জীবনের রেলগাড়ি থেমে গেলো

শিপ্ত বড়ুয়া :

“গরীবরা চুরি করেনা, তারা পরিশ্রম করে উপার্জন করে। চুরি করে শালার বড়লোকেরা। এই অঙ্ক বুঝিতেই হইবে”

“তোমরা না তরুণ, তোমরা না যুবক- তোমাদের ভয় কিসের! তোমরা পারবে না কেন? এই সমাজ, এই পঁচা-গলা সমাজ ভাঙ্গা ছাড়া মুক্তি আসবে না”

“সমাজতন্ত্র গণমানুষের একমাত্র মুক্তির পথ”- এছাড়াও অসংখ্য মূল্যবান কথা আছে জসিম উদ্দিন মন্ডল’র ঝুড়িতে। কেউ কেউ বলছেন শেষ কমিউনিস্ট নেতা চিরবিদায় নিলেন। হয়তো অনেক অনেক কমিউনিস্ট নেতার মধ্য থেকে আর কোন জসিম উদ্দিনকে পাওয়া যাবে না।

বৃটিশবিরোধী সশস্ত্র সংগ্রামের নেতা এবং মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক কমরেড জসীমউদ্দিন মণ্ডল আজ ভোরে ০২/১০/২০১৭ইং তারিখ ৯৭ বছর বয়সে ঢাকার একটি হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন। বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির সাবেক প্রেসিডিয়াম সদস্য তিনি এবং কমিউনিস্ট পার্টির উপদেষ্টা ছিলেন। কর্মজীবনে ছিলেন বৃটিশ রেলওয়ের কর্মী, কয়লার ইঞ্জিনে কয়লা ভরার কষ্টসাধ্য আর ঝুঁকিপূর্ণ কাজ। ঈশ্বরদীর পূর্ব টেংরির বাসাতেই কেটেছে সারা জীবন। মানুষের মুক্তির সনদ দিতে গিয়ে বিভিন্ন সময় মাঝের ১৬ বছর অবশ্য কাটাতে হয়েছে কারাগারে। পশ্চিমবঙ্গের প্রাক্তন মূখ্যমন্ত্রী কমরেড জ্যোতি বসুর ঘনিষ্ঠ সহচরও ছিলেন তিনি।

ডক্টরেট, ব্যারিস্টার, প্রফেসর সবাই নিজেদের রশদ যোগাতেন কমরেড জসিম উদ্দিনের জীবনের নানান অভিজ্ঞতা থেকে। ছাত্র, যুবক, জনতার বুকে সাহস এঁকে দিতেন এই মানুষটি। শেষ বয়সে এসে যখন মৃত্যুশয্যায় তখনো তিনি একটুও ভীতু নন, সহজভাবেই উত্তর দিচ্ছিলেন “জন্মিলে মরিতে হইবে”। কমরেড জসিম উদ্দিন মন্ডল দেহ ত্যাগ করেছেন ঠিকই কিন্তু লক্ষ লক্ষ ছাত্র,যুবক, জনতার হৃদয়ে আজীবন বিপ্লবের সঞ্চার হিসেবে থাকবেন এই আজীবন বিপ্লবী।

আমার মনে আছে, আমি যখন নতুন নতুন ছাত্র ইউনিয়ন করছি তখন এক কমরেড আমাকে কমরেড জসিম উদ্দিন মন্ডলের লেখা “জীবনের রেলগাড়ি”- বইটি পড়তে দিয়েছিলেন এবং আমি বইয়ের নাম দেখেই বেশ উৎসাহ নিয়েই বইটি পড়েছিলাম আর সেদিন দেখেছিলাম আমার মধ্যেও একজন জসিম উদ্দিনের বসবাস আছে, আছে উদ্যম। সেদিন থেকেই আমি নিজেকে অন্যরকমভাবে ভাবতে শুরু করেছি এবং নিজের জীবনের রেলগাড়ি টেনে নিয়ে যাচ্ছি।

খুব সহজেই নাকি যে কোন মানুষের সাথে মিশে যেতেন আর আড্ডা দিতেন মানুষের মুক্তি নিয়ে। আজ সকাল ৬.০০ টার দিকে এমন নির্মম খবর শুনে নিজেকে বিছানা ছেড়ে তুলতে পারছিলাম না। কমরেড জসিম উদ্দিন মন্ডলের এমন চলে যাওয়া জাতির জন্য অনেক বড় ক্ষতি। আরো বড় ক্ষতি আমাদের মতো টগবগে যুবকদের জন্য যারা নিজেদের সাহসের সঞ্চার করেন কমরেড জসিম উদ্দিনের মতো মানুষদের বক্তব্য থেকে। আমি শুধু এতোটুকুই বলতে পারি, আপনি চলে গেলেন কিন্তু আপনার দেখিয়ে যাওয়া পথ এবং স্বপ্নের হাত আমরা ধরবো, একদিন এই আকাশে উড়াবো সমাজতন্ত্রের লাল পতাকা।
কমরেড জসীমউদ্দিন মণ্ডল লাল সালাম।

