Home / ধর্ম ও দর্শন / মার্কসবাদ একটি বিজ্ঞান সত্ত্বেও রাজনৈতিক মতবাদ ।। মোর্শেদ হালিম

মার্কসবাদ একটি বিজ্ঞান সত্ত্বেও রাজনৈতিক মতবাদ ।। মোর্শেদ হালিম

 মোর্শেদ হালিম:

দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদ আসলে কি? কার্ল মার্কস ছিলেন প্রগতিশীল বামপন্থী হেগেলের ছাত্র। হেগেল জগৎ, মানুষ ও জীবনকে ব্যাখ্যা করেন দ্বান্দ্বিক চৈতন্যবাদ দিয়ে। চিন্তার যে দ্বন্দ্ব তার সমাধান করতে না পেরে দ্বারস্থ হন ঈশ্বরের বা পরমশক্তির। যা তারই ছাত্র কার্ল মার্কস মানতে পারলেন না। মার্কস ঘোষণা করলেন, চিন্তার দ্বন্দ্ব বস্তুর দ্বন্দ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন কিছু নয়। বস্তুর মধ্যে দ্বৈত সত্তা বলে কিছু নেই। তবে চিন্তার স্বাধীন অস্তিত্ব আছে যা বস্তুর সাংগঠনিক দ্বন্দ্ব থেকেই উৎপন্ন হয়। ঘটনাকে বা বস্তুকে সঠিক ভাবে বিশ্লেষণ করা হলে দ্বন্দ্বগত চিন্তাও সাময়িক ঐক্য প্রতিষ্ঠা করা যায়। যে ঐক্য বদলে দিতে পারে সমগ্র বস্তুজগৎ, মানুষ ও জীবনকে। এই অর্থে চিন্তা বস্তু থেকে উৎপন্ন হলেও, চিন্তা বস্তুর নিয়ন্ত্রণমুক্ত হয়ে স্বাধীন কার্য পরিচালনা করতে সক্ষম। যা অনিবার্য পরিণতিতে জগৎ পরিবর্তনে মানুষের নিয়ন্ত্রণ অনেকাংশেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এরপর তিনি এই দর্শন দিয়ে অর্থনীতি, রাজনীতি, সমাজ, সংস্কৃতি, ধর্ম ও প্রকৃতিকে ব্যাখ্যা করলেন। তিনি দেখলেন মানব সভ্যতার রাজনৈতিক পরিবর্তন গুলি। তিনি দেখলেন ধর্মীয় ও দার্শনিক মতাদর্শের পরিবর্তন গুলি। তিনি ইতিহাস খোঁজতে গিয়ে দেখলেন সমাজ ও সংস্কৃতির দ্বন্দ্ব গুলি। তিনি উন্মোচন করলেন পুঁজি সঞ্চয়ের পিছনে উদ্বৃত্ত মূল্য শোষণে মালিককের একচাটিয়া বর্বরতা। সবই সম্ভব হয়েছে দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদের তিন সূত্র আবিষ্কারের দ্বারা। প্রশ্ন হতে পারে সূত্র আবিষ্কারের পূর্বে তা কি অকার্যকর ছিল ? বা মার্কসবাদ চর্চা না করলে এই দর্শন অকার্যকর হয়ে পড়বে? দুইটার উত্তর একই মোটেই নয়। এই দর্শন মূলত একটা নিয়ম। যে নিয়মে বস্তুজগৎ বা চৈতন্য জগৎ বদলাচ্ছে। শুধু মানুষ নয় অন্যান্য প্রাণীগুলির মধ্যে কোন প্রজাতি যদি এই সূত্র উপলদ্ধি করতে পারে তারাও জগতের বিদ্যমান শক্তির বিপরীত শক্তির ঐক্য প্রতিষ্ঠা করে জগতের নিয়ন্ত্রণ নিতে পারবে। সেইক্ষেত্রে মার্কস অর্থনীতির ব্যাখ্যা করতে গিয়ে দেখলেন মানবসমাজে দুইটা শ্রেণির জন্ম হয়েছে শাসক ও শোষিত। মানুষের পৃথিবী দাস মালিকেরা দখল করেছে, দাস মালিকদের জমিদাররা উৎছেদ করেছে এবং জমিদারদের বণিক বুর্জোয়ারা উৎছেদ করেছে। আজ পৃথিবীর মানবসমাজে বুর্জোয়াদের শাসন চলছে। এরা মানুষের মানবিক সম্পর্ক গুলিকে অর্থমূল্য বিবেচনায় বিচার করে। যার অর্থ আছে তার ক্ষমতা, সম্মান, খাবার সবই আছে। এরা ধীরে ধীরে সকল পুরানো ব্যবস্থা ভেঙ্গে মানুষদের মুক্তবাজারে তুলেছে। যেখানে অর্থে ইজ্জত বিক্রি হয়, ভালো-মন্দ থাকা নির্ভর করে। তিনি দেখলেন পুঁজির বিকাশে একটা শ্রেণি সর্বহারায় পরিণত হচ্ছে। আরেকটা শ্রেণি কোন কাজ না করেই নিয়ন্ত্রক হয়েছে। যা মানব সভ্যতার চরম ঘৃণিত ও অমানবিক ক্রিয়া। এর থেকে মুক্তির উপায় সর্বহারা শ্রেণি একদিন অবশ্যই খোঁজে বের করবে। বুর্জোয়ারা জমিদারদের তাড়াতে তৎকালীন সমাজে বিপরীত শক্তির ভূমিকায় উত্তীর্ণ হয়েছিল, ঠিক তেমন না হলেও অন্যভাবে যেকোন নতুন উপায়ে বুর্জোয়া সমাজে সর্বহারার বিপরীত শক্তি ঐক্যবদ্ধ হবে। এবং পুঁজিবাদ ভেঙ্গে যাবে। এইটা মতবাদ নয়, এই জগৎ পরিবর্তনের সূত্র। এইটা অস্বীকার করার কিছু নেই। মানি আর না মানি কিংবা ভালো লাগুক বা খারাপ লাগুক আমরা দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদের নিয়মের ভিতর দিয়েই যাচ্ছি। এই পর্যন্ত বিজ্ঞান। এই দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদ তখনই মতবাদ হয়ে উঠে যখন জনগণের কিছু অংশ এই সূত্রটা বুঝতে পারে এবং বিশ্বাস করে বুর্জোয়াদের বিপরীত শক্তি সর্বহারাদের ঐক্যবদ্ধ করে মানবসভ্যতার যে পণ্যায়ণ ও মানবিক সম্পর্কগুলি বিক্রির যাত্রা চলমান তা প্রতিরোধ করা সম্ভব। দাস মালিকরা মানুষদের যে পৃথিবী দখল করেছিল তা উদ্ধার করা সম্ভব। এই বিশ্বাস থেকে পার্টি তৈরি ও আন্দোলন সংগ্রাম চলমান রাখাই মার্কসীয় মতবাদ। এবং এইটাই একমাত্র আদর্শিক মতবাদ। কারণ ভাববাদী আদর্শ গুলির তত্ত্ব ও চর্চার মিল নেই।

লেখক: ছাত্র ইউনিয়ন নেতা।

Comments

comments

Check Also

দ্বন্দ্ববাদ, সার্বিক সংযোগ ও বিকাশের মতবাদ ।। লুৎফর রহমান

লুৎফর রহমান : একটি বিজ্ঞান হিসেবে দ্বন্দ্ববাদ : এঙ্গেলস দ্বন্দ্ববাদ বা ডায়ালেকটিকসের সংজ্ঞা নিরূপন করেছেন এভাবে, …