Home / ধর্ম ও দর্শন / দ্বন্দ্ববাদ, সার্বিক সংযোগ ও বিকাশের মতবাদ ।। লুৎফর রহমান

দ্বন্দ্ববাদ, সার্বিক সংযোগ ও বিকাশের মতবাদ ।। লুৎফর রহমান

লুৎফর রহমান :
একটি বিজ্ঞান হিসেবে দ্বন্দ্ববাদ : এঙ্গেলস দ্বন্দ্ববাদ বা ডায়ালেকটিকসের সংজ্ঞা নিরূপন করেছেন এভাবে, দ্বন্দ্ববাদ হচ্ছে সমস্ত গতি ও বিকাশের বিশ্বজনীন নিয়মগুলোর বিজ্ঞান । জগতের সব বস্তু ও ঘটনাপ্রবাহ সামগ্রিক রূপের এক প্রকাশ, এখানে কোনো কিছুই খণ্ডিত নয় । প্রতিটি বিষয় অবশিষ্ট জগতের সাথে যুক্ত আছে । বস্তু ও ঘটনাপ্রবাহের নিরন্তর বিকাশ হচ্ছে । এই বিকাশের মধ্যে আছে সুশৃঙ্খলা, নিয়মানুবর্তিতা ও সুসম্পর্ক । গভীর সম্পর্কের বন্ধন, অখণ্ড সামগ্রিক বিষয়গত বন্ধন, বিকাশের চরিত্র ও গতি নির্ধারণ করে । এই বিধিবদ্ধ সম্পর্কের প্রকাশ ঘটে নীতি ও নিয়মাবলীতে । এটাই বিকাশের বিশ্বজনীন নিয়মসমূহ । বিশ্বজনীন সংযোগের নীতিটিকে এঙ্গেলস বিবেচনা করেছিলেন গতি ও বিকাশের নীতির ঘনিষ্ট ঐক্যে ।
কেননা বস্তুগত জগতে সংযোগ বলতে বোঝায় মিথষ্ক্রিয়া । মিথষ্ক্রিয়া (interaction) হলো গতি ও বিকাশ । আমাদের জ্ঞেয় প্রকৃতির সবটাই গঠন করে একটি ব্যবস্থাতন্ত্র । গঠন করে পদার্থসমূহের একটি অভ্যন্তরিক সংযোগসহ সামগ্রিকতা । এই পদার্থসমূহ একটি অপরটির প্রতি প্রতিক্রিয়া দেখায় । আর এই পারস্পরিক প্রতিক্রিয়াই হলো গতি । এঙ্গেলস দ্বন্দ্ববাদকে বিজ্ঞান বলার সময় সংযোগগুলোর দ্বারা নির্ধারিত মিথষ্ক্রিয়ার বিশ্বজনীন নিয়মগুলোকে, গতি ও বিকাশের নিয়মগুলোকে বুঝিয়েছেন । তিনি একই সময়ে বিশ্বজনীন সংযোগগুলোকেও বোঝান । কেননা মিথষ্ক্রিয়া বা গতি ছাড়া কোনো সংযোগ নেই, ঠিক যেমন সংযোগ বা মিথষ্ক্রিয়া ছাড়া কোনো গতি নেই ।
মার্কসীয় দ্বন্দ্ববাদের শুরু পৃথিবীর বস্তুগত ঐক্য থেকে এবং বস্তুর গতি ও বিকাশের সকল রূপ থেকে । বিষয়মুখ ও বিষয়ীমুখ দ্বন্দ্ববাদে তার বস্তুবাদী চরিত্র বেশি পরিষ্কার হয় । বিষয়মুখ ডায়ালেকটিকস হলো অখণ্ডভাবে বস্তুগত জগতে গতি ও বিকাশ । বিষয়ীমুখ ডায়ালেকটিকস বা দ্বান্দ্বিক চিন্তন হলো চিন্তা, ধারণা প্রভৃতির গতি ও বিকাশ যা বস্তুজগতকে জানতে সাহায্য করে । বস্তুবাদী দ্বন্দ্ববাদ মার্কসবাদের অন্তরাত্মা : “মার্কসবাদের জ্ঞান-তত্ত্ব হচ্ছে দ্বন্দ্ববাদ ।” -লেনিন । প্রকৃতিতে বিরাজিত বিষয়গত দ্বান্দ্বিকতা জ্ঞান অর্জনেরও পদ্ধতি আর সেটাই মার্কসবাদের সার । বিকাশের সাধারণ তত্ত্ব হিসেবে বস্তুবাদী ডায়ালেকটিকস খুবই গুরুত্বপূর্ণ । এই তত্ত্ব ছাড়া পৃথিবীর অখণ্ড বৈজ্ঞানিক চিত্র কখনো উপস্থিত করা যায় না । তা আবার পৃথিবীর বৈজ্ঞানিক অবধারণা ও বৈপ্লবিক রূপান্তরের এক অপরিহার্য হাতিয়ার । তাই লেনিন এই পদ্ধতিকে মার্কসবাদের অন্তরাত্মা বলেছিলেন ।
