Home / অনন্যা / টিনএজ বেবি গার্ল এবং কিছু কথা ।। মুমিতুল মিম্মা

টিনএজ বেবি গার্ল এবং কিছু কথা ।। মুমিতুল মিম্মা

মুুমিতুল মিম্মা:
এক বাচ্চা মেয়ে লিখে পাঠালো ,
“আপু একটা কথা বলবো? আপনি খুব সাহসী,একটু সাহায্য করবেন? একটা ছেলের সাথে আমার প্রায় ই কথা হতো, সে আমার থেকে কয়েক বছরের বড়, সাহিত্যিক ধরনের,মুক্তমনা। তার পোস্ট আমার ভালো লেগেছিলো বলে রিকোয়েস্ট পাঠিয়েছিলাম, বেশ কতদিন কথা বার্তা হচ্ছিলো। এমনিই কথা বলতে ভালোলাগতো এইটুকই ব্যস। তবে যেকোন ব্যাপারেই খোলামেলা আলোচনা। কারণ আমি কখনোই যেকোন কিছুই হোক না কেন, তা নিয়ে খোলামেলা কথা বলতে পছন্দ করি। শুধু ফেসবুকেই কথা হতো। হঠাৎ পরশুদিন তিনি আমাকে বলে বসেন, “আসো সেক্স করি”। আমি হতচকিত হয়ে গিয়েছিলাম, পরক্ষণেই তিনি মজা করছেন বলে হেসে উড়িয়ে দিলেন, অন্য টপিক নিয়ে কথা বলতে শুরু করলেন। গতকাল হঠাৎ নক, কথার পর্যায়ে তিনি সেক্স চ্যাট শুরু করলেন, জঘণ্য এবং নোংরা ভাষায় আমাকে জড়িয়ে, আমার সারা গা ঘিনঘিন করছিলো, তাকে ব্লক মেরে দিই,সব চ্যাট মুছে ফেলি। কাল আমার ঢাকা ইউনিভার্সিটির অ্যাডমিশন টেস্ট, আমি পড়তে পারছি না, গা ঘিনঘিন করছে, নিজের প্রতি তীব্র বিতৃষ্ণা, ঘৃণা কাজ করছে।”
মেয়েটা সহ সব টিন-টুনটুনিদের বলছি –
শোন পাখিরা
কিছু শুয়োরের বাচ্চাদের জন্ম হয় পাঁক ঘাঁটার জন্যে আর ছোড়াছুঁড়ি করার জন্যে। এদের এড়িয়ে যাওয়া শিখতে হবে। এই যে আমাকে তোমার খুব সাহসী মনে হচ্ছে এই আমিও কিছু শুয়োরদের (দুঃখিত! এর চাইতে ভালো ভাষা আমি ব্যবহার করতে পারলাম না) নিয়মিত মুখোমুখি হই। এই প্রতিনিয়ত যুদ্ধে আমাকে প্রতিমুহূর্তে সিদ্ধান্ত নিতে হয় এড়িয়ে যাব নাকি যুদ্ধে মুখোমুখি হব। তোমাকেও সিদ্ধান্ত নিতে হবে কোনটা কখন প্রয়োগ করবে।
একটা ঘটনা বলি- তখন রিডার্স ব্লকের অত্যাচারে পাগল হবার দশা আমার। বই জড়িয়ে ঘুমাই, বই নিয়ে ঘুরি কিন্তু বই পড়তে আর ভালো লাগে না। ছাত্রী দিল ‘তম্রিসা’। লেগুনায় বসে ডুবে বই পড়ছি। বহুদিন পরে বই পড়ার আনন্দে উদ্ভাসিত আমি। এক ভদ্রলোক আমার কোমরে এমনভাবে হাত দেয়া শুরু করলেন যে আমি আর বইয়ে মনযোগী হতে পারছিলাম না। কিন্তু তখন আমার প্রাণপণ চেষ্টা বইয়ে ফেরায়। আমি লোকটাকে কিছুই না বলে সিট বদলে বইয়ে আবার ডুবে গেলাম।
তোমার প্রশ্ন আসতে পারে – শুয়োরদের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে যুদ্ধ করা আমি কেন তাকে কিছু বললাম না?
শোন পুতুল, প্রতিটা যুদ্ধের মূল কথা হল টিকে থাকা। এরপরে আসবে টিকিয়ে রাখা। টিকে থাকতে না পারলে তুমি কিছুই করতে পারবে না সোনা। আমি আমার নিজেকে টিকিয়ে রাখার স্বার্থে তখন বইয়ে ডুবে ছিলাম। এই যে দেখো টিকে আছি বলেই টিকিয়ে রাখতে পারছি আশেপাশের মানুষদের যাদের সাহায্য দরকার।
