Home / ভ্রমণ কাহিনী / রামুতে গেলে ।। উপল বড়ুয়া

রামুতে গেলে ।। উপল বড়ুয়া

উপল বড়ুয়া:

রামু যেতে হলে প্রথমে আপনাকে বাসে চড়তে হবে। রেললাইন যেহেতু দোহাজারী পর্যন্ত এসে থেমে গেছে কতোকাল আগে; বাসের ঘষা কাচে মুখ লাগিয়ে আপনি যেতে পারেন রামু। রামু যাবেন কেননা রামু দেখার মতো। ঐতিহাসিক, শৈল্পিক ও নৈসর্গিক দৃষ্টিকোণ থেকে রামুকে আলাদা করা যায় অন্যান্য থেকে। যদি আপনার পড়া থাকে প্রেমেন্দ্র মিত্রের ‘তেলানাপোতা আবিষ্কার’ বা শুনা থাকে যদি জন ডেনভারের ‘কান্ট্রি রোড টেক মি হোম টু দ্যা প্লেস’ তাহলে এই যাওয়ার কিম্বা ভ্রমণের একটা দ্যোতনা পাবেন। রামুতে এলে রিকশা সহযোগে প্রথমে আপনি চলে যাবেন রামকোট বা রাংকুটের দিকে। রামকোট হলো সনাতনীদের আর রাংকুট বৌদ্ধদের। দুইজনই থাকেন পাশাপাশি। একই জায়গা। তবে নাম ভিন্ন।

 

রামকোট/ রাংকুটঃ দশরথের ছেলে-বৌ যখন ১৪ বছরের বনবাসে, তখন সীকাকুন্ড, বান্দরবান হয়ে খ্রিষ্ট্রপূর্ব ৩৪০০ অব্দে এই পঞ্চবটি বনে এসেছিল রাম-সীতা-লক্ষণ। কথিত আছে এখানে সীতার ব্যবহার্য্য অনেক জিনিসপত্র পাওয়া গেছে। ফলে এখানে বৎসরে সীতাস্মরণে একবার সীতামেলা হয়। পঞ্চবটি বনের কয়েকটা বৃক্ষও চোখে পড়ে। এখানে যে দুর্গা পুজা হয় সেই দুর্গা বিসর্জিত হয় পরের বছর। মাঝারি সাইজের একটা শিবলিঙ্গও দেখতে পাবেন এখানে । হিন্দু আর বৌদ্ধ ধর্মালম্বীরা জন্মন্তরবাদী। বুদ্ধত্ব লাভের পূর্বে গৌতম বুদ্ধ পারমী পূরণের জন্য যে পাঁচশ জন্ম নিয়েছিলেন তৎমধ্যে কয়েকবার ‘রাম’ নাম নিয়ে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। সুতরাং দেখা যায় রামায়ণের সাথে গৌতম বুদ্ধের জীবন অঙ্গাঅঙ্গিভাবে জড়িত। রাম থেকে রামকোট। বৌদ্ধজাতকে আরও পাবেন মহাভারতের খন্ড কাহিনী। এইসব মিথলজি, মিথিক্যাল ক্যারেকটার আরও জানতে চাইলে পড়তে পারেন বৌদ্ধজাতক, রামায়ন, মহাভারত। আর রাংকুটে ঢুকতে প্রথমে আপনাকে অভিবাদন জানাবেন ১৪০০ বছরের পুরনো মহামান্য এক বিশাল বুড়ো অশ্বত্থবৃক্ষ। এই গাছঠাকুর চতুদ্দিসে মেলে দিয়েছেন তাঁর শাখা-প্রশাখা। গৌতম যে বোধিমূলে বসে ০৬ বৎসর ধ্যান করেছিলেন এবং পরে বুদ্ধত্ব লাভ করেছিলেন এই বোধিতরু হলো সেই বুদ্ধগয়ার বোধির উত্তরসূরি। এখানে পাখিরা ফল খেয়ে ওড়ে যায়। আর পথিকেরা জিরায় । পাশে দেখবেন ত্রিপিটক হাতে সম্রাট অশোকের মুর্তি। ২৫০০ হাজার আগে তিনি গৌতমের বক্ষাস্থি বা ধাতু দিয়ে প্রতিষ্টা করেছিলেন এই রাংকুট। বক্ষাস্থির পালি অর্থ হলো রাং। রাং থেকে রাংকুট। প্রতিবছর চুরাশি হাজার বুদ্ধের পুজা হয় এখানে। চুরাশি হাজার বুদ্ধ হলো মারবিজয়ী সিদ্ধার্থের নির্বাণ পরবর্তী পুড়ানো চুরাশি হাজার অস্থি। সনাতনী আর বৌদ্ধদের কাছে এই স্থান অত্যন্ত পবিত্র তীর্থস্থান। এখানে এলে আদতেই শরীর জুড়ায়। এছাড়া বিদেশী অনুদানে তৈরী অনাথ আশ্রম জগৎজ্যোতি শিশু আশ্রমের নজরকাড়া শৈল্পিক স্থাপত্য।