এর বিশ্লেষণ হচ্ছে – (১) দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদ বৈপ্লবিক : সারমর্ম ও অন্তর্বস্তুর দিক থেকে বস্তুবাদী ডায়ালেকটিকস বৈপ্লবিক । এই তত্ত্ব সবকিছুকে দেখে গতি, পরিবর্তন ও বিকাশের মধ্যে । দ্বন্দ্ববাদ সামাজিক কোনো রূপকে চিরস্থায়ী গণ্য করে না, এর পরিবর্তনের চরিত্র উদ্ঘাটন করে । (২) সমাজ পরিবর্তনে বিপ্লবী শ্রমিক শ্রেণির হাতিয়ার : দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদ সমাজ পরিবর্তনের গতিমুখ নির্ণয় করে । পুঁজিবাদ সহ পূর্বেকার সামাজিক সম্পর্কের অবশ্যম্ভাবী পরিবর্তনের কারণসমূহ ব্যাখ্যা করে । বলে দেয় শোষণহীন সমাজ প্রতিষ্ঠা ইতিহাস নির্ধারিত । এই তত্ত্ব বিপ্লবী শ্রমিক শ্রেণিকে তার ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালনে বৈজ্ঞানিকভাবে, তত্ত্বগতভাবে প্রস্তুত করে । এটি বিপ্লবী পার্টিগুলোর এক রণনৈতিক ও রণকৌশলের তত্ত্বগত ভিত্তি যোগায় এবং সমাজ পরিবর্তনের হাতিয়ার হয় ।
(৩) দ্বন্দ্ববাদ মানবচিন্তাকে প্রভাবিত করে : দ্বন্দ্ববাদ মানবজাতির সমগ্র বস্তুগত ও আত্মিক জীবনের বিকাশের বিশ্বজনীন নিয়মসমূহের ব্যাখ্যা করে । এটা শ্রমিক শ্রেণি ও মেহনতি মানুষের রাজনৈতিক আদর্শ, লক্ষ্য ও স্বার্থকে বৈজ্ঞানিক ধারায় সূত্রায়িত করে । ডায়ালেকটিকস জনগণের সৃষ্টিশীল কর্মশক্তির উৎস, বৈপ্লবিক কর্মের বিস্তার, গতিহার ও গতিপথকে প্রভাবিত করে । (৪) বিশ্ব-দৃষ্টিভঙ্গিগত এবং পদ্ধতিগত ভূমিকা পালন : দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদ প্রাকৃতিক ও সামাজিক জ্ঞানার্জনে, বৈপ্লবিক রূপান্তরের নিয়মগুলো জানতে, সামাজিক ন্যায়বিচারপূর্ণ এক সমাজ নির্মাণের নিয়মগুলো জানতে এক জরুরী বিশ্ব-দৃষ্টিভঙ্গিগত ও পদ্ধতিগত ভূমিকা পালন করে । মার্কস ও এঙ্গেলসকে এই ডায়ালেকটিকস আগ্রহী করেছিলো অর্থশাস্ত্রকে উৎপত্তি থেকে শুরু করে নতুন আকৃতি দেয়ার জন্য । ইতিহাস, প্রাকৃতিক বিজ্ঞান, দর্শনে এই তত্ত্ব প্রয়োগ করতে । আগ্রহী করেছিলো শ্রমিক শ্রেণির কর্মনীতি ও রণকৌশলে দ্বন্দ্ববাদ প্রয়োগ করতে । এখানেই দ্বান্দ্বিক বস্তবাদের সর্বাধিক গুরুত্ব নিহীত ।

Comments

comments

Check Also

ধর্মে আমাদের দ্বৈত আচরণ, ভিন্ন ভিন্ন পরিবেশ

মোর্শেদ আলম সাকিল : মৃত ব্যক্তির বাড়িতে প্রবেশ করলেই চারপাশের পরিবেশ বলে দেয় যে, এই …