Home / গবেষণা / শিশু শ্রম, বিপ্রতীপ কোণ থেকে ।। বিদিশা দাশ

শিশু শ্রম, বিপ্রতীপ কোণ থেকে ।। বিদিশা দাশ

বিদিশা দাশ:

যে কোন জীবের প্রাণধারণের জন্য প্রাথমিক প্রয়োজন খাদ্য – পরিধেয়-বাসস্থল তাকে যে কোনো প্রকারে আহরণ করতে হয়। আর অবশ্যই মূল্য বিনিময় ব্যতীত অন্য কোন প্রক্রিয়ার দ্বারা তা সম্ভব নয়। সুতরাং যথাযথ মূল্য সংগ্রহে রাখার জন্য তাকে কোনো না কোনো রকম শ্রমদানের মধ্য দিয়ে যেতে হয়। জীবজগতের বিবর্তনের সাথে সাথে যত ক্রমবিকাশ ঘটেছে, প্রকৃতি ততই প্রাণীর জীবন প্রণালী সহজতর করার আয়োজন করেছে। স্তন্যপায়ী প্রাণীর ক্ষেত্রে শিশু তার মায়ের কাছ থেকে খাদ্যের যোগান পেয়ে থাকে। মানবসমাজের প্রথানুযায়ী, যারা নিজেদের জীবনের রসদ সংগ্রহে অপারগ তাদের সাহায্য করবে পরিবার কিংবা সমাজ। যারা সৌভাগ্যবান তারা অপ্রাপ্তবয়স্ক, বৃদ্ধ বা শারীরিক ভাবে অক্ষম হলে ও পারিবারিক সাহায্যের সুযোগ পায় কিংবা উন্নত বিশ্বের সদস্য হলে সমাজ তথা রাষ্ট্র তাদের দায়িত্ব নিয়ে থাকে।

আমাদের মত অনুন্নত দেশগুলোতে যেখানে সক্ষম ব্যক্তিরাও সকল সময় প্রান্তিক অর্থ উপার্জনের সুযোগ পান না সেখানে যারা শ্রমদানের অনুপযুক্ত তারা তো একান্ত নিরুপায়। সাম্প্রতিক বিষয়টি যখন শিশুশ্রম তখন আলোচনার পরিধি তাতেই সীমাবদ্ধ করি। আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য বিধি অনুযায়ী চোদ্দ বছর বয়স পর্যন্ত মানবসন্তান শিশু হিসাবে পরিগণিত। সুতরাং ধরে নেওয়া যেতে পারে ঐ বয়স পর্যন্ত তার জীবন যাপনের প্রয়োজনীয় উপাদান সামগ্রী সে বিনা শ্রমে পেয়ে থাকবে। বিভিন্ন দেশের শ্রমিক পর্যায়ে যুক্ত হবার বয়স বিভিন্ন, পনেরো বছরকে মোটামুটি ভাবে সরলীকরণ করা যায় এই বিষয়ে। কিন্তু অনুন্নত দেশগুলোতে অসংগঠিত ক্ষেত্রে বহুলসংখ্যায় শিশুরা নিয়োজিত হয়ে থাকে। তার কারণ অতি স্বচ্ছ কেননা, প্রথমতঃ, সংগঠিত ক্ষেত্রে অপ্রাপ্তবয়স্কদের নিয়োগ বেআইনি এবং প্রধানতঃ শিশুদের নিয়োগে বেতনের সীমা অতি নিম্নে, সে অনুপাতে প্রাপ্তির পরিমাণ কম নয়। অর্থাৎ যে বেতনে একটি অপ্রাপ্তবয়স্ক শ্রমিক কাজে যোগ দেবে সেই বেতনে কোন সক্ষম শ্রমিক রাজি হবেনা কিন্তু কাজের পরিমাণ প্রায় সমান ই হবে। সুতরাং উৎপাদকের দৃষ্টিতে শিশু শ্রমিক স্বভাবতই পছন্দের।

