Home / গল্প অথবা উপন্যাস / বাইজী নাচ ও দিপালী মাসী

বাইজী নাচ ও দিপালী মাসী

শরীফ আহমেদ :
এক.
আমি তখন অনেক ছোট। আট দশ বছর বয়স হবে। মফস্বল শহরে ভাড়া বাসায় থাকি। একটি হিন্দু দম্পতি ছিল আমাদের প্রতিবেশী। স্বামী ছিল বাস ড্রাইভার আর বউ গৃহিণী। গৃহিণী হলেও মাসিমা ছিলেন যথেষ্ট বুদ্ধিমতি, স্মার্ট ও সুন্দরী। স্বল্প আয়ের সংসারে ছিল দুটি ছেলে মেয়ে। বড়টার ছয় বছর আর ছোটটার দুই বছর। টানাটানির সংসার চলতো কোন রকম।
এক বার তাদের সংসারে একটা সমস্যা দেখা দিল। ঠিক সাংসারিক সমস্যা নয় বরং দাম্পত্য সমস্যা।
সমস্যাটা হলো কাকাবাবু মানে মাসিমার স্বামী মাঝে মাঝে বাইজির বাড়িতে যায়। মদ খায় আর বাইজির নাচ দেখে বিভুর হয়ে পরে থাকে।
মাসির শুভাকাঙ্ক্ষী বা অশুভাকাঙ্ক্ষী কয়েকজনের মাধ্যমে মাসির কানে খবরটা আসলো। মাসি লজ্জিত হলেন সেই সাথে বিচলিত ও মর্মাহতও। কিন্তু অনেকে আবার বলল বাস বা ট্রাক ড্রাইভারদের মধ্যে এইসব অভ্যাস থাকতেই পারে। অবশ্য যারা এই কথা বলল তারা মাসির শুভাকাঙ্ক্ষী না কি অশুভাকাঙ্ক্ষী তা বুঝা মুশকিল। তবে কেউ কেউ মাসিকে অন্য কিছু পরামর্শ দিল যেগুলো থেকে বুঝা যায় তারা অবশ্যই মাসির শুভাকাঙ্ক্ষী।
সেই সব শুভাকাঙ্ক্ষীরা যা বলল সে অনুযায়ী মাসিমাকে প্রথমে কাকাবাবুকে মন থেকে ঘৃণা করতে হবে যেহেতু কাকাবাবু পাপ কাজ করছে। তার পর কাকাবাবুর সাথে কথা বলা বন্ধ করতে হবে কারণ যে বাইজি বাড়ি যায় তার সাথে কোনও ভদ্রঘরের মেয়ের কথা বলা ঠিক নয়। বলাবাহুল্য যে ভদ্রঘর বলতে তারা মাসিমার বাপের ঘরকেই বুঝিয়েছিল। তারা ঠিক বুঝতে পারেনি বা বুঝতে চায়নি যে বিয়ের পর দম্পতির নিজেদের ঘরই মাসিমার ঘর আর যে ঘরের কর্তার চরিত্রে সমস্যা সে ঘর আর ভদ্রঘর থাকে না আর সে অর্থে মাসিমা হচ্ছেন অভদ্রঘরের বউ। অবশ্য এসব আমার ভাবনা। মাসিমার শুভাকাঙ্ক্ষীদের এইসব কথা ভাবার মতো শুভবুদ্ধিসম্পন্ন ছিল না।
শুভাকাঙ্ক্ষীরা মাসিমাকে বলল, ঘৃণা ও কথা না বলার ফলে কাকাবাবু মাসিমার কাছে কিছুটা পরাজয় স্বীকার করবে আর তখন মাসিমা বলবে বাইজিবাড়ি যাওয়া বন্ধ না করলে আর কখনো তিনি কাকাবাবুর সাথে কথা বলবে না। তাতেও যদি কাজ না হয় তবে মাসিমা ও কাকাবাবু উভয়ের আত্মীয় ও পরিচিত মানুষদের ডেকে কাকাবাবুকে আচ্ছা মতো শাসিয়ে দিতে হবে। তাহলে হয়তো কাকাবাবু তার পাপ কাজ চালিয়ে যাবার সাহস করবে না।
যাই হোক মাসিমা সবার সব কথা কান পেতে শুনলেন কিন্তু কারও কথাই অনুসরণ করলেন না। তিনি একদিন রাতের বেলায় কাকাবাবুকে খুব করে আদর দিলেন। আদর নেওয়া শেষে কাকাবাবু যখন ঘুমের জন্য চোখ বুঝতে চললেন যখন মাসিমা তাকে জিজ্ঞাসা বললেন, তোমারে একটা কথা কইব?
