Home / গল্প অথবা উপন্যাস / মেয়েমানুষের কাঁধ

মেয়েমানুষের কাঁধ

শাশ্বতী বিপ্লব :

আত্মীয় স্বজনে জনাকীর্ণ বাড়ীর উঠানে দাঁড়িয়ে নিঃসীম শুন্যতার অনুভুতিতে ডুবে যায় জুঁই। চারদিকটা একবার চোখ বুলিয়ে নেয়। বিজলী ফুফুকে দেখতে পায় কয়েকজনের সাথে কথা বলছে। তার একটু পেছনেই রহিম কাকা, ইদ্রিস ভাই, আক্কাস চাচা। জড়ো হয়েছে পাড়া প্রতিবেশীরাও। সবাই হঠাৎ তাদের বাড়ীতে কেন এসেছে? বুকের ভেতরটা অজানা আশংকায় ধ্বক করে ওঠে জুঁইয়ের। তবে কি বড় কোন দূর্ঘটনা ঘটেছে তাদের বাড়ীতে? হঠাৎই বাবার কথা মনে পড়ে যায়। আব্বা? আব্বা কোথায় তার?

জুঁইকে দেখতে পেয়ে বিজলী ফুফু এগিয়ে আসে। কিছু একটা বলে তাকে, পিঠে হাত রাখে। কিন্তু জুঁইয়ের কানে কিছুই ঢোকে না। হাতে ধরা ব্যাগটা নিয়ে তড়িঘড়ি করে এগিয়ে যায় ঘরের দিকে। জোরে ডাক দেয়, “আব্বা, আব্বা, কই তুমি? উফ্, পাটুরিয়ায় আইজ যা ভীড়, বাপরে বাপ। আর কি যে গরম! বইসা থাকতে থাকতে সিদ্ধ হয়ে গেসি একদম।“ কিন্তু জুঁই বাবাকে কোথাও দেখতে পায় না। এঘর ওঘর ঘুরে মাকে খুঁজে বের করে, “ওমা, আব্বা কই? দেহিনা যে?” জুঁইকে দেখে সালেহা বেগম নিজেকে আর ধরে রাখতে পারেন না। ডুকরে কেঁদে ওঠেন, “মারে, তুমি আইছোরে মা। তোমার আব্বা যে চইলা গেলোরে মা। চোখ দুইটা দিয়া তোমারে কত খুঁজলো, কত খুঁজলো। আহারে মাগো, তোমার আব্বা তোমারে শেষবার একটু দেখতেও পারলোনা। উনার পরানডা তোমারে দেখার জন্য ছটফট করতেসিলো গো মা।“

জুঁই মনে মনে এমন কিছু একটার আশংকাই করছিলো। তবুও ওর মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়লো যেনো। চারদিকটা শব্দহীন হয়ে গেলো হঠাৎ। এ কেমন কথা! তাকে তো কেউ এই খবরটা জানায়নি! শুধু বলেছে, তোমার আব্বার শরীর ভালো না। তুমি বাড়ী আসো।

জুঁই মাকে ধরে থাকে। নীচু স্বরে জানতে চায়, কখন?

সালেহা বেগম কাঁদতে কাঁদতেই বলেন, “কাইল মাগরিবের পর পরই উনি চইলা গেসেন আমাদের ছাইরা। নামাজ পইড়া শুইছিলেন একটু। বুকে ব্যাথা উঠসিলো। শরীরডা কয়দিন ধইরা এমনিতেই ভালো যাইতেসিলো না। আমারে বললেন, “এইবার জুঁই আসলে ভালো ডাক্তার দেখাবো, বুঝলা জুঁইয়ের মা। একা একা ডাক্তারের কাছে যাইতে ভয় লাগে আমার। জুঁই সাথে থাকলে শক্তি পাই মনে।“ সেই তুমি আইলারে মা, কিন্তু তোমার আব্বাতো আর থাকলো না। কারে তুমি ডাক্তারের কাছে নিবা?

জুঁই কিছুই বলে না। বাবার উপর ভীষণ, ভীষণ অভিমানে গলা ধরে আসে। এতোটা স্বার্থপর কি করে হতে পারে তার আব্বা? তার সাথে কথা না বলে কেমন করে চলে যেতে পারে? জুঁইয়ের বিশ্বাস হতে চায় না। এতটুকু অপেক্ষা করতে পারলো না ওর জন্য? কিসের এতো তাড়া ছিলো আব্বার? এইতো গতকাল বিকালেও মোবাইলে কথা হলো, হোস্টেল থেকে রওনা দেয়ার আগে।

আব্বা বললো, তাড়াহুড়া কইরো না মা। ধীরে সুস্থ্যে আসো।

জুই: তোমার গলাটা এমন শোনায় কেন আব্বা? শরীর কি বেশি খারাপ?

