একটি দিনের গল্প

লিটন বড়ুয়া :

পাঁচতলা একটি বাড়ি। পাঁচতলায় থাকে শমিক। দুই তলায় থাকে রফিক সাহেব। বাড়ির মালিক উনি। আজ শনিবার। শমিক ঘুম থেকে ওঠে হাতমুখ ধুয়ে অল্প মুড়ি ও চানাচুর মাখিয়ে কম্পিউটারটা ওপেন করে যথারীতি ফেইসবুকে ঢুকল। ফেইসবুকে ঢুকতেই স্ক্রিনে ভেসে আসে গ্রামের এক পরিচিত ছোট ভাইয়ের হাসোজ্জল ছবি। সে আর নেই। গতরাতে স্ট্রোক করে মারা গেছে। বয়স আনুমানিক ২২-২৩ বছর হবে। এদিকে শমিকের বয়স ২৯ এর কাছাকাছি। মৃত্যুর খবরটা শমিকের মনে তাৎক্ষনিক কোন প্রতিক্রিয়া তৈরি করলো না। মাউসের বাটন ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে ফেইসবুকের স্ক্রিন স্ক্রোল করতে লাগলো। তাঁর মনে হতে লাগলো- স্ক্রিনের আরেকটু নিচে নামলেই বোধ হয় মৃত্যুকে দেখা যাবে। না, ফেইসবুক তাঁর ভালো লাগছে না। ঘুম থেকে ওঠে প্রতিদিন যেখানে সে কমপক্ষে আধঘণ্টা ফেইসবুকে লাইক, কমেন্ট করে কাঁটায় সেখানে সে আজ পাঁচ মিনিটের বেশী ফেইসবুকে থাকতে পারলো না। অতঃপর কম্পিউটার বন্ধ করে শমিক কাজের জন্য তৈরি হতে লাগলো। শার্ট- প্যান্ট পড়ে চুল ঠিক করার জন্য সে তাঁর রুমের আয়নাটার উপর চোখ রাখল। সূর্যের কিছু আলোক রশ্নি জানলা দিয়ে ঢুঁকে থমকে রয়েছে ঠিক আয়নাটার উপর। আয়নাও যথারীতি শমিকের মুখখানি ভাসিয়ে তুলল তার বুকে। আয়না আজ ইচ্ছে করেই শমিকের চেহারায় একটা পরিবর্তন দৃশ্যমান করলো।

একটি সাদা চুল হ্যালির ধুমকেতুর মতন দৃশ্যমান হয়েছে মাথার মাঝখানের চুলের ভাঁজে। চুলটা হয়তো অনেক দিন ধরে ধীরে ধীরে কালো থেকে সাদা রং ধারন করেছে। শমিক চুলটা দেখে হতবম্ব হয়ে গেল। গ্রামে ও শহরে যত সাদা চুলের মানুষকে দেখেছে শমিক তাঁদের সবার প্রতি যে এক ধরনের করুণা দেখিয়েছিল তা আজ ফিরে ফিরে আসছে নিজের দিকে। সে এতদিন জানতো শুধু বুড়ো মানুষেরই চুল পাকে। সাদা চুল শুধু বয়স্ক মানুষের মাথায় মানায়। কারন এই সাদা চুল মৃত্যুর আগাম বার্তা নিয়ে আসে। শমিক চুলটা ছিঁড়বে কি ছিঁড়বে না, মাথার অন্যান্য কালো চুল থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলবে কি ফেলবে না এই নিয়ে বেশ দ্বিধায় পড়ল। সাদা চুলটার গায়ে হাত বুলাতে বুলাতে সে ভাবতে লাগলো- কালো চুলগুলো যেমন এক ধরনের বাস্তবতা ঠিক তেমনি সাদা চুলটিও অন্য আরেক ধরনের বাস্তবতার প্রতিবিম্ব। এরই মধ্যে শমিকের মনে এক ধরনের মৃদু আনন্দ জেগে ওঠলো এই ভেবে যে- মৃত্যু চিন্তাটা থিউরি থেকে অবশেষে আপন শরীরে বাসা বেঁধেছে। এসব চিন্তা করতে করতে শমিক অবচেতনে সাদা চুলটা টান দিয়ে বিচ্ছিন্ন করে ফেলল যদিও সে এমনটা হোক, চাই নি। সাদা চুলতি পরম মমতায় শার্টের পকেটে নিয়ে শমিক গ্রামের বাড়িতে মাকে কল দিল ।

