ রেখেছে। আধুনিক হয়েছে পোশাকে আর মুখের আঞ্চলিকতাকে পর করেছে, হয়েছে হ্যাডম দেখাতে শুদ্ধ! আর ভারতী জি টিভি চ্যানেলগুলো দেখে অন্যের বিরুদ্ধে কেমনে ইর্ষা করতে হয় তা শিখেছে। উদার হতে পারেনি। উন্নত মস্তিষ্কে আলোর শিখা দেখার চেষ্টা এরা স্বপ্নে ভাবে কি না জানিনা। তাও মনে হয়না। কেউ নাচ করতে, গান করতে , অভিনয় করতে ডাকলে এরা ছুটে যায়। পুরুষদের শিকলে এরা এখনো আবদ্ধ। এদের মেধা,এদের চাওয়া পাওয়াকে এখনো পুরুষের মতের কাছে জিন্মী রেখেছে। এরা একটা কথাকে হ্যাঁ বলবে বা না বলতে নানা ছলচাতুরীর আশ্রয় নিল দেখলাম। নানা টাল বাহানাতে কথাকে ঘুরায় ,প্যাঁচায় ! ফেনীর লেখক ও সাংবাদিক হিসাবে আমি কী ব্যর্থ? আমাকে তো কেউ পথ দেখায়নি !

আমি নিজে পথ চলেছি। কেউ আমাকে বলেনি সাংবাদিক হও, লেখ।একা চল। আমি সাংবাদিকতাকে পেশা হিসাবে নিয়েছি। এই পেশায় থেকেও আমার পারিবারিক ঐতিহ্য ও শিক্ষাতে কোন ব্যতয় ঘটেনি। আমার সংসার ও সন্তান মানুষেও আমি কোন বাধা পাচ্ছিনা এটা নির্দিধায় বলতে পারি। নারীদের এই পেশায় আগানোর জন্য, নারীদের সন্মাণ দিয়ে বলিষ্ঠ নেতৃত্ব ও কর্তৃত্ব চান বাংলাভিশনের ও বাংলা ট্রিবিউনের জেলা প্রতিনিধি রফিকুল ইসলাম। কিন্তু সে নারীরা কোথায় তিনিও ভাবেন; খুঁজেন ! আমার অস্তিত্ব ধরে রাখতে তিনি সদা ব্যস্ত। সুযোগ পেলেই তিনি উৎসাহের যত শব্দ আছে তিনি আমার পেছনে ব্যয় করেন। আমি গর্বিত আমি আমার শহর ফেনীতে যাদের উদ্দিপনায় ও যাদের সহযোগিতায় কাজ করছি তারা সবাই পুরুষ সহকর্মী ! আমি তাদের বোন। আমি তাদের বোন হতে পেরেছি। আমার সিনিয়র ,সমবয়সী,জুনিয়র সবাই আমাকে সাহস দেয়, সাহায্য করে সকল কাজে। আমি তাদের কাছে কৃতজ্ঞ। সমকালের স্টাপ রিপোর্টার শাহজালাল রতন নিজের হাতে কলমে আমাকে দীক্ষা দিয়েছেন। তিনিই এই সাংবাদিকতায় আমাকে বলবৎ করার মূল নির্দেশক । ভুলিনা ফেনীর সময় সম্পাদক ও নয়াদিগন্তের স্টাপরিপোরর্টার শাহাদাত হোসেন যিনি বিভিন্ন এঙ্গেলে আর্টিকেল লিখতে প্রেরণা দিয়েছেন।

নারী হিসাবে চলতে তিনি ভাবনায় থাকলেও আমার উপর আস্থা রেখেছেন যে আমি প্ররোচিত হবোনা পুরুষ চৈতন্যের হামলায়। এনটিভি জেলা প্রতিনিধি ওসমান হারুন দুলাল ও ভোরের কাগজের প্রতিনিধি শুকদেবনাথ তপন দুজনেই একযোগে আমার সব কন্টকীর্ণ পথে সব বাধাকে জলাঞ্জলী দিতে সদা উদ্ভুদ্ধ রেখেছেন। বিটিভি জেলা প্রতিনিধি শওকত মাহমুদ ভাই যিনি আমাকে এই পেশায় রপ্ত হতে বিভিন্ন ট্রেনিং করার সুযোগ করে দিয়েছেন। আমি কখনো এই পেশায় অর্থের কথা ভাবিনি। প্রয়োজনে নিজ খরচে পথ চলছি। শওকত ভাই এর কাছে জেনেছি ২০০৬/৭ – এ অনেক নারীকে ফেনীতে ট্রেনিং দিয়েছেন। তিনি এমএমসির হয়ে নারী সাংবাদিক তৈরিও করেছেন বেশ কয়েকজনকে। কিন্তু পরবর্তীতে দেখলেন তাদের মধ্যে কেউ ঢাকায় গেছেন অর্থ ইনকামে। কেননা জেলা শহরে টাকা কামানোর পথ নেই এই পেশায়। আবার কেউ গেছেন অন্য পেশায়। কেউ বিয়ে করে হয়েছেন পুরোদস্তুর গৃহিণী। আফসোস! আমার শহরের নারীগণ দুকলম লিখতে শিখেছে বটে একটা শাখায়। কবিতা বা গল্প। তবে, লেখক হয়ে এক সময় চ্যালেঞ্জিং পেশাটাতে জড়াতে কেউ ইচ্ছুক নন।

বর্তমান সরকার মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষে কাজ করা লোকদের নিয়ে আগ্রহ বেশী। যে দেশকে ভালবাসে সেই তো মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে। কোন সংগঠনে আবদ্ধ থেকে সংঘাত ও বিতর্ক সৃষ্টি, সমাজে বিশৃঙ্খলা আনা লোকদের নিয়ে সতর্ক থাকবে এটাই দায়িত্ব ও কঠোরতার স্বাভাবিকতার মধ্যে পড়ে। এরপরেও সাংবাদিকতা পেশায় অনেকে এখন মুখোশ পড়ে ঢুকার চেষ্টা করছে। ঢুকুন। সবারই নাগরিক অধিকার রয়েছে। তবে কোন বিতর্কিত সংগঠন থেকে নিজের অস্তিত্ব মুছে ফেলে চিরতরে আসুন। সাংবাদিকতার অর্থ কোন সংগঠন ও দলীয় মনোভাব নয়। এটা যেমন ঝুঁকির পেশা তেমনি আদর্শ নিয়ে সব মত দলের উর্দ্ধে থাকার এক সৃজনশীল পেশা।

লেখক: সাংবাদিক ।

 

 

শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!