সে এবং মাঝি

আওলাদ হোসেন রনি:

‘মাঝি তুমি নৌকা হবে?’
এ হেন অদ্ভুত প্রশ্নের উত্তরে কি বলা যেতে পারে? মাঝিটি রসিক সুজন। তার হাত দুটি পালের মতো তুলে দিয়ে বলে-
‘ এই বুকে পাও রাখিতে কইন্যার এতো সাধ?’
রাঙা ঠোঁটে দুপুরের রোদ মেলে দেয়, বালিশের মতো নরম রঙিন গালে ঈষৎ ভাঁজ পড়ে তার অর্থ্যাৎ সে হাসে।
‘বুকে তবে কি রাখিতে পারি?’
‘যা রাখার মন চায়। বিশাল দরিয়ার মতো বুক আমার। চাও তো মাথা অথবা তোমার বুক কিংবা নিজেই থাকতে পারো অনায়াসে তুমি।’ বুক উঁচু করে সমুদ্রের প্রশস্ততা দেখায়, হৃদয়ের গোপন বাসনা ছল করে বলে মাঝি।
‘তোমার বুঝি শরম লইজ্জা নাই।’ ভোর রাতের শাদা শাপলার মতো ফুটে বলে ওঠে সে।  ‘ছিলো, ছিলো। সবই ছিলো। মুখরা রূপসীরে দেইখ্যা ভিতরে ঝড় বইয়া গেলো! কি কথা শুনাইলা কইন্যা – লাজ? রূপের হাট দেখনে কইন্যা লাজের কি কাজ?’ শ্রাবণের বৃষ্টির মতো কথাগুলো বলে ঝরঝরে হয় মাঝি।  ‘মাঝি তুমি মখকাটা। রসিক বটে কিন্তু সূরুযরে ধরিবার চাও। এতো সাধ পতঙ্গের মতো। জ্বলে যেতে পারো মাঝি, পুড়ে যেতে পারে জিহ্বার তেজ!’ ছাতুরী আত্মরক্ষণের পর নদীর জলে রাঙা পায়ে জল ছিটিয়ে হরিণ শাবকের মতো ছুটে যায় সে। খলখল হাসির শব্দ বাতাসে মিলিয়ে যায়। পিছন থেকে মাঝির চোখের দৃষ্টি তাকে বিদ্ধ করে।

পরদিন ভোর হলে পরে- সকালের রাঙা সূর্য যখন ওঠে। আলুথালু কেশে মাঝি আবার বসে নৌকায়। বসে বসে ঢুলে। হাতের বৈঠায় সব ভার ছেড়ে দিয়ে মাঝি ভাবে, অথবা স্বপ্ন দেখে। গতরাতে যে এসেছিলো ঘুমে, মূহুর্তের অসর্তকতায় সব নিয়েছে কেড়ে, সে কি তবে আর আসবে না দিনের আলোয়, পূর্ণ করে দিতে?  যখন সূর্য ওঠেছে তেতে। ধরণীরে জানিয়েছে তার বৈভব। তখনো মাঝি ঢুলছে, স্বপ্নে আরেকবার দেখতে চাইছে সেই অবয়ব। তখনি বাঁশির মতো হাসির সুরে ফিরে পায় সম্বিত। মাঝি ঘুরে, ফিরে তাকায়, দেখে ঘুম তার কেটে গেছে। অন্ধ কোঠরে জ্বলছে আলো, তীরে দাঁড়ায়ে আছে শরবিদ্ধ হরিণ।