মাসিমার কন্ঠস্বর ও কথা বলার ভঙ্গি কাকাবাবুকে অবাক করলো। তন্দ্রা ভেঙে তিনি উঠে বসলেন। মানুষটা হয়তো বা দূশ্চরিত্র হলেও হতে পারে কিন্তু নয়টি বছর যে বউয়ের সাথে এক ছাদের নিচে এক বিছানায় কাটিয়েছেন আর এক সাথে রমণ করে সন্তান জন্ম দিয়েছেন তার প্রতি তো সবারই একটা টান থাকে। তাই সদ্য রমণক্লান্ত বউয়ের আধাকাতর আধাকম্পিত কন্ঠস্বর তার মনটাকে স্পর্শ করে। তিনি বললেন, দিপালী! তুমি কিছু কইবা?
দিপালী মাসি জিজ্ঞাসা করল, তুমি কী রাত বিরাতে অন্য কোথাও যাও?
সহসা এই প্রশ্ন শুনে কাকাবাবু যেন তড়িতাহত হলেন। তার কন্ঠ যেন স্তব্ধ হয়ে গেলো। তবু তিনি নিজেকে সামলে নিলেন। ড্রাইভার হিসেবে গাড়িকে যেভাবে সামলে নেন অনেকটা সেরকম। সামলে নিয়ে মাসিমার কাঁধে হাত রেখে বললেন, না গো দিপালী আমি তো কোথাও যাই না তোমারে কে কইছে এই কথা?
মাসি বলল, না কেউ কয়নাই। এমনি মনে অইল তাই জিগাইলাম। তুমি মাঝে মইধ্যে রাইতে বাসায় আস না তো এই জন্য।
আরে বোকা আমার তো অনেক রকম কাজ থাকে। যেইদিন দূরে কোথাও যাই হেইদিন আর আই না রাইতে।
ও এই তাইলে ব্যাপার?
হ এইডাই ত।
আইচ্ছা তাইলে ভাল।
সেদিন তারা ঘুমিয়ে পড়ল। তাদের মধ্যে বিষয়টা নিয়ে এর বেশি কথা হয়নি।

দুই.
