Home / গল্প অথবা উপন্যাস / মজলিশপুর লজ

মজলিশপুর লজ

প্রমা ইসরাত :

ছোট বেলায় ডায়রি লিখতাম। একটা দুইটা গল্প, ছড়া লেখার চেষ্টা করতাম। মনের দুঃখ, কষ্ট, দিনে কি কি করলাম, আর কি কি করার ইচ্ছা আছে এইসব। তখন আমিই ছিলাম আমার পাঠক। আরেকটু বড় হলে ডায়রির কিছু লেখা দেখাতাম স্কুলের এক বান্ধবী কে। আরেকজন গুপ্তচর পাঠক ছিল আমার, সে আমার ভাই। তার কাজ ছিল ডায়রি চুরি করে পড়া এবং কোন তথ্য পেলে আমার মা’র কাছে পাচার করা।ছোট বেলায় ডায়রি লিখতাম। একটা দুইটা গল্প, ছড়া লেখার চেষ্টা করতাম। মনের দুঃখ, কষ্ট, দিনে কি কি করলাম, আর কি কি করার ইচ্ছা আছে এইসব। তখন আমিই ছিলাম আমার পাঠক।

আরেকটু বড় হলে ডায়রির কিছু লেখা দেখাতাম স্কুলের এক বান্ধবী কে। আরেকজন গুপ্তচর পাঠক ছিল আমার, সে আমার ভাই। তার কাজ ছিল ডায়রি চুরি করে পড়া এবং কোন তথ্য পেলে আমার মা’র কাছে পাচার করা।এখনো অনেক কিছু লিখি, কাওকে জানাতে ইচ্ছে না করলে “অনলি মি” করে রেখে দেই, কিংবা লিখেই আবার ডিলিট মারি। মাঝে মাঝে মনে হয়, সব কিছু লিখে প্রকাশ করে দেই। তারপর মনে হয়, কারো কি আদৌ কোন ঠ্যাকা পড়েছে, সব কিছু জানার? আমারই বা এতো কথা লেখার বিগাড় কেন?  হঠাৎ করে অনেক কিছু মনে পড়ে যায়, মাঝে মাঝে নিজেই অনেক কথা ডেকে ডেকে নিয়ে আসি। “আয় , আয়, স্মৃতি আয়, কথা আয়, ব্যাথা আয়” । তারপর সব কিছু নিয়ে ভাবি, মন খারাপ করি, ভালো করি। তারপর আবার চলে আসি বাস্তবে, মন খারাপ করি, ভালো করি। সময় কি করে কাটাতে হয়, আমি বোধ হয় শিখে গিয়েছি। ভূমিকা শেষ করি, শিরোনামে ফিরে যাই।

 “মজলিশপুর লজ” আমার দুই খালাতো ভাইদের বাড়ি। শৈশবে এই বাড়িতে অনেক যাওয়া হতো, বড় হয়ে যাওয়া আসা খুব কম ছিল। বাড়িটা আমার কাছে অদ্ভুত লাগতো, কিন্তু ভালো লাগতো। দোতালা বাড়ি, নিচে বাথরুম, টয়লেট, উপরে রান্না ঘর, শোবার ঘর, ড্রয়িং রুম আর অনেক বড় খোলা বারান্দা। বারান্দায় কোন গ্রিল নাই। ইচ্ছে করলেই বারান্দা থেকে নিচে লাফ দেয়া যায়। ছাদ টা ছিল অন্যরকম ভালোলাগার ব্যাপার। রোদে পোড়া ছাদ থেকে কেমন একটা গন্ধ আসতো, ইভানের পায়রার খোপ ছিল সেই ছাদে। সেটা অবশ্য অনেক পরে। শৈশবে বেড়ানোর জায়গায়ই কয়েকটা, মামার বাড়ি, খালার বাড়ি, নানার বাড়ি। খুব অবস্থা সম্পন্ন পরিবার দেখেই আমার নানা আমার মেজো খালার বিয়ে দিয়েছিলেন। আমার মেজো খালা বিউটি,আমার মেঝপা খালামণি।

