Home / ধর্ম ও দর্শন / দর্শনে মার্কসবাদ একটি বিপ্লব

দর্শনে মার্কসবাদ একটি বিপ্লব

মোঃ লুৎফর রহমান :

মহামতি মার্কস ও এঙ্গেলস সৃষ্ট দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদ হচ্ছে দর্শনের ইতিহাসে এক বুনিয়াদি বিপ্লব । এটি বিজ্ঞানের অগ্রযাত্রায়ও একটি বিপ্লব । আমরা যদি ইতিপূর্বে সৃষ্ট দর্শনের সাথে মার্কসবাদকে মেলাই তা হলে তফাৎ দেখতে পাবো । দেখতে পাবো মার্কস ও এঙ্গেলস সৃষ্ট নতুন উপাদানগুলো । (১) মার্কসীয় তত্ত্বের সামাজিক দিক : মার্কস-এঙ্গেলস সৃষ্ট দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদের সামাজিক গুরুত্ব হচ্ছে তাদের দর্শন শ্রমিক শ্রেণির বিশ্ব দৃষ্টিভঙ্গি । তাঁরা দর্শনের সকল প্রশ্নের উত্তর দিয়েছিলেন শ্রমিক শ্রেণি ও অন্যান্য মেহনতি মানুষের স্বার্থের দৃষ্টিকোণ থেকে । বিপ্লবী গণতন্ত্রীদের দার্শনিক তত্ত্বগুলো ব্যতীত আগের সব দার্শনিক তত্ত্বই সম্পদশালী শ্রেণিগুলোর স্বার্থকে এবং প্রয়োজনকে প্রকাশ করেছিলো বরাবরই । (২) শ্রমিক শ্রেণির ভাবাদর্শগত হাতিয়ার : একমাত্র মার্কসবাদী দর্শনই শ্রমিক শ্রেণির স্বার্থের পক্ষের দর্শন, তাদের ভাবাদর্শগত হাতিয়ার । এই দর্শন শ্রমিক শ্রেণি ও অন্যান্য শ্রমজীবী জনতাকে অর্থনৈতিক ও আত্মিক মুক্তির পথ দেখায় । প্রকাশ করে সামাজিক বন্ধনমুক্তির নিয়ম ।

মার্কস বলেছেন,“দর্শন যেমন তার বস্তুগত অস্ত্র খুঁজে পায় প্রলেতারিয়েতের মধ্যে, তেমনি প্রলেতারিয়েত তার আত্মিক অস্ত্র খুঁজে পায় দর্শনের মধ্যে ।” শ্রমজীবীদের ক্ষমতাপ্রাপ্তির জন্য শ্রমিক শ্রেণি এই দর্শন গ্রহণ করেছে । একে তারা ব্যবহার করতে চায় শোষণহীন সমাজ বিনির্মাণে এক ভাবাদর্শগত হাতিয়ার হিসেবে । (৩) পৃথিবী বদলাতে আবশ্যক কর্মপ্রয়োগ : কার্ল মার্কস বলেছেন, “দার্শনিকরা এ যাবৎ পৃথিবীকে শুধু নানাভাবে ব্যাখ্যা করেছেন, আসলে প্রয়োজন একে বদলানো ।” এজন্য তিনি তার দর্শনে কর্মপ্রয়োগের কথা বলেছেন । পৃথিবীকে যদি শ্রমিক শ্রেণির স্বার্থে পরিবর্তন করতে হয় তবে প্রয়োজন হবে সুপরিকল্পিত কর্মের, শুধু ব্যাখ্যায় হবে না । সে জন্যে জানতে হবে পৃথিবীর অস্তিত্বের ও বিকাশের নিয়ম এবং সক্ষম হতে হবে এগুলোর ব্যবহারে । এটি মার্কস ও এঙ্গেলসের দর্শনের একটি নতুন রূপ ।

(৪) বস্তুবাদ ও দ্বন্দ্ববাদের মিলন : মার্কস ও এঙ্গেলস তাদের লক্ষ্য অর্জনের জন্য দর্শনে বস্তুবাদ এবং দ্বন্দ্ববাদকে সৃজনশীলভাবে একত্রে মিলিয়েছিলেন । আগের বস্তুবাদী এবং দ্বান্দ্বিক তত্ত্বগুলো ছিলো অসংগতিপূর্ণ । বস্তুবাদ ছিলো স্বঃতস্ফূর্ত বা অধিবিদ্যাগত বা অধিযন্ত্রবাদী । আর দ্বন্দ্ববাদ ছিলো ভাববাদী । তাঁরা বস্তুবাদকে অধিবিদ্যা থেকে মুক্ত করেন এবং দ্বান্দ্বিকতাকে ভাববাদ থেকে মুক্ত করেন । তাঁরা এ দুটিকে সৃজনশীলভাবে পুনর্বিচার করে বস্তুবাদকে দ্বান্দ্বিকতা দিয়ে সমৃদ্ধ করেছিলেন । এই বিকাশের অর্থ ছিলো বিজ্ঞানসম্মত বিশ্ব দৃষ্টিভঙ্গির বিকাশ সাধন । (৫) দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদকে সমাজজীবনে স্থাপন : মার্কস ও এঙ্গেলস তাঁদের দর্শন দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদকে প্রকৃতির সাথে সাথে মানুষের সমাজেও প্রয়োগ করেন । আগেকার বস্তুবাদীরা অসংগতিপূর্ণ ছিলেন । তাঁরা তাদের বস্তুবাদকে কেবল প্রাকৃতিক ব্যাপারগুলোর উপরই প্রয়োগ করতেন । অন্যদিকে সামাজিক ব্যাপারগুলোর ব্যাখ্যায় ভাববাদেরই প্রাধান্য ছিলো । সমাজে বস্তুবাদী ব্যাখ্যার ফলে মার্কসবাদ বিজ্ঞানসম্মত হয়ে ওঠেছিলো, হয়ে ওঠেছিলো সুসংগত ও সম্পূর্ণ, দ্বান্দ্বিক ও ঐতিহাসিক বস্তুবাদ । এভাবে দ্বান্দ্বিক ও ঐতিহাসিক বস্তুবাদ সৃষ্টি করে মার্কস ও এঙ্গেলস দর্শনের ইতিহাসে এক বিপ্লব সাধন করেছিলেন ।

Comments

comments

Check Also

ধর্মের উত্তরাধিকারি এবং মার্কসবাদের উত্তরাধিকারিরা ধূর্তবাজ!।। তানভীরুল মিরাজ রিপন

তানভীরুল মিরাজ রিপন : ধর্ম আর মার্কসবাদ দুটোই এখন উত্তরাধিকার সূত্রে দখলে গেছে। যারা আকড়ে …