দিপালী মাসীর বড়ছেলের নাম ছিল রাজন। কাছাকাছি বয়সের ছেলেরা তখন একসাথে খেলাধুলা করতো তাই রাজন ছিল আমার সহচর ও খেলার সাথী। আমার মায়ের সাথেও মাসীমার খুব বন্ধুত্ব ছিল। আমি প্রায়দিনই ওদের বাসায় যেতাম। পাশাপাশি বাসায় আমরা ভাড়া থাকতাম। মাঝে একটা ছোট্ট উঠান আর আরেকটা ঘর ছিল।
দিপালী মাসী কিন্তু সত্যি সত্যি কাকাবাবুর কথা বিশ্বাস করেছিলেন। স্বামীকে অবিশ্বাস করার মতো মানষ মাসীমা ছিলেন না। তবে তিনি ছিলেন যথেষ্ট বিচক্ষণ। চোখ কান বন্ধ করে বসে ছিলেন না তিনি।
তবে আরেকটি সমস্যায় তার চোখ কান বন্ধ হবার জোগাড় হলো। সেটা হচ্ছে রাজনের অসুখ। একদিন রাত্রিবেলা রাজনের মাথাব্যাথা থেকে প্রচন্ড বমি হতে থাকলো। দুপুরের দিকে বমি থামলো মাথাব্যাথাও কমলো অনেকটা কিন্তু রাজনকে মোটেও সুস্থ্য মনে হলো না মাসীমার। রাজনকে ডাক্তারের কাছে আর নেওয়া হলোনা কিন্তু পরের দিন জানা গেলো রাজনের জন্ডিস হয়েছে আর তাতে মাসীমার মাথায় হাত পড়ল। রাজন মাসীমাদের একমাত্র ছেলে অার তার হয়েছে জন্ডিস।
জন্ডিস মারাত্মক রোগ। এই রোগের কোন চিকিৎসা নেই। কতদিনে আরোগ্য হবে এটা সম্পূর্ণ ভাগ্যের ব্যাপার। তবে ওষুধ না থাকলেও সুস্থ্য হবার জন্য কিছু নিয়ম কানুন মানতে হয়।
আমরা রাজনের অসুখের কথা তখনই জানতে পেরেছিলাম। কিন্তু আরও নিশ্চিত হলাম রাজনের প্রস্রাব দেখে। রাজন আমাদের উঠানের বৃষ্টির পানিতে একবার প্রস্রাব করেছিল। মা আমাকে দেখিয়ে বলেছিল রাজনের প্রস্রাব হলুদমেশানো পানির মতো আর এটাই হচ্ছে জন্ডিস হওয়ার প্রমাণ।
জন্ডিস থেকে সুস্থ্য হবার নিয়মগুলো ছিল রাজনের জন্য মানা খুব কঠিন। নিয়মগুলো একটু অদ্ভুৎ আর শিশুদের জন্য মানা অনেকটা অসম্ভব। নিয়মগুলো হচ্ছে প্রচুর পরিমাণ পানি খাওয়া আর সারাদিন বিছানার সাথে পিঠ লাগিয়ে রাখা। ঘুমিয়ে থাকলে সবচেয়ে ভালো আর জেগে থাকলেও হাতপা না নাড়ানোই ভালো। পাঁচ বছরের বাচ্চাকে এই নিয়মগুলো কে বুঝাবে আর কেই বা মানাবে।
রাজন যা ইচ্ছা তাই করতে লাগলো। আগের মতোই খেলাধূলা, ছোটে বেড়ানো আর লাফালাফি সবই চলতে থাকলো যথা নিয়মে।
মাসীমা ঘর সংসারের কাজ আর ছোট বাচ্চাটাকে নিয়েই ব্যাস্ত সারাদিন। আর কাকাবাবুকেও ড্রাইভারি থেকে ছুটি নিয়ে ঘরে বসে থাকা সম্ভব নয়। তবু হয়তো সপ্তাহে দুএকদিন তিনি তা করেছেন। কাকাবাবু জড়তার জন্য ছুটির কথা বলতে পারেন না। মাসীমা নিজে গিয়ে অনুরোধ করে ছুটির ব্যাবস্থা করলেন কিন্তু ছুটিতো থাকলে তো টাকা আসবেনা। দিনে এনে দিনে খাওয়া সংসার তাদের।
আমাদের সবাইকে বলা হলো রাজনকে খেলায় না নিতে। কিন্তু আমরা শুনে অবাক হলাম কারন তখন ছোট ছিলাম। আমরা ভাবতাম রাজনকে দেখেতো অসুস্থ্য মনে হয় না। সেতো খেলাধুলা, লাফালাফি, গাছে উঠা, ফুটবল খেলা সবই করতে পারে তবে তাকে কেন বাসায় আটকে রাখার চেষ্ঠা করা হচ্ছে?
