Home / ইতিহাসের পাতা / অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখি

অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখি

শীর্ষেন্দু শেখর বিশ্বাস :

আমি আশায় বাঁচি। বেঁচে থাকার রসদ খুঁজি। ছোট ছোট কিন্তু অনেক বড় স্থান করে নেয়া ঘটনাগুলো আমাকে স্বপ্ন দেখতেই সাহস দেখায়। তাই আমি সব দুঃস্বপ্নের মাঝেই আবার স্বপ্ন দেখি আমার সেই স্বপ্নের আবাস ভূমির। জন্মেজয়ের পাড়, বাংলাদেশের অন্য দশটা ছোট পাড়ার মত একটি পাড়া। বরিশাল জেলার আগৈলঝাড়া উপজেলার এই ছোট্ট পাড়া গড়ে উঠেছে একটি দীঘিকে কেন্দ্র করে। কি নেই এই ছোট্ট পাড়া টুকুতে? শান্তি-সম্প্রীতি-অশান্তি-হৃদ্যতা। মানুষে মানুষে ভালবাসা যেমন আছে, তেমনি আছে নিত্য দিনের ঝগড়া ঝাটি। কিন্তু একের বিপদে অন্য হাজির। ভালবাসা ও ঘৃনা তো মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি।

কিন্ত সব কিছু ছাপিয়ে প্রায় সব সময়ই এই গ্রামের মানুষের মানুষ হয়ে ওঠার গল্প টাই আমার কাছে যেন বেশি রঙ্গিন হয়ে ওঠে। এমনি বৈচিত্রময় গ্রামেই আমার জন্ম, আমার বেড়ে ওঠা। আজ আমি এই গ্রামেরই কিছু গল্প শোনাব আপনাদের, যা সবই আমার ব্যক্তিগত ভাবে খুব কাছ থেকে দেখা ঘটনা। হয়ত ছোট কিন্তু আমাকেই এই ঘটনাগুলো আজও স্বপ্ন দেখায়। একটা শোনা গল্প দিয়েই শুরু করি, গ্রামের পশ্চিম পাশে কালী মন্দির। তার পাশের নগর বাড়ি। যেখানে সবাই ইসলাম ধর্মে বিশ্বাসী। একসময়ে আমাদের এই কালী মন্দিরে বিশাল ধুম ধাম করে পুজা হোত। কবি গান হোত। সেখানে এই অনুষ্ঠান করার জন্য হিন্দু মুসলিম খ্রিষ্টান সবাই চাঁদা দিত।

বড় দিনের আগে মহাত্মা যীশু খ্রিস্টের গুন কীর্তন করে নেচে গেয়ে যে নগর কির্তন করা হয় তা কেউ দেখেছেন? এমন আনন্দের আয়োজন যারা দেখেন নাই তারা অনেক কিছুই জিবনে মিস করেছেন। আমি আমার বড় ভাইদের মত নগর কির্তনে নেচে গেয়ে যীশু খ্রীস্টের গুন কীর্তন করে চাঁদা তুলে পিকনিক করেছি। গির্জার রবিবারে মিশাতে উপস্থিত থেকে ফাদারের কাছ থেকে হাতের তালুতে দ্রাক্ষারস নিয়ে খেয়েছি কতবার। বড় বড় ঝালর নিয়ে নগর বাড়ির রহমান ভাই যখন গাজির গান গাইতেন আমাদের উঠোনে তখন আমাদের মধ্যে বয়ে যেত উৎসবের আনন্দ।

