সুত্রপাত / ইতিহাস / আদিবাসী থেকে সেটেলার ও বিএনপি

আদিবাসী থেকে সেটেলার ও বিএনপি

সজীব তালহাঃ

আদিবাসী শব্দ শুনলে একটা আলাদা আলাদা ঘ্রান আসে। আলাদা মানে আলাদা দেখতে আলাদা শুনতে আলাদা সাংস্কৃতিক দিক দিয়েও আলাদা কিন্তু তারাও বাংলাদেশে বসবাস করে। বর্তমান সময়ে আমরা যারা আদিবাসী না তারা যেমন আছি আমাদের চেয়ে আদিবাসীরা কি ভাল আছে ? বা,তাদের খারাপ থাকা ভাল থাকা কবে থেকে শুরু হয়েছিল? প্রথমে জেনে নেই,আদিবাসীদের সংখ্যা কত?

৪৫টি আদিবাসী জাতী আছে,যার বেশিরভাগ পার্বত্য চট্রগ্রামে। যে সংখ্যা আজ এ পর্যন্ত কোন সরকারী আদমশুমারি বা প্রতিবেদনে দেখানো হয়নি। কেন দেখানো হয়না সে প্রশ্নের জবাবে চলুন জেনে নেই পুরোনো হিসাব সাল ১৮৭২ মোট জনসংখ্যা ৬৯,৬০৭ এরমধ্যে ৮৫ জন হিন্দু, ১৯৭ জন মুসলমান,৬৮,৬০৭ জন ধর্মাবলম্বী আর ৯,৭১৮ জন অন্যান্য শ্রেণীতে অন্তর্ভুক্ত ছিলো।

কিছু বোঝা যায়? সবাই আদিবাসী হিন্দু মুসলমান বোদ্ধ তাইনা? আসলে না। আচ্ছা ১৮৭২ সালের দিকে ধরে নিলাম সবাই আদিবাসি। সবাই আদিবাসী হলে সবার জাতী বড় হওয়ার বাজন সংখ্যার অনুপাত ঠিক থাকার কথা। ১৯৪১ সালে,মোট জনসংখ্যা ছিলো প্রায় ২,৪৭,০৫৩ জন যার মধ্যে ৬,৬৯১ জন হিন্দু,৭,২৭০ জন মুসলমান অপর দিকে ২,৩৩,৩৩৯১ জন আদিবাসী। অনুপাত কিছুটা স্বাভাবিক মনে হলেও তা পাল্টে যায় ১৯৯১ সালের সরকারিলোক গণনার সময়। সেখানে আদিবাসী আর বাঙালীদের অনুপাত ৪৯% জন এবং জুম্মু জনগন ৫১% দেখানো হয়, যেখানে সর্বমোট জনসংখ্যা ছিলো প্রায় ৯,৭৪,৪৪৫জ ন। ১৯৯১ সালের গণনায় সঠিকভাবে জুম্মু জাতী সনাক্ত হলেও তাদের সঠিক সংখ্যা নির্দেশ করা হয়নি। উল্টো সেটেলার আর আদিবাসীদের অনুপাত প্রায় সমান করা হয়েছে। সেটেলার বলতে বেশিরভাগ মুসলমান যারা পার্বত্য জেলার বাইরে থেকে এসে আদিবাসীদের মধ্যে বসবাস করা শুরু করেছে। কারন সেটেলার না যদি না আসত তাহলে জনসংখ্যার অনুপাত ঠিক থাকত। আর জুম্মুজনগন বলতে আদিবাসী বা স্থানীয় জনগনকে বোঝায়।

পরিস্থিতি তখনও কিছুটা স্বাভাবিক ছিলো কাগজ কলমে আদিবাসীদের সংখ্যা কম দেখানো হলেও তারা বাস্তবিক দিক দিয়ে জনসংখ্যায় বেশি ছিল। কিন্তু সেটেলারদের হাতে আদিবাসীরা তখনও নির্যাতিত। পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তি চুক্তি স্বাক্ষরীত হওয়ার পর সেটেলারদের রাষ্ট্রপৃষ্ঠপোষকতা কিছু দিনের জন্য মুলতবি করা হয়। বিএনপি জামাত জোট যখন অষ্টম জাতীয় নির্বাচনে পার্বত্য চট্রগ্রামের সংসদীয় আসন থেকে সাম্প্রদায়িক সেটেলারকে সংসদ সদস্য হিসেবে মনোনয়ন দিল তখন’ই পরিস্থিতি বদলেছে। তিনি নির্বাচিত হয়ে পার্বত্য চট্রগ্রামের বাইরে থেকে লোক এনে বাসস্থান দেয়া শুরু করলো। তিনি সম্ভাব্য সেটেলারদের যাতে সহজে আনা যায় এজন্য তিনি খাগড়াছড়ি থেকে বিভিন্ন রুটে বাসসার্ভিস চালু করে। সেটেলারদের সংখ্যা বাড়তে থাকল আর কাগজে আদিবাসী জাতীগুলোর জনসংখ্যা কমতে লাগলো। বলাযায় সেটেলারদের ব্যাপকভাবে পার্বত্য চট্রগ্রামে প্রবেশ বিএনপি-জামাত জোটের হাত ধরে।

