সুত্রপাত / দর্শকের চোখে / “স্পর্শটুকু থাক হৃদয়ে” (গ্রন্থ আলোচনা)
Ruhul amin

“স্পর্শটুকু থাক হৃদয়ে” (গ্রন্থ আলোচনা)

রুহুল আমীন:

“স্পর্শটুকু থাক হৃদয়ে” উর্বশি শিপ্রা দাস, প্রকাশক: ধ্রুপদী প্রকাশনী, ৪২ হাজী মেহের আলী রোড, ইকবালনগর, খুলনা। প্রচ্ছদ: প্রসেনজিৎ মন্ডল, মূল্য: ১৫০ টাকা।

কবি উর্বশী শিপ্রা দাস ময়মনসিংহ জেলার গফরগাঁও এর এক মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের বেড়ে ওঠা মানবিক নারী। ছোটবেলা থেকেই তার কবিতার সাথে গভীর মিতালী। নিজস্ব কাব্যিক ঢঙে তিনি কবিতার শরীরকে অলঙ্করিত করতে ভালবাসেন। তাই তার প্রথম কাব্যগ্রন্থকে সাজিয়েছেন প্রাণোচ্ছ্বল আবেগ আর কল্পনার মায়াজালে। তার কবিতা সাবলীল ও স্বচ্ছ, শব্দ চয়নে বেছে নিয়েছেন সহজ সরল শব্দের বুনন। প্রকৃতি, জীবনবোধ এবং দেশপ্রেমে কবি তার কবিতাকে করে তুলেছেন নান্দনীক। বাছাইকৃত শব্দের উচ্চমার্গের আধুনীকতার ভাবশেলীতে পৌছাতে না পারলেও উপমা আর অলঙ্কারে যে মিথ সৃষ্টি করেছেন তাতে পাঠক হৃদয় নাড়া দেবে বলে আমার বিশ্বাস। প্রেম, ভালবাসা, আবেগ আর জীবনবোধের শিল্প কাব্যগ্রন্থকে সুষমামন্ডিত করেছে। যা সাধারণ পাঠকের কাছে উপজীব্য হয়ে উঠেছে। চৌষাট্টিটি কবিতার সমন্বয়ে এই কাব্যগ্রন্থটি নামকরনে রয়েছে দারুন এক শিল্পের ছাপ। যদিও নামকরণের সাথে প্রচ্ছদের কোথায় যেন খামতি রয়ে গেছে। কাভারপেজের প্রথম ডালা খুলে মোড়কেই প্রকাশক চুম্বক কবিতাটি ছেপে পাঠকের নজর কেড়েছেন। শোভন পেজের এই বইয়ে যেমন ঝকঝকে প্রিন্ট তেমনি বানান ভুল একেবারে নেই বললেই চলে। তবে কবি পরিচিতি তুলে ধরতে গিয়ে প্রকাশক নিজস্ব অভিব্যক্তি তুলে ধরে বলেছেন, লেখিকার বেশ কিছু বই পড়ার সৌভাগ্য আমার হয়েছে। ঠিক পরের অংশে বলেছেন, স্পর্শটুকু থাক হৃদয়ে কবির প্রথম কাব্যগ্রন্থ। দুটি বাক্যের মধ্যে বিরোধ আছে বলে আমার মনে হয়েছে। কবির প্রকাশিত অন্য বই সম্পর্কে এখানে কোন স্পষ্ট ধারনা নেই। কবি “স্পর্শটুকু থাক হৃদয়ে” কাব্যগ্রন্থটি উৎসর্গ করেছেন বাবা ও মাকে। তার এই কাব্যগ্রন্থের বেশ কিছু কবিতার গল্প শরীর নির্মিত হয়েছে তার স্বর্গবাসী বাবা ও মমতাময়ী মাকে নিয়ে। কাব্যগ্রন্থের প্রথম কবিতার শিরোনাম “জনম দুঃখিনী মা”তে মায়ের দুঃখ কষ্ট তুলে ধরে তার কোলে জন্ম নেবার জন্য এবং বাঁচিয়ে রাখার জন্য কবি মাকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন। মায়ের বৃদ্ধ জীবনের ছবি এঁকেছেন “বৃদ্ধাগ্রম” কবিতায়। “মা” কবিতায় কবি মায়ের প্রতি নিগূঢ় ভালবাসা প্রকাশ করে জন্ম দিনের শ্রভেচ্ছা জানিয়েছেন। কবি “পারিনি যোগ্য মা হতে” কবিতায় কবির প্রক্ষাঘাতগ্রস্থ’ দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত বাবার জন্য কিছু করতে না পারার কষ্ট এবং শৈশব কৈশরের স্মৃতিগুলো অনর্গল বলে যাওয়ায় পিতা হারানো পাঠকের চোখে জল আনতে পারে। কবি মনের কল্পনা ও বাস্তব জগতের প্রেম ভালবাসা ও সংসারের ছোঁয়া হৃদয়ে অনুভব করেছেন তা মনের মাধুরী মিশিয়ে ছন্দবদ্ধ ভাবশৈলী হিসাবে তুলে ধরেছেন। তাই “স্পর্শটুকু থাক হৃদয়ে” নামকরণে কবি স্বার্থক। প্রেমিক মনের ভালবাসা প্রকৃতি ও দেশের প্রতি গভীর শ্রদ্ধায় কবি লিখেছেন বেশ কিছু কবিতা। “ওগো বৃষ্টি” কবিতায় কবি বৃষ্টিকে থেমে যেতে বলেছেন, সে যেন প্রিয়ের পথ আগলে না রাখে। “আকাশ তুমি আর কেঁদোনা” কবিতায় কবি হৃদয়ের কান্না আর আকাশের কান্না মিলেমিশে কষ্টের বোঝা কবি আর বইতে পারছেন না বলে অভিব্যক্তি প্রকাশ করেছেন। যদিও কবিতাটিতে কষ্ট বানান কস্ট লেখা হয়েছে। “কেমন হবে সে রাত” কবিতায় কবি হৃদয় বাসর রাত বা ফুল শয্যার কথা মিলনের রাতকে দারুনভাবে কল্পনা করে শিহরিত হয়েছেন। লিখেছেন
“কেমন হবে সেই অনুভূতি
যখন হাতে চুম্বন করবে
কেমন হবে নাড়ির স্পন্দন।
“আমি আর তুমি” কবিতায় কবি তার প্রেমভর্তি হৃদয় নিয়ে প্রেমিকের সাথে নিজেকে তুলনা করেছেন নানা শব্দ উপমায়। কবি দেশপ্রেম থেকে কাব্যগ্রন্থে ঠাই দিয়েছেন দেশের কবিতা। “বিজয় দিবস ও ২১শে ফেব্রুয়ারী” কবিতা দুটিতে কবি তার নিজস্ব ভঙ্গিমায় দিবসের তাৎপর্য ও করণীয় তুলে ধরেছেন। “স্বাধীনতার নব উত্থান” কবিতায় কবি ইতিহাস বর্ননা করেছেন। যাকে সেই অর্থে কবিতা বলা চলে না। “আমি বীরাঙ্গনা বলছি” কবিতায় কবি এই কাব্যগন্থের কবিতাগুলো হতে ব্যতিক্রম। এখানে ৭১এর নির্যাতীত নারীর অপবাদ নিয়ে বেঁচে থাকার কষ্ট তুলে ধরেছেন।