আমাদের ধারনা অনুযায়ী কারও হাত পা ভেঙে গেলে বা জ্বর টর হলে সে বাসায় শুয়ে, বসে বা ঘুমিয়ে থাকে আর হাত পা পারতপক্ষে নাড়ায়না। কিন্তু রাজনের তো সেসব কিছু হয়নি তাহলে রাজন কেন বাসায় বসে থাকবে? তবে আমরা শুনলাম রাজনের জন্ডিস নামক যে অসুখ হয়েছে তার একমাত্র চিকিৎসা হচ্ছে পূর্ণবিশ্রাম।
জন্ডিস খুব সিরিয়াস রোগ। তাড়াতাড়ি না সারলে বা মাত্রা বেশি হলে এ থেকে লিভারের ক্ষতি হতেপারে। এমনকি লিভার নষ্ট হয়ে মানুষ মারা যেতে পারে। শুনে আমরা খুব ভয় পেয়েছিলাম। মানুষ শুধু জ্ঞান নয় ভয় থেকেও অনেক কিছু শিখে।

তিন.
অবশেষে রাজন সুস্থ হলো। আর দিপালী মাসীর মাথা থেকে ভয়াবহ বোঝা নামল। একমাত্র ছেলে রাজন তার উপর এখনও নিতান্ত শিশু আর তার হয়েছিল জন্ডিস। তাই মাসী পড়ে গিয়েছিলেন অনিশ্চয়তা আর কষ্টের গভীর গর্তে।
সুন্দর সাজানো একটা সংসারের আশা মাসীর সব সময়। কিন্তু সংসারটাকে তিনি কোনওভাবেই সাজাতে পারছেন না মনের মতো করে। অভাবকে তিনি মেনে নিচ্ছেন কিন্তু আরো তো অনেক সমস্যা। বড় সমস্যা হচ্ছে জাগতিক সব বিষয়ে কাকাবাবুর বিচক্ষণতার অভাব। মানুষ সৎ হোক বা অসৎ হোক তার মধ্যে বিচক্ষণতা থাকা আবশ্যক। কিন্তু কাকাবাবুর মধ্যে তিনি তা একদমই দেখতে পান না। সব বিষয়েই কাকাবাবুকে তিনি দমে যেতে দেখেন। আর এটাই তার হতাশার প্রধান কারণ। তাছাড়া কাকাবাবু সব বিষয়ে অত্যন্ত উদাসীন কিছুটা তার বিষয়েও। তার প্রতিও যেন কাকাবাবু গত কয়েক বছর ধরে উদাসীন।
যদিও বিয়ের পর কাকাবাবুর সাথে মাসীমার দিনগুলো বেশ উপভোগ্য ছিল কিন্তু আজকাল তা তেমন নেই। তবে কী দাম্পত্যের একান্ত উপভোগ্য বিষয়টা থেকে কাকাবাবু দূরে সরে যাচ্ছেন? এমনটা কী হতে পারে? সত্যিই কী বিষয়টা তাই?