জিয়াউর রহমান পার্বত্য চট্টগ্রামে খুন হন, সেনাবাহিনীর কোন এক অংশের বিশ্বাসঘাতকতায়। তার মৃত্যুর পর সেটেলারদের আধিপত্ব কমে যাওয়ার কথা ছিল,কিন্তু তিনি খুন হন ১৯৮১ সালে আর সেটেলারদের ব্যাপক আকারে বসতি স্থাপনে তিনি সুযোগ সুবিধাদিতে থাকেন মৃত্যুর আগে থেকেই। যা পরবর্তীতে সেনাবাহিনী তার দেখানো পথ অনুসরণ করে। সেটেলার বাঙালীদের পরিমান এত বেড়ে গিয়েছিলো যে ১৯৫১ সালে পার্বত্য চট্টগ্রামে মসজিদের সংখ্যা ছিল ১০টি,কোন মাদ্রাসা ছিলনা তবে গুটি কয়েক মসজিদে মাদ্রাসার মত শিক্ষা দেওয়া হত। ১৯৮১ সালে মসজিদের সংখ্যা ১০ টি থেকে ৫৯২ টি তে বেড়ে যায় আর যেখানে মাদ্রাসা ছিলই না সেখানে বড় বড় ৩৫ টি মাদ্রাসা স্থাপন করা হয়। আরো ভালভাবে বুঝতে হলে ১৯৮১ সালের জনসংখ্যার হিসাব আরো একবার দেখা যেতে পারে। ১৯৮১ সালে বান্দরবানে পাহাড়ি লোকের সংখ্যা ছিল ৮৯,৫০৩ জন এবং বাঙালী সেটেলারদের সংখ্যা ৭২,৪৮৪জন। যা ১৯৯১ সালে সেটেলার বাঙালীর সংখ্যা বেড়ে গিয়ে ১,২১,১৩৯ জন হয়ে যায়। খাগড়াছড়ির দিকে তাকালে এক চিত্র চোখে পড়ে সেটেলার বাঙালীর সংখ্যা ১,৭৫,২৯৫ জনে বেড়ে যায় । আর রাঙামাটিতে অনুপাত এত বেড়ে যায় যে ১৯৮১ সালে যেখানে ১,০৩,৮০৪ জন বাঙালীর হিসাব পাওয়া যায় যেটা কিনা মাত্র ১০ বছর ব্যবধানে ১৯৯১ সালে ১,৭২,৩৯০ হয় যায়। জেনারেল জিয়া খুন হওয়ার আগে সেটেলারদের বসবাসের জন্য জায়গা জমির পাশাপাশি সরকারীভাবে নগদ অর্থ প্রদান করেছিলেন। জেনারেল জিয়ার নির্দেশে সেখানে খাদ্যাদি সরবরাহ করা হত।

এসব করার কারনে সেটেলারা সরকারীভাবে সুযোগসুবিধা পায়যে তারা জুম্মুদের উপর অত্যাচার করা বাড়িয়ে দেয়। আদিবাসীরা কোনঠাসা হয়ে পরে। ঠিক সে সময় কিছু সাম্প্রদায়িকলোক সুপরিকল্পিতভাবে সাম্প্রদায়িক দাঙা উস্কে দেয় যার ফলে বেশি নির্যাতিত হয় পাহাড়ি মেয়েরা। ধর্ষন, খুন এ দাঙার ফলে যে পরিমান বেড়ে গিয়েছিলো পাহাড় পাহাড়ের মত থমকে গিয়েছিল। সে বছর জুনের তিন দিন মানে ২৬,২৭,২৮ তারিখে প্রায় পাচঁহাজার মানুষ খুন হন যাকোন প্রতিবেদনে দেখানো হয়নি, তখনকার সংবাদপত্র ঘেটে তথ্যাদি মিলিয়ে ৫০/৬০ জন খুন হওয়ার সংবাদ পাওয়া গেছে! প্রায় একহাজার ঘড়বাড়ি জ্বালিয়ে দেওয়া হয় পাহাড়িদের। শান্তিবাহিনী গঠিত থাকার কারনে এদোষ তাদের উপর চাপিয়ে দেয়া হয়েছিল। তখন বাম নেতারদের সাথে সন্তুলারমা আর শেখর চাকমা ঢাকাতে অবস্থান করছিলেন আজিমপুরে আলোচনা করার জন্য,তখন প্রায় ১৮ হাজার চাকমা ত্রিপুরায় চলে যায়। মানে তাদের সুপরিকল্পিতভাবে বিতাড়িত করা হয়। এরকিছুদিন পর পার্বত্য চট্টগ্রামের নেতৃবৃন্দ জেনারেল জিয়ার সাথে আলোচনয়া বসেন এবং তারা সমস্যা সমাধানের জন্য তাকে অনুরোধ করেন। জিয়া তাদের আশ্বাস দেন যে পাহাড়ি আর কোন বাঙালীকে প্রবেশ করতে দেয়া হবেনা। কিন্তু কিছুদিন পর জিয়া তার কথা থেকে সরে আসেন, আগেরচেয়ে বেশি পরিমাণ বসতিস্থাপন করেন এবং নগদ অর্থ প্রদান করা বাড়িয়ে দেন। যা জুম্মুদের জিয়ার উপর বিশ্বাসের ব্যঘাত ঘটে জিয়া তাদের কাছে বিশ্বাসঘাতক রুপে বিশ্বাস ভঙ করে।

শেয়ার করুন
  • 143
    Shares

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!