মানবিক হৃদয়ের কবি তার কবিতায় মানবতার জয়গান গেয়েছেন সহজ সরল শব্দ চয়নে। তাইতো “চাই শ্রমের যোগ্য মর্যাদা” কবিতায় শ্রমিকের নায্যতার দাবী তুলে ধরেছেন। পঁচা সমাজ ব্যবস্থার গোড়ামীকে ভাঙ্গতে নতুন সমাজের জন্য সারথি খুঁজে চলেছেন, “তুমি কি আসবে স্বপ্নের সারথি হবে?” কবিতায়।
স্পর্শটুকু থাক হৃদয়ে কাব্যগ্রন্থের একটি বিশেষ চমক হলো কতগুলো অনুকবিতা, কবি তার প্রথম কাব্যগ্রন্থকে সাজিয়েছেন নানা ভাবে। পাঠকের মন জয় করতে “গণি মিয়া ” কবিতায় কবি ব্যঙ্গ ভাবে রঙ্গরসের মাধ্যমে গ্রামের চরিত্রকে সুনিপুনভাবে উপস্থাপন করেছেন। যদিও মাত্রা নিয়ে কবিকে আরো ভাবতে হবে।

সবশেষে “প্রার্থনা” কবিতায় কবির শেষ অভিমান
ফিরে আসবে জীবনে? উঁহু
প্রার্থনা করবো না।

শব্দ ভাবের উচ্চমার্গে পৌছাতে না পারলেও কবির সহজ সরল প্রানবন্ত উপস্থাপনে কাব্যগ্রন্থ “স্পর্শটুকু থাক হৃদয়ে” পাঠক হৃদয় জয় করবে বলে আমার বিশ্বাস।

Comments

comments

error: Content is protected !!