সুত্রপাত / সম্পাদকের কলম / হুমায়ুন আজাদের সাক্ষাতকার ( পর্ব-৩, শেষ পর্ব)
Humayun azad

হুমায়ুন আজাদের সাক্ষাতকার ( পর্ব-৩, শেষ পর্ব)

শিপ্ত বড়ুয়া:

বাংলাদেশের বিখ্যাত লেখকদের অন্যতম ছিলেন অধ্যাপক হুমায়ূন আজাদ। । হুমায়ুন আজাদের এই সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ করা হয়েছিলো নিউইয়র্কে ২০০২ সালে নিউইয়র্কস্থ বাংলা টিভির পক্ষ থেকে । প্রিন্ট মিডিয়ায় এটি প্রকাশিত হয়নি। তাকে গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করে সাক্ষাৎকারটি মরণোত্তর প্রকাশ করা হয় উত্তর আমেরিকায় সর্বাধিক প্রচারিত ঠিকানার ২০ বছর পূর্তি উপলক্ষে বিশেষ সংখ্যায়-যা ১৯ ফেব্রুয়ারিতে বাজারে এসেছে। তিন পর্বে প্রকাশিত সাক্ষাৎকারটির শেষ পর্ব প্রকাশিত হল।

প্রশ্ন: আপনি একজন আধুনিক মুক্ত চিন্তার মানুষ এবং আপনার লেখাগুলোও প্রথা বিরোধী। আমার প্রশ্ন হলো আপনি কবিতা কম লিখেন কেন?

হুমায়ুন আজাদ : আমি কবিতা কম লিখি এটা ঠিক। যেমন নিউইয়র্কে আপনারা আছেন, চমৎকার পোশাক পরেছেন- আমি কিন্তু চমৎকার পোশাক পড়ি একথা বলবো না। আমি স্যুট পরি না, আমি জুতো পরি না, আমি জিন্স পরি। বাংলাদেশে একজন শিক্ষকের পক্ষে জিন্স পড়া স্বস্তিকর না, তারপরেও আমি পড়ি। এমন কি আমি বিকেলে সাইকেলও চালাই। কেউ কেউ মুগ্ধ হয় কেউ বা ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে। বাংলাদেশে এরকম একটি অবস্থা, যিনি কবি, তিনি শুধুই কবি, যিনি ঔপন্যাসিক, তিনি শুধুই ঔপন্যাসিক। আমি তো নানা বিষয়ের সাথে জড়িত। যেমন আমি কবিতা লিখেছি, প্রচুর পরিমাণে প্রবন্ধ লিখেছি, সমালোচনা লিখেছি, ভাষা বিজ্ঞান, উপন্যাস- কিশোরদের জন্য রচনা এবং কলাম লিখেছি। আমি যদি সুরের কবিতা লিখতাম তাহলে হয়ত এখন আমার ৩০টির মত বই থাকতে পারতো। নানা দিকে আমাকে লিখতে হচ্ছে। আমি বাধ্য হয়ে লিখছি। আমার ভিতরের যে বোধ সেটাকে মূলায়ণ করি। আমি যখন বোধ করি যে আমার প্রবন্ধ লেখার মনোভাব জেগেছে তখন আমি প্রবন্ধ লিখি, যখন মনোভাব জাগে উপন্যাস লেখার তখন উপন্যাস লিখি। কবিতা আমি খুব কমই লিখেছি। বাংলাদেশই এক মাত্র দেশ যেখানে মনে করা হয়- কবিদের হাজার হাজার কবিতা লিখতে হবে। আমি তা মনে করি না। শ্রেষ্ঠ কবিদের মধ্যে যেমন মালারসহ আরো যারা রয়েছেন, তাদের কবিতা সংখ্যা বড় জোর ১০০ শ। কিন্তু আমাদের দেশে কবি হতে হলে হাজার হাজার কবিতা লিখতে হবে। হাজার হাজার ছোট বড় লাইন লেখা এগুলো কবিতা নয়। আমি তখনই কবিতা লিখি যখন আমি গভীরভাবগ্রস্ত হই। যারা আমার বই এর নিবীড় পাঠক তারা বিষয়গুলো নিশ্চয় বুঝবেন- আমার উপন্যাসগুলোর মধ্যে এক ধরনের কবিতা রয়েছে। আমি আরো একটি জিনিস বোধ করি যে, গত ১৫ বছর ধরে আমাদের রাজনীতি যেমন দূষিত হয়ে গিয়েছে, সমাজ যেমন দূষিত হয়ে গিয়েছে, আমাদের বাংলা ভাষা এবং বাঙালির আবেগও অনেক দূষিত হয়ে গিয়েছে। এই দূষিত অবস্থা থেকে আমাদের পরিশুদ্ধ করা দরকার।

