নারীমুক্তির গোলকধাঁধা

বিদিশা দাশ:
উপযোগিতা মানুষের একান্ত পছন্দ, এবং তার জন্য সে মূল্য দিতে প্রস্তুত।  ততটাই মূল্য যতটা উপযোগিতা সে পাবে। তবে সেই মূল্য দেবার জন্য প্রয়োজন হয় কিছু, সাধারণ ভাবে তা হল অর্থ।  সুতরাং, নিজের পছন্দ অনুযায়ী বস্তুগুলি অন্ততঃ পেতে হলে তাকে আর্থিক দিক দিয়ে সবল হতে হবে।  অর্থাৎ অর্থের জোগান যেন তার হাতে অপ্রতুল থাকে। তখন ধরে নেওয়া যেতে পারে সে কারো অধীন নয়  অর্থাৎ সে মুক্ত।
সে কারণেই তথাকথিত নারীমুক্তির প্রসঙ্গ এলেই প্রথমতম এবং শেষতম আলোচ্য বিষয় হয়ে থাকে নারীর অর্থনৈতিক স্বাধীনতার বিতর্ক। যদিও জীবিকা অর্জনের ক্ষেত্রে নারী পুরুষের সাম্য  নিয়ে কোনো দ্বিমত থাকতে পারে না, বর্তমান যুগে প্রায় সমস্ত ক্ষেত্রেই নারীরা নিজেদের সামর্থ্য প্রদর্শনে পারঙ্গম হয়েছে।  গত শতকের প্রথমার্ধ পর্যন্ত কিছু বিশেষ জীবিকাই নারীদের জন্য নির্ধারিত ছিল। দুটি বিশ্বযুদ্ধ এবং সাম্রাজ্যবাদের কিছুটা অবসান সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গিতে অনেকটা পরিবর্তন আনতে সক্ষম হয়েছে।
তাহলে তো  এক কথায় সেরে ফেলা যেতে পারে নারীদের উপার্জনের অধিকার এবং নারীমুক্তি পুরোপুরি সমার্থক। নারীদের হাতে প্রয়োজনীয় অর্থ থাকলেই সে প্রচলিত সমাজ ব্যবস্থা যা একান্তই পুরুষতান্ত্রিক সেখানে সে পূর্ণ অধিকার বজায় রাখতে পারবে। তবে তো ব্যাপারটা খুব অসুবিধেজনক নয় কিংবা বলা যেতে পারে ক্রমশ উন্নত বিশ্বের সাথে সাথে পা মিলিয়ে আমরা, বিশ্বের এই প্রান্তিক দেশগুলোও সে ব্যাপারে অনেকটা অগ্রগতি লাভ করেছি। অর্থাৎ ক্রমাগত আমাদের সমাজেও নারীরা অর্থনৈতিক ভাবে স্বাবলম্বী হয়ে উঠতে সক্ষম হচ্ছে। তবে ফুরিয়েই গেলো ঝামেলা – আরো কিছুদিন পরে নারী পুরুষের ভেদাভেদ ঘুচে যাবে এবং নারীমুক্তি ব্যাপারটার আর প্রাসঙ্গিকতা থাকবেই না।
কিন্তু, আবার কিন্তু কিসের? হ্যাঁ কি ন্তু তো আছেই। প্রথমত: উপযোগিতা মানুষ শুধু অর্থের বিনিময়ে উপলব্ধ বস্তু থেকেই পায় না।  সেজন্য বর্তমান উন্নয়নের মাপকাঠি হিসেবে জাতীয় আয়কে করা হয় না  – ধারা হয় জাতীয় উন্নয়ন সূচক (HDI)-কে ।  অর্থাৎ খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থানের  উৎকর্ষ মানুষকে শুধু উন্নয়নের পথে নিয়ে যেতে পারে না – তার আরো কিছু  অন্য উপাদানের প্রয়োজন । সার্বিকভাবে পুরো দেশের পরিস্থিতির জন্য এক রকম আর নারী সমাজের ক্ষেত্রে বিষয়গুলো সম্পূর্ণ আলাদা ।
