Home / গল্প অথবা উপন্যাস / ক্ষুধা ।। নীল মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর

ক্ষুধা ।। নীল মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর

রিকশাচালকের কটাক্ষ চোখকে অস্বীকার করে দ্বিতীয় বার জিজ্ঞাসা;দাদা,বয়স কতো হবে? প্যাডেলে সমস্ত জোর লাগিয়ে খিচে ওঠে;মোশাই নতুন নাকি? দেবী দর্শনে আগে কখনোই আসেনি শুভ্রাংশু, দেবালয়ের পথ চেনে না। জেদ চেপে বসেছে,অনিরুক্ত ক্ষোভ দাবানলের মতো জ্বালিয়ে দিয়েছে ভেতরটা নেভাতে হবে আগুন- নয়তো পুড়ে মরতে হবে। প্যাডেল ঘুরতে থাকে,মনে হয়-  আগুনে ঘোড়ার দৈবরথে চেপে বসে আছে সুকুমার দেবতা “দেবতা না ছাই,শরীরের ক্ষুধা মেটাতেই আসে পুরুষেরা দলে দলে সুর,বীর,পরাক্রমশালীরা- দরজা ভেজালেই ভেড়া হয়ে যায়।” রেনু মাসির তাচ্ছিল্য মাখা গল্প শুনেছে শুভ্রাংশু, তখন সে পুরুষ নয়- ভাতিপশমের বিড়ালমুখো কিশোর। কলপারে দড়িতে মেলা মালতী বউদির অন্তর্বাসের গন্ধে বমি পেতো অথচ সন্ধ্যা বেলায় পাখি হয়ে উড়ে যেতো লাল অন্তর্বাস- এ ছাঁদ হতে ও ছাঁদে, নন্দুদা’রা জ্যোৎস্না রাতে হাসনাহেনার গন্ধ পেতো তাতে।
ক্লাসরুমে রুহানি আর নিয়াজ -কি চুমুই না খেয়েছিল!

টিফিন পিরিয়ডে লুকোচুরি প্রেম ওদের, প্রেম নাই ছাই- সব শরীরের খেলা।
অর্গাজমের দারুণ প্রশিক্ষণ দিয়েছে নরেন, সরিষার তেল মেখে- ছাঁদে উত্তনশয়নে দুপুর বেলা  আকাশে ঘোড়া দৌঁড়াত। বিচ্ছিরি নেশায় পেয়ে বসেছিল, একাকি রাত্রি কোল বালিশে বেশামাল! মেলায় কেনা ঐশ্বর্য্যরাই এর ভিউকার্ড জ্যান্ত হয়ে স্পর্শ দিয়ে যেতো, স্বপ্নের দুয়ার আলগোছে খুলে যার তার অবাধ প্রবেশ ছিল। ব্যাস এটুকুই,তারপর বহুকাল দুঃস্বপ্নে কেটেছে বহুকাল প্রেমহীন কতোগুলো বসন্ত কেটে গেছে কতোগুলো বর্ষা শারদীয়া গেছে প্রচণ্ড দুর্ভোগে কোথাও যেন কেউ অপেক্ষায় নেই কিংবা ভগবানচন্দ্র ভুলেই গেছে যুগল বানাতে। বিভাবরী ঘুচল,রোদ হাসল,মুছে গেল জন্মের অভিশাপ এক সাবলীল সুন্দর অপেক্ষায় ছিলবসন্তবনে অবশিষ্ট একটি ফুল ফুটেছিল যার সন্ধান কেবল শুভ্রাংশু’ই পেয়েছে শুভ্রাংশু প্রেমিক থেকে আরো প্রেমিক ধ্যানী থেকে মহা যোগী। শুভ্রাংশু একদিন প্রেমিক থেকে পুরুষ হয়ে ওঠে- পুরুষ থেকে দখলদার না না দেহের নয়,মনের বৈকি শুভ্রাংশু জানতো না- লাঠির জোর ছাড়া কিচ্ছু মেলে না বসন্তবনের শেষ ফুলটিকেও ছিঁড়ে নিয়ে যাবে শক্ত হাত কিংবা ফুলের ধর্মই হাত বদল….
.
“দাদা,এয়ে পড়েছি।”
“কতো হলো?”
“ত্রিশ টাকা।”
ভারা পেয়ে সদয় হলেন রিকশাচালক,প্রসন্ন মুখে দেখিয়ে দিলে স্বর্গের গলি। সরু গলিটিতে চিলতে আলো নেই- সম্ভাষণ নেই কোনো অপ্সরার, নিষিদ্ধ হয়েছে কোনো এক শতাব্দীতে এই সব জলসাঘর। অন্ধকার ফুঁড়ে মুখের উপর নেবে আসে একটি মুখ!
“বাবু,কি চাই?”
“সেবা।”
“তিনশ পঞ্চাশ টাকা ছাড়ুন।”
“দাদা,বয়স কতো হবে?-কতক্ষণ থাকতে পারব?”
“চেহারা দেকি তো মনে হতিছে দমে কুলিয়ে উঠবেন নাকো,কচি’ই কয়ে দিচ্চি!”
“আচ্ছা ঠিক আছে।”
“ওই যে সিঁড়ি,উঠে যান দেকি,ডানদিকের তিন নাম্বার ঘরে গিয়ে বসেন।”

