সুত্রপাত / অনন্যা / হে সু-নাগরিকগণ দাঁড়ান, একটু শুনুন
arshi Marzan

হে সু-নাগরিকগণ দাঁড়ান, একটু শুনুন

আরশি মারজান:

“হে সু-নাগরিকগণ’ দাঁড়ান, একটু শুনুন” একজন স্বাধীন স্বার্বভৌম দেশের নাগরিক হিসেবে আপনি কি জানেন, সংবিধান অনুযায়ী আপনি কতটা ক্ষমতার অধিকারী? না! আমি আপনাকে সংবিধানের ক খ A B C স্বমন্ধে বলবনা। কারন অনলাইনে যারা সময় ব্যয় করে তারা এতটা অজ্ঞ নয় যে তাকে ধরে ধরে তার প্রাপ্য তার অধিকার স্বমন্ধে জানাতে হবে। কিন্তু হ্যাঁ, জানানোর আছে। জানেনা বলেই আজও কিছু মানুষ অধিকার হতে বঞ্চিত। আমি গনতান্ত্রিক দেশের একজন নাগরিক। গনতন্ত্রের নীতি অনুযায়ী, দেশের মালিক জনগণ। কোন আমলা, কোন সামরিক বাহিনীর অফিসার, পুলিশ, কোন রাজনৈতিক নেতা, এমন কি সরকারও নয়। তাহলে কোন থানা, কোন সরকারী অফিস, আদালতে গিয়ে একজন মানুষ তাঁর অধিকার মোতাবেক কতটুকু সেবা পেয়ে থাকেন? বা তাঁরা আদৌ কি সম্মানিত হোন? একজন ভিকটিম যখন থানায় কোনো ডায়রি লেখাতে যান পুলিশ কতটুকু তাকে সাহায্য করে বা তিনি কতটুকু পেয়ে থাকেন? শুনুন:- একজন নারী থানায় গিয়েছেন তাঁর সহকর্মীর বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করতে। তাঁর অভিযোগটি ছিল এমন- তিনি একটা বিয়েতে অংশগ্রহণ করেছেন। অনুষ্ঠান শেষে ফিরবে বলে তিনি বেরিয়েছেন। বাইরে বের হতেই দেখা হয় সহকর্মীর সাথে যিনি সিএনজিতে আগে হতেই বসে ছিলেন। তাঁকে দেখা মাত্রই তিনি সহযাত্রী হওয়ার জন্য তাঁকে আমন্ত্রন জানান।

কিছুদুর যাওয়ার পর সহকর্মীর দেয়া জুস পান করলে তিনি আর কিছু বলতে পারেননা। ঘুম ভাঙ্গলে নিজেকে আবিষ্কার করেন ঢাকা শহরে। আমি বলে রাখি, এটা আমার বানানো গল্প নয় যদিও এই কথাগুলো আড়ালেই থেকে যায় যেটা আমি আজ একজন সদ্য পুলিশে জয়েন করা কোন সাব-ইনস্পেক্টারের কাছে শুনেছি। মনে হল মানুষকে অনেক কিছু জানানোর আছে এই গল্পটার মধ্য দিয়ে। তারপর, তিনদিন সেই লম্পট সহকর্মী ও তার বন্ধুদের দ্বারা পালাক্রমে গ্যাং রেপ হয় যাকে বলে ‘গণধর্ষণ’। তিনদিন পর আবার সন্ত্রাসীরাই তাকে তাঁর বাড়ির আশপাশের কোন এক জায়গায় ফেলে রেখে যায়। ঘটনার দশদিন পর ভিকটিম থানায় যায়। পুলিশ তাঁকে প্রশ্নবাদ করে-:যখন আপনাকে সিএনজিতে তোলা হল তখন আপনি স্ব-ইচ্ছায় উঠেছিলেন?:আপনাকে একটা ঘরে রাখা হল, আর আপনি ঘুম ভেঙ্গেই কি করে বুঝলেন যে সেটা ঢাকা শহর?:আপনাকে আবার তারাই আপনার এলাকায় রেখে গেল?:যখন আপনাকে গাড়ি হতে তারা নামিয়ে দিল তখন আপনি চিৎকার করেননি কেন?:তাহলে আপনি দশদিন পরে কেন থানায় এলেন অভিযোগ দিতে? এই প্রশ্ন গুলো শুনে একবারো কি মনে হয় যে এই প্রশ্নগুলো তদন্তের স্বার্থে বা ভিকটিমের স্বার্থে করা হয়েছে? এগুলোর জবাবে একজন সাহায্যপ্রার্থী মানুষ কি জবাব দেবেন?

যখন প্রশ্নগুলো তাঁরই বিরুদ্ধে যাচ্ছে? যখন ভিকটিম তটস্থ তখন ভেবে নেওয়া হলো সে একজন লোভী নারী, সহকর্মীর সাথে তার পরকিয়া ছিল, এবং এক পর্যায়ে তাঁকে বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে ঢাকায় নিয়ে যাওয়া হয়, সেটা তাঁর নিজের ইচ্ছায়, এবং যখন সে রেপ হয় তখন মিনতি জানালে তাঁকে রেখে যাওয়া হয়, সে চেয়েছিল ঘটনা গোপন রাখতে কিন্তু এলাকার মানুষ ও বরের চাপে সে অভিযোগ জানাতে এসেছে! এই যদি হয় পুলিশের ভাষ্য? তবে কোন ধর্ষিতা নারী নিজের প্রাপ্য পেতে আইনের আশ্রয় পেতে থানায় যাবেন? এই বোঝায় যে, সে সেক্সুয়াল রিলেশনটাকে উপভোগ করতে পারেনি বলেই ধর্ষিতা? অপরাধী তাকে বিয়ে করেনি বলে সে প্রতিশোধ নিতে চাইছে? ধরাযাক, একজন মানুষ বিবাহ বহির্ভুত সম্পর্কে জড়ালেন। প্রতিশ্রুত হলেন, বিশ্বাস করলেন। কিন্তু তাঁর বিশ্বাস ভাঙ্গা হল, তাঁকে প্রতারিত করা হলো। এর পরিপ্রেক্ষিতে মানবাধিকার কি বলে? তিনি পরকিয়ার দায়ে অপরাধী? ধর্ষণ তাঁর যোগ্য শাস্তি? নাকি প্রতারিত হওয়ায় তিনি আইনের আশ্রয় পাওয়ার যোগ্য? যদি গণতান্ত্রিক দেশের নাগরিক হিসেবে তাঁর আইনের সাহায্য পাওয়া অধিকার হয় তাহলে এই ধরনের প্রশ্ন উত্থাপিত হয় কেন? আমরা পত্রিকায় প্রায়ই দেখি ধর্ষিতার সাথে ন্যায়যোগ্য আচরণ করা হয়না। অনেকে অপদস্থ হওয়ার ভয়ে পুলিশের দারস্থ হতেই নারাজ। এই সংস্কৃতি যদি চলতে থাকে দেশ উচ্ছন্নে যেতে বেশি দিন লাগবেনা। তাই জনগণের ক্ষমতা জনগণের বুঝিয়ে পাওয়ার সময় এসেছে।  রক্ত, যুদ্ধ ছাড়াই আমরা একটা সুশীল সমাজ গড়ে তুলতে পারি। আর তার জন্য নিজের আমিত্বটাকে জাগাতে হবে সবার আগে।

লেখক: মানবাধিকার কর্মীও লেখক।

Comments

comments

error: Content is protected !!