(কমরেড জসিম উদ্দিন মণ্ডল-এর সংক্ষিপ্ত জীবনী)
(সংগৃহীত)

১৯২০ সালে কুষ্টিয়া জেলা কালীদাশপুর গ্রামে কমরেড জসিম উদ্দিন মন্ডল জন্মগ্রহন করেন। তাঁর বাবার নাম হাউসউদ্দীন মণ্ডল রেলওয়েতে চাকরি করতেন। মায়ের নাম জহুরা খাতুন। বাবার চাকুরীর সুবাদে সিরাজগঞ্জে, রানাঘাটে, পার্বতীপুর, ঈশ্বরদী, কোলকাতায় বসবাস করেন। বাবার সাথে কোলকাতায় নারকেলডাঙা রেল কলোনিতে বসবাসকালে মাত্র ১৩-১৪ বছর বয়সে মিছিলে যোগ দিয়ে রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন।
১৯৪০ সালের মাঝামাঝিতে শিয়ালদহে মাসিক ১৫ টাকা মাইনেতে রেলের চাকরিতে যোগ দেন। চাকরির পাশাপাশি ক্রমে লাল ঝান্ডার একজন সক্রিয় কর্মী হিসেবে পরিচিতি পান।

১৯৪০ সালে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিআই)’র সদস্য পদ লাভ করেন।
১৯৪১-৪২ সালে জসিম মণ্ডলের প্রমোশন পেয়ে সেকেন্ড ফায়ারম্যান হন।
রেল শ্রমিক আন্দোলনে তিনি জ্যোতি বসুর সহকর্মি ছিলেন। ১৯৪৬ এর নির্বাচনে রেল আসনে জ্যোতিবসু’র নির্বাচী প্রচারনায় সক্রিয় অংশ নেন।
১৯৪৭ সালে দেশবিভাগের পর জসিম মন্ডল পার্বতীপুর এবং তাঁর বাবা ঈশ্বরদীতে বদলি হয়ে আসেন।

১৯৪৯ সালে রেলের রেশনে চাউলের পরিবর্তে খুদ সরবরাহ করলে রেল শ্রমিক ইউনিয়নের ‘খুদ স্টাইকের’ অপরাধে জসিমউদ্দিন মন্ডলসহ ছয় নেতার বিরুদ্ধে হুলিয়া জারি হয়। একপর্যায়ে পুলিশ তাকে গ্রেফতার করে এবং রেল কর্তৃপক্ষ তাঁকে চাকুরীচ্যুত করে। ১৯৫৪ সালে তিনি মুক্তি পান। মুক্তি পাওয়ার কিছুদিন পর আবার তাঁকে নিরাপত্তা আইনে গ্রেফতার করে জেলে পাঠানো হলো। এসময় রাজশাহী জেলে কিছুদিন থাকার পর তাঁকে ঢাকা সেন্ট্রাল জেলে বদলি করা হল। ১৯৫৬ সালে তিনি মুক্তি লাভ করেন। ১৯৬২ সালের দিকে আবার গ্রেফতার হন এবং ১৯৬৪ সালে মুক্তি পান। মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি কলকাতা চলে যান। সেখানে বাংলাদেশের মুক্তি অগ্রণী ভ‚মিকা পালন করেন। কৃষক-শ্রমিক-মেহনতি মানুষের সার্বিক মুক্তির লড়াই-সংগ্রামের জন্য স্বাধীন বাংলাদেশেও তাঁকে জেল বরণ করতে হেেছ। মোট ১৭ বছর কারারুদ্ধ ছিলেন।

১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধে ৫১ বছর বয়সে জসিম মন্ডল সংগঠক এবং উদ্দীপক হিসেবে ব্যাপক ভুমিকা রাখেন।
১৯৭৩ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভ্রমণ করেন।
১৯৯৩ সালে সিপিবি’র প্রেসিডিয়াম সদস্য নির্বাচিত হন।
২০১২ সালে সিপিবি’র উপদেষ্টা মনোনীত হন। আমৃত্যু এ দায়িত্ব তিনি পালন করেন।
কমরেড জসিম মন্ডল বাংলাদেশ রেল শ্রমিক ইউনিয়ন ও বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের সহসভাপতি ছিলেন। তিনি বাংলাদেশ গার্মেন্ট শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের উপদেষ্টা ছিলেন।
কমরেড জসিম উদ্দিন মন্ডল ১৯৪২ সালে জাহানারা খাতুন মরিয়মের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। কমরেড মরিয়ম তাঁর রাজনৈতিক কর্মকান্ডে উৎসাহ জুগিয়েছেন সারাজীবন। জসিম-জাহানারা দম্পতি পাঁচ কন্যা ও এক পুত্রের জনক-জননী ছিলেন।

লেখক:- সম্পাদক, আমার কলম।

Comments

comments

Updated: ২ অক্টোবর, ২০১৭, ৭ টা ৩৭ মিনিট, অপরাহ্ণ — ৭:৩৭ অপরাহ্ণ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আমার কলম © ২০১৭, সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। লেখা পাঠানোর ঠিকানা: editor@amarkolom.com