ভর সন্ধ্যায় ঘরের সামনের সিঁড়ির উপর পা দুলিয়ে বসে বসে মাসীমা এইসব কথা ভাবছিলেন আর ভাবনার অথৈ জলে থৈ হারাচ্ছিলেন। আর তলাহীন জলে হাতড়াতে হাতড়াতে তিনি একটা হাঙরকে তার দিকে তেড়ে আসতে দেখলেন। মাসীমার চেতনা ফিরল। তার অস্থির মনের দৃষ্টিতে হাঙড়টা হয়ে গেলো নৃত্যরতা রঙিন বসনা খেমটারত বাইজী। আর নিজেকে তার মনে হলো কাকাবাবুর মতো।
তবে কি সত্যি কোনও বাইজীর রূপসৌন্দর্যের মোহ কাকাবাবুকে গ্রাস করতে চলেছে? মাসীমা আবার মনের কষ্টের অথৈ জলের অচেনা জলে ডুব দিলেন।
সন্ধ্যার অন্ধকার তার অচেতন মনকে আরও করুণভাবে গ্রাস করতে লাগলো। সত্যিই সে বিষাক্ত কাল জলের গ্রাস পাথরের মতো মজবুত রক্তের গন্ধেমাখা ধূসর দাঁতের গ্রাসের থেকেও ভয়াবহ।
সন্ধ্যার আঁধার অনেকটা গভীর হয়ে গেলেও মাসীমা আজ বিকেল বেলায় খেলতে বের হওয়া রাজনকে খুঁজতে গেলেন না।
মা খুঁজে না আনলেও সদ্য অসুখমুক্ত রাজনকে আমরা খেলা শেষে তাদের ঘরের কাছে দিয়ে আসি।
ছেলের ডাক শুনে আর ছেলেকে কাছে পেয়ে মাসীমা যেন নিজেকে উদ্ধার করলেন কুমিরজলের গ্রাস থেকে। আর তখনই মাসিমার ছোট মেয়ে ইতি ঘুম থেকে উঠলো। ইতির বয়স মাত্র দুই। সে ঘরের ভেতর ঘুমাচ্ছিল গত দুই ঘন্টা ধরে। মাসীমার এই মেয়েটি এর মধ্যে অনেক ধরনের কথা শিখে ফেলেছে। সে বাবাকে বলতে পারে, বাজাত থেকে এপ পোয়া চাউল আনবা বা মাকে কয়ে দিবা আমারে জানি না মারে ইত্যাদি কথা।
ছেলে মেয়ে নিয়ে ব্যাস্ত থাকলেও মাসীমার মনে কুমিররূপী বাইজীর মোহগ্রাসে পড়া কাকাবাবুর করুণ ছবি জেগে থাকে সব সময়।

চার.
রাজন সুস্থ্য হবার পর দিপালী মাসীর মনে কাকাবাবুর বাইজীর বাড়ি যাওয়ার ব্যাপারটা খুব করে চেপে বসল। লোকের কথায় কাকাবাবুকে চরিত্র নষ্টের জন্য দোষ না দিলেও মাসী ভাবলেন তার নিজেকে একটু ব্যাপারটা খতিয়ে দেখার দরকার। নিজের স্বামী বাইজী বাড়িতে গেলে কোন বউ কষ্ট পায়না বলুন?
মাসী খেয়াল করলেন পর পর দুইদিন কাকা বাবু দেরি করে রাতে বাসায় ফিরল। একদিন রাত বারোটা ও অন্য দিন রাত দুইটায়।
মাসী কাকা বাবুকে জিজ্ঞেস করলেন, তুমি এতো রাত করে বাসায় ফির কেন?
কাকাবাবুর সহজ উত্তর, আমি কি আজ নতুন দেরি করে বাড়ি ফিরি? আমার তো বাইরে কাজ থাকে তাই মাঝে মধ্যেই দেরি হয় বাসায় ফিরতে।
মাসী এই উত্তর শুনে চুপ করে গেলেন কিছু বললেন না।
দুইদিন পর আবার কাকাবাবু দেরি করে বাসায় ফিরলেন সেদিন। রাত আড়াইটায়। মাসী খুব স্বাভাবিক আচরণ করলেন কাকাবাবুর সঙ্গে। আর যখন কাকাবাবু শুয়ে পড়লেন তখন খুব করে একান্ত সান্নিধ্যে গিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, আচ্ছা আজ কোথায় কাজ ছিল তোমার?
কাকাবাবু এক মিনিট চুপ করে থেকে বললেন, আনসার সাহেবের এখানে। সব ড্রাইভারদের ডেকেছিলো একটা দরকারে।
সব ড্রাইভাররাই আজ রাত আড়াইটা অবধি সেখানে ছিল?
না তা না। মিটিং শেষ হলো রাত সাড়ে বারোটায়।
তার পর কোথায় ছিলা?