সকাল বিকাল রাত আজানের মধুর সুরের সাথেই আমার পাড়ার লোকেরা সময়ের হিসাব বুঝে নিত। আমাদের পঞ্চপল্লীর সার্বজনীন দূর্গোতসবে যখন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান পরিচালনার জন্য মাইক্রোফোন হাতে নিতাম, দেখতাম বেশির ভাগ অংশগ্রহন কারীই মুসলিম ধর্মের। আমার বিশ্বাস এখনও খুব বেশি পরিবর্তন হয়নি এই অবস্থার। একবার পূজায় আসুন আমাদের উপজেলায়, দেখবেন ধর্ম যার যার অনুষ্ঠান সবার কথাটা কতটাই না স্বার্থক এখানে। এবার আমার জিবনের গল্পটাই বলি আপনাদের। আমার বাবা স্বর্গীয় বিভূতি ভূষণ বিশ্বাস কে শুধু শিক্ষক নয় অনেকেই দেবতা বলে মানতেন। তার অসুস্থতার সময়ে ডাক্তার ফজলু ভাই দিনরাত বাবা কে চিকিৎসা করেছেন। অনেক সময় তার ভিজট পর্যন্ত দিতে পারি নাই।

কিন্তু তিনি এমনকি সারা রাত বাবার পাশে বসে চিকিৎসার পাশাপাশি তার হাত টিপে দিচ্ছেন যেন বাবা একটু আরাম পান। নগর বাড়ির অনেকেই ধনশা ফকিরের কবরে মোমবাতি ও আগরবাতি দিয়েছেন বাবার সুস্থতা কামনা করে। পাশের বাড়ির জেঠিমা সিস্টার আর ব্রাদারদের ডেকে ধর্মীয় সভা করে বাবার রোগমুক্তির প্রার্থনা করেছেন। বাবার মৃত্যুর পরে শ্রাদ্ধের কত কাজই না গ্রামের সবাই ধর্ম বর্ন নির্বিশেষে করেছে। কুড়াল দিয়ে গাছ কেটে লাকড়ি করেছে। প্যান্ডেল বেঁধেছে। কাজ করেছে। এই দৃশ্য কোথায় পাব আমাদের এই দেশ ছাড়া!! ছোট বেলাতে ফরমান ফকির ভাই কে তো সকাল বিকাল আমাদের বাড়িতেই পড়ে থাকতেন।

তার রিক্সা চালাতাম মজা করে। মাকে যখন কাকি মা বলে সেই ফরমান ভাই ডাক দিত কেউ কি বুঝতে পারত যে তিনি আমাদের ঘরের বাইরের কেউ না। ইস্তিফান দা তো কত রাত না ঘুমিয়ে বাবার বিছানার পাশে জেগে থাকত। শান্তিলতা জেঠি মা কখনও আমাকে বাবা ছাড়া ডাকে নাই। কিংবা কফিল তালই যিনি কিনা বিপদের ঝুকি নিয়ে বাবার পাশে দাড়িয়েছেন বার বার, তাকেই বা ধর্মের কারনে কিভাবে দূরে ঠেলে দেই। এখনও বাড়ি গেলে সকলে যখন কথা বলে মনে হয় কত আপন তারা। বিশ্বাস করুন, আমি কখনোই মানসিকভাবে দূর্বল হই না। কয়েকদিন আগে আমার বাবার ২০ তম মৃত্যু বার্ষিকিতে প্রথাগত ভাবেই পাড়ার সকল কিশোর যুবকরা সমস্ত কাজ করেছে। এখানে মানুষকে ভেদাভেদ করা হয় নাই হিন্দু খ্রিষ্টান নামে। আমি স্বপ্ন দেখি একদিন আমাদের ছোট পাড়ার এই ভালবাসার শক্তিতে জেগে উঠবে সারা বাংলাদেশ। স্বপ্ন দেখি সেই সুদিনের, যেদিন সবাই মিলে একসাথে হাসতে পারব, পারব বুকে বুক মিশিয়ে হু হু করে কাঁদতে। জয় মানবতার জয়।

Comments

comments

Check Also

শ্রেষ্ঠ উপহার অাজ হারিয়ে ফেলেছি ।। মোঃছানা উল্লাহ সেলিম

মোঃ ছানা উল্লাহ সেলিম: গত ২০১২ সালের রমজান মাসের ৫ম তম রোজার দিন অামার বাবাকে …