প্রাগৈতিহাসিক যুগে যখন খাদ্য অন্বেষণ করতে হলে শারীরিক শক্তিরই একমাত্র প্রয়োজন ছিল এবং সন্তানধারণের সম্পূর্ণ শারীরিক ক্লেশ নারীই বাহন করতো (বা করে ) তখন থেকে নারীর জন্য নির্ধারিত ছিল স্বল্প কায়িক শ্রমের কার্যকলাপ। দৈনিক গৃহকর্ম তার অন্যতম।  ক্রমে দেখা গেল, বহির্জগতের ক্রিয়াকর্মগুলি জীবনধারণের জন্য একান্ত প্রয়োজন।  তাই সেই ক্ষেত্রের কর্তৃত্ব যার হাতে, সেই পুরুষ সমাজ ক্রমাগত: নিজের প্রাধান্য স্বাবাভিকভাবেই প্রতিষ্ঠা করে ফেলল।  নতুন দেশ জয় বা নিজের দেশরক্ষার কারণে যুদ্ধক্ষেত্রেও তারাই প্রতাপশালী।  সুতরাং সমস্ত ক্ষেত্রেই পুরুষকুল অজানিত উচ্চাসনে নিজেদের শক্তিপ্রয়োগে সক্ষম হল।যদিও আদি যুগে শোনা যায় নারীরা শিক্ষা ইত্যাদি ক্ষেত্রে কোনো কোনো সময়ে নিজেদের সামর্থ্য প্রদর্শন করতে পেরেছেন এবং সফলও হয়েছেন।  মধ্য যুগ থেকে নারীর সাম্যের কোন হদিশ পাওয়া যায় না  তৎকালীন  কোনো সূত্র থেকেই।  নারীর অগ্রাধিকার রয়ে গেলো সৌন্দর্য্য, যৌন আবেদন – অর্থাৎ পুরুষের কামনার বস্তু হিসেবে।  কালক্রমে নারীও অভ্যস্ত হয়ে পড়লো সেই চিন্তাধারায়।  ফলস্বরূপ পরিণত হলো পুরুষের ক্রীড়নকে।
নারীর অর্থনৈতিক পরিস্থিতির উন্নতি ঘটেছে বা ঘটছে বহুদিন – তবে তো পূর্বাক্ত ধারণা অনুযায়ী নারীর সমস্ত শৃঙ্খল থেকে মুক্ত হওয়া উচিত – পারিবারে কিংবা সমাজে। আসলে প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তন যত  সহজে সম্ভব হৃদয়ের পরিবর্তন বা মানসিকতার পরিবর্তন তত সহজ নয় । শতেক শতাব্দী ধরে শিরে নেমে আসা অসম্মান আর নারীর নিজের মনেও যেন প্রস্তরীভূত হয়ে জমে আছে । প্রতিপক্ষ কখনো কাওকে বাঁধন কাটতে সাহায্য করে না । বা কোনো ক্ষেত্রে করে থাকলেও নিজের ডানায় যদি জোর না থাকে খাঁচার পাখি কিভাবে উড়ে যাবে ? জোর তো তার হরণ  করা   হয়েছে বহুকাল ধরে বদ্ধ অবস্থায় বাস করে ।
তাই একমাত্র শক্তি আসতে পারে মনের জোর বাড়িয়ে নিজেকেই নিজে দৃঢ়পায়ে এগিয়ে চলার পথে স্থাপন করার মাধ্যমে।  