আমার মায়ের সাথে তার চেহারার সবচেয়ে বেশি মিল। একবার আমাদের সবচেয়ে ছোট ভাই আরিয়ান কে দু জনের মাঝে দাঁড় করিয়ে দেয়া হয়েছিল, সে অবাক বিস্ময়ে প্রায় একই রকম দেখতে দুটো মানুষ কে দেখছিল। অবস্থা সম্পন্ন, বনেদি বাড়িতে আমার খালার কেমন জীবন কেটেছে এগুলো নিয়ে মোটেই লিখতে ইচ্ছে হচ্ছে না। মজলিশপুর লজ নিয়েই বলি। মজলিশপুর লজে থাকতো, খালা খালু, হিমেল ভাইয়া আর ইভান।আরেকটা ভাগ বোধ হয় তাদের চাচাদের। হিমেল ভাইয়া আমার পিতৃকুল-মাতৃকুলের মধ্যে একমাত্র বড় ভাই। আমার চেয়ে ১২-১৩ বছরের বড়। আমার মায়ের খুব আদরের ভাগিনা।

বোনের সন্তান দের প্রতি অন্য রকম আদর কাজ করে। খালা হওয়া একটা অনুভূতি। খালা হওয়া হচ্ছে সেই অনুভূতি যে অনুভূতি অনুভব করায় যে মা হতে হলে সন্তান জন্ম দিতে হয় না। সব ক্ষেত্রে এরকম হয়ত নাও হতে পারে, সেটা আমি জানি। সম্পত্তি নিয়ে কত শত মামলা আসে আদালতে, সেই মামলা চলে বছরের পর বছর সেগুলোও জানি। কিন্তু মানুষ যখন মানুষ থাকে তখনের অনুভূতি গুলি নিয়েই বলতে চাই। হিমেল ভাইয়া ছিল সবচেয়ে চঞ্চল, সবচেয়ে দূরন্ত, সবচেয়ে অস্থির এক ছেলে।

অনেকটা ছুটি গল্পের ফটিকের মতো। সবাইকে ব্যাস্ত রাখতো, জ্বালাতো নানান কর্মকান্ডে। একটা সময় পরে সে বদলে গেল, নানান শারীরিক মানসিক অসুস্থতায় সে একদম বদলে গেল। সে বেশ মেধাবী ছিল, হয়ত তার জীবন টা অন্যরকম হতে পারতো। পড়ালেখা শেষ করে সে পরিবারের দায়িত্ব নিতে পারতো, রাজনীতি করতে পারতো, ব্যাবসা করতে পারতো।তার সাফল্য দেখিয়ে হয়ত আমাদেরকেও তার মতো হতে বলত। সব কিছু করার সুযোগ তার ছিল। কিন্তু আমার কান্ডজ্ঞানহীন খালু সেই পরিবেশ দিতে পারে নি।

নিজের ভেতরের হামবড়া ভাব আর সহায় সম্পত্তির গরিমায় সেই পরিবেশ তিনি তৈরিই করতে পারেন নি। খালুর একটা দোকান ছিল, এলিট আর্ট। নামটা কি ভুল লিখলাম? যাকগে। সেই দোকানে নানান রং তুলি, ছবি আঁকার জিনিস ছিল, দোকানটার ভেতরে ঢোকার খুব ইচ্ছা ছিল আমার, সেই সুযোগ হয় নি। একবার স্কুলের একটা ড্রয়িং কম্পিটিশনে নাম দিয়েছিলাম, আম্মু খালুর কাছে নিয়ে গেলেন উনি একটা গ্রামের দৃশ্য, গাছ, খরের দোচালা ঘর এইসব আঁকা শিখিয়ে দিলেন, আমিও শিখে নিলাম। আমি থার্ড হয়েছিলাম সেই কম্পিটিশনে। নইলে আমাদের স্কুলের যে ড্রয়িং টিচার ছিল তার স্কেলের বাড়ি খেয়ে খেয়ে ছবি আঁকাআঁকির উপর থেকে সব রকমের ভক্তি উঠে গিয়েছিল।  হিমেল ভাইয়া খুব বন্ধু প্রিয় আড্ডাবাজ ছেলে ছিল। ওই এলাকার সামনে দিয়ে গেলেই বেশির ভাগ সময়ই দেখতাম হিমেল ভাইয়া দাঁড়িয়ে বা বসে আড্ডা দিচ্ছে। আমি সামনে গেলেই বলত কিরে মোটকি, কি খবর?  আর কোনদিনই হিমেল ভাইয়া কে সেই রাস্তায় দেখা যাবে না। সে আর মোটকি বলে ডাকবেও না। মানুষের সাথে যোগাযোগ রাখতে খুব পছন্দ করতো হিমেল ভাইয়া। আমাদের বাসায় আসতো প্রায়ই। ঘুরতে বেড়াতে খুব পছন্দ করতো, বন্ধুত্ব করতে পছন্দ করতো। সব জায়গায় কেমন যেন একটা অধিকারবোধ নিয়ে চলা ফেরা করতো।