তার পর অনিল বাবাু বলল দিনের বেলা তো সময় হয় না তাই কিছু জরুরী হিসাব কিতাব বুঝিয়ে দিবার জন্য চল আমার ওখানে।
ও তার পর অনিল বাবুর ওখানেই ছিলা তুমি?
হ্যাঁ।
অনিল বাবু মদ খেতে বলল?
না মানে… মদ তো অামি মাঝে মাঝে খাই তাই না?
আজ কি অনিল বাবুর ওখানে মদ খেয়েছ?
হ্যাঁ সবাই খাইল তাই আমিও… খাইলাম।
আচ্ছা ঠিক আছে অনেক রাত হইছে। ঘুমাও।
কাকাবাবু নিঃশব্দে ঘুমিয়ে পড়লেন।
পড়দিন কাকাবাবু কাজে বেরিয়ে গেলে রাজনকে স্কুলে দিয়ে মাসীমা অনিল বাবুর ওখানে গেলেন। জিজ্ঞেস করলেন বাবু একটা কথা কইব আপনাকে যদি কিছু মনে না করেন।
অনিল বাবু বলল, বল বোন কি বলবা। কোন সমস্যা তোমাদের?
না বাবু সমস্যা কিছু না। আর সমস্যাও বলতে পারেন।
কি হইছে বল শুনি।
আমি দুইটা ছেলে মেয়ে নিয়ে বাসায় একা একা থাকি আপনার দাদা যদি বেশি রাত করে বাসায় ফিরে তাইলে খুব সমস্যা হয়।
অনিল বাবু একটু চিন্তিত হয়ে বললেন, ও এই কথা? সেটা তো সমস্যারই কথা। কিন্তু কাজ টাজ থাকে মাঝে মধ্যে। আমার এখানেও রাতে আসে মাঝে মাঝে। তা শুন দিপালী বোন। এই মাঝে সাঝে রাত বারোটা সোয়া বারোটা তো বাজতেই পারে তবে সেটা সবদিন তো নয় নাকি?
বারোটা সোয়া বারোটা সমস্যা না। সেতো আগেও হতো সপ্তাহে দুই একদিন। কিন্তু রাত দুইটা পার হলে আমি কী করি বলুন দাদা।
অনিল বাবু এবার চোখ বড় বড় করে মাথায় হাত দিলেন। বললেন, দুইটা অাড়াইটা মানে? কী কও তুমি বোন?
হ্যাঁ দাদা। মাঝে মাঝে তো এরকমই দেরি হয়। এই যে গত রাতে দুইটা অবধি আপনার এখানে ছিল।
মানে? কী কও তুমি? আমার এখানে তো গতরাতে সাড়ে এগারোটা পর্যন্ত ছিল। তার পর তো বাসায় চলে গেলো।
না দাদা বাসায় যায় নাই। মদ টদ খেয়ে আড়াইটায় বাসায় গেলো।
মদ খেয়ে বাসায় গেলো? আমরা তো গতকাল মদ খাইনি।
তাহলে কোথায় গিয়েছিল সে দাদা বাবু? আমাকে তো আপনার এখানকার কথাই বলেছে।
তাহলে মদের ঘোরে নিশ্চই ভুল বলেছে।
আপনি ব্যাপারটা একটু দেখবেন দাদা। মাঝে মধ্যেই এমন করে।
আচ্ছা দিপালী বোন। আমি খুঁজ নিয়ে সত্যি কথাটা তোমাকে জানাব। তুমি এখন বাসায় চলে যাও। আর ওনাকে বাসায় এ বিষয়ে আর কিছু আজকে জিজ্ঞেস কইর না। আগামীকাল আমার এমন সময় আবার আইস। আমি সঠিক তথ্য দিব।