তিন নাম্বার ঘরের কপাট বন্ধ,ভেতরে ঘোমটা খোলার ছলনায় মায়া ঘুঙরু আবিষ্ট করেছে বুঝি কোনো বিষকণ্ঠি প্রেমিককে আহ্!ক্ষণকালেই খুলে যাবে দুয়ার প্রমোদকাননে বিষ নিশ্বাস ঝেড়ে এক শুদ্ধ পুরুষ হয়ে যাওয়া। তারপর নিশ্চয়ই পৌরুষ্যগন্ধ ছড়াবে শরীরে তখন না হয় শক্ত মুঠোয় নষ্ট নখে খামচে ধরা যাবে অবন্তীর শরীর পরিস্ফুটিত স্তনযুগল,তলপেটের স্থূল চামড়া- নাভিমূল চিড়ে ফেলা যাবে আঙ্গু্লের ফলায় ঘাড়ের উপর রক্তচোষা বাদুড়ের কামড়ে কর্ণের দুল ছিঁড়ে দেহের প্রতিটি ইঞ্চি-খণ্ড খণ্ড চষে ফেলা যাবে, প্রেমিকের মতো নয়- পুরুষের মতো করে। দরজা খুলে যায়,লুঙ্গির গিঁট ঠিক করতে করতে বাইরে আসে দেহাতি বদন-অ-কান্তি পৌর! প্রবেশে অনিচ্ছা,তবুও চৌকাঠে ঠেকেছে অপেক্ষা। কলারে পৌঁছে গেছে নারকীয় হাত মানবিক কোনো স্পর্শ নয় রমণীয় ছলাকলা নেই,শ্রী নেই বাচনে

“আহ্ মলো যা,রসের নাগর আমার,আয় ভেতরে।” বেখাপ্পা শরীর,নিতম্বদেশে দারিদ্রতা কাপড়খোলার তাড়া নেই এসো এবং উঠে যাও,এই শহরে একটিই ঘোড়া- নামে বেনামে দৌড়ায়। ধূপ ধূম্র,হোমাগ্নি,ধ্যান কিংবা বন্দনার ছন্দ নেই বদ্ধ বাতেসে কেবল স্খলিত বীর্যের গন্ধ  প্রাচীন চৌকিতে জবুথবু হয়ে পড়ে আছে সর্বগ্রাসী!-  শ্রীহীন সৃজনের অপেক্ষায়। এখানে অর্চনীয় কে? একটি ক্ষুধার্ত মানুষ জানে ক্ষুধা কি! একটি ব্যর্থ প্রেম একগুচ্ছ কবিতা,ও- এক গলা রাজনৈতিক বক্তৃতা এবং পৃথিবীর সমস্ত যুদ্ধ মেটাতে পারেনি যাকে- সেই অশ্লীল সুন্দরের নাম “ক্ষুধা” শুভ্রাংশু মিছিলের শহরে কবিতার ক্যানভাস ফেলেছিল প্রেমিকার শরীরে দেখেছিল জৌলুশ! এখানে কার সাথে সঙ্গম? বেশ্যা -নাকি এক উদর ক্ষুধার সাথে! বিটকেল গন্ধ অচেনা মানস শরীরে,মাংসল গন্ধ- ঘাম শুঁকিয়ে ইস্পাতের গন্ধ; অথচ অবন্তীর বুকে বকুল ফুলের সুঘ্রাণ ছিল! চোখ কি গভীর- ডুব দিয়ে তলানি খুঁজে পাওয়া যায়নি। এই যে মহিলাটি,ঠোঁটের ফাঁকে হাসি সে হাসিতে কটাক্ষ!মৃত চোখে ইশারা “এসো পুরুষ,এসো মিটিয়ে নাও ক্ষুধা।” শুভ্রাংশু ক্ষুধার্ত,সক্কালবেলা পার্টি অফিসের গলিতে গঞ্জিকার কড়া পারফিউম মেখেছে চোখবুজে এক নিশ্বাসে সাবার করেছে কোলকি।
অন্নজলের সংস্পর্শে বমি পায় অন্ননালী সরু হয়ে গেছে,গলায় আটকে যায় সকালের প্রথম গ্রাস; ব্যর্থ প্রেমিকের ক্ষুধামন্দা দীর্ঘজীবী হোক।

