Home / গল্প অথবা উপন্যাস / জামিলার কোরবানীর কুটুম

জামিলার কোরবানীর কুটুম

শাশ্বতী বিপ্লব :
আজ সারাদিন বেশ ঝক্কি গেছে। তবুও বিছানায় শুয়ে এপাশ ওপাশ করে জামিলা। ঘুম আসে না কিছুতেই। মেয়েটাকে কেন যে ওভাবে মারতে গেলো। মেয়েটা কেঁদে কেঁদে না খেয়েই কখন ঘুমিয়ে পড়েছে। জামিলা নিজেও খায়নি। ঈদের দিন মেয়েটা খায়নি দেখে নিজের গলা দিয়েও খাবার নামে নি জামিলার।
কোরবানীর ঈদ মানেই মহাযঞ্জ। শহর থেকে দেবর আসে পরিবার নিয়ে। একাই একটা গরু কোরবানী দেয়। জমিলাদের একটা আস্ত গরু কোরবানী দেয়ার সামর্থ্য নেই। দেবরের কারণে গ্রামে তাদেরও একটু সম্মান বাড়ে।
দেবর আর তার পরিবারের  নানা খাবারের বায়নাও থাকে। বিশেষ করে চিতই পিঠা বানাতেই হয়। গরম গরম চিতই পিঠা আর গরুর মাংস – সবাই খুব উৎসব করে খায়।
এসব সামলাতে জমিলার বেশ কষ্টই হয়। মাংস গুছিয়ে রাখা, বাড়ী ভর্তি কুটুমের খাবারের ব্যবস্থা করা। কম কাজতো নয়। তার উপর আজ সারাদিন বৃষ্টি।
মূল ঘর থেকে রান্নাঘরটা একটু দুরে। মাটির উঠান পার হয়ে যেতে হয়। এমনিতেও বৃষ্টির পানিতে কাদায় মাখামাখি, তার উপর এতোগুলো মানুষের রান্না, মাংস সিদ্ধ করে রাখা। ফ্রিজতো নেই যে কোনরকম ধুয়ে উঠিয়ে রাখবে। তাদের গ্রামে এখনো বিদ্যুত আসেনি।
জমিলা চিতই পিঠা বানানোয় ব্যাস্ত ছিলো। এর মাঝে জা এসে বললো, “ভাবী, তোমার ছোট মেয়েটা কিন্তু বেশ পাকা পাকা কথা বলে।”
জমিলা জায়ের গলার শ্লেষ ঠিক ধরতে পারেনি। চুলার আগুনটা একটু উস্কে দিয়ে বললো, ” হ, তা একটু কয়। মাথায় ম্যালা বুদ্ধি। পড়াশুনায়ও ভালো, বুঝলা।”
জমিলার জা ঝুমুর বললো, “হুমম। তোমার মেয়ের জন্য এতো সুন্দর একটা জামা আনলাম। তার নাকি সেটা পছন্দ হয় নাই। আমাকে বলে, এইটাতো পুরান জামা কাকী। আমি এই জামা পরুম না। আমার তিতলীর জামাটা বেশি পছন্দ হইসে।”
এইটা কোন কথা হইলো, বলো ভাবী? আশ্চর্য! তিতলী ওই জামাটা একদিন মাত্র পরসে। তাতেই পুরান হইয়া গেলো!! আর তিতলী যে জামাটা পরসে সেইটা ওর বাবা বিদেশ থেকে নিয়া আসছে। তাছাড়া, তোমরা  গ্রামে থাকো। তোমার মেয়ে কি ওইরকম প্যান্ট আর টপস পরবে নাকি? এতো বেশি বুঝলেতো অসুবিধা, ভাবী।”
জমিলা এবার বিব্রত কণ্ঠে কোনরকম বললো, “আরে ধুর, তুমিওনা। পোলাপাইনের কথা ধরতে নাই। নাও, দেখোতো পিঠা খাইতে কেমন হইসে।”
এর মাঝেই কোত্থেকে আধভেজা হয়ে জামিলার মেয়ে হাসি রান্নাঘরে এসে দাঁড়ায়। বলে, “মা, আমারেও একটা দেও। খালি কাকীরেই খাওয়াইবা নাকি?”
জমিলা ধৈর্য্য রাখতে পারে না। খপ করে হাতটা ধরে দুম দুম দুটো কিল লাগিয়ে দেয় মেয়ের পিঠে, “বেশি কথা কওয়া শিখসোস, না?”