আব্বা: আরে না। আমার তেমন কিছু হয় নাই। বয়স হইসে তো, একটু আধটু শরীর খারাপ তো হইতেই পারে। শোন, তোমার সাথে অনেক কথা আছে আমার। জমিজমা গুলান উইল করতে চাই। আমি না থাকলে তো সাত ভূতে ভাগ বসাইতে আসবো।

জুঁই: সে দেখা যাইবো। তুমি এতো চিন্তা করো ক্যান? এতো তাড়াহুড়ার তো কিছু নাই।

আব্বা: আছেরে মা, আছে। কার কখন কি হয়, তাতো কওন যায় না। সাবধান হওয়া ভালো। থাউক, এখন এইসব আলাপ বাদ দেও। তুমি এইবার বাড়ীতে আসলে বাপ বেটিতে অনেক আড্ডা দিবো। কতদিন আমার মা জননীর সাথে মন ভইরা গল্প করিনা।

জুঁই: আমারও তোমারে অনেক কথা বলার আছে আব্বা। মোবাইলে তো আর সব বলা হয় না। বলা যায়ও না। তোমারে সামনা সামনি বলবো।

আব্বা: আচ্ছা গো মা। অপেক্ষায় থাকলাম।

এই বুঝি আব্বার অপেক্ষায় থাকার নমুনা হইলো? চইলাই যদি যাবে তাইলে তারে কেন মিথ্যা বললো আব্বা? আড্ডা দিবে বইলা এমন কইরা ফাঁকি দিলো? শেষ কথাটা বলার জন্যও একটু অপেক্ষা করতে পারলো না? অভিমানে কথা খুঁজে পায়না জুঁই। মাকে ছেড়ে নিজের ঘরের দিকে রওনা হয়। কাপড় চোপড় ছাড়ে, তারপর কলতলায় গিয়ে ওজু করে নেয়। একটা কল দেয়া পুতুল যেনো সে। একমনে কাজ করে যায়, একটুও কাঁদে না। আলমারী থেকে কোরান শরীফটা নামায় নীরবে। বিছানার উপর রেহেলে রেখে পড়তে বসে, “ইয়া-সী ন। ওয়াল কুর্‌আনিল হাকিম। ইন্নাকা লামিনাল্ মুরসালীন। আলা সিরাতিম্ মুস্‌তাক্বীম।“ সুরার সুরের সাথে সাথে মাথার ভিতর সেলুলয়েডের ফিতার মতো চলতে থাকে বাবার সাথে তার জীবনের ছবি। প্রিয়তম মানুষের স্মৃতির কথামালা।

আব্বাকে বলা হলো না বুকের ভেতর সারাক্ষণ এক পদ্ম পুকুর নিয়ে ঘোরে জুঁই। স্বচ্ছ, টলমলে তার জল। যখনই তার চারদিকটা অস্থির হয়ে ওঠে, খুব একান্তে সেই পুকুরের জলে পা ডুবিয়ে বসে সে। মনের ভেতরের না বলা কথাগুলো অনর্গল বলে যায় আব্বাকে। ঠিক যেমন বলতো শৈশবে বা বালিকাবেলায়। আব্বাই যে জুঁইয়ের জীবনের জিয়নকাঠি। তার সবচেয়ে কাছের বন্ধু। আব্বার জন্যই আজ সে এতোদুর।

মনে পড়ে, আব্বার সাথে তার এই সখ্যতায় মায়ের হিংসে হতো খুব। প্রায়ই নিজের মনে বকবক করে বলতো, “পেটে থুইলাম আমি, কষ্ট কইরা পালতেসি আমি, সারাদিন হাঁড়ি ঠেলতে ঠেলতে জান বাইর হইয়া যায় আমার, আর মেয়ের সব কথা বাপের লগে। সব ভালোবাসা বাপের জন্যে। বাপের লাইগা কত্ত পরান পুড়ে। কই, আমার লগে তো কোনদিন বইসা দুইডা আলাপ করস না।