আমরা সমাজের সচেতন সহানুভূতিশীল ব্যক্তি হিসেবে তাই দাবি করে থাকি যে শিশু শ্রম বন্ধ হোক, তারা আনন্দে খেলা ধুলো পড়াশোনা করে আর পাঁচটা বাচ্চার মত উপভোগ করুক জীবনের ঐ অমল প্রভাত বেলা। যারা শিশুদের কাজে নিযুক্ত করেন তারা আমাদের কাছে তীব্রভাবে ধিক্কৃত। এতে তো কোনো দ্বিমত থাকতে পারে না। তবুও একটা কিন্তু এসে যায়। সেকি, শিশুশ্রমের পক্ষে আবার যুক্তি কি করে সম্ভব? যুক্তিটা পক্ষে ঠিক নয় কিন্তু তার সঠিক প্রয়োগ এবং যৌক্তিকতা নিয়ে। আইনের মাধ্যমে দিলাম সকল শিশু শ্রমিকদের কাজ বন্ধ করে, ফিরে দেখতে হবে তো যে বাচ্চাগুলো খাবে কি? একান্ত নিরুপায় না হলে কি কোনো বাবা-মা তাদের শিশুসন্তানকে উপার্জন করতে পাঠায়? অধিকাংশেরই জীবনধারণ অসম্ভব যদি তাদের সন্তানেরা কিছু না কিছু উপার্জন করতে পারে। যারা অনাথ তাদের তো কোনো কথাই নেই, কে তাদের জীবন নিয়ে ভাববে।

প্রকৃতপক্ষে শিশুশ্রমের প্রতি বিরাগটা অনেকটা ঘোড়ার আগে গাড়ি জোতার মত ব্যাপার। আগে আর্থিক দিক দিয়ে পশ্চাৎপদদের উন্নতি হোক, তারা উপলব্ধি করুক যে সন্তানদের শিক্ষিত করতে পারলে ভবিষ্যতের সুনিশ্চিতি অনেক বেশি। নইলে কেবল বিদ্যালয়ে বিনামূল্যে শিক্ষা বা খাদ্যের ব্যবস্থা তাদের কাছে কখনই আকর্ষণীয় মনে হবেনা। তাই শিশু শ্রম বিনাশের আন্দোলনের পরিবর্তে আশু প্রয়োজন শিশুর পরিবারের আর্থিক সচ্ছলতার পরিকল্পনা। পরিশেষে আরেক প্রকার শিশু শ্রমের কথা উল্লেখ না করে পারলাম না, যদিও বেদনাবিলাস বলে উপহাসের শিকার হতে পারি। উচ্চ শিক্ষিত স্বচ্ছল পরিবারের শিশুরাও তো বাবা-মার সামাজিক সম্মানের অন্যতম প্রধান উপাদান হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে প্রথম সারির বিদ্যালয়ে ভর্তি হতে হচ্ছে, সেখানে ও তালিকায় শীর্ষ স্থান বজায় রাখতে হচ্ছে, নানাবিধ ক্ষেত্রে নিজের কুশলতা প্রদর্শন করতে করতে ওরা যেন আরো তিক্ততায় ভরে উঠছে। ওরাও ভালো নেই। তাই একটু অন্য ভাবে যদি এই কষ্টগুলো বাচ্চাদের ওপর থেকে সরিয়ে নেয়া যায়, শুধু তাত্ত্বিক ভাবে শিশু শ্রমের বিরুদ্ধে সোচ্চার না হয়ে তাই এত কথার উপস্থাপনা।

Comments

comments

Check Also

স্লো পয়জনিং ।। অনুপম আইচ

রসায়ন শাস্ত্রে ‘স্লো পয়জনিং’ নামে একটা ঘটনার উল্লেখ আছে। কিছু ভারী ধাতু আছে (যেমনঃ শীসা) …