প্রশ্ন: সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের সাহিত্য সম্পর্কে আপনার মূল্যায়নটা কি?

হুমায়ুন আজাদ : একটি জাতির যখন সব দিকে পতন ঘটে, তখন সব দিকেই পতন ঘটে। বাংলাদেশের সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ দশক হচ্ছে ষাটের দশক। ষাটের দশকে বাংলাদেশের বাঙালিরা আধুনিক হয়ে উঠেছেন, বিশ্ব সাহিত্যের সঙ্গে যুক্ত হয়। অসাধারণ কবিতা, উপন্যাস লেখা হয়েছে। ঐ সময়ে আমাদের মধ্যে স্বাধীনতার জন্য স্পৃহা তৈরী হয়েছিলো। স্বৈরাচারের কারণেই বাংলাদেশের সৃষ্টি হয়েছে। এখনো কিন্তু ৫০ এবং ৬০-এর দশকের যে সব লেখকরা ছিলেন তাদের সৃষ্টিই সেরা ছিলো। আমাদের সাহিত্যের ক্ষেত্রেও একটি পতন সৃষ্টি হয়েছে। এটা অবশ্য বিস্ময়করও নয়, ভীতিকরও নয়। কারণ শিল্প- সাহিত্য- এগুলো ধাপে ধাপে এগিয়ে যায় আবার পিছনেও যায়। উৎকৃষ্ট সাহিত্য রচনার পর দেখা যাবে যে- কয়েক বছর উৎকৃষ্ট সাহিত্য রচনা হলো না, তারপর নিকৃষ্ট সাহিত্য রচনা হলো। এটা ইংরেজি সাহিত্যে হয়েছে, মার্কিন সাহিত্যে হয়েছে। ইংরেজি সাহিত্যের ক্ষেত্রেতো দেখা গেল- ৪০ এর দশকের পর উকৃষ্ট সাহিত্য রচনা হলো না। মার্কিন সাহিত্যেও তাই। শিল্প সাহিত্য শুধু উৎকর্ষ থেকে উৎকর্ষের দিকে যায় না- সেটা অনেক সময় অপকর্ষের দিকেও যায়। ৫০ এবং ৬০ এর দশকের লেখকরা যে উচ্চতা অর্জন করেছিলেন- ৭০-৮০-৯০ এর লেখকরা সেই উচ্চতায় পৌঁছাতে পারেন নি।

প্রশ্ন: জনপ্রিয়তার দিক থেকে ষাটের দশকের লেখকদের চেয়ে বর্তমান সময়ের বেশ কয়েকজন লেখক জনপ্রিয় বেশিতারপরও কি আপনি সেই কথা বলবেন?

হুমায়ুন আজাদযেমন ধরুন হ্যারেন লরিন্সই। তিনিও প্রচণ্ড জনপ্রিয় ছিলেন। কিন্তু দেখা যাছে ইংরেজি সাহিত্য এবং মার্কিন সাহিত্যে তার কোন স্থান নেই। ইউরোপের জনপ্রিয় সাহিত্য হচ্ছে প্রাপ্ত বয়ষ্কদের জনপ্রিয় সাহিত্য। এগুলোর কোন মূল্য নেই। এগুলো হচ্ছে সাবওয়ের সাহিত্য, মেট্রো সাহিত্য। আমাদের দেশের যে জনপ্রিয় সাহিত্য সেগুলো হচ্ছে- অপ্রাপ্ত বয়স্কদের সাহিত্য। এগুলো হচ্ছে চার পরমার সাহিত্য, টেলিভিশনের নিম্ন মানের নাটকের সাহিত্য।

প্রশ্ন: জীবনে কখনো প্রেম করেছেন কি বা প্রেম বিষয়ক কোন স্মৃতি আছে কি?