পরদিন আবার রাজনকে স্কুলে দিয়ে মাসীমা অনিল বাবুর ওখানে গেলেন। অনিল বাবু বলল, গতরাতের আগের রাতে তোমার স্বামী বাইজিবাড়িতে ছিল রাত দু্ইটা পর্যন্ত। সে নাকি মাঝে মধ্যেই সেখানে যায়। তোমার স্বামী মানুষটা খারাপ না। আগে কখনো এই সব অভ্যাস ছিল না। পুরুষ মানুষ মন কখন কোন দিকে যায় বলা মুশকিল। তুমি তাকে বুঝাও আর তার প্রতি বেশি বেশি যত্ন নাও। দেখ ফেরাতে পারো কিনা।
এ কথা শুনার পর দিপালী মাসী আর কোন কথা না বলে রাজনকে স্কুল থেকে নিয়ে বাসায় আসলেন। মনটা কেন যেন খুব পুড়ছে তার। কী যত্নের অভাব রাখেন তিনি স্বামীর প্রতি। কেন তার স্বামী এমন করছে। রাজ্যের ভাবনা তাকে সারাদিন ঘিরে রাখলো। সেদিন কাকাবাবু অবশ্য রাত নয়টার মধ্যে ঘরে ফিরলো।
মাসীমা মনে অনেক কষ্ট নিয়েও কাকাবাবুকে যথেষ্ট যত্ন করলেন। আর রাত দশটায় তারা সবাই বিছানায় গেলেন। তারপর মাসীমা ঘৃণায় দূরে সরে থাকার বদলে কাকাবাবুর অনেক ঘনিষ্ট হলেন। বিশুদ্ধ প্রাকৃতিক সান্নিধ্য দিলেন তিনি স্বামীকে। অনেক আদর ও সোহাগের আদান প্রদান হলো তাদের মধ্যে।
তার পর কাকাবাবুকে ঘুমিয়ে পড়ার সুযোগ না দিয়ে মাসীমা তাকে প্রশ্ন করলেন, ওগো একটা কথা ছিল তোমার সাথে।
কাকাবাবু বললেন, আবার এখন কী কথা। সবই তো হলো এখন ঘুমাও না।
মাসীমা বললেন, আমার মনে একটা কষ্ট আছে তুমি কী তা দূর করবা?
কাকাবাবু অবাক হয়ে বললেন, কী কইলা দিপালী মনের কষ্ট? কেন? তোমার কী কষ্ট? তোমাকে তো আমি কখনো কষ্ট দেই না?
কষ্ট না দিলেও অনেক সময় কষ্ট থাকে।
ও এই কথা? তাইল কউ কি কষ্ট।
তোমাকে একটা কথা জিগাইব। আমার মাথায় হাত দিয়া সত্য কথা কইবা তাইলে আমার আর কোন কষ্ট থাকব না।
আচ্ছা কইলাম সত্য কথা। কী সত্য কইতে হইব কও দেখি।
মাসীমা মাথা নিচু করে বললেন, তুমি বাইজীর কাছে যাও কেন? আমি তো তোমাকে সবই দেই। আমাকে কী তোমার এখন আর ভালো লাগে না?
কাকাবাবু মাসীমাকে বললেন, আমার বাইজীর খেমটা ভাল লাগে। বাইজীর অঙ্গ দুলানো দেখতে অন্যরকম একটা মজা আছে যা তোমার মাঝে নেই।
মাসীমা কম বয়সে পূজা পার্বণে মাঝে মাঝে শখ করে অল্প স্বল্প নাচতেন। তাই সাহস করে মাসীমা যতটুকু সম্ভব বাইজী নাচ শিখলেন আর রাতে ছেলে মেয়েরা ঘুমালে আলাদা রুমে নাচের আসর বসাতে শুরু করলেন। কাকাবাবু মুগ্ধ হলেন। তিনি বাইজী বাড়ি যাওয়া আর দূশ্চরিত্র উপাধি থেকে মুক্তি পেলেন।

Comments

comments

Check Also

একটি দিনের গল্প

লিটন বড়ুয়া : পাঁচতলা একটি বাড়ি। পাঁচতলায় থাকে শমিক। দুই তলায় থাকে রফিক সাহেব। বাড়ির …