মায়ের কপট রাগ দেখে জুঁই মাকে জড়িয়ে ধরে। বলে, তুমিতো সারাদিন ব্যস্ত থাকোগো মা। কোন কথা কইতে চাইলে অধৈর্য হইয়া যাও। তোমার এই কাজ, সেই কাজের কথা মনে পইরা যায়। এমন কইরা গল্প করন যায় নাকি? আব্বাতো এমন করে না। মন দিয়া আমার কথা শুনে।

মা তখন বলে ওঠে, তা তো শুনবোই। তোমার আব্বার তো আর আমার কাজগুলান করা লাগে না। তার আর চিন্তা কি? এইবার ছাড়, আর জড়ায়া ধরা লাগবো না। আমার কাজ আছে। যাও, বাপের লগেই কথা কও গিয়া।

মা মেয়ের খুনসুটি শুনে জুঁইয়ের বাবা হা হা করে হেসে ওঠেন। বলে, “তোমার কিছু কিছু কাজ মাঝে মাঝে আমারেও তো দিলে পারো সালেহা। আমি হাসিমুখে কইরা দিবো, দেইখো। তোমার আশেপাশে থাকতে তো আমার ভালো লাগে। তুমিই তো দুর দুর করো।“ বাবার এই হাসিটা জুঁইয়ের খুব প্রিয়। কেমন দিলখোলা একটা মানুষ তার আব্বা। হাসলে তার আব্বাকে নায়কের মতো লাগে। হ্যা, নায়কই তো। এই আব্বা মানুষটা জুঁইয়ের জীবনের নায়ক। তার জীবনীশক্তি।

কামাল আর সালেহার একমাত্র সন্তান জুঁই। খুব আদরে মানুষ। কোনদিন জুঁইকে নিয়ে কাউকে কোন বাজে কথা বলার সুযোগ দেয়নি জুঁইয়ের বাবা। আত্মীয় স্বজন জুঁইয়ের বাবাকে ভয় পেতো। জুঁই তার বাবাকে কোনদিন ছেলে নাই বলে দুঃখ করতে দেখেনি। জুঁইকে সবসময় বলতো, কোনদিন নিজেরে ছোট ভাববানা মা। ছেলে মেয়ের মধ্যে ছোট বড় নাইরে মা। আলাদা কাজ বলতেও কিছু নাই। সবাই সব পারে। খালি ইচ্ছাটাই থাকা দরকার।

সেবার যখন আক্কাস চাচা বেড়াতে এলো, জুঁইয়ের বাবা মহা আনন্দে অনেক বাজার করল। মাও খুব আয়োজন করে রান্না করলো। বাড়ীতে বেশ উৎসব উৎসব আমেজ। আক্কাস চাচা শুধু জুঁইকে নিয়ে কটু কথা বলায় পুরোটা আনন্দ হঠাৎ মাটি হয়ে গেলো।

আক্কাস চাচা: এইবার আরেকটা বাচ্চা নেও কামাল। ছেলে না থাকলে তোমার এতো বিষয় সম্পত্তি কে দেখবো? বংশধর রাইখা যাবা না?

আক্কাস চাচা জুঁইয়ের বাবার বয়সে বড়। অন্য কেউ বললে তিনি ধমক দিয়া উঠতেন। কিন্তু আক্কাস চাচারে কিছু বললেন না। সেই কথার উত্তর না দিয়া বললেন, গোসলে যাবেন নাকি ভাইজান? চলেন, নদীতে ডুব দিয়া আসি।

আক্কাস চাচা তবুও হাল ছাড়েন না। বলেন,ম্যায়ার পিছনে এতো খরচ কইরা কি লাভ কামাল? সেইতো পরের ঘরেই চইলা যাবে। ম্যায়ারে এতো আস্কারা দিও না।

জুঁইয়ের বাবা স্পষ্টতই রেগে গেলেও ঠান্ডা ভাবেই বললেন, ভাইজান, আপনি বেড়াইতে আসছেন, বেড়ান। খানাদানা করেন। আমার মেয়ে নিয়া আমি কি করবো সেইটা আমারেই ভাবতে দেন। আর আপনার না পোষাইলে চইলাও যাইতে পারেন। কিন্তু এইখানে থাকলে আমার মেয়েরে নিয়া কোন বাজে কথা কইতে পারবেন না।

