শেকল ভাঙার গান

তাহমিনা শাম্মী:

পুরুষতন্ত্র সমাজের একটি পুরাতন ব্যাধির নাম যা রাজনীতি ও ধর্মের মধ্যদিয়ে সমাজে প্রবেশ করেছে। সমাজ, সংসার, রাষ্ট্র, সর্বোপরি মানুষের রক্তের ভিতর পর্যন্ত এর বীজ প্রসারিত। বাবা-মা ছেলে সন্তানটির মধ্যে যখন নিজেদের ভবিষ্যৎ দেখতে শুরু করে তখন থেকেই ছেলে সন্তাটির মধ্যে অহমিকা, পৌরুষ ও ঈশ্বরের বীজ প্রবেশ করতে শুরু করে, আর মেয়ে সন্তানটির মধ্যে দুর্বলতা, হীনমন্যতা, ও প্রভুভক্তি প্রবেশ করতে শুরু করে। আর এভাবেই প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুকে পরে পুরুষতন্ত্রের বীজ।

প্রকৃতির নিয়মে নারী ও পুরুষ আলাদা অঙ্গ নিয়ে জন্ম গ্রহণ করে এটা যেমন সত্য তেমনি কিন্তু জন্মের সাথে সাথে তারা নিজেদের আচার আচরণ কেমন হবে সে সম্পর্কে জানতে পারে না, সমাজই তাদের শিখিয়ে দেয় একজন পুরুষের ও নারীর কী করতে হবে কীভাবে খেলতে হবে, কী নিয়ে খেলতে হবে ইত্যাদি। এভাবেই খেলনা থেকে শুরু করে সাঁজসজ্জা, অঙ্গভঙ্গি, চলাফেলারা সব কিছুতেই নারী ও পুরুষকে তাঁদের নিজেদের অবস্থান বুঝিয়ে দেওয়া হয় আর পুরুষতান্ত্রিকতার ভিত্তি স্থাপন করা হয়। নারীদের জন্য জন্য দেওয়া হয় অসংখ্য নিয়ম ও শৃঙ্খলের বেড়াজাল, পুরুষের জন্য উন্মুক্ত আকাশ।

আমরা সবাই জানি, নারীদের হাতধরেই মানুষ বন্য জীবন ছেড়ে একদিন সভ্য সমাজের সন্ধান পেয়েছিলো, তখন নারীদের হাতেই ছিলো সমস্ত ক্ষমতা এবং মতৃতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থায় পরিচালিত হতো প্রতিটি পুরুষ। কিন্তু পুরুষরা নিজেদের শারীরিক শক্তি অনুধাবন করে ধীরে ধীরে নারীদের উপর নিজেদের ইচ্ছা অনিচ্ছা চাপিয়ে দিয়ে তাদের উপর অধিকার প্রতিষ্ঠা শুরু করলো, এবং একপর্যায়ে নিজেদের ঈশ্বর ভাবতে শুরু করলো। এরপর তারা নারীদের শুধু শারীরিকভাবেই নয় মানুষিক ভাবেও বশীভূত করতে ধর্মের মধ্যেও তাদের জন্য জুড়ে দিলো বিশেষ বিশেষ আইন, রীতিনীতি ও অনুশাসন। এভাবেই পুরুষরা নারীদের দাঁড় করিয়ে দিলো নিচু শ্রেনীতে আর তারা উঠে এলো প্রভু হিসেবে। এবং জয় জয়কার হলো পুরুষতন্ত্রের।

এবার আসি সংজ্ঞায়, পুরুষতন্ত্র হলো সেই সমাজব্যবস্থা যেখানে ধর্মের ও শক্তির দোহাই দিয়ে সমাজের প্রতিটি স্তরে নারীকে বঞ্চিত করা হয়, উপেক্ষা করা হয়, নির্যাতন করা হয়, ইচ্ছেমতো ভালোবাসা হয় আবার পন্য হিসেবে বাজারজাতকরণ করা হয়। যেখানে নারীর প্রতিভাকে অস্বীকার করে তাকে পুরুষদের নির্মিত ব্যূহের মধ্যে আবদ্ধ করে রাখা হয় তা ঘর বা পতিতালয় যে স্থানই হোক না কেনো।