ফোন ধরতেই মা বলল- পাশের বাড়ির মইন্না কাকা মারা গেছে আজ সকালে। সংবাদ শুনে শমিকের মনে কাকার চেহারা ও স্মৃতির আগে তাঁর মাথার দীর্ঘদিনের সাদা চুলের অবয়ব ভেসে ওঠলো। মায়ের সাথে কথোপকথন শেষ করে শমিক তাঁর কানে হেড ফোন গুজে দিয়ে বের হয়ে গেল। শমিক আজকে ভারি কোন নাস্তাও করে নাই, আবার বাসা থেকে বের হওয়ার আগে স্ত্রী অনামিকাকে রোম্যান্টিক সুরে বলল না- ফির মিলিঙ্গে। যেটা গত এক বছরের দাম্পত্য জীবনে উভয়ের অভ্যাসে পরিনত হয়েছে। বাসার নিচে নামতেই বাড়িওলা রফিক সাহেবের সাথে তাঁর দেখা। উনিও বের হচ্ছেন কর্মওস্থলের উদ্দেশ্যে। দুজনের মধ্যকার নাগরিক কুশল বিনিময় শেষে শমিকের প্রস্থান। রফিক সাহেবের বয়স পঞ্চাশ ছুই ছুই। তিন ছেলে মেয়ে ও স্ত্রী জাহানারা সহ তাঁর পরিবারের সদস্য সংখ্যা মত ছয় জন। যদিও দুইজন কাজের ভুয়া অনেকটা স্থায়ীভাবে তাঁর পরিবারে দীর্ঘদিন কাজ করছে। এই বাড়ি ছাড়াও ঢাকা শহরে আরও দুটি পাঁচতলা বিল্ডিঙের মালিক রফিক সাহেব। তিন সন্তানের দুজন দেশের নামীদামী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে এবং ও লেভেল পরীক্ষা দিবে সামনের বছর।

তাঁর প্রায় ৪০ বছর বয়সি স্ত্রী খাস গ্রামের মেয়ে হলেও গত বিশ বছরে সে শহুরে আধুনিক নারী ও মা হয়ে ওঠেছে। রফিক সাহেবের টিকাধারী ব্যবসায়ের পাশাপাশি অন্যান্য অনেক ব্যবসায়ে ছোট বড় বিনিয়োগ রয়েছে। উনি রাতদিন ব্যবসা- বিনিয়োগ- লাভ সংক্রান্ত শব্দের মধ্যে গড়াগড়ি খায়। বিকেলের দিকে রফিক সাহেবের মুঠোফোনে তাঁর গ্রামের বাড়ি থেকে হটাত একটা কল আসে। তাঁর আপন চাচা মুনিব মুন্সী মারা গেছে। এই চাচা রফিক সাহেবকে তাঁর ছাত্রজীবনে টাকা পয়সা ও পরামর্শ দিয়ে সাহায্য করতো। এই সাহায্যের মেয়াদকাল ৫-৬ বছরের মতন হবে। মাঝখানে মুনিব মুন্সীর আয় কমে যাওয়াতে আর্থিক সাহায্য বন্ধ হয়ে যায় তবে নিয়মিত রফিক সাহেবের খোঁজ খবর নিত ও ভালো মন্দ পরামর্শ দেয়ার চেষ্টা করতো। রফিক সাহেবের কাছে আর্থিক সাহায্যটা মানসিক সাহায্যের চাইতে বেশী তীব্র ছিল । অতএব তাঁদের মধ্যকার যোগাযোগটা পরবর্তীতে অচল হয়ে যায়। এরপর রফিক সাহেব ছাত্র ও রাজনৈতিক জীবন শেষে ব্যবসায় নামে এবং অল্প সময়ের মধ্যেই নারী- বাড়ি- গাড়ি- সামাজিক সম্মানের মালিক হয় যেগুলো তাঁর সারা জীবনের কাম্য ছিল।