‘এই তো এলে, তবু এলে? আমারে করে ছাই। এখন কি পোড়া বুক জুড়াবার মতো কিছু নাই?’ কথা ক‘টি বলে মাঝি মাটির ধরণীতে প্রত্যাবর্তণের ঘোষণা দেয়।
‘কি হইলো? দরিয়ায় কিভাবে লাগিল আগুন?’ ফের তার জ্বালাময়ী মগজে আগুন ধরা টিপ্পনী কাটে সে।
‘দরিয়া আর নাই লো! বিবাগী যৌবনে সব পুড়ে গেছে। সবুজ উদ্যানে মড়ক লেগে সব মরুভূমি।’ এত অসহায় মাঝি আর হয় নি কখনো। তখন সে তীরে, গাঙের পূবালী বাতাসে এলো তার চুল, নাতিদীর্ঘ শাড়ির আঁচল লিলুয়া বাতাসে ঘুড়ি ওড়ায়। এখনো তেমনি সে গতরাতের মতো। মাথার উপরে সূর্য, সর্বনাশী তাপ তার নরম শরীরে।

কাঁচের চুড়ির মতো মিষ্টি শব্দে সে আবারো বাক্য ছুঁড়ে-
‘ক্যান মাঝি? এক রাইতেই? ধরে বুঝি রাখতে পারো নাই? কেমন মরদ তুমি?’
‘ রাখতে আমি সবই পারি কইন্যা। এমন হয় নাই আগে। ভিতরে জ্বলে পুড়ে সব অঙ্গার হয়ে যায়। জল ঢালো কইন্যা বাঁচাও আমায়।’ তৃষ্ণার্ত ছাতকের মতো মাঝি অনুনয় করে।
‘তোমার মতো এমন দেখি নাই আগে। আর যাই হও, মাঝি মরদ তুমি নও।’ আবারো সে চলে যায় গোপন মেঘের আড়ালে।

অতঃপর রাত হলে ভাদ্র মাসের পূর্ণিমা ভাসিয়ে নেয় সারা পৃথিবী। এধারে-ওধারে পরে থাকে নরম জোছনা। এখানে নদীতে মাঝি বিহ্বল হয়ে জলের উপরে। জোছনার মতো সাদা আয়নায় চোখ মেলে থাকে। সে ভুলে গেছে তাকে। এই নিস্তব্ধ বিশ্ব চরাচরে। জেগে আছে কিছু ঝিঁঝিঁ, নীল জল, জোছনার প্লাবন। তার মাঝে জেগে আছে মাঝির বিবাগী মন। নদীর কূল আছে, তার ভাবনার কূল নেই। কেন, কি তার কারণ? যারে সে দেখে দিবাস্বপ্নে, শয়নে, জাগরণে- সে কি তার মহ মহাজন? সে কি তবে পড়লো প্রেমে?
যখন গ্রামের সব আলোগুলো একে একে নিভে। অন্ধকারের দ্বীপে যখন জোছনার রাজত্ব। যবে নিশুতির পেঁচাগুলো ক্লান্ত হয়ে ডাকছে বারেবার। প্রেমিকার মন তখন সর্বনাশা ডাকে, ঘর থেকে ছুটে। মাঠের শীতল ঘাস দু‘পায়ে মাড়িয়ে, জোছনার চাদর বাতাসে উড়িয়ে, সে এস দাঁড়ায় তীরে। দেখে মাঝি তার তেমনি আছে বসে। বৈঠায় ভর দিয়ে বিহ্বল হয়ে।

অবলার ব্যাকুল মন। অতশত বিচার বা রোমান্টি কালক্ষেপণের ধৈর্য তার নেই। নৌকায় ওঠে বলে-
‘মাঝি তুমি নৌকা হয়। আমারে ভাসায়ে নিয়ে যাও, এই জোছনা রাজ্যে। সতীনের ঘরে সোনার যৌবন চষেছে বুড়ায়, তবে কি আর হবে? নিয়ে যাও মাঝি, শীতল করো। আমারে বাঁচাও মাঝি। এই দুর্লভ যৌবন, শরীরের ভার আমি রাখিতে নারি।’
সহাস্যে মাঝি তখন নৌকায় জোর বৈঠা চালায়। ভরা জোছনায় দুই কূল ছেড়ে নৌকা ভাসায়ে মাঝি বলে-
‘আমি কিন্তু পারি।’

Comments

comments