যেহেতু তোমার ভর্তি পরীক্ষা চলছে। জীবনের এই গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষাটা তুমি অবশ্যই অতি মনোযোগ দিয়ে দেবে। প্রেম ভালো লাগা অস্বাভাবিক জিনিস নয়। কিন্তু শুধু এগুলো নিয়ে পড়ে থাকাটা খুব অস্বাভাবিক। আমি যখন মাঈনের জন্যে শ্বাসকষ্টে মরে যাচ্ছিলাম তখন এক আপু আমাকে বলেছিলেন, “মিম্মা, এখন তোমার রিসার্চ করার সময়। আর তুমি কী করছ? দেশ তোমার কাছ থেকে কী পাচ্ছে চোখের জল ছাড়া? অথচ তুমি যেখানে পড়ছ সেখানে অসংখ্য দরিদ্র হতদরিদ্র মানুষের কন্ট্রিবিউশন আছে এই সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়য়ের খরচ যোগাতে – কথাটা মাথায় রেখ।”
তোমায় বলে রাখি – দুটো মানুষ কোন সম্পর্কে আবদ্ধ হলে সেখানে শারীরিক প্রয়োজন আসতে পারে মধ্যবর্তী ভূমিকায়। কিন্তু শারীরিক সম্পর্কটাই প্রেমে মূখ্য নয়। যদি দেখো মগজের চেয়ে তোমার প্রেমিক তোমার শরীরটাকেই বেশি প্রাধান্য দিচ্ছে তবে বেশিদূর না গড়িয়ে সরে এসো সম্পর্ক থেকে। কেননা এই শারীরিক সম্পর্কের বেশিরভাগ দায় মেয়েদেরই নিতে হয়। বেশিরভাগ শারীরিক সম্পর্ক হওয়া সম্পর্কগুলো ভেঙ্গে গেলে মেয়েরা খুব কষ্ট পায়। আমাদের এমনভাবেই ভাবানো হয় শারীরিক সম্পর্কটাই একটা সম্পর্কে অনেক কিছু। কিন্তু কথা হচ্ছে যেখানে তুমি কিছুক্ষণ পরে জানোই না তুমি বেঁচে থাকবে কিনা সেখানে শারীরিক সম্পর্ক দিয়ে প্রেমের গ্যারান্টি কতটুকু? বেশ কিছুদিন আগে আমার এক ব্যাচমেট নিয়মিত কন্ট্রাসেপ্টিভ পিল খাবার দীর্ঘমেয়াদী জটিলটায় পড়ে যায়। এবং জটিলতা দেখেই ওর মা বুঝতে পারেন যা বোঝার।
যার মগজে মুগ্ধ হওয়া যায় না তাকে শরীরে না টানাই শ্রেয়। প্রশ্ন আসতে পারে মাঈনে মুগ্ধ আমি কী তবে শরীরে মুগ্ধ হই নি? উত্তর – না হই নি। মাঈন খুব বাচ্চা ধরণের ছেলে ছিল। ওর কাছে মগজের মুগ্ধতাই অনেক কিছু। ফলে শরীর গৌণ ছিল আমাদের কাছে।
জীবনে ব্যর্থতাকে মেনে নিয়ে পথ চলতে শিখবে। ‘বদলে যান এখনই’ বইটাতে তারিক হক খুব সুন্দর করে লিখেছেন, “আপনাকে নিঁখুত হতে হবে না, নিপুণতর হতে হবে”। জীবনে ব্যর্থতা আসবেই। সেখানে থেমে যাবে কিছুসময়ের জন্যে, চারপাশ বুঝে এগোবে তবে কখনোই একেবারে দমে যাবে না।
প্রযুক্তির উৎকর্ষতা তোমার জন্যে ভয়াবহ হয়ে আসতে পারে যদি তুমি প্রযুক্তিকে নিয়ন্ত্রণ করতে না শেখ। বাচ্চাটা, মাথায় রেখ তুমি এখানে যা করছ সবটাই রেকর্ড হয়ে আছে আরেকজনের কাছে। চাইলেই তোমার ব্যক্তিগত জিনিস ফাঁস করে তোমার জীবন নরক বানানোর কাজে সে লিপ্ত হতে পারে। পাসওয়ার্ডের মত গোপন জিনিস কারও সাথে ভাগাভাগি করতে যেও না তাই। সেক্স চ্যাট, ফোনো সেক্স – এই সব হাবিজাবি করতে যতটা ভালো লাগে ফাঁস হলে খারাপ লাগাটা হয় এর তিনগুণ। তাই “ভাবিয়া করিও কাজ, করিয়া ভাবিও না”। কিছু ফেসবুক সেলেবকে পাবে যারা উপর দিয়ে টাইমলাইনে ভালো ভালো কথা লিখে যাচ্ছে, ইনবক্সে এসে “চলো সেক্স করি” ধরনের কথা বার্তা শোনাবে। অথবা তোমার ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে খুব বেশি আগ্রহ দেখাবে। এদের পাতা ফাঁদে পা দিও না সোনা। এরা তোমাকে মুগ্ধতার জাল ফেলে জালে জড়াবে, এরপরে যা হবে সেখানে একরাশ তিক্ততা ছাড়া কিছু নেই। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই মুক্তমনাদের মন মুক্ত না থেকে প্যান্টের জিপার উন্মুক্ত রয়ে যায়। কাজেই ফ্রি সেক্সের এই ভণ্ডদের কাছ থেকে সাবধান!
কোন সময় যদি আসে যেখানে মনে হচ্ছে বেঁচে থাকাটাই দায় তখন স্বহননের মত বাজে কিছুকে বেছে নিও না। গতকিছুদিন আগেই একটা আত্মহত্যার কেস হ্যান্ডেল করেছিলাম। মেয়েটাকে বাঁচিয়ে তোলার কিছুদিন পরেই সে জানতে পারে ডিপার্টমেন্টে জমা নেয়া অসংখ্য রিসার্চ পেপারের মধ্যে তারটা গৃহীত হয়েছে ষষ্ঠ হিসেবে। কী অসাধারণ এই অনুভূতিটা সে জানতেও পারতো না মরে গেলে। আমাদের জাবির এক বড় আপু আত্মহত্যার ছদিন পরে বাংলাদেশ ব্যাঙ্কের চাকরির এপয়েন্টমেন্ট লেটার পান। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্যি তখন তো তিনি আর চাকরিতে যোগদানের জন্যে পৃথিবীতে নেই। এজন্যেই তোমাকে বলব স্বহনন নিয়ে চিন্তা ভাবনা একদম করবে না। স্বহনন মানে যেমুহূর্তে মরে যাবে তারপরের মুহূর্তের আনন্দের ঘটনার ভাগিদার আর তুমি হতে পারছো না, এই সুন্দর পৃথিবীর অসংখ্য ভালো কাজের সাথী আর তুমি নও।
মনযোগী শ্রোতা হও। শোন, শোন, শোন এবং শোনার চর্চা করো। ভালো গান শোন, আবৃত্তি শোন। দূরে যাবার দরকার নেই। সঙ্গী হিসেবে নির্ভরযোগ্য খুব কাছের কাউকে বেছে নাও। কাউকে না পেলে মরিয়া হয়ে যেও না। বই সঙ্গী হিসেবে যে কোন মানুষের চাইতে ভালো। ভালো বই পড়। দেখবে ভাবনা বদলাচ্ছে। সর্বোপরি তুমি বদলে যাচ্ছ। পরিবর্তনটা ভালোর দিকে হওয়াইটাই বাঞ্ছনীয় সবসময়। অন্যের সাথে নিজেকে তুলনা না করে নিজেকে নিজের সাথে তুলনা করো। গতকালকের তুমির চেয়ে আজকের তুমি কতটা বদলেছ সেটা নিয়ে কাজ করো। মাথায় রেখ – তোমার কাজ তোমাকেই করতে হবে। শুধু মোটিভেশন নিয়ে বসে থাকলে তো বদল হয় না, তাই না?
জীবন তোমার তাই সিদ্ধান্তও তোমার। এই মূল্যবান জীবনের মূল্যবান সিদ্ধান্তগুলো তাই মগজ খাটিয়ে ভালোভাবে নাও। উপভোগ করা প্রতি মুহূর্তে বলো, “জীবন সুন্দর!”
লেখক: শিক্ষার্থী, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ও সক্রিয় নারীবাদী এবং সমাজকর্মী ।

Comments

comments

Check Also

পরিবার ও নারীর পিছিয়ে পড়া ।। ফারজানা কাজী

ফারজানা কাজী: নারীর পিছিয়ে পড়ার প্রধান কারণ হচ্ছে তার পরিবার। একই পরিবারে একটি ছেলে আর …