এ সমাজ ব্যবস্থায় নারীকে অনেকটা পণ্যের মতো ব্যবহার করা হয়। পুরুষতান্ত্রিক সমাজে পর্দা প্রথার মধ্য দিয়ে একদিকে প্রতিমা বানিয়ে পূজা করা হচ্ছে অন্য দিকে শাঁখা সিঁদুর পড়িয়ে বিকলাঙ্গ করে রাখা হচ্ছে। আবার একদিকে যেমন পর্দা প্রথার মধ্য দিয়ে নারীকে বন্দী/ আবদ্ধ করে রাখা হয়েছে, অন্য দিকে শারীরিক নির্যাতন ও ধর্ষণ করা হচ্ছে। পুরুষতন্ত্র দাসীদেরো মুক্তি দেয়নি। তার হাজার হাজার প্রমান আরবের শেখদের কাছ থেকে পাওয়া যায়। মন্দিরে সেবাদাসীর নামেও যুগেরপর যুগ তাঁদের ধর্মগুরুরা যৌন দাসী করে রেখেছে। বাইবেল বা তোরাহ (তাওরাত)-তেও নারীদের কোনো সম্মান দেওয়া হয়নি। বাংলায় একটা বাজে শুনতে একটা প্রবাদ আছে ‘রসুনের সব কোয়ার এক পাছা’। পুরুষতন্ত্রে ধর্মটাও ঠিক তাই, বিভিন্ন ধর্মগ্রন্থগুলো হচ্ছে রসুনের কোয়া আর পাছা হচ্ছে, নারীদের কীভাবে অবমূল্যায়ন করা যায়। আর ধর্মের অপর পিঠের নাম হচ্ছে পুরুষতন্ত্র।

কিন্তু সময়ের সাথে সবকিছু বদলে যায়, একসময় শক্তি দিয়ে যেমন সবকিছু জয় করা যেতো এখন আর সেটা সম্ভব না। নারীরা এখন শিক্ষিত হচ্ছে। এখন তারা নিজেদের শক্তি সম্পর্কেও ধারণা পাচ্ছে। আসলে শক্তি দিয়ে সব জয় করা যায় না। মানুষ সমস্ত প্রাণীকুলকে শাসন করছে শুধুমাত্র তাদের মেধা ও বুদ্ধির বলে, মেধা ও বুদ্ধিতে নারীরা কোনো অংশে কম নয়। এতোকাল পুরুষ যেমন মাথা উঁচু করে চলেছে এখন নারীদের তাই চলতে হবে।

নারী উন্নয়ের জন্য কী করতে হবে তা নারী জাগরণের অগ্র দূতেরা চমৎকার বলে গিয়েছেন।

তবে আমাদের সমাজের গোড়া থেকে এই পুরুষতন্ত্রকে সমূলে উৎপাটন করে নারী ও পুরুষের সমতা রচনা করতে হলে সবার আগে প্রয়োজন শিক্ষা ও সচেতনতার মাধ্যমে লিঙ্গ বৈষম্য ঘুচিয়ে দেওয়া। পরিবার থেকে এ শিক্ষা শুরু করতে হবে। সর্বাগ্রে একটা নারীকে আরেকটা নারীরা শক্তি হয়ে দাড়াতে হবে এবং বুদ্ধি ও মেধাভিত্তিক চর্চা করাতে হবে।

পুরুষতন্ত্র নিয়ে কথা বলছি বলে আমার কথার মানে এই নয় যে পুরুষতন্ত্র মানে পৃথিবীর তাবৎ পুরুষই খারাপ বা একই প্রকৃতির। ভালোর সাথে মন্দের মিশেল থাকবেই, একশ্রেরনীর পুরুষ যেমন নারীদের অসম্মান আর অপমান দিয়ে এসেছে অন্য আরেক শ্রেনীর পুরুষই আবার তাঁদের পাশে দাঁড়িয়েছে, নিজেকে সম্মান করতে শিখিয়েছে। আসলে পুরুষরাও যে পুরুষদের দ্বারা নির্যাতিত হয় না তা নয়। আমি পুরুষের বিপক্ষে নই, পুরুষতন্ত্রের বিপক্ষে। আমি চাই এই পুরুষতন্ত্র ভেঙে সাম্যতার পৃথিবী নির্মাণ হোক যেখানে পুরুষতন্ত্রের চাপিয়ে দেয়া নিয়মগুলো শরীরে ধারণ করে কোনো নারীকে বাঁচতে হবে না। পুরুষ এবং নারী প্রত্যেকেই তার নিজ নিজ স্বাধীনতায় একে অপরকে সম্মান করে ভালোবেসে একসাথে পথ চলবে। অপার ভালোবাসা থেকে জন্ম দেওয়া সন্তানেরা (নারী-পুরুষ, কালো-ফার্সা, বেটে-লম্বা যেমনই হোক) নিজ স্বাধীনতায় খেলে বেড়াক পৃথিবীর ময়দানে। বৈষম্যহীন সত্য ও সুন্দরের পৃথিবী হোক।

লেখক : তরুণ কবি ও প্রাবন্ধিক ।

Comments

comments

Updated: ৮ অক্টোবর, ২০১৭, ৯ টা ৫৮ মিনিট, অপরাহ্ণ — ৯:৫৮ অপরাহ্ণ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আমার কলম © ২০১৭, সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। লেখা পাঠানোর ঠিকানা: editor@amarkolom.com