ঈদের সময় গ্রামে গেলে রফিক সাহেব মুনিব চাচাকে একবার দেখে আসতো ও তাঁর পরিবারকে চাচার অজান্তে কিছু টাকা পয়সা দিয়ে আসতো। চাচা টাকা পয়সার ব্যাপারটা জানলে দুঃখ পাবে এটা সে খুব ভালোভাবেই জানতো। ভালোবাসা ও টাকার পারস্পরিক রুপান্তরের কাহিনি সম্পর্কে চাচা মৃত্যুর আগে জ্ঞাত হয়েছিল কিনা জানা নেই। মুনিব মুন্সীর মৃত্যুসংবাদ রফিক সাহেবের চলমান জীবনকে দুই এক মিনিটের বেশী আটকে রাখতে পারে নাই। সকাল হতেই তাঁর মাথায় ঘুরছে গাড়ির চিন্তা। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর তাঁর ছেলে মেয়েকে নতুন ব্রান্ডের একটা জার্মান গাড়ি কিনে দিবে বলে কথা দিয়েছিল। যদিও তাঁর নিজের ও পরিবারের ব্যবহারের জন্য দুটি গাড়ি ইতিমধ্যে রয়েছে। ব্যাংক ঋণ, চলতি বছরের ব্যবসায়িক লোকসান, দরপত্রের ভাগাভাগি নিয়ে রুই কাতলার যুদ্ধংদেহি অবস্থা, বউকে বছর শেষে আমেরিকা ঘুরতে নিয়ে যাওয়ার কমিটমেন্ত, গাড়ির ড্রাইভারের তেল চুরির কেস সব মিলিয়ে মুনিব মুন্সীর মৃত্যু সংবাদ তাঁর মাথা থেকে নিজ দায়িত্বে অদৃশ্য হয়ে গেল। বিকাশে মুনিব মুন্সীর বড় ছেলেকে কিছু টাকা পাঠিয়ে দিয়ে রফিক সাহেব কাজে ব্যস্ত হয়ে গেল।

রফিক সাহেব বাসায় ফিরল ১১ টায়। তাঁর কাছে আজকের দিনটা গতানুগতিক ছিল যদিও মৃদু একটা খারাপ লাগা আজকে সারাদিন তাঁকে তাড়া করেছে মনের সচেতন ও অবচেতন জগতে। রফিক সাহেব শারীরিক বিভিন্ন সমস্যার কারনে ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী ডায়েট নিয়ন্ত্রন করার চেষ্টা করছে এবং গাড়িতে চলাফেরা কম করে হেঁটে চলাফেরা করার চেষ্টা করছে। তাই তাঁর অবস্থান থেকে বাসার দূরত্ব কম হলে সেই প্রায় সময় হেঁটে বাড়ি ফিরে। রাতে আজ একটা কলা, একটি সিদ্ধ ডিম ও এক পিচ রুটি খেয়ে বিছানায় শুতে গেল। অন্যদিকে শমিকের কাছে আজকের দিনটা জীবনের সবচেয়ে ছোট দিন ছিল। পকেটে সেই সাদা চুল এবং মনে সাদা চুল সম্পর্কিত চিন্তাগুলোর একটা বিশেষ প্রাধান্য ছিল সারাদিন। বিগত অনেক বছরের মধ্যে আজকেই কর্পোরেট কোন চিন্তা প্রথমবারের মতন তাঁকে ছুটি দিয়েছে। সারাদিন তেমন কিছু খায় নি সে। শুধু সিগারেট ও কফি খেয়েছে। আজ রাতে স্ত্রী অনামিকাকে রান্না ঘর থেকে ছুটি দিয়ে সে নিজেই আস্ত এক মুরগি রান্না করেছে। অতঃপর পেট ভরে ভাত খেয়ে, এক প্যাঁক হুইস্কি টান দিয়ে সে বিছানায় ঘুমাতে গেল। অফিসে থাকাকালীন শমিকের মনে হয়েছিল একমাত্র স্ত্রী অনামিকাই পারে তাঁর এই প্রাগৈতিহাসিক বিষাদকে ভালোবাসার ছুরি দিয়ে কেটে ছিন্ন বিচ্ছিন্ন করে ফেলতে কিন্তু বিছানায় শুয়ে পড়তেই সে অবশ হয়ে গেল।