আক্কাস চাচা যা বোঝার বুঝে গিয়েছিলেন। আর কথা বাড়াননি। তবে আর থাকেনও নি। কয়দিন থাকার কথা থাকলেও সেই বেলা খেয়েই চলে গিয়েছিলেন।

এই তার আব্বা। তার বন্ধু, তার গাইড, তার হিরো, সব। প্রথম যখন আব্বাকে ছেড়ে ঢাকায় পড়তে আসে, জুঁইয়ের ভেতরটা কেমন শূন্য হয়ে গিয়েছিলো। হলে ওঠার পর বাবার জন্য মনটা ছটফট করতো খুব। মোবাইলে রোজ কথা হলেও মন ভরতো না। মোবাইলে তো আর আব্বাকে ছোঁয়া যায়না। অনেক কথাই না বলা থেকে যেতো। আব্বা দুশ্চিন্তা করতে পারে ভেবে কিছু কথা লুকিয়েও রাখতো জুঁই। হলে খাবারের কষ্ট, ক্লাসে কোন সহপাঠীর কাছ থেকে পাওয়া কষ্ট, এসব লুকাতো জুঁই। আব্বা ঠিক বুঝে যেতেন কেমন করে যেনো, কিন্তু বলার জন্য পিড়াপিড়ি করতেন না। শুধু রাত গভীর হলে বুকের ভেতর লুকিয়ে রাখা সেই পদ্ম পুকুরের শান বাঁধানো ঘাটে গিয়ে শান্ত জলে পা ডুবিয়ে বসতো জুঁই। আর কাল্পনিক কথোপকথনে বাবার কাছে উগরে দিতো যত না বলা কথাগুলো।

একমনে কোরান পড়া আর স্মৃতি হাতড়ানোয় এতটাই ডুবে ছিলো জুঁই যে তাকে কেউ ডাকছে সেটা খেয়ালই করে নি। বিজলী ফুফু কাছে এসে মাথায় হাত রাখতেই সম্বিত ফিরে পেলো জুঁই।

বিজলী ফুফু: ওই জুঁই, এইবার একটু ওঠো মা। তোমার আব্বারে গোসল দিয়া আনসে। শেষবার দেইখা আসো।

জুঁই ধীর পায়ে উঠানে যায়। খাটিয়ার পাশে বসে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে বাবার দিকে। জুঁই দেখে, মন ভরে দেখে। খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখে। সালেহা বেগম হাউ মাউ করে কাঁদেন। জুঁই নীরবই থাকে। সাদা কফিনে মোড়ানো বাবার মুখটায় সেই নায়কোচিত হাসিটা খোঁজে। বাবার যে হাসিটা তার খুব প্রিয়। আক্কাস চাচা গলা খাঁকারী দিয়ে বলেন, লাশের পাশে এতো জোরে কাঁইন্দো না বউমা। আজাব হইবো। দোয়া পড়ো, দোয়া পড়ো।

জুঁই আর তার মাকে বেশিক্ষণ বসতে দেয়া হয় না সেখানে। এমনিতেই দেরী হেয়ে গেছে অনেক। সবাই ঢাকা থেকে জুঁইয়ের আসার অপেক্ষা করছিলো, নাইলে আরো আগেই কাজ শেষ হয়ে যেতো। এখনো জানাজা পড়ানো বাকী। বাড়ীর পাশেই মসজিদে জানাজা পড়ানো হবে। তারপর পারিবারিক কবরস্থানে কবর দেয়া হবে।

সবাই খাট ওঠানোর প্রস্তুতি নেয়। এবার বিদায়ের পালা। জুঁই হঠাৎ ব্যস্ত হয়ে ওঠে। বলে, দাঁড়াও তোমরা।  একটু দাঁড়াও আমার জন্য। আমি স্যান্ডেলটা পায়ে দিয়া আসতেসি।

সকলে মুখ চাওয়া চাওয়ি করে। এমন আজব কথা তারা কোনদিন শোনে নাই। জুঁই কি লাশের সাথে যাবে নাকি? এ কেমন কথা!

আক্কাস চাচা বলে, কই যাবা তুমি?

