Home / রাজ্যের যুক্তি-তর্ক / আপনার শিশুকে ‘মনুষ্যত্বের’ শিক্ষা দিন

আপনার শিশুকে ‘মনুষ্যত্বের’ শিক্ষা দিন

রমা রানী দেব :

“মানব জীবনের ক্ষুদ্র স্মৃতিপাতায় কত ঘটনাই ভীড় জমায়। কতক স্মৃতির অতলে তলিয়ে যায় আর কতক মনের মণি কোঠায় গাঢ় স্থান পায়,যা ভুলা যায় না কোনক্রমেই” – কবির কবিতার মতই জীবনের এই মধ্যাহ্নে এসে দাঁড়িয়ে শৈশবের স্মৃতিগুলো মনকে প্রায়ই দোলা দেয়। আমার জন্ম হবিগঞ্জের ছোট্ট একটি গ্রাম ভুগলিতে। গ্রামে আমাদের বাড়িটি ‘ডাক্তার বাড়ি’ নামে পরিচিত। আমার বাবা ড রাধারঞ্জন দেব ই ছিলেন ডাক্তার বাড়ির ডাক্তার। যৌথ পরিবারে বাবার তিন ভাইয়ের মধ্যে বড় জ্যাঠা মহাশয় ছিলেন খুবই ধার্মিক। সারাদিন ধর্মকর্ম নিয়ে থাকতেন আর আমি এবং আমার ছোট ভাই মিহিরকে নিয়েই উনার সময় কাটতো।

মেজ জ্যাঠাকে কোনদিন চোখে দেখিনি। বাড়ির বড়দের কাছ থেকে শুনেছি উনি কলকাতায় এক কলেজের অর্থনীতির প্রফেসর ছিলেন; সেই সাথে রাজনীতির সাথে সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন। ভারত পাকিস্তান পৃথক হবার পর উনার আর কোন খোজ খবর পাওয়া যায় নি কখনো। আমাদের বাড়ির ডান পাশে ছিল আনছবউল্লাহ চাচা আর বাম পাশে ছিল ওয়াছউল্লাহ চাচাদের বাড়ি। আশেপাশের বাড়িঘর মিলিয়ে আমাদের সমবয়সি ছেলেমেয়ের কোন অভাব ছিল না। হিন্দু মুসলিম সবাই আমরা একসাথেই বড় হয়েছি। আমাদের ছোটবেলা কেটেছে একসাথেই। প্রাইমারী স্কুল থেকে শুরু করে হাইস্কুল আমরা সবাই দল বেধে একসাথে যেতাম। আমাদের বাড়ি থেকে স্কুল অনেক দূরে ছিল। পুরোটা রাস্তা হেঁটে যেতে হত।তাই সবাই একসাথে যাওয়াটাই নিরাপদ ছিল আমাদের কাছে। আবার বিকালে স্কুল থেকে এসে সবাই একসাথে খেলাধুলা,দৌড়াদৌড়ি কত আনন্দে কেটেছে আমাদের শৈশবকাল।

প্রায়ই সন্ধ্যার পরে বাবা-চাচারা মিলে উঠানে গল্পের আসর বসত। মাঝে মাঝে বসত গাজীর গীতের আসর। ঈদের দিনে আমরা চাচাদের বাড়ি যেতাম, মজা করতাম অনেক। ঈদের আনন্দটা সবাই একসাথে ভাগাভাগি করে নিতাম। ঠিক তেমনি আমাদের বিভিন্নপূজা পার্বনে চাচাদের বাড়ির সবাই আমাদের আনন্দে সামিল হতেন। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় আমাদের পরিবার ভারতে আশ্রয় নিয়েছিলাম। যুদ্ধকালীন সেইসময়ে চাচারা আমাদের বাড়ী পাহারা দিয়েছেন। বাবা-চাচাদের বন্ধুত্বের কারনে আমাদের বাড়িঘরের কোন ক্ষয়ক্ষতি হয়নি। এমনকি আমাদের গ্রামের ও পাক হানাদারেরা তেমন কোন ক্ষয়ক্ষতি করতে পারেনি। প্রত্যেকের প্রতি প্রত্যেকের একটা মমত্ববোধ ছিল, ছিল অকৃত্তিম ভালবাসা। আমাদের বাড়িতে কীর্তনের পরে যে লুট হত ,আমরা হিন্দু মুসলিম সবাই মিলে লুট কুড়াতাম। কালীপূজার পরের দিন সবাই একসাথে পটকা ফোটাতাম।

