আদিবাসী দিবসে স্বপ্নপূরণের গল্প হোক শুরু

মোমিন মেহেদীঃ

আদিবাসী জাতিসমূহের জীবনধারা উন্নয়ন নিশ্চিতকরণে নিবেদিত থাকে না কেউ, ছিলো না কেউ- কোন মহল। তবু বারবার অধিকার অধিকার বলে চিৎকার ওঠে আদিবাসীদের মধ্যে। বিশেষ করে গারো সমাজে জীবনমান উন্নয়ন আর সমাজের রীতির পরিবর্তনে নিরন্তর চেষ্টা চলছে ছাত্র-যুব-জনতার পক্ষ থেকে। মুসলিম, সনাতন, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান এমনকি ইহুদী ধর্মানুসারেও রয়েছে সন্তানদের মাঝে মা অথবা বাবার সম্পদ সমানভাগে ভাগে ভাগ করার বিষয়ভ কিন্তু এই গারো সমাজ জীবনে নির্মম রীতি প্রচলিত হচ্ছে হাজার বছর ধরে। আর তা হলো- কন্যা সন্তানরাই কেবল উত্তরাধিকারের ভাগিদার। তার উপর সবচেয়ে ছোট কন্যা পাবে সকল সম্পদ। এমন একটা উদ্ভবট নিয়মের উটের পিঠে উঠে বসে আছে গারো সমাজের জীবন ব্যবস্থা। যা সংস্কারের জন্য নতুন প্রজন্মের অনেক তরুণ ঐক্যবদ্ধ। তারা ‘জামাই’ বা ‘বউ’ যাওয়ার রীতি থেকে বেরিয়ে এসে সাধারণ জীবন যাপন করতে চায়। যা বাংলাদেশ সরকারের নিয়মানুসারে রয়েছে। সেক্ষেত্রে তারা খ্রিস্টান ধর্মের রীতিও মানতে রাজি। আর তারই ধারাবাহিকতায় তারা ৯ আগস্ট, আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবসে সোচ্চার হয় প্রতি বছর। আদিবাসীদের অধিকারের উন্নতি ও নিরাপত্তার জন্য প্রতিবছর এইদিনে দিবসটি পালিত হলেও দুখ আর পিছু ছাড়ে না বৈষম্য। তবু বারবার চেষ্টা চলবেই। কেণনা, মানবাধিকার উন্নয়ন ও সংরক্ষণ সাব-কমিশনের আদিবাসী জনগণ সম্পর্কিত কর্মদল তাদের প্রথম সভায় ১৯৯৪ সালে ৯ আগস্টকে আদিবাসী দিবস পালনের ঘোষণা করে। পাশাপাশি বিভিন্ন রাষ্ট্রকে তা পালনের আহ্বান জানায়।