জুঁই বলে, ক্যান? আপনাদের সাথে যাবো চাচা। আব্বার খাটিয়া নিয়া যাবো। আমার কাঁধে কইরা আব্বারে নিয়া যাবো।

আক্কাস চাচা: এইসব কি আকথা কও জুঁই? ঢাকায় গিয়া তো দেহি তোমার মাথাডা একেবারেই বিগড়াইয়া গেসে। ম্যায়া মানুষ লাশের খাটিয়ায় কাঁধ দেওনের নিয়ম নাই। কবর দেওনের সময়ও কোন ম্যায়া মানুষ থাকনের নিয়ম নাই। তুমি যাইতে পারবা না।

জুঁইয়ের মুখটা অপমানে কেমন ফ্যাকাশে হতে থাকে। অস্ফূট ভাবে বলে, নিয়ম নাই না? ক্যান নিয়ম নাই চাচা? আমি তো আমার আব্বার সন্তান। তাইলে ক্যান কাঁধ দিতে পারুম না? আপনে যদি পারেন, কবির ভাই যদি পারে, ময়না কাকা যদি পারে, আমি ক্যান পারুম না? আমি যাবোই।

আক্কাস চাচা অধৈর্য্য হয়ে ওঠে। একটু উঁচু গলায় বলে, এই ওরে কেউ বুঝায়া বল ক্যান পারবো না। তারপর সালেহা বেগমকে বলেন, বউমা ওরে ঘরে নিয়া যাও।

সালেহা বেগম জুঁইকে সরানোর চেষ্টা করেন। হাত ধরে টানেন, কিন্তু জুঁইকে নড়াতে পারেন না। পাশের বাড়ীর কবির ভাই এসে বলে, ঘরে যাও বুইনডি। তোমার জন্য মাটি নিয়া আসবো একটু পরেই। তুমি ছুঁইয়া দিও। তাইতেই হবেনে। নিয়ম নাই যে, কি করবা কও?

জুঁইয়ের চোখ দিয়ে এই প্রথম পানি গড়িয়ে পড়ে। বলে, কিন্তু আমার আব্বা তো কোনদিন আমারে মেয়ে বইলা ছোট কইরা দেখে নাই। কোনদিন আমারে বলে নাই আমি মেয়ে বইলা কোন কিছু করতে পারবো না। তয় আইজ কেন আমি তার শেষ যাত্রার সঙ্গী হইতে পারুম না? কেন তার খাটে কাঁধ দিতে পারুম না? কেন তার কবরের পাশে দাঁড়াইয়া একমুঠা মাটি দিতে পারুম না? আমিতো আমার আব্বার সন্তান কও, তাইলে নিষেধ কিসের?

চারদিক আরো থমথমে হয়ে যায়। মুরুব্বীরা বিরক্ত হয়ে ওঠে। কারো কারো মুখে হালকা বিদ্রুপের হাসি ফুঁটে উঠেই মিলিয়ে যায়। তবু বাবার সাথে যাওয়া হয়না জুঁইয়ের। ওকে সাথে নেয়না কেউ। খাটিয়া কাঁধে উঠিয়ে নিয়ে রওনা হয়ে যায়। জুঁই চেয়ে দেখে পাশের বাসার ইদ্রিসও কাঁধ দিয়েছে তার আব্বার খাটে। ইদ্রিস তার আব্বার কেউ হয় না, তবুও। শুধু সেই পারেনি।

এক দৌঁড়ে ঘরে আসে জুঁই। এই প্রথম চিৎকার করে কেঁদে ওঠে, “আব্বা, ও আব্বা, তুমি ভুল বলসিলা আব্বা। মিথ্যা শিখাইসিলা আমারে? ছেলে মেয়ে আলাদা গো আব্বা, ছেলে মেয়ে আলাদা। আমি তোমার ছেলে হইলাম না কেন গো আব্বা? ছেলে হইলাম না কেন? কিছুই করতে পারলাম না তোমার জন্য। তুমি সময়ই দিলা না আমারে। ছেলে হইলেতো তবু তোমার খাটে কাঁধ দিতে পারতাম!”

জুঁইয়ের কান্না সাত আসমান ভেদ করে পৌঁছায় না কোথাও। শুন্য উঠানে নেড়ী কুকুরটা শুধু দুবার ডেকে ওঠে। আর খাটিয়ার চারপায়ের দাগ খাঁ খাঁ দুপুরে বিদ্রুপ ছড়াতে থাকে।

লেখক : নারী আন্দোলন কর্মী, সাহিত্যিক ।

Comments

comments

Check Also

একটি দিনের গল্প

লিটন বড়ুয়া : পাঁচতলা একটি বাড়ি। পাঁচতলায় থাকে শমিক। দুই তলায় থাকে রফিক সাহেব। বাড়ির …