মাঝরাতে শমিক স্বপ্ন দেখতে লাগলো- তাঁর শারীরিক আকার ছোট হয়ে আসছে। অফিসের ফাইল পত্র ছুড়ে মারছে এদিক ওদিক। চিৎকার ও কান্নাকাটি করছে অবিরত। এর মধ্যে প্রয়াত মইন্না কাকা একটি খেলনা ও একটি এক টাকার আইসক্রিম এনে তাঁর হাঁতে দিল এবং একটি ভালোবাসার হাঁসি দিতেই দৃশ্যপট থেকে অদৃশ্য হয়ে গেল। খেলনা ও আইসক্রিম পেয়ে তাঁর কান্না থামলেও তাঁর ক্রমাগত ছোট হয়ে যাওয়া থামছিল না। আইসক্রিমটা মুখে দিতেই সে বমি করতে শুরু করলো ও বমির সাথে পেট থেকে বেরিয়ে আসতে লাগলো মুরগির কলিজা, রানের টুকরা ও মদের গন্ধ। বমি শেষ হতেই তাঁর শারীরিক আকার ও বয়স হয়ে গেল একটা দুই বছরের শিশুর মতন যদিও স্বপ্নের ভাষা নির্ধারণ হচ্ছে বর্তমান শমিকের মানসিক ও শারীরিক বয়স দ্বারা। হাতের আইসক্রিমটা উধাও হয়ে গেল দৃশ্যপট হতে। খেলার মাঠ থেকে মায়ের আঁচল সব জায়গায় সে তন্ন তন্ন হয়ে খুঁজছে অদৃশ্য হয়ে যাওয়া আইসক্রিমটাকে। অবশেষে আইসক্রিমটা কোথাও খুঁজে না পেয়ে সে আবার কান্না শুরু করতেই সে নিজেকে খুঁজে পেল আলো আধার মিশ্রিত একটি কক্ষে যেখানে বেশ কয়েকজন গ্রাম্য ধাত্রী চেষ্টা করছে তাঁকে এক ক্লান্ত – প্রসন্ন মহিলার গর্ভে প্রতিস্থাপন করার যেই গর্ভ থেকে সে ২৯ বছর আগে অপসারিত হয়েছিল। সকল ধাত্রী এক যোগে উচ্চারণ করছে – বিদায় পুত্র, তোমার জন্য এই পৃথিবী নই।

একই সাথে একই বিল্ডিঙে স্বপ্ন দেখছে রফিক সাহেবও। তিনি স্বপ্নের মধ্যে দেখতে পেলেন বিশাল শরীরের অধিকারী এক লোককে। বিশাল তাঁর পাকস্থলী। ব্যাপক তীব্র তাঁর ক্ষুধা যেন পৃথিবীর সমস্ত ক্ষুধা জমা হয়েছে তাঁর পেটে। আর লোকটার সামনে সাজানো আছে পৃথিবীর সবচেয়ে দামি দামি ও সুস্বাদু খাবার। লোকটার চোখে মুখে লেগে আছে ক্ষুধাকে প্রশমিত করার আপ্রান চেষ্টা। কিন্তু লোকটার মুখ ছিদ্র এতই ছোট যে, ভাতের একটি দানাকেই তাঁর ভেঙ্গে ভেঙ্গে খেতে হচ্ছে এক মাস ধরে। পেটে অসীম ক্ষুধা, সামনে সুস্বাদু খাবার, সুইচ এর চাইতে ছোট মুখ ছিদ্র নিয়ে বাঁচার জন্য যুদ্ধ করছে লোকটি।

অতঃপর ভোর হলে শমিক ও রফিক সাহেবের ঘুম ভাঙ্গে যথারীতি। যথারীতি ডুব দেয় জীবন স্রোতে। যথারীতি সেই স্বপ্নের রেশ বয়ে বেড়ায় প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে।

লেখক : শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ।

Comments

comments

Updated: ২৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৭, ১১ টা ৪৪ মিনিট, অপরাহ্ণ — ১১:৪৪ অপরাহ্ণ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আমার কলম © ২০১৭, সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। লেখা পাঠানোর ঠিকানা: editor@amarkolom.com