 

এই পর্ব শেষে আপনি আরেকটু সামনে এগিয়ে চলে যাবেন বিশাল নারিকেল বাগান। ভেতরে ঢুকে দেখবেন সারি সারি মার্চের লাইনে দাঁড়ানো নারিকেলগাছ। যতো ভেতরে ঢুকবেন ততোই দেখবেন ঘন হয়ে আসছে নারিকেল বৃক্ষ। দেখবেন পাহাড়ের ওপারে পাহাড়। নারিকেলে ফাঁক দিয়ে মেঘে ঘষা খাওয়া পাহাড় আপনাকে হাতছানি দিয়ে ডাকবে। ওদিকে ভুলেও পা বাড়াবেন না। কেননা সামনেই সব রাস্তা খাড়া হয়ে আছে। বিপজ্জনক। বিশাল এলাকাজুড়ে তৈরীকৃত নতুন বোটানিকেল গার্ডেনেও ঢুঁ মারতে পারেন সময় পেলে। চারদিকে ফুটে আছে অসংখ্য পরিচিত অপিরিচিত বুনো ও চাষকৃত ফুল। একটু পাহাড়ী। ও গা ছমছমে এই বোটানিকেল গার্ডেন। গাছেদের ছায়া ও ঘ্রাণ আপনার দিকে ঝুঁকে এস ভয় দেখাবে নিশ্চিত। তারপর যানবাহনে চড়ে ফিরে আসুন চৌমুহনী। লাঞ্চ সেরে বেরিয়ে পড়ুন মিড়াছড়ির উদ্দেশ্যে। সদ্য নির্মিত একশ হাত শায়িত বুদ্ধমূর্তির পাশে আপনিও শুয়ে পড়ুন। মিঠাছড়িতে আছে তাড়িকোটা (তাড়িবাগান/ পামবাগান)। সুস্বাদু তাড়ি একবার চেখে দেখতে পারেন। বলা যায়, এই জনপদটির অর্থনীতি তাড়ি নির্ভর। তাড়ি কেবল নেশা হিসেবে নয় বিবিধ রোগ সারাতে ও চিনি তৈরীতেও তাড়ি ব্যবহৃত হয়। বিশাল এলাকা জুড়ে চাষ হয় পাম গাছ। সমুদ্রের নোনা পানি খাল দিয়ে ঢুকে পড়ে তাড়িক্ষেতে। মাঝেমধ্যে বিষাক্ত সাপ চোখে পড়বে ক্ষেতের ভেতর। ভোর থেকে চাষীরা বাঁশের চোঙা হতে তাড়ি সংগ্রহ করে। মিঠাছড়ির ভেতর দিয়ে বয়ে গেছে ফাঁড়িখাল নদী। এই নদী বিবিধ সুস্বাদু মাছের উৎস।

 