বাবা বাজার থেকে পটকা এনে আমাদের সবাইকে দিতেন।তখন কে হিন্দু আর কে মুসলমান কারো মাথায় থাকত না।আমাদের সবার মধ্যে পটকা ফোটানো নিয়ে এক ধরনের প্রতিযোগিতা চলত। এভাবেই ছিল আমাদের বড় হওয়াটা। কিন্তু আমাদের এই গল্প যেন আজ হারিয়ে যেতে শুরু করেছে।আমাদের মধ্যকার সম্প্রীতির এই বন্ধ যেন আজ ধীরে ধীরে বিলীন হতে চলেছে। খুব কষ্ট পাই যখন সাম্প্রদায়িক সহিংসতার কথা শুনি, এমনতো হবার কথা ছিলোনা? আমার ছোটবেলা, আমাদের সম্প্রীতির গ্রাম ভুগলি, হারিয়ে যাওয়া সুন্দর সেই দিনগুলো এখনো আমাকে আশা যোগায়। আমাদের সেই দিনগুলোকে হারিয়ে যেতে দেয়া যাবে না। আমাদের রক্ষা করতে হবে আমাদের হাজার বছরের পারস্পরিক সম্প্রীতির ঐতিহ্য। আমাদের স্বাধীনতার মূল ছিল ধর্মনিরপেক্ষতা।

সেই মন্ত্র স্মরণ রেখে সব ধর্মের অনুসারিদের সমান গুরুত্ব দিয়ে গড়ে তুলতে হবে ধর্মীয় ও মানবিক মূল্যবোধ সম্পন্ন সমাজ। আমাদের সময়ে আমরা সম্প্রীতির সবচেয়ে বড় শিক্ষাটা পেয়েছি আমাদের পরিবার থেকে, কখনো মানুষকে ধর্ম দিয়ে আলাদা করতে শিখিনি। আমরা ভালোবেসেছি আমাদের প্রতিবেশীকে তা সে যেই ধর্মেরই হউক না কেন। আমি তাই মনে করি আমাদের শিশুদেরকে ‘মনুষ্যত্ব’ শেখানোটা খুব জরুরি। তারা যাতে সংবেদনশীল মানবিক মানুষ হয়ে গড়ে উঠতে পারে সেই অসাম্প্রদায়িকতার শিক্ষার শুরুটা করতে হবে যার যার ঘর থেকেই। পরিশেষে বর্তমান সমাজ ব্যবস্থার আলোকে মধ্যযুগের কবি চন্ডিদাশের কবিতার কয়েকটা লাইন দিয়েই শেষ করতে চাই যার মানবিক বানী এ যুগের মানুষকেও পথ দেখাতে সাহায্য করবে বলেই আমার বিশ্বাস- “কিসের তন্ত্র কিসের মন্ত্র মানুষ ভজ ভাই সবার উপরে মানুষ সত্য তাহার উপরে নাই”

লেখক: প্রাক্তন শিক্ষিকা, ফতেহপুর সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়, সিলেট ।

Comments

comments

Check Also

পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি ২০ বছরেও পূরণ হয়নি ।। প্রসেনজীৎ কুমার রায়

পার্বত্য শান্তি চুক্তি বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ী আদিবাসীদের সঙ্গে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ বন্ধ এবং শান্তি প্রতিষ্ঠার …