নারীমুক্তির প্রধান উপায় কখনোই তাই হতে পারে না কেবল অর্থনৈতিক স্বাধীনতা। যতক্ষন না পরিবারে বা সমাজে নিজের মতপ্রকাশের এবং নিজের মতানুযায়ী কার্যকলাপের অধিকার পাবে ততক্ষন নারীসমাজের সমস্তরে প্রতিষ্ঠার সুযোগ নেই। বহু ক্ষেত্রেই দেখেছি নারীরা পরমুখাপেক্ষী বা বিশেষ সুবিধা লাভে আগ্রহী নিজেদের উন্নয়নের পথ সুগম করার জন্য। কিন্তু কেন? নারী তো কোন অংশে হীন নয় যে তার জন্য বিশেষ ব্যবস্থার প্রয়োজন হবে? যেদিন সমস্ত নারীরা নিজের মনে বিশ্বাস করবেন যে তাদের জীবনপথে অপরের কোন অবশ্য প্রয়োজন নেই ততদিন নারীমুক্তি অসম্ভব। নারীবাদ বলে কোন তত্ত্ব হতে পারে না। নারী কোনো বিশেষ জীব নয় , সে একেবারেই সাধারণ একটি মানুষ। এক জন পুরুষের যেরকম ক্ষমতা, মেধা ইত্যাদি দ্বারা পৃথিবীতে তার যোগ্যতা নিরুপন করা হয়, এক নারীর ক্ষেত্রেও তাই হওয়া সমীচীন। অপরপক্ষে মানসিক, দৈহিক, জৈবিক চাহিদা পূরণের অধিকার ও তার একই থাকার কথা – তা অকপটে প্রকাশের অধিকারও তার থাকা উচিত। জীবিকা দ্বারা অর্থ উপার্জন করেও নম্র  নেত্রপাতে সে এক অলীক স্বপ্ন হয়েই যদি থেকে যায় তবে তার স্বাভাবিক জীবন যাপন স্বম্ভব নয়।
নারীর উন্নতিকল্পে পুরোধা যারা তারা অনেকসময়ই নিজেদের বিশেষ দলবদ্ধ জীব হিসেবে কল্পনা করতে ভালোবাসেন, তবে কেন তারা অন্যের কাছ থেকে উদারনৈতিক ব্যবহার আশা করবেন? একটা সামাজিক এবং কিছু ক্ষেত্রে বা বেশিরভাগ ক্ষেত্রে একটা মানসিক পরিস্থিতি তৈরি করা হয়েছে তা নিশ্চয়ই নারীর ক্ষেত্রে কিছুটা অসুবিধাজনক। কিন্তু তার পরিবর্তনের জন্য সমগ্র সমাজের মানসিক পরিবর্তন বা চেতনা উন্মেষ প্রয়োজন ।
তবে বিশেষ রূপে প্রয়োজন নারী চেতনার – আর পাঁচজন পুরুষ যেমন নিজের আর্থ-সামাজিক পরিস্থিতি, শিক্ষা, কায়িক ক্ষমতা ইত্যাদির দ্বারা জীবনে প্রতিষ্ঠিত  হয় সেই অধিকার যে তার ও আছে সেটাই তার মনে প্রতিটা হওয়া  দরকার। নিশ্চয়ই আমাদের মত উন্নতিশীল বা পশ্চাৎপদ দেশগুলিতে নারীর  জীবনে প্রতিষ্ঠালাভ প্রতিপদে বাধার সম্মুখীন হয়। তা কাটিয়ে ওঠার জন্য শুধু আইনি বা প্রাতিষ্ঠানিক সুযোগ সুবিধা যথেষ্ট হবে না, নিজের চিন্তাধারার বিকাশই একমাত্র তার থেকে পরিত্রানের উপায়। অর্থনৈতিক শক্তি সেখানে অবশ্যই প্রয়োজনীয় কিন্তু যথেষ্ট নয় ।
লেখক: অনলাইন এক্টিভিষ্ট ।

Comments

comments

Updated: ৮ অক্টোবর, ২০১৭, ২ টা ২১ মিনিট, অপরাহ্ণ — ২:২১ অপরাহ্ণ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আমার কলম © ২০১৭, সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। লেখা পাঠানোর ঠিকানা: editor@amarkolom.com