ফটিকের মতোই হয়ত ভাবতো, মামার বাড়ি কি পর নাকি? এই জন্য তার মামার বাড়ি, মামাদের প্রতি ছিল সবচেয়ে বেশি আকাঙ্ক্ষা। মানসিক এবং শারীরিক অসুস্থতায় তার আচরণে মাঝে মাঝে পরিবর্তন আসতো, সেটা অনেকের কাছেই গ্রহণযোগ্য ছিল না। হিমেল ভাইয়া যখন খুব অসুস্থ্য, তার “বোন টিবি” ধরা পড়ে, তার অর্ধেক শরীর অবশ হয়ে যায়। ইভান তাকে ঢাকায় নিয়ে আসে, পপুলারে দেখাতে। আমি খবর পেয়ে দেখতে যাই। সুদর্শন এক যুবক, কেমন করে ক্ষয়ে ক্ষয়ে গেল। আমাকে দেখে হিমেল ভাইয়া বেশ কিছু কথা বলে, সবার কথা জিজ্ঞেস করে, আমার সব কাজিন দের খোঁজ খবর নেয়, তার জন্য দোয়া করতে বলে। সে একসময় ঠিক হয়ে যাবে সেই আশার কথাও বলে। বলে যে তার সামনে জন্মদিন।

গত জন্মদিনটাই হিমেল ভাইয়ার শেষ জন্মদিন গেল।আমার সাথে বয়সের একটা বড় গ্যাপ থাকাতে তার সাথে গল্পের বিষয় বস্তু কিছুই ছিল না। সবাইকে ক্ষ্যাপানো, দুষ্টামি, ফাইজলামি, এগুলিই করতো। আমি বড় হয়ে গেলে দু একটা সিরিয়াস ভাবে কথা জিজ্ঞেস করতো। মাঝে মাঝে মনে হয় এমন যদি হতো, যে হিমেল ভাইয়া ভালো একটা কিছু করতো, পড়াশোনা করে নিজের পায়ে দাঁড়াতো, চাকরি ব্যাবসা কিছু করতো, বিয়ে করতো, তার বিয়েতে আমরা আনন্দ করতাম, একটা ভাবী হতো আমাদের। আবার মনে হয়, এই এতো কিছু না করেও সে অনেকের মনেই জায়গা করে নিয়েছিল।বড় ভাইয়ের একটা ভূমিকা থাকে, কাজিনদের মধ্যে হলেও। আগে কখনো মনে হয় নি, কেন জানি ইদানিং মনে হয়। মনে হয় আমার যদি একটা বড় ভাই থাকতো হয়ত সেইদিন, আমার ছোট ভাইটা ঘুষিটা দেয়ালে না মেরে জায়গা মতো বসিয়ে দিতে পারতো।

সন্তান হারানো মাকে স্বান্তনা দেয়ার কোন ভাষা থাকে না। আমার নানু এবং আমার মেঝপা খালামণি দুজনকেই এই কষ্টের ভেতর দিয়ে যেতে হয়েছে। একই কষ্ট নিয়ে বেঁচে আছে আমার অন্য দুই বোন নয়ন আপু, পুতুল আপু। হিমেল ভাইয়া মারা যাওয়ার পর, এখন রয়েছে ইভান। হিমেল ভাইয়া আগে যেখানে বসে থাকতো একদিন সেই রাস্তায় যাওয়ার সময় দেখি ইভান বসে আছে। হিমেল ভাইয়ার সাথে ইভানের আচার আচরণে কোন মিল নেই। জীবন সম্পর্কে তার চিন্তা ভাবনা অন্যরকম। হিমেল ভাইয়া অসুস্থ্য থাকা অবস্থায় ইভান আর তার বন্ধুদের ভূমিকা ভাষায় প্রকাশ করার মতো না। ইভানের বন্ধু ভাগ্য ভালো। ওর বন্ধু ভাগ্য দেখলে আমার হিংসা হয়। লেখা শুধু দীর্ঘই হচ্ছে। “মজলিশপুর লজ” আমার শৈশবের বেড়ানোর জায়গা, হিমেল ভাইয়া ইভানদের বাড়ি।হিমেল ভাইয়া ছাড়া, এই বাড়িটা অসম্পূর্ণ।

লেখক : আইনজীবী

Comments

comments

Check Also

একটি দিনের গল্প

লিটন বড়ুয়া : পাঁচতলা একটি বাড়ি। পাঁচতলায় থাকে শমিক। দুই তলায় থাকে রফিক সাহেব। বাড়ির …