জাতিসংঘের তথ্যানুসারে, বিশ্বের ৭০টি দেশে প্রায় ৩০ কোটি আদিবাসী রয়েছে। এদের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার ইন্ডিয়ান, অস্ট্রেলিয়ার ইনুইট বা এস্কিমোস, উত্তর ইউরোপের সামি, নিউজিল্যান্ডের মাওরি অন্যতম। মোট জনসংখ্যার ৬০ শতাংশ আদিবাসী আছে বলিভিয়ায়। পেরু ও গুয়াতেমালায় অর্ধেক লোকই আদিবাসী। চীন, মায়ানমারেও বহু আদিবাসী রয়েছে। ইতিহাস বলে যে, ১৯৯১ সালের আদমশুমারির হিসেব মতে বাংলাদেশে ১২ লাখ ৫ হাজার ৯৭৮ জন আদিবাসী রয়েছে। এক প্রতিবেদনে জানা যায়, বাংলাদেশে বর্তমানে ৪৫টি আদিবাসী বা ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী রয়েছে। জনসংখ্যায় এরা আনুমানকি ৩০ লাখেরও বেশি। আমাদের দেশে রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকৃতি না দিয়ে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী হিসেবে আখ্যায়িত করে। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধন অনুসারে সংবিধানের ২৩ক অনুচ্ছেদে বলা হয় ‘রাষ্ট্র বিভিন্ন উপজাতি, ক্ষুদ্র জাতিসত্তা, নৃ-গোষ্ঠী ও সম্প্রদায়ের অনন্য বৈশিষ্ট্যপূর্ণ আঞ্চলিক এবং ঐতিহ্য সংরক্ষণ, উন্নয়ন ও বিকাশের ব্যবস্থা গ্রহণ করিবেন’। সরকার যাদেরকে উপজাতি ও ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী হিসেবে ঘোষণা করেন তারা নিজেদের আদিবাসী হিসেবে দাবি করেন। তবে তারা আদিবাসী না উপজাতি তা খোঁজ করা আমার উদ্দেশ্য নয়। ২০১০ সালে আদিবাসীদের ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীতে রুপান্তরিত করে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান আইন ২০১০ পাশ করে এবং আইনের ধারা ২ (১) এবং ১৯ দ্রষ্টব্য, বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী ও শ্রেণীর জনগণের নাম দিয়ে ২৭ টি ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী ও শ্রেণীর জনগণের নাম প্রকাশ করে। এগুলো হচ্ছে: চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, ম্রো, তঞ্চঙ্গা, বম, পাংখোয়া, চাক, খিয়াং, খুমি, লুসাই, কোচ, সাঁওতাল, ডালু, উসাই (উসুই), রাখাইন, মণিপুরি, গারো, হাজং, খাসিয়া, মং, ওরাও, বর্মন, পাহাড়ী, মাল পাহাড়ী, মুন্ডা ও কোল। আদিবাসী স্বপ্নময় আগামী নিয়ে এগিয়ে গেলে আমাদের রাজনীতি-শিক্ষা-সাহিত্য-সংস্কৃতি-অথর্নীতি সহ সকল স্তরে আসবে বিবর্তন। যা আমাদের স্বাধীনতা-স্বাধীকার রক্ষায় অবিরত প্রয়োজন। আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবসটি উদযাপনের জন্য তিন পার্বত্য জেলা, রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে নানা ধরনের কর্মসূচি পালন করা হয়।

আদিবাসী জনগণকে প্রাথমিক দিকে প্রথম জাতি, পাহাড়ি জনগোষ্ঠী, আদিম মানুষ, উপজাতি প্রভৃতি নামে চিহ্নিত করা হত। আদিবাসী শব্দটির প্রকৃত সংজ্ঞা ও তাদের অধিকার নিয়ে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিতর্ক প্রচুর। জাতিসংঘের বিভিন্ন পর্যায়ে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনার পরেও আদিবাসীদের ব্যাপারে সাধারণভাবে গ্রহণযোগ্য কোন সংজ্ঞায় উপনীত হওয়া সম্ভব হয় নি। সাধারণত কোন একটি নির্দিষ্ট এলাকায় অণুপ্রবেশকারী বা দখলদার জনগোষ্ঠীর আগমনের পূর্বে যারা বসবাস করত এবং এখনও করে; যাদের নিজস্ব আলাদা সংস্কৃতি, রীতিনীতি ও মূল্যবোধ রয়েছে; যারা নিজেদের আলাদা সামষ্টিক সমাজ-সংস্কৃতির অংশ হিসেবে চিহ্নিত করে এবং বেশিরভাগ ক্ষেত্রে যারা সমাজে সংখ্যালঘু হিসেবে পরিগণিত, তারাই আদিবাসী। আদিবাসীদের উপজাতি হিসেবে সম্বোধন করা একেবারেই অণুচিত, কারণ তারা কোন জাতির অংশ নয় যে তাদের উপজাতি বলা যাবে। বরং তারা নিজেরাই এক একটি আলাদা জাতি। ওহঃবৎহধঃরড়হধষ উধু ড়ভ ঃযব ডড়ৎষফ’ং ওহফরমবহড়ঁং চবড়ঢ়ষবং যা বাংলাদেশে ‘আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস’ সকল আদিবাসীর জীবনে নিয়ে আসুক অধিকারের আলো। এই প্রত্যাশায় অগ্রসর হোক কালোহীন আলোকিত প্রতিটি মানুষ। সেই প্রত্যয়ে বাংলাদেশ গারো সমঅধিকার সংস্থা জেরাব-এর অগ্রযাত্রাই শুধু নয়; পাহাড়ে-সমতলে-সকল স্থানে নিবেদিত থাকুক সবাই…

By | ২০১৮-১০-১৭T১৭:৫৫:৩৪+০০:০০ আগস্ট ৮, ২০১৮|ইতিহাস|০ Comments

About the Author:

Leave A Comment

error: Content is protected !!