হাসি প্রথমে কিছুটা থতমত খায়। মা তাকে কখনোই মারে না। আজ কেন এতো রাগ করলো প্রথমে বুঝতে পারলো না। পরমুহুর্তেই কাকীর দিকে চোখ পড়তেই বললো, “তুমি মায়েরে বিচার দিসো, না?”
ঝুমুর ধরা পরা মুখে ঝাঁঝিয়ে উঠলো, “দেখসো ভাবী, তোমার মেয়ের কি তেজ!! এই মেয়ে, আমি কেন বিচার দিতে যাবো তোর নামে? আশ্চর্য!!”
হাসি আরো তেজের সাথে বললো, “দিসোই তো। নাইলে মা আমারে কোনদিন মারে না। তোমরা আসলে মা কতো কষ্ট করে তোমাদের জন্য, আর তোমরা আমাদের পুরান জামাকাপড় দেও ক্যান? আমরা কি তোমাগো কাছে চাইসি? না তোমাগো টাকার অভাব?”
জামিলা অবস্থা বেগতিক দেখে রান্নার একটা চ্যালা কাঠ নিয়ে এবার হাসির দিকে তেড়ে যায়। ” বেয়াদপ মাইয়া, বড়দের মুখে মুখে কথা? তুমি রাজার বেটি হইসো না? তুমারে এখন রাজরানীর পোশাক কিইনা দিতে হইবো?”
মেয়েটাকে বেশ দু’ঘা বসিয়ে দিয়ে জায়ের কাছে এসে কাচুমুচু মুখ করে বললো, “তুমি কিছু মনে কইরো না ঝুমুর। ওর বাপ আসুক। ওরে শায়েস্তা করা দরকার।”
ঝুমুর এতোটা আশা করেনি। এবার সেও বিব্রত হলো, “আরে না ভাবী। কি যে বলো। ভাইজানরে বিচার দিতে হবে না। আসলে, আমাদেরই নতুন জামা দেয়া উচিত ছিলো। গতবারও তো তিতলীর জামা দিলাম। তখনতো হাসি কিছু বলে নাই। আসলে….থাক্, ছোট মানুষ। আমি কিছু মনে করি নাই।”
হাসি সেই থেকে লাপাত্তা। সন্ধ্যায় কখন এসে ঘুমিয়ে পড়েছে জমিলা তা খোঁজ রাখার ফুসরত পায়নি। দেবর নিজের গাড়ি নিয়ে গ্রামে আসে। তাদের বাসার সামনে রাখা গাড়িটা সবাই ভিড় করে দেখতে আসে। নিজেদেরও দুইদিনের জন্য বড়লোক বড়লোক মনে হয়।
নিজের ওইটুকুন মেয়েটার কাছে সেই কাঙ্গালপনা এমনভাবে ধরা পড়বে তা জামিলা স্বপ্নেও ভাবে নাই। মেয়ের কথাটাও মাথা থেকে তাড়াতে পারছে না। ঠিকই তো, ওরা কি হাসির জন্য একটা নতুন জামা আনতে পারতো না?
জমিলা অপরাধ বোধ কাটাতে পারে না। হাসি তার বড় আদরের। বেশ বুদ্ধিমতি। স্কুলের স্যারেরা সবসময় প্রশংসা করে। জামিলাম ইচ্ছা ওকে পড়ালেখা করিয়ে জজ ব্যারিস্টার কিছু একটা বানানোর। যত কষ্টই হোক। আর সেই মেয়েটারে আজকে সে মারলো শুধুমাত্র সত্যিটা চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়ার জন্য।
জামিলারও চোখ ভিজে ওঠে। ভেজা চোখ নিয়েই ঘুমানোর চেষ্টা করে। সকালে উঠে আবার কুটুমের জন্য নাস্তা বানাতে হবে। ম্যালা কাজ।

Comments

comments

Check Also

একটি দিনের গল্প

লিটন বড়ুয়া : পাঁচতলা একটি বাড়ি। পাঁচতলায় থাকে শমিক। দুই তলায় থাকে রফিক সাহেব। বাড়ির …