হুমায়ুন আজাদ : আমি মূলত বাল্যকাল থেকেই একা থাকতে চেয়েছি। কিন্তু সব সময়ই আমার কিছু বন্ধু- বান্ধবী ছিলো। আমি যখন নবম শ্রেণীর ছাত্র তখন আমার ২/৩ জন বন্ধু ছিলো, ২/১ জন অনুরাগিনী ছিলেন।

প্রশ্ন: অনুরাগিনীকে কি বান্ধবী বলা যায়?

হুমায়ুন আজাদ : আসলে এদের বান্ধবী না বলে বন্ধু বলাই ভাল। এরা আমাকে খুব ভালবাসতো এবং ওদের সঙ্গে আমার একটু ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিলো। যখন আমি গ্রামে ছিলাম। তারপরে আমি যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে এসেছি তখনও আমার বন্ধুর সম্পর্ক ছিলো কিন্তু তীব্র আবেগের মত কোন সম্পর্ক ছিলো না। আমার স্ত্রী তো আমার সহপাঠিনী। তার সম্পর্কেও আমার সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ আবেগের ছিলো না। আমি যখন এডিনবোরায় ছিলাম তখনও আমার ২/১ জন বন্ধু অনুরাগি বন্ধু ছিলো এবং বান্ধবীও ছিলো। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে আমি বিবাহিত হয়েছি। অধ্যাপনা করেছি। এখনো পর্যন্ত আমার বন্ধুর সংখ্যা কিন্তু কম। কারণ আমি খুব কম মিশি তো। আমার অনেক অনুরাগিণী রয়েছেন। আমি জীবনে বার বার আলোড়ন বোধ করেছি। সেই আলোড়নতো মানুষের জীবনে বার বার আসতে পারে।

প্রশ্ন: দুই একজনের নাম বলবেন কি?

হুমায়ুন আজাদনাম বলা বোধ হয় আমার জন্য খুব আপত্তিকর হবে না কিন্তু তাদের জন্য আপত্তিকর হতে পারে। আমার সাথে যাদের সম্পর্ক হয়েছে ( বিদেশীদের ছাড়া, আমি জানি না এখন তারা কোথায় আছে)। আমার তীব্র অনুরাগিনী ছিলেন সিঙ্গাপুরের প্রধানমন্ত্রীর ভাই এর মেয়ে। ওর নাম হলো লিলিয়ান। জীবনে এই প্রথম আমি তার নামটি বললাম। ওকে আমি একটি কবিতাও লিখেছি। আমি যখন এডেনবোরায় ছিলাম ও ছিলো আমার ক্লাসমেট। ও আমার প্রচুর ছবি এঁকেছে। ও আমার জন্য চাইনিজ রান্না করে দিতো। লিলিয়ান শব্দের অর্থ ঘন্টা ধ্বনি। সেতো আমার ঘনিষ্ঠ বান্ধবী ছিলো। অসাধরণ সুন্দরী চাইনিজ তরুণী। চিকিৎসা বিদ্যায় পড়তো। সে কখনো কবিতার কথা শুনেনি। আমার সঙ্গে পরিচয় হবার পর সে কবিতা পড়তে শুরু করেছে। যদিও সে ইংল্যান্ডে বড় হয়েছে। তার বাড়ি হচ্ছে মালয়েশিয়ার পেনাং দ্বীপে। আমার কাছে প্রথম ছাত্রাবাসের রান্না ঘরে তার পরিচয়। আমি তাকে মালারের কবিতা পড়ে শুনিয়েছি, বদলেয়ারের কবিতা পড়ে শুনিয়েছি। সে খুব মুগ্ধ হয়েছে। এক সময় সে আমাকে বলেছিলো- ক্যান ইউ ম্যারি মি। তখন থেকেই তার সাথে আমার বিচ্ছিনতা দেখা দেয়।

প্রশ্ন: আপনি কি নিজেকে এখনো মনের দিক থেকে যুবক মনে করেন?