“আয় শুরু কর,বাইরে খদ্দের এয়ে লাইন দিবে নাকি?- যত্তসব! এ শালা বুড়োটার আক্কেল দেকিছ,পাঠিয়েছে কচি খোকা।” গজগামিনী সমস্ত শরীর এলিয়ে আকর্ষণ করে, উপেক্ষার চোখ দেয়ালে খেলে নেয় শুভ্রাংশু; টেরাকোটায় ভগবান মিটমিটে হাসছে!
“আমি পারব না ওসব,মিনিট দশেক বসি?- সিগারেট শেষ করেই চলে যাচ্ছি।”
“টাকা দিয়ে ঢুকলি,আর না ঢুকিয়েই চলে যাবি?”
“ভদ্রভাবে কথা বলুন।”
“ওরে আমার ভদ্দরনোক রে,একেনে কারা আসে জানিস না?”
“আপনি কাপড়টা পরে নিন দয়া করে।”
“প্রেমে মরা?”
“মানে?”
“ন্যাকা কানাই আমার,মাইয়া গুলাও মানুষ চিনতে ভুল করে।তুই খুব ভালো মানুষ।”
“না,ভালো মানুষ হলে এখানে আসব কেন?”
“একেনে বুঝি ভালো মানুষ থাকতে পারে না?- শরীর বেচা খুব খারাপ?”
“জানি না।”

ক্ষুধার কাছে ভালো মন্দের কি দাম জীবনের জন্য জীবিকা সে শরীরই হোক আর…… আর?- শুভ্রাংশু মিছিলে নেবেছে,ক্ষুধা দারিদ্রতার নিরসনের রাজনীতি করেছে রাজনীতি!চেতনা!মুখরোচক তত্ব ক্ষুধা মিটে গেলে এই সব তত্ত্বকোষ এই সব তাত্ত্বিকেরা না খেয়ে মরবে নিশ্চয়ই নচেৎ মানুষের কাছে যেতে পারেনি কেন তারা? “তাকে খুব ভালবাসিস, তাই না রে?” “জানি না,উঠব।”
“নাম কি লো তার?” “আসছি,ভালো থাকবেন।” “শোন ভাই,নেশা টা ছেড়ে দিস।আমার তো স্থায়ী ঠিকেনে নেই,আবার দেকা হলি গপ্প শুনতেম তোর।” শুভ্রাংশু বাইরে আসে,কটকটে নীলের সমুদ্রে সাঁতরে ফিরছে পাখিরা মিছিলে ফুটেছে লোহিত ফুল,ক্ষুধার রঙ কি তবে নীল-লোহিত?
স্লোগানে স্লোগানে উত্তাল রাজপথ!
ওরা কারা আসে-
কেন আসে, কোথায় যায়?
শুভ্রাংশু মিশে যায় মিছিলে,নগর চত্বরে টার্বাইনের মতো ঘুরে-
নিরুদ্দেশ হবে মিছিল।
সময়ের চোরাস্রোত বয়ে যাবে নগর জুড়ে
রাত নাববে,ক্ষুধা জেগে উঠবে
কংক্রিটের সমুদ্রে পা চুবিয়ে কবিতা লিখতে বসবে
এই সভ্যতার অশ্লীল কবি।

লেখক:কবি ও লেখক।

Comments

comments

Check Also

আবারো হিমু

আরাফাত এইচ রাশেদ : কেমন আছেন?ভালো আছেন? হ্যাঁ ভালো। আমাকে চিনছেন? না। কি বলেন সত্যি …