Home / অনন্যা / ‘বিবাহের নামে নির্যাতনের বৈধতা আর নয় ‘ ।।সুদর্শনা চাকমা

‘বিবাহের নামে নির্যাতনের বৈধতা আর নয় ‘ ।।সুদর্শনা চাকমা

সুদর্শনা চাকমা 

বিবাহ বন্ধনটা এত মঙ্গলজনক নয়। অথবা এত সুখকরও নয়। অথবা বিশেষ কোন সদুদ্দ্যেশ্যেও করা হয়না। ঘাবড়ে যাবেননা। কেন সেটার প্রমান দিচ্ছি। কল্যাণী ক্লাশ সিক্স থেকে সেভেনে উত্তীর্ণ হয়েছে মাত্র।তখন তার বয়স হয়েছিলো মাত্র বারো বছর। মামার বাড়িতে থেকে পড়াশুনা করে। নিজ গ্রামের এক ছেলে যার বয়স কল্যাণীর সাত বছরের বড় বড়বোনের বয়সের চেয়েও সাত আট বছরের বড়। সেই ছেলে মুরুব্বি ঠিক করে কল্যাণীর পিতার বাড়িতে পাঠায় বিবাহের প্রস্তাব নিয়ে। উদ্দেশ্য কল্যাণীকে বিবাহ করে নিজের লোলুপ স্বার্থ সিদ্ধ করা। সেই কল্যাণী বিভিন্ন ঘাত প্রতিঘাত পেরিয়ে বড় হবার পর আবারো একই ষড়যন্ত্রের স্বীকার হয়। এক লোক একইভাবে কল্যাণীকে এতটাই পছন্দ করে সাজিয়ে গুছিয়ে কল্যাণীর সাথে সম্পর্ক আছে বলে কল্যাণীর বাড়িতে বিবাহের প্রস্তাব পাঠায়। অথচ কল্যাণী এই প্রস্তাব শুনে রীতিমত আকাশ থেকে পড়ে যায়! কল্যাণীর সচেতন পিতা মেয়ের খবর জেনেশুনে প্রস্তাব সরাসরি নাকচ করে দেন। আমাদের সমাজে বিবাহটা একটা ফাঁদ। একটা সাজানো গোছানো ষড়যন্ত্র। একটা স্বাধীন চিন্তাকে হরণ করার অস্ত্র। বয়সকে কব্জা করে বলা হয় বিবাহের উপযুক্ত সময় পেরিয়ে যাচ্ছে।
একজন নারী যদি নিজের ভিত্তি গড়ে তুলতে না পারে যদি সে কারো প্রতি স্বাভাবিক জীবন যাপনের পরিবেশ নিশ্চিত করতে না পারে সেখানে বিবাহ কতটা যুক্তিসঙ্গত? অন্ধকারে ঢিল ছুঁড়ে জীবন নিপাত দেবার সিদ্ধান্ত কতটা স্বাভাবিক? আমাদের সমাজে বিবাহ করতে পারলেই একজন স্বামী তার স্ত্রীকে যা ইচ্ছা নির্যাতন করার বৈধতা পেয়ে যায়। স্ত্রীকে সব নির্যাতন সহ্য করার উপায় বলা হয় ‘চুপ থাকো ‘! এই বিবাহ সম্পর্কটা কত নারীর মৃত্যুর সম্পর্ক হয়ে দাঁড়ায়। কত সুন্দর জীবনের নষ্ট সম্পর্ক হয়ে দাঁড়ায়। আমাদের সচেতন পিতা মাতার দৃঢ় সিদ্ধান্ত এই সম্পর্কের একটা নতুন সূচনা আনতে পারে। বিবাহ তখনই করা উচিত যখন দুইজনের মানসিক ও পারস্পরিক সামঞ্জস্যতা স্বাভাবিক জীবন যাপনের জন্য উপযুক্ত হয়। আমরা এখনো চিন্তা করি বিবাহ জীবনের একটা অধ্যায়। এটা সম্পন্ন করতে পারলে জীবনের অনেক দায় চুকে যায়। কি করুণ পরিণতি জীবনের। দায়মুক্ত হতে গিয়ে কত দায় চেপে বসে। নির্যাতনের বৈধতা দিয়ে কত দায় থেকে মুক্ত হওয়া যায়?
বিবাহের মাধ্যমে একজন নারীর নিজের সব ইচ্ছাগুলো সমাপ্ত হয়। বলতে ঘৃনা হয় রান্নাঘরের চুলায় কি কি রান্না হবে সেটাও সে নিজে সিদ্ধান্ত নিতে পারেনা। আশ্চর্য্যজনকভাবে একজন দাসীর চেয়েও কম মূল্যে নারীদের জীবনকে এভাবে থামিয়ে দেয়া হয় কেবল বিবাহ নামক শব্দটা দিয়ে! একজন দাসীর দৈনিক বেতন হিসাব করলে আমরা যা পাই মিলিয়ে দেখুন। প্রতিদিন যদি একজন দাসী সকাল বিকাল আমাদের ঘরঝাড়ু দেয়, কাপড় চোপড় আয়রন করে, রান্নাবান্না করে, বাসনকোসন ধূঁয়ে দেয়, সকাল সন্ধ্যা চা করে দেয়, আত্মীয় স্বজন আসলে ভরনপোষণ করে, পারিবারিক সদস্যদের সেবা করে ন্যূনতম বেতন হিসাব করলেও প্রায় পঁচিশ থেকে ছাব্বিশহাজার টাকা মাসিক বেতন আসে। সাথে তারসাথে খারাপ ব্যবহারতো করাই যাবেনা। কিছু একটা ব্যতিক্রম হলে সে সাথে সাথে কেটে পড়বে। অথচ শুধুমাত্র বিবাহ শব্দটা দিয়ে আমরা একজন নারীকে বিনা মর্যাদায় বিনামূল্যে খাটিয়ে নিচ্ছি! কোন কোন ক্ষেত্রে তার অপমৃত্যুও এভাবে হচ্ছে। তাই সঠিক সিদ্ধান্ত পরিবার থেকে আসা উচিত। জীবন সুন্দর করার জন্য বিবাহ মূখ্য নয়। আগে বিবাহের উপযুক্ত হওয়াটাই মূখ্য। স্বাধীনতা, সচেতনতা, সামঞ্জস্যতা আর মূল্যবোধ থাকলে তবেই বিবাহ করা উচিত নয়তো নয়।

Comments

comments

Check Also

তিন তালাক ও কিছু কথা ।। ফারজানা কাজী

ফারজানা কাজী: ভারতের সর্বোচ্চ আদালত মুসলমানদের তিন তালাক প্রথাকে অসাংবিধানিক বলে ঘোষণা করেছে এই বছরের …