হুমায়ুন আজাদএটা আসলে ভুল ধারণা। আমাদের দেশের লোকেরা বিশেষ করে লেখকরা বয়স বলতে অস্বস্তিবোধ করে। আমি কিন্তু অস্বস্তিবোধ করি না। অনেকেই আমাকে বলেন, আপনাকে দেখে মনে হয় না, আপনার অত বয়স, আবার কেউ কেউ বলেন, বয়সের তুলনায় অনেক বয়সের মনে হয়। আমার বক্তব্য হচ্ছে- প্রত্যেক বয়সের নিজস্ব সৌন্দর্য্য রয়েছে। প্রত্যেক বয়সের নিজস্ব বৈশিষ্ট্য রয়েছে। আমি ৮০ বছর বয়সে ১৮ বছরের যুবক হতে চাই না। আমি ৬০ বছর বয়সে ১৯ বছরের যুবক হতে চাই না। ২৫ বছর বয়সের যুবকের কি আছে- তার রয়েছে উত্তাল যৌবন এবং যৌবনই মানুষের এক মাত্র সম্পদ নয়। সে তো পরিপক্কতা অর্জন করেনি, অভিজ্ঞতা অর্জন করেনি, সে উপলব্ধি অর্জন করেনি। আমি ৬৫ বছরের মানুষের কাছে ৬৫ বছরের সৌন্দর্য্য আশা করি। যারা বয়স লুকানোর চেষ্টা করেন তাদের মধ্যে আসলে সম্ভোক্তির বাসনা এখনো রয়েছে। ২৫ বছরের যুবকের কাছে আমি প্রধানত সম্ভোগ বা যৌনতা আশা করতে পারি। যৌবন হচ্ছে যৌনতার কাজ। আমার এখনো অনেক কাজ বাকি। আমি যদি সব কাজ শেষ করতে নাও পারি, তাহলে আমার কোন দু:খ থাকবে না। আমি সন্ধার গোধুলি দেখতে দেখতে গরুর পা থেকে যে ধুলোকণা উঠছে সেগুলো দেখতে দেখতে আস্তে আস্তে ঘরে ফিরবো। শুধু আকাশের দিকে তাকাবো এবং দেখবো কীভাবে অন্ধকার নেমে আসছে। কাজেই যৌবনকে আমি একমাত্র কর্ম সময় বলে মনে করি না।

প্রশ্ন: বাংলা টিভি নিউইয়র্কের দর্শক সম্পর্কে কিছু বলুন?

হুমায়ুন আজাদ : নিউইয়র্কের বাংলা টিভির দর্শকদের সম্পর্কে বলবো- আপনারা বাঙালি থাকবেন। সঙ্গে আধুনিক মানুষও হবেন এবং যা কিছু পুরানো, যা কিছু আপনাকে বন্দী করে রাখছে- যা কিছু আপনাদের অনাধুনিক রাখবে সেগুলো পরিহার করবেন। এখনে আমি দেখেছি- একটি সুন্দরী মেয়ে আমাকে যখন বললো- সে হিজাব পড়বে। আমি ভয় পেয়েছি। এটা হতে পারে না, আধুনিক হতে হবে। আপনারা যারা এখানে জীবিকার সন্ধানে বা স্বপ্নের সন্ধানে এসেছেন- তাদের সন্তানরা হয়ত সামনে এগিয়ে যাবে, বাংলাদেশের সাথে কোন সম্পর্কই থাকবে না। আপনাকে অনেক অনেক ধন্যবাদ।আপনাদেরকেও ধন্যবাদ।

সাক্ষাতকারটি নিয়েছিলেন  এনা, বাংলা টিভি।

Comments

comments

error: Content is protected !!