রামু হলো প্যাগোডা প্রধান জনপদ। কিছু দূরত্ব পরপর রয়েছে বৌদ্ধ মন্দির। সেখানে সৌম্যকান্তি গৌতম বুদ্ধ সিংহশয্যায় পদ্মাসনে ধ্যান সমাধিতে বসে থাকেন। রামুতে আগে রাখাইন জনগোষ্ঠীর আবাসস্থল ছিল। রামুর ঐতিহাসিক যা কিছু তার পেছনের অবদান কিন্তু রাখাইনদের। রাখাইনরা তখন এখানে দিঘি, স্কুল, রাস্তা, প্যাগোডা, জাদী নির্মাণ করেন মানুষের সুবিধার্তে। ১৮শ শতকে কাউয়ারখোপের এক বৃহৎ পাহাড়ের উপরে নির্মাণ করা হয় সুউচ্চ জাদী বা চেতি। জাদী হলো বুদ্ধের সিম্বলিক। সবুজ বৃক্ষঘেরা এই পাহাড়ের উপর চড়াও এ্যাডভেঞ্চার। বুনোগন্ধ মাখা পরিবেশে আপনি নিজেকে হারিয়ে খুঁজবেন। জাদীর নিচে বয়ে গেছে বাঁকখালী নদী। তার তীরে গড়ে উঠেছে রাজারকুল গ্রাম। রাজা নেই, তবে বালিকারা যেহেতু দুরন্ত প্রেমিকা আপনিও খুঁজে পেতে পারেন স্মরণীয় মুহুর্ত। নদীর দু’পাশে বেগুন, মুলা, লেবু, টমেটো, বরবটি, শিম হরেক সবজির ক্ষেত। আপনি পারলে ক্ষেত থেকে মুলা ছিঁড়ে রাখাইনদের চুলাইকৃত মদ খেয়ে নেবেন। রাজারকুল গ্রামে যতই গভীর ঢুকবেন ততই হিম করা ভয় আপনাকে পেয়ে বসবে। বিশেষ করে সন্ধ্যায় গাছের ছায়ারা ভৌতিক আকার ধারণ করে। বাঁকখালী তীরে বসে রাজারকুলে একরাত কাটালে আপনাকে একটা ঘোর পেয়ে বসবে। যেহেতু আপনি শহর ছেড়ে গ্রাম দেখতে এসেছেন এবং রাজারকুল আপনাকে ফিরিয়ে দেবে আদর্শ গ্রামের অনুভূতি। রামুর সবচেয়ে উল্লেখ্য স্থান বাঁকখালী নদী। বর্ষাকালে এই নদী যেমন ব্যগ্রতায় চুরমার করে দু’পাশের গ্রাম তেমনি অন্যান্য ঋতুতে এই নদী অর্থনৈতিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে রামুর। দূরের পাহাড় থেকে কাঠুরেরা নদীর স্রোত বরাবর গাছ-বাঁশ ভাসিয়ে দিয়ে নিয়ে আসে ফকিরাবাজারে। এই নদীতে বৌদ্ধদের জাহাজ ভাসা উৎসব, জলকেলি, সনাতনীদের প্রতিমা বিসর্জন, নৌকা বাইচ, আরও কতো গ্রামীণ মেলা জমে! সাপ্তাহিক বাজার দেখার জন্য আপনি যেতে পারেন ফকিরাবাজার বা গর্জনিয়ায়। এই দুই বাজারে মিলবে না এমন জিনিস খুব কম। তাছাড়া ফকিরাবাজারের ভেতর যে শিরিষ গাছ আর রেইন ট্রির বর্তমান আয়ুস্কালও ১০০-২০০ বছর। ফকিরাবাজারের মধ্যেই দেখতে পাবেন রাখাইনদের তৈরী ক্যাং বা কিয়াং। রাখাইনদের তৈরী ক্যাং বা কিয়াং স্থাপত্য শৈলী অত্যন্ত মনোমুগ্ধকর। এসব দেখার জন্য দূর-দুরান্ত থেকে ছুটে আসে দেশী বিদেশী পর্যটক। রামুতে প্রায় ২০-২১টি বৌদ্ধমন্দির বা ক্যাং বা কিয়াং দেখতে পারেন। এসব মন্দির ৩০০-৪০০ বছর পুরনো। তেমনি একটি ক্যাং হলো লামার পাড়া বৌদ্ধমন্দির। এই বৌদ্ধমন্দিরের ভেতর আছে ৩০০ বছরের পুরনো বৃহৎ দুই পিতলের ঘন্টা।

 

সোনাইছড়ি আর নাইক্ষ্যংছড়ি বান্দরবান জেলার মধ্যে পড়লেও কক্সবাজার জেলার রামুর সাথেই যেন এই দুই জনপদের মানুষ, সংস্কৃতির সম্পর্ক বেশি। দুই জায়গায় দেখার মতো। রামু থেকে চান্দের গাড়ি ভাড়া করে বা লোকাল ট্রিপে চড়ে আপনি ঘুরে আসতে পারেন নাইক্ষ্যংছড়ি। যেতে যেতে আপনাকে হাতছানি দিয়ে ডাকবে রাবার বৃক্ষ। তেমনি সোনাইছড়ি; পাহাড়ী অধ্যুষিত এক উপজেলা। সপ্তাহন্তে এখানকার মানুষ ১৬-১৭ কিলোমিটার পাহাড়ী উঁচু নিচু পথ হেঁটে বাজার করতে নামে ফকিরাবাজার। সাথে নিয়ে আসে পাহাড়ের চাষকৃত ফসল আর মধু। সোনাইছড়িতে ঘরে ঘরে শুয়োর প্রতিপালন ও চোলাই মদ উৎপাদিত হয়। আছে শত মিটার উঁচু ভগবানটিলা নামের এক পাহাড়। যার শরীরে হরেক রঙের পাখির অজস্র বাসা। তার নিচে বসে থাকে পাহাড়ী এক বর্ষীয়ান বুড়ি। পথিক দেখলে পানি পান করায়। ভগবান টিলার নিচে বয়ে গেছে ঝিরিঝিরি ছড়া। সেই ছড়ার জল ঠান্ডা মিঠা। পথে চলতে চলতে ক্লান্ত হলে এই জল আপনার তৃষ্ণা মিটাবে। হাঁটুর উপর লুঙ্গি তুলে বা ছোট এক কাপড় পরে পাহাড়ী যুবক আর পাহাড়ী মেয়েরা সেইসব জায়গায় স্বপ্ন ও ফসল বুনে।

রামুতে দেখতে পারেন বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ রাবার বাগান। প্রতিযোগীতামূলক পরীক্ষায় এই প্রশ্নটার সম্মুখীন তো আপনি হয়েছেন অনেকবার! ভেতরে ঢুকতেই দেখবেন উড়োচুলের বালিকারা এখানে রাবার বিচি বস্তাবন্দি করছে। কেউ রাবার তুলছে। কেউ কাটছে কাঠ। বেশিদূর যাওয়ার চিন্তা ভুলেও করবেন না। রাস্তা হারিয়ে হাতিমামার দলে পড়তে পারেন নিশ্চিত। রামুর জীবনাচার, তার পুজা পার্বণের রীতি বহন করছে তার ইতিহাসকে। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, পর্যটক হিউয়েন সাং, গ্রীক ঐতিহাসিক টলেমির পুস্তকপুরাণে পাবেন রামুর কথা। রামু হয়ে আপনি যেতে পারেন কক্সবাজার সদর। কক্সবাজারে মনভুলানো দেখার কতো কী পাবেন! সে তো আপনি নিজেই জানেন।

রামু। কক্সবাজার জেলার একটি উপজেলা। কক্সবাজার থেকে রামুর দূরত্ব ১৭ কি.মি.। ঢাকা থেকে বা চট্টগ্রাম যে কোনভাবেই আপনি যেতে পারেন।

লেখক: কবি ও